নষ্ট সময় একটি সামাজিক গল্প । লিখেছেন শাকিলা নাছরিন পাপিয়া।

এক
শ্রাবণ মাস অথচ আকাশের কোথাও মেঘ নেই। ঝকঝকে নীল আকাশ। চারিদিকে রোদ। মনে হচ্ছে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। গরমে অস্থির পৃথিবীর জীবকুলের প্রতিটি প্রাণী।
‘শ্রাবণ শব্দটার সঙ্গে ভেজা ভেজা একটা ভাব আছে। পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন সেই ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। এখন আর বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় না। শীতকালে শীত থাকে না।
ঋতু কখন আসে কেমন করে আসে কে জানে।
হাতের ক্রেষ্টটির দিকে তাকিয়ে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে রফিক মাস্টারের। ২২ বছরের চাকুরি জীবনের প্রথম স্বীকৃতি। শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের স্বীকৃতি। বারবার ক্রেষ্ট আর সার্টিফিকেটের দিকে তাকায় সে। বাসার দূরত্বটা আজ বেশি মনে হচ্ছে।
গরমে ঘেমে যেন গোসল করে উঠছে। শার্ট-প্যান্ট ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপটে আছে। তারপর কেমন যেন একটা ভাল লাগায় আচ্ছণ্ণ হয়ে আছে মন-প্রাণ।
বাসায় পৌঁছে স্ত্রী শিখাকে আর কন্যা স্বপ্নাকে যতক্ষণ তার পুরস্কার দেখাত না পারছেন ততক্ষণ যেন স্বস্তি নেই। রফিক মাস্টার অতি নিষ্ঠার সঙ্গে এই ২২টি বছর ধরে শিক্ষকতা করে আসছেন। হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী এ পর্যন্ত তার স্কুল থেকে পাস করেছে। এতদিনে তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে সম্মান পেয়েছেন। আগামীকাল পত্রিকায় তার ছবি আসবে।
ভালো লাগায় আচ্ছন্ন ছিলেন রফিক মাস্টার। হঠাৎ রিক্সাওয়ালার কণ্ঠস্বর, ‘স্যার এইবার নামেন।‘
গল্প : নষ্ট সময়
অতি সাবধানে ক্রেষ্ট আর সার্টিফিকেটটি হাতে নিয়ে রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিতে গেলে রিক্সাওয়ালা জিভ কেটে বলে, ‘না স্যার। টাকাডা পকেটে রাহেন। আমি আপনের ছাত্র। আপনের মনে নাই।‘
রফিক মাস্টার বিস্ময় নিয়ে তাকায়, ঘেমে গোসল করে উঠেছে তার ছাত্রটি। এই রোদে এতখানি পথ এসে ভাড়া নেবে না তা কি হয়?
তিনি বেদনার্ত দৃষ্টিতে ছাত্রটির দিকে তাকালেন। টাকাটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ভাড়া না হয় নাই বা নিলি। টাকাটা ধর। ছেলে, মেয়েদের জন্য কিছু কিনে নিস। কে জানে কেন ছেলেটির ঘামে ভেজা কালো মুখের দিকে তাকিয়ে দু’চোখ ভিজে উঠল তার।
‘স্যার আমার নাম সম্রাট। সেই যে আমার বাপে বিয়া কইরা আমারে আর আমার দুইটা বইনরে ফালাইয়া গেলোগা। আপনে গেলেন পরীক্ষার আগে আগে খবর নিতে। আমি স্কুলে যাই না ক্যান। আমার মায়ের কাছে সব হুইন্যা আমারে স্কুলে লইয়্যা আইলেন। পরীক্ষার ফিস দিলেন। ঈদের সময় নতুন জামা কিন্যা দিলেন। মনে আছে স্যার?”
রফিক মাষ্টার যাদের শিক্ষক তাদের অনেকের জীবনের ঘটনাই এমন। ক’জনের কথা মনে রাখবেন তিনি।
ছেলেটি যেমন আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে মুখের দিকে।
সে দৃষ্টির সামনে না বলা যায় না।
তিনি ক্লাসে শিক্ষার্থীদের বলেন, সব সময় সত্যি কথা বলবে। সত্যই সুন্দর, সত্যই মুক্তি।
তিনি কি পারেন সব সময় সত্যি কথা বলতে? না, পারেন না।যেমন এই মুহূর্তে পারছেন না।
তিনি কোমল দৃষ্টিতে তার ছাত্রটির পানে তাকিয়ে আছেন। করুণ হাসিতে বুঝিয়ে দিলেন চিনেছেন। যে মিথ্যা ছেলেটিকে একটু আনন্দ দিবে সে মিথ্যাটুকু না হয় আজ বললেন। ছেলেটি আচমকা পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল,” স্যার এই বার যাই।”
রফিক মাস্টার অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন রিক্সাটার দিকে। রিক্সাটা চোখের আড়াল হবার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গেটের কলিং বেল বাজালেন তিনি। মনের ফুরফুরে ভাবটা এখন আর নেই। চাপা একটা বেদনা অনুভব করলেন বুকের মাঝে। বিড়বিড় করে বললেন, সম্রাটেরা কি বংশানুক্রমিকভাবে দারিদ্রতার বোঝা বয়ে বেড়াবে?
