ধ্রুব নীলের কিশোর সায়েন্স ফিকশন গল্প
স্কুলের উত্তরে পরিত্যক্ত একটা ক্লাসরুম। তার পেছনে জলাভূমি। সেখানে ধান চাষ হয়। মাঝে মাঝে বক-মাছরাঙা দেখা যায়। ভবনের ওই কোণাতেই দেয়ালে ঠেস দিয়ে পড়ে থাকে সাইকেলটা। পড়েই থাকে। ওতে চড়ে কে আসে, কেনই বা সেখানে পড়ে থাকে সাইকেলটা, কে জানে! কেউ জানার চেষ্টাও করেনি কোনোদিন। ক্লাস টেনের পপেল ছাড়া।
পপেল তার বন্ধু রানাকে বলেছে বিষয়টা। পাত্তাই দিল না।
‘পুরানা ফোনিক্স সাইকেল। এ আর এমন কী। এমনি পড়ে আছে।’
‘এখানে প্রতিদিন কে রেখে যায়?’
‘কেউ রাখে না। আগে থেকেই ছিল বোধহয়।’
‘মাঝে মাঝে তো দেখা যায় না।’
‘তখন মনে হয় স্কুল বন্ধ থাকে।’
রানার বোকামি টাইপ কথা শুনে বিরক্ত হয় পপেল। বলে ‘সাইকেল যদি এমনি এমনি আসে, তার সঙ্গে স্কুল খোলা-বন্ধের কী সম্পর্ক!’
‘ও। তা হলে কেউ নিয়ে যায়, আবার রেখে যায়। আমি গেলাম। টিফিন টাইম শেষ হয়ে যাবে। পরে খিদে পেলে ফোনের অ্যাপগুলোকেই খেয়ে ফেলতে পারি।’
পপেলের ভাবনা কাটছে না। যে ঠিক করেছে মরিচা পড়া সাইকেলটা নিয়ে গবেষণা করবে। কেন এভাবে এক কোণে পড়ে থাকে, কে আসে, কে যায়, কখন যায়, জানা চাই উত্তরগুলো।
ক্লাসের সমস্ত টিচার আর দপ্তরিকে খেয়াল করেছে, কয়েকজনকে জিজ্ঞেসও করেছে। কেউই উত্তর দিতে পারল না। একদিন তো সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সাইকেলটাকে এক চুল সরতে দেখেনি। তার চিন্তা হলো সাইকেলে যতই যন্ত্রপাতি থাকুক, ওটা নিজে নিজে চলতে পারে না। তবে কি ভূত টুথ কিছু! দুর! কী সব আবল তাবল ভাবছে।
দুদিন পরের কথা। এ দুদিন পপেলের সঙ্গে গবেষণায় ছিল রানাও। এমনি এমনি নয়, বিনিময়ে রানাকে দুটো ট্রলের গ্রাফিক্স ডিজাইন করে দিতে হয়েছিল।
‘চল পপেল, সাইকেলটা চালাই। আমি চালাব, তুই পেছনে উঠবি। দেখি কেউ কিছু বলে কিনা।’
‘কিন্তু…।’
‘তোর ভয় লাগছে? খিক খিক। আমার ভয়ডর নাই, চল।’
রানা দৌড় দিল সাইকেলটা নিতে। সঙ্গে পপেলও। সাইকেলের ঠিক সামনে যেতেই থমকে গেল রানা। মনে হলো যেন একটা ধাক্কা খেয়েছে।
‘সাইকেলে কারেন্ট আছে মনে হয়!’
