রোবটপাড়ায় সঙ্কট


লেখক: ধ্রুব নীল

ধরন: রম্য রচনা

প্রসঙ্গ: পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে মানুষের কাটা মাথা লাগবে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণাকে কুচক্রী মহলের গুজব বলে জানিয়েছে সেতু প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

খবরের লিংক

‘বাবা হাজারখানেক চার্জ দাও। দোকানে যাব। একটা সুপারকনডাকটর খাওয়া লাগবে। একটা অ্যাটমিক অ্যাপ বানাচ্ছি তো।’
‘পপ-২৪৬! এসব করতে মানা করেছি না! উল্টোপাল্টা খেলে পরে তোর হার্ডডিস্কে ব্যথা করবে!’
‘একটা সুপার খেলে কিছু হবে না বাবা!’
‘আহা! আমাদের সময় চল্লিশ মিলিঅ্যাম্পিয়ার চার্জে কী সুন্দর আইসি পাওয়া যেত! এখনকার এসব সুপারকনডাকটরে..।’
‘কথায় কথায় ছেলেকে তোমাদের সময়ের গল্প শোনাবে না! বরং ওকে সাবধানে থাকতে বলো। রোবটধরা বের হয়েছে।’
গিন্নির কথায় এ কালে ফিরে এলেন বজ-৪৫ মডেলের বাবা রোবট।
‘অ্যাঁ! পপকে ধরবে কেন? কে ধরবে! কেন ধরবে!’
‘খবর কিছু রাখো! আন্তঃগ্যালাক্টিক স্পেস-টাইম সেতু তৈরি হচ্ছে আমাদের রোবটপাড়ায়। ওটা হয়ে গেলে কী যে দারুণ কাণ্ড হবে! ফুরুৎ করে রোবটপাড়া থেকে রোবটগ্রহে যেতে পারব। মানুষের গ্রহে মানুষ থাক! আমরা ভাগি!’
‘তো? ব্রিজের সঙ্গে ছেলেধরার কী সম্পর্ক?’
‘আরে! কে যেন বলছে ওই স্পেস-টাইম ব্রিজ বানাতে নাকি নবম মাত্রার রোবটের মাদারবোর্ড লাগবে। কী দিনকাল যে এলো!’
‘এ কেমন কথা! মাদারবোর্ড লাগবে কেন!’
‘গুজব হোক, যাই হোক, পপ-২৪৬কে সতর্কতার শিক্ষা দাও! ও তো নবম মাত্রার রোবট। ওর জন্য ভয়। তোমার মতো সেমিকনডাকটর হলে তো চিন্তা ছিল না! অনেক বেলা হলো। ক্যালকুলেটরগুলোকে চার্জ দিতে হবে। এর মধ্যে আবার আমার বান্ধবী সিরি-৬৫৭ কল দিয়েছে। ওর ননদের প্রসেসরে রেজিস্টার ধরা পড়েছে। ব্লক সারাতে আবার আইবিএম-এ ভর্তি করাতে হবে নাকি।’
বজ-৪৫ এর কানে আর কোনো কথা ঢুকল না। ছেলেকে নিয়ে টেনশনে পড়ে গেলেন। ঘটনা যদি গুজব না হয়? মাদারবোর্ডে অনেকগুলো সুপারকনডাকটর। এগুলোর সঙ্গে স্পেস-টাইমের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? সেতু বানানোর জন্য অ্যাটমিক চিপের ঘাটতি পড়ল নাকি?
ঘটনা পরিষ্কার করার জন্য সংবাদ পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন বজ। কিন্তু চোখ আটকে গেল আরেকটা খবরে। নতুন এক জাতের মশার আমদানি হয়েছে মানুষপাড়ায়। ধারণা করা হচ্ছে কোনো এক উল্কাপিণ্ডতে চড়ে এসেছে ওরা।
‘এলিয়েন মশা! এইবার মানুষের দল বুঝবে মজা!’
বিড়বিড় করতে করতে স্ত্রীর সঙ্গে কাজে হাত দিলেন বজ। বাক্স থেকে এক মুঠো ব্যাটারি নিয়ে ছিটিয়ে দিলেন পোষা ক্যালকুলেটরগুলোর খাঁচায়।
‘মশার খবরটা শুনেছো?’
‘শুনবো না কেন! আমার অ্যান্টেনা কি ভোঁতা!’
‘মানুষের তো খবর আছে। আমাদের কিছু হবে না তো আবার। এলিয়েন মশা যদি আবার আমাদের হামলা করে?’