গল্প : নষ্ট সময়
তাদের ভাগ্যে কি কখনও পরিবর্তন আসবে না?
স্বপ্না গেট খুলে দিল। আতংকিত দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা তাড়াতাড়ি এসো। ভাইয়ার পাগলামী বেড়েছে। আজ মায়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।”
শিখা শোবার রুম থেকে বেড়িয়ে আসতেই রফিক মাস্টার শুকনো মুখে মাথার ব্যান্ডেজটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে?’
শিখা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে হাতের ক্রেষ্ট আর সার্টিফিকেটের দিকে ইঙ্গিত করে বললো, ‘হাতে ঐগুলো কী?’
অসহায়ের মতো জিনিসগুলো স্বপ্নার হতো দিয়ে তিনি বললেন, “আমি এবার ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছি তো তাই পুরষ্কার দিয়েছে সরকার।‘
শিখার কণ্ঠস্বর আরো উচুঁতে উঠলো। তিনি ঝাঁজের সঙ্গে বললেন, “তবে আর কী। ঐগুলো ধুয়ে ধুয়ে পানি খাও। ছেলে নেশায় ডুবে থাকে সারাক্ষণ। ঘরে নুন আনতে
পানতা ফুরায়, আর উনি এসছেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরষ্কার নিয়ে। ছাত্ররা এক একজন দেশের কৃতী সন্তান। ঐ আনন্দ নিয়েই থাকো। স্কুল আর ছাত্র-ছাত্রী এই তো তোমার জীবন।”
” আমি কী পেলাম?আমার একমাত্র ছেলে আজ নেশার টাকা না পেয়ে আমার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। আর উনি এসেছেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের গর্বে গর্বিত হয়ে। সমাজ বদলে দেবে, দেশ বদলে দেবে। খালি বড় বড় স্বপ্ন আর বড় বড় কথা।”
শেষের দিকে কেঁদে ফেলে শিখা।
স্বপ্না দৌড়ে গিয়ে মাকে ধরে।
সংসারের অভাব অনটন বাবার স্কুল নিয়ে ব্যস্ততা। ভাইটার সঙ্গদোষে নষ্ট হয়ে যাওয়া কোনটাই শিখাকে এতকাল দূর্বল করতে পারেনি। আজ আচমকা ভেঙ্গে পরেছে। স্বপ্না কখনও কোনো বিপদে মাকে কাঁদতে দেখেনি।
রফিক মাস্টার বুঝতে পারছে না তার এখন কী করা উচিত। স্ত্রীর এমন অসহায় রূপ সে কখনও দেখেনি। সারাজীবন শিখাই তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে। তাই অন্যকে কী ভাবে সান্ত্বনা দিতে হয় তা তার জানা নেই।
শিখাকে ধরে স্বপ্না শোবার ঘরে নিয়ে গেছে। শিখার কান্নার শব্দ সামনের রুমে বসেও শুনতে পাচ্ছেন তিনি। স্কুল আর ছাত্র-ছাত্রীর বাইরে যে মানুষটি কখনও কিছু ভেবে দেখেনি সে হঠাৎ কেমন করে সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াবে? শার্টটা খুলে চেয়ারের সঙ্গে রেখে আরাম করে চেয়ারে বসে রফিক মাস্টার। এখন তার চোখে রাজ্যের ঘুম।
দুই
স্কুলের আঙিনায় পা দিয়েই বুকটা ধ্বক করে উঠে রফিক মাস্টারের। পশ্চিম কোণার নিম গাছটার কে যেন ডাল ভেঙে নিয়ে গেছে। গাছটাকে শূন্য মনে হচ্ছে। পাঁচটা নিমগাছ থেকে একটা নিমগাছকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। গাছগুলোকে পরম যত্নে স্কুলের শিক্ষকরা লালন-পালন
করে বড় করে তুলেছেন। কে অমন করে ভেঙ্গে ফেলল তার ডালপালা? বুকের মধ্যে কেমন যেন একটা শুন্যতা অনুভব করেন তিনি।