পপেল এদিক ওদিক তাকাল।
কোনো কারেন্টের লাইন দেখতে পেল না। ‘আস্তে ধরে দেখ।’
রানার সাহস মাত্রাতিরিক্ত। খপ করে হ্যান্ডেলটা ধরে ফেলল! কিছুই হলো না। কেমন যেন দুলে উঠল সাইকেলটা। খেয়াল করল, শুধু সাইকেল নয়, সব কিছুই দুলে উঠল। ভূমিকম্পের মতো দুলুনি নয়। একেবারে লেজেগোবরে দুলুনি। রানা ভয়ে ভয়ে তাকাল পপেলের দিকে। পপেলের মুখটা একবার লম্বা, আরেকবার মার্বেলের মতো গোল দেখাচ্ছে। একবার মনে হলো দূরের জামগাছটা একেবারে কাছে আরেকবার বহু দূরে। নিচের মাটিতেও কেমন ঢেউ খেলছে।
‘অ্যাই, সাইকেল ধরেছিস! আজ তোদের দুই ঘণ্টা নিল ডাউন! মুরগির মতো গোটা মাঠে লাফাবি, বুঝলি!’
ভড়কে উঠল দুজন। দ্রুত সাইকেল ছেড়ে দিল রানা।
‘কেক! কে! কে আপনি!’
‘হারামজাদা! সালামটাও দিতে শিখিসনি! আমাকে জিজ্ঞেস করিস আমি কে!’
‘আ.. আ.. আমরা আসলেই চিনতে পারছি না।’ টেকো মাথার মধ্যবয়সী ছোটখাট লোকটার দিকে চেয়ে ভয়ে ভয়ে বলল পপেল।
‘আমি তোদের নেপাল স্যার! পদার্থবিজ্ঞান পড়াই! এখন বুঝলি সোনামানিকরা! বেতের বাড়ি খাবি চল! অবশ্য তোদের চেনা মনে হচ্ছে না। তোরা কোন স্কুলের? দেখেতো সাইকেল চোরও মনে হচ্ছে না।’
‘আমরা সাইকেল চোর নই। এ স্কুলেই পড়ি। ক্লাস টেনে। সায়েন্স গ্র“প। আমার রোল দশ ওর তিন।’
‘অ্যাঁ, চোরের গলায় মামদোবাজি! দেখবো তোরা কী করে এসএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশন পাস!’
‘অ্যাঁ!’ পপেল আর রানা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
‘স্যার, ফার্স্ট ডিভিশন কী? জিপিএ ফাইভ?’
এরপর নেপাল স্যারের সঙ্গে দুই কিশোরের কথাবার্তা চলল আরো অনেকক্ষণ। দুই কিশোর খেয়ালই করল না যে তাদের চারপাশের অনেককিছুই বদলে গেছে। পরিত্যাক্ত ভবনটা চকচক করছে। ভেসে আসছে ছাত্রদের শোরগোল। সাইকেলটার পাশে আরো অনেকগুলো সাইকেল। কলতলায় কল চেপে পানি খাচ্ছে কেউ কেউ।
শেষমেশ তর্কবিতর্ক শেষে নেপাল স্যার এটা বুঝতে পারলেন ছেলেদুটো বড় গণ্ডগোলে পড়েছে। ওদের পকেটে দুটো উন্নত বৈদ্যুতিক যন্ত্রও পেয়েছেন তিনি। সেই যন্ত্রে ছবি তোলা যায়, গান শোনা যায়, ভিডিও দেখা যায়, আরো যে কত কী।
‘তো, তোরা ২০১৯ সাল থেকে এসেছিস?’
কথা হচ্ছিল স্যারদের কমনরুমে। অন্য ছাত্ররা উঁকিঝুঁকি মারছে। তারা খুব অবাক। নেপাল স্যারের মতো জাঁদরেল স্যারের সামনে চেয়ারে বসে কথা বলছে দুটো ছেলে!
‘২০১৯ সালে কি মানুষ মহাকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে? গ্রহ নক্ষত্র গ্যালাক্সিতে হামলা টামলা চলছে?’
‘না স্যার বিশেষ কিছুই হয়নি। মানুষ আর চাঁদেও যায়নি, গ্রহ নক্ষত্র তো দূরের কথা।’
‘অ্যাঁ, বলিস কী! তার মানে আমরা এখন সব গর্দভদের পড়াচ্ছি! এরা বড় হয়ে নতুন কিছুই বানাতে পারল না!’