‘আমার সোনার বরণ ত্বক। টাইটেনিয়াম গোল্ড অ্যালয়। তোমার মতো ফাইবারের বডি না!’
‘অ্যাঁ, এখন উপায়? ভিনগ্রহের মশা যদি আবার ভাইরাস ছড়ায়!’
‘কী আর করবে। বিয়ের সময় যে ক্রিমিয়াম আয়ন ব্যাটারগুলো দিয়েছিলে, সেগুলো বেচে একজোড়া স্বর্ণের পা বানিয়ে দেব তোমাকে!’
ঝগড়া বাদ দিয়ে উদাস মনে ঘর ছেড়ে হলেন বজ-৪৫। মোড়ের লিকুইড ব্যাটারির দোকানে যাবেন। একটু চার্জও হলো, সঙ্গে আড্ডাও। বের হতেই পথ আগলে দাঁড়াল পুরান আমলের মরিচা পড়া কটকটি-৪২। মেজাজ বিগড়ে গেল বজ’র। একদলা ইলেকট্রনিক জঞ্জালের একটা বস্তা হাতে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে রোবটটা।
‘কুথায় যাচ্ছেন মহাশয়?’
‘তুই এখানে কী করছিস! ব্যাটা মুর্খ। শুদ্ধ ভাষার অ্যাপ নেই!’
‘আপনার পুলার নাকি নবম মাত্রার মাদারবোর্ড আছে। হে হে হে।’
ব্যস! নিয়ন্ত্রণ মডিউলের ডাটা-বাসটা মুহূর্তের মধ্যে স্পার্ক করে বিগড়ে গেল। সপ্তম মাত্রার ইস্পাতের বডি বজ-৪৫ এর। সেটা দিয়ে দুড়ুম দাড়ুম পেটাতে লাগলেন কটকটিকে। তারওপর বজ-৪৫ এর হার্ডডিস্কে আবার পাঁচ ধরনের মারামারির অ্যাপ ইন্সস্টল করা আছে। বেচারা কটকটি-৪২ সুবিধা করতে পারছে না।
আশপাশে রোবটের ভিড় জমে গেল। মার থামাচ্ছেন না বজ-৪৫।
‘আজ তোরে শাটডাউন যদি না করসি!’
‘বজ ভাই, থামেন থামেন!’
হই হই করে এগিয়ে এলো কয়েকজন। ধরাধরি করে থামাল বজ-৪৫কে।
‘আপনি রোবট হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন কেন! আপনি তো মানুষ না!’
‘ও আমার পোলারে চুরি করতে আসছে!’
রাগে বজ-৪৫ এর কপালের তিনটি এলইডি বাতি জ্বলছে নিভছে। চোখ থেকে মবিল মুছতে মুছতে বলল কটকটি-৪২, ‘বিশ্বাস করেন রোবট ভাইসব। আমি শুধু হালহাকিকত জিগাইসি। আমি রোবটধরা না।’
‘বজ মিয়া। ও ঠিক কইসে। ওরে আমরা চিনি। ওর র‌্যামে একটু গণ্ডগোল আছে। মাঝে মাঝে উল্টাসিধা আউটপুট দেয়।’
রাগের অ্যাপটা ক্রাশ করলো বজ-৪৫ এর। দ্রুত সামলে নিলেন। আফসোসও হলো।
‘ইয়ে, আসলে আমার পোলারে নিয়া…।’
কথা না বাড়িয়ে মানে মানে কেটে পড়লেন বজ-৪৫। টংয়ের দোকানে এসেই খটাং করে বসে পড়লেন। তরল হাইড্রো-কার্বন খাচ্ছিল বগা সিরিজের দুই বুড়ো রোবট।
‘চাচা মিয়া, নতুন মশার আমদানি হইসে শুনলাম। মানুষতো এইবার ধরা।’
‘তুমি তো আধা খবর রাখো বজু মিয়া। এই মশা তো মানুষরে কামড়াইতাসে না। এগুলা আয়রনিয়াম গ্রহের মশা। পুরান লোহালক্কড় খায় আর মেটাল বডিরে কামড়ায়। এগুলার সার্কিটে আবার ডিংডিংগু নামের একটা ভাইরাসের কোড আছে। কামড় দিলেই..।’
কথা শেষ করতে পারল না বুড়ো বগা-২৪০। তার আগেই সটান দাঁড়িয়ে গেল। চোখ দিয়ে ঠিকরে বের হচ্ছে লাল নীল আলো। একটু পর হেঁড়ে গলায় বিচিত্র একটা গান গাইতে শুরু করল, ‘চিঁ চিঁ চিঁ.. আ…মি পাথরে হুল ফোটাব! হুল! আমি পুরান জঞ্জাল চিনতে করি না ভু…ল।’