ধীরে ধীরে গাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ান। পরম মমতায় হাত রাখেন গাছটা গায়ে। নিজের অজান্তেই পানি চলে আসে চোখে। বয়সের এই এক দোষ। অল্পতেই চোখে পানি চলে আসে। গেটের সামনে কোলাহলের শব্দে সম্বিত্ ফিরে পান রফিক মাস্টার। ধীরে ধীরে হেঁটে গেটের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। ভ্যান গাড়িতে করে স্কুলের জন্য বেঞ্চ এসেছে। সেই বেঞ্চ নামাতে বাঁধা দিচ্ছে এলাকার কিছু ছেলে।
গল্প : নষ্ট সময়
রফিক মাস্টারকে দেখে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে একটা ছেলে এগিয়ে এলো। ছেলেটি চিৎকার করে বলছে, এই স্কুলের মাস্টাররা সব চোর। কবে এই টেবিল চেয়ারের টেন্ডার হলো, কে কাজ পেলো, এসব কিছুই জানলাম না। আমাদের না জানিয়ে কারা এসব কাজ পায় জানতে চাই। ছেলেটির কথাগুলো মাথায় ঢুকছে না তার। তিনি অবাক হয়ে দেখছেন, তার অতি প্রিয় নিম গাছের ভাঙা ডাল ছেলেটির হাতে।
তুমি আমার সেই ছাত্র না যে ক্লাসের একটি ছাত্র গাছের পাতা ছিঁড়েছিল বলে কাঁদতে কাঁদতে আমার কাছে এসেছিলে? অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন রফিক মাস্টার।
তখন বয়স ছিল সাত। আজ আর সাত বছরের খোকা নাই। তখন যা বুঝাতেন তাই-ই বুঝতাম। স্কুলের টাকা কোথায় যায়? মনে করছেন আমরা কিছু বুঝি না?
“আমার সব শিক্ষা এমন মিথ্যে হয়ে যাবে জানলে আমি সারা জীবন বড় বড় স্বপ্ন দেখতাম না। বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম, মহসীন, রোকেয়া, প্রীতিলতা তৈরির স্বপ্নে সারাটা জীবন শেষ করলাম।”
অথচ তৈরি হলো তোমার মতো ছাত্র। ব্যথিত কণ্ঠে উত্তর দিলো রফিক মাস্টার।
-‘রাখেন আপনার বক্তৃতা। আমাদের পাওনা না পেলে এই বেঞ্চ স্কুলে ঢুকতে পারবে না।‘
-তোমাদের কী পাওনা?
-আমদের মিষ্টি খাওয়ার টাকা দিতে হবে।
-কারণ?
-কারণ আমাদের না জানিয়ে এগুলো তৈরির অর্ডার অন্যদের দেয়া হয়েছে তাই।
-এ ব্যাপারে শিক্ষকদের কোনো হাত নেই। সরকার সব জানে।
-আপনাদের মতো শিক্ষক এই স্কুলে থাকলে স্কুলের কোনো উন্নতি হবে না। এই বেঞ্চ গেটের ভিতরে ঢুকতে হলে আমাদের পাওনা আগে মিটাতে হবে। মনে রাখবেন আমার দল এখন ক্ষমতায়।
-তুমি ঠিক বলেছো। যে শিক্ষক তোমার মতো ছাত্র তৈরি করে তার লজ্জায় মরে যাওয় উচিত। কে জানতো, যে ছেলেটি গাছের পাতা ছেড়া দেখে কেঁদেছিল; সে-ই একদিন গাছটাকেই উপড়ে ফেলার দুঃসাহস দেখাবে?
রফিক মাস্টার দ্রুত হেঁটে অফিসরুমে চলে আসেন। বড় অসহায় বোধ করেন তিনি। নিজেকে নিজে প্রশ্ন
করেন, কেন আমি ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’ হলাম? কী আমার যোগ্যতা?
আচমকা উঠে দাঁড়ান তিনি। দ্রুত পায়ে শিশু শ্রেণীতে ঢুকে পরেন। ক্লাস ভর্তি ছোট ছোট মুখ। দরিদ্র, অসহায় মুখের মাঝে শিশু সুলভ সৌন্দর্য। মায়ের অতি যত্নে, আদর করে, স্কুলে পাঠানো শিশু নয়। ক্ষুধার্ত, সুবিধা বঞ্চিত শিশু। সারাটা ক্লাসে চোখ বুলিয়ে নিজে নিজেকে বলেন, “হেরে গেলে চলবে না। এখনও পাঁচ বছর সময় আছে। আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে।”
ঘোর লাগা কণ্ঠে ব্লাক বোর্ডে অ আ ই ঈ…….লিখে শিশুদের অক্ষরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। বাইরে বেঞ্চ নিয়ে কোলাহল, হাতাহাতি কিছুই তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছে না। হাতে সময় কম। যে করেই হোক একটি সূর্য সন্তান তৈরি করতে হবে এ দেশের জন্য। শিক্ষক ছাড়া এ দায়িত্ব আর কে পালন করবে!