‘স্যার, শুধু এই ফোনটা বানিয়েছে।’
‘ফোন! টেলিফোনতো এখনো আছে! টেলিগ্রামও আছে। তোদের এই এসএমএস ফেসেমেসের কী দরকার শুনি! যত্তসব! আর ছবি কি আমরা এখন তুলতে পারি না!’
‘স্যার আমাদের ফেসবুক আছে। সেখানে আমরা সবাই বন্ধু বানাই, মানে বন্ধুর মতো আর কি। মানে.. মানে.. তারপর ধরেন স্যার চ্যাটিং.. মানে কথাবার্তা..।’
‘চোপ! একদম চোপ! অবশ্য তোদের ওপর রাগ করে লাভ কী! গাধার দল তো আমাদের স্কুলেই আছে। এই গাধারা বড় হয়ে এই সব বানিয়েছে! আমি আশা করেছিলাম মিনি নিউক্লিয়ার ফিউশন বানাবে, মানুষ আকাশে বাড়ি বানাবে, সমুদ্রের তলায় মাছ আর সবজির বাজার বসবে। উফফ এখন কী শোনাচ্ছিস তোরা!’
‘স্যার বাদ দিন এসব। আপনার মন আরো খারাপ হবে। আমাদের তো মনে হচ্ছে এখনই বেশ আছে সবাই। আমরা যদি আবার এ সময়ে আসতে পারতাম…। সে যাক, কিন্তু স্যার আপনার সাইকেলের রহস্যটা কী! ওটা কেন প্রতিদিন স্কুলে আসে?’
‘সম্ভবত স্কুলের ওই কোণায় একটা অ্যানোম্যালি আছে। অ্যানোম্যালি মানে..’ বলে নেপাল স্যার একটু দম নিলেন। অ্যানোম্যালির যুৎসই বাংলা পাচ্ছেন না। তারপর বললেন, সম্ভবত এখানকার স্থান-কালে কোনো গোলমাল আছে। আমি সাইকেলটা এনে রাখলেই গোলমাল শুরু হয়। সাইকেলটা আমার বহুদিনের সঙ্গী। ওটার সঙ্গে মাঝে মাঝে গপসপ করি। মহাবিশ্ব, ব্ল্যাকহোল, আইনস্টাইন কত কথা যে হয়। সাইকেলটা বোধহয় সেসব কথা শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।’
দুই বন্ধু আবার একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। বুঝতে পারল ১৯৯৯ সালের এই নেপাল স্যার খেই হারিয়ে ফেলেছেন। তবে স্যারের শেষ কথাটা তাদের খুব মনে ধরল।
‘সাইকেলটা সম্ভবত আমার সেইসব বিজ্ঞানের লেকচার খুব মিস করে। এ কারণে সে দেয়ালে কান পেতে থাকে।’
bangla humour story poem poetry অণুগল্প অতিপ্রাকৃত গল্প আব্দুস সাত্তার সুমন আসাদুজ্জামান খান মুকুল এম. আব্দুল হালীম বাচ্চু কবিতা কবির কাঞ্চন কিশোর গল্প গল্প ছোটগল্প ছোটদের গল্প ছড়া থ্রিলার ধ্রুব নীল নবী হোসেন নবীন নারী নার্গিস আক্তার নিরামিন শিমেল পরাবাস্তব গল্প পিঁপড়ার গল্প প্রাপ্তবয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের গল্প প্রেমের গল্প ফারুক আহম্মেদ জীবন বাবা বাবার গল্প বিবেক বিবেকের গল্প ভূতের গল্প মোঃ আশতাব হোসেন রকিবুল ইসলাম রমজান রম্য রচনা রহস্যজট রাকিবুল ইসলাম রোমান্টিক গল্প শিশুতোষ গল্প শিশুদের গল্প সাইকোথ্রিলার সামাজিক গল্প সায়েন্স ফিকশন হরর গল্প