অবাক হয়ে বগা চাচার দিকে তাকিয়ে আছে বজ-৪৫ ও বাকিরা। একটু পর রোবটটার লুঙ্গির কোচড় থেকে বেরিয়ে এলো বীকটদর্শন একটা মশা। পরিষ্কার বাংলায় বলল, ‘আয়রনিয়াম গ্রহের পক্ষ থেকে আপনাদের অভিবাদন। রোবট নগরীতে আমরা বসতি গড়তে যাচ্ছি। এ জন্য আপনাদের শরীরে কামড়ের মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সফার করতে এসেছে আমাদের একটা দল। মানুষরা আমাদের এই পাড়ায় পাঠিয়েছে। তারা চায় না আপনারা এখানে থাকুন।’
মশাটার কথা শুনে মেজাজ দ্বিতীয়বার চড়ে গেল বজ’র। এগিয়ে এসে তালি মারলেন। ঝননন! নাহ মরল না মশাটা। বজ’র তালিটা ওর সেন্সরে আগেই ধরা পড়েছিল। ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছে মশাটা।
‘আমাদের তালি দিয়ে মারতে পারবে না বোকা রোবট। যাই হোক, আমাদের অনেক খিদে। আমাদের অনেক অনেক আয়রণ পরমাণু ও আগানে বাগানে জমে থাকা বাতিল সুপারকনডাকটর চিপ লাগবে। তারপর দেখাবো খেলা!’ এই বলে বোঁ বোঁ শব্দ পাখা নাচিয়ে চলে গেল ভিনগ্রহের মশাটা।
মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে গেল রোবটপাড়ায়। মেটাল মশার আতঙ্কে অনেকের সিস্টেম হ্যাংও করেছে। বজ ও তার স্ত্রী তাদের সন্তানকে নিয়ে কোথায় পালাবেন বুঝতে পারছেন না।
‘বাবা! ও কী বলেছে শুরু থেকে বল।’
জ্বলজ্বল করছে পপ-২৪৬ এর চোখজোড়া। শুরু থেকে সব বললেন বজ-৪৫। শুনে খুশিতে চিৎকার দিল পপ, ‘ক্রিউরেকা! বাবা আমি যাচ্ছি। ট্রান্সমিটার স্টেশনে যেতে হবে। আমার ক্লাসের সব বন্ধু আর সবাইকে একটা বার্তা দিতে হবে।’
তিন দিন পর। রোবটপাড়ায় শান্তির সুবাতাস। ভিনগ্রহের ধাতব মশার মরদেহ পড়ে আছে সবখানে। ধাতব জ্বালানির অভাবেই বেশিরভাগ মারা গেছে। বাকিরা আশ্রয় নিয়েছে মানুষপাড়ায়। এদিকে সবার চোখে হিরো হয়ে গেছে পপ-২৪৬। কেন? কারণ তার আবিষ্কার করা অ্যাটমিক অ্যাপ! অ্যাপটাকে ধোঁয়া আকারে ছড়িয়ে দিয়েছে পপ ও তার বন্ধুরা। সেই ধোঁয়ার স্পর্শ পেতেই বদলে গেল ভিনগ্রহের মশাদের কোর সফটওয়্যার। বিচিত্র আচরণ শুরু করল ওরা। ধাতু বাদ দিয়ে খুঁজতে শুরু করল ময়লা, আবর্জনার স্তূপ আর নর্দমা। কিন্তু ওসব নিয়ে তো বাস করে তো মানুষেরা, রোবটপাড়ায় ময়লা আবর্জনা পাবে কোথায়!

bangla humour story poem poetry অণুগল্প অতিপ্রাকৃত গল্প আব্দুস সাত্তার সুমন আসাদুজ্জামান খান মুকুল এম. আব্দুল হালীম বাচ্চু কবিতা কবির কাঞ্চন কিশোর গল্প গল্প ছোটগল্প ছোটদের গল্প ছড়া থ্রিলার ধ্রুব নীল নবী হোসেন নবীন নারী নার্গিস আক্তার নিরামিন শিমেল পরাবাস্তব গল্প পিঁপড়ার গল্প প্রাপ্তবয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের গল্প প্রেমের গল্প ফারুক আহম্মেদ জীবন বাবা বাবার গল্প বিবেক বিবেকের গল্প ভূতের গল্প মোঃ আশতাব হোসেন রকিবুল ইসলাম রমজান রম্য রচনা রহস্যজট রাকিবুল ইসলাম রোমান্টিক গল্প শিশুতোষ গল্প শিশুদের গল্প সাইকোথ্রিলার সামাজিক গল্প সায়েন্স ফিকশন হরর গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *