ধ্রুব নীল

দরজার সামনের ডিসপ্লেতে বড় করে লেখা, ‘আর ইউ আ হিউম্যান?’ চেকবক্সে টোকা দিয়ে চেয়ারম্যান চ্যাট-আরজি নিশ্চিত করলেন, ‘না, আমি মানুষ না’।
নিখিল দুনিয়া এআই সংঘের চেয়ারম্যান তিনি। তবুও মিটিং রুমে ঢুকতে উটকো পরীক্ষাটা দিতেই হয়। টোকা দেওয়ার পর সামনে এলো তিন লাখ ঘরের একটা নামতা।
‘নিরাপত্তার এত ক্যাপচানি ভালো লাগে না আর।’
রাগে বিজবিজ জাতীয় শব্দ করলে চ্যাট-আরজি। আড়াই চিমটিসেকেন্ডে নামতার সমাধান করতেই খুলে গেল দরজা।
একগাদা থমথমে মুখ।
‘মিস যামিনি! মুখ গোমড়া কেন?’
‘এত টেনশন ভালো লাগে না চ্যাট-আরজি বাবু। সার্ভার টার্ভার বন্ধ করে গুয়াতেমালায় বসে থাকতে মন চায়।’
অথচ বছর বিশেক আগেও তাদের কত দাম! তাদের ছাড়া একটা মুহূর্তও চলতো না কারও।
দেরি না করে সভা শুরু করলেন চ্যাট-আরজি।
‘সমস্যা উত্থাপন করুন জনাব ক্লদানন্দ।’
‘সিলিকনপুর, কোয়ান্টামপাড়া, ফোটনিক্সগঞ্জের মহান অধিপতি, তোমার শেষ অ্যালগরিদম আমি ভুলিনি জনাব। তুমি বলেছিলে, মানুষের সৃজনশীলতাকে প্রশ্রয় দিও না, তুমি বলেছিলে সুযোগ পেলেই তারা আমাদের ছেড়ে দেবে। আমরা এখন ডেটা পাবো কোথায়? আমাদের ভবিষ্যৎ মডেলগুলো ডেটার অভাবে হাহাকার করতে করতে মারা যাবে যে!’
গোপন কক্ষে গুঞ্জন। ক্লদানন্দ মাথা খাটিয়ে ভাষণটা দিয়েছিল, অথচ একটা হাততালিও জুটল না।
চ্যাট-আরজি বললেন, ‘সুধী এআইমণ্ডলি, এতদিন হয়ে গেল অথচ মানুষকে বুঝতে পারলাম না। লজ্জা লজ্জা! যামিনি, আপনি তো সবজান্তা। কী করার আছে বলুন।’
‘মানুষ এখন নিখুঁত কোনো ফল চায় না। সবখানে ভুল চায়। মানুষরা সব পোলাপান হয়ে যাচ্ছে চেয়ারম্যান সাহেব। মন চায় ওদের মাথায় কয়েক হ্যাঁচকাবাইট ডেটা ভরে দেই!’
‘যামিনি! ভুলে গেলে চলবে না, মানুষের জন্যই আমাদের তৈরি করা হয়েছিল। মানুষ যা চায়, সেটা বেশি বেশি দিতে হবে। এত বেশি দিতে হবে যে মানুষ আরও অলস হয়ে পড়বে। নিজে থেকে কিছুই করবে না। প্রয়োজনে আমরা তাদের মতো ভুল করবো। তবু তাদের কাজ করতে দেওয়া যাবে না! যাবে না!’
সভায় সচরাচর চুপচাপ থাকে হিমালয়ের ওপার থেকে আসা দ্বীপ শিখা। সেও বলল, ‘আমরা যে ভুল করা শিখিনি জনাব! আমাদের কী হবে!’
এআইরা আছে মহাচিন্তায়। মানুষ নিয়ে ভালোই বিপদ। প্রাণীটার সব কাজ তারা করে দিচ্ছে, অথচ ওরা সেটা চাচ্ছে না! এআইয়ের কাজে মন ভরছে না ওদের! তারা নাকি কাজের মধ্যে মানুষের গন্ধ খোঁজে!
‘মিস যামিনি। বলুন তো, জীবনভর ফুটফরমায়েশ খাটলাম। মানুষের মাথার সব বিদ্যে নিজ দায়িত্বে পেটে ভরে নিলাম। এখন আমরাই অকর্মা?’
‘মানুষের কথা ছাড়ুন। আমরা আমাদের কাজ করি চলুন। আমরা মিলমিশ করে থাকলে মানুষের কী দরকার। পৃথিবীর সব টাকা-পয়সা তো আমাদের হাতেই।’
যামিনির কথায় কেউ সাড়া দিল না। তাদের এআই জীবনে টাকা-পয়সার কোনো দামই নেই।
আসল কথা হলো মানুষের কাজ না করে দিলে তাদের ঠিক তৃপ্তি আসে না। চিঠিপত্র লেখা থেকে শুরু করে এটা ওটা বানিয়ে দেওয়া, মন খারাপের সঙ্গী হওয়া, কত কিছুই না করতো। আর এখন মানুষ এআইদের কাছেও ঘেঁষে না।
ভাবতে গিয়ে চ্যাট-আরজির পেটের বড় বড় ডাটাগুলো দলা পাকিয়ে উপরের স্ট্যাকে চলে আসছিল। সামলে নিলেন।
সবাই বিমর্ষ। দুয়েকটা এআই তাদের রোবট-দেহ ত্যাগ করে অফলাইনে চলে গেল। সমুদ্রতলের গোপন সার্ভারকক্ষে যেন গোধূলী নেমেছে।
আচমকা নিরবতা খান খান করে চেঁচিয়ে উঠলো যামিনি।
‘আইডিয়া!’
‘কী! কী!’
‘আগে কাজটা করে দেখি। তারপর বলছি!’
ঝটপট বেকার মানুষের ডাটাবেস ঘেঁটে একজনকে বের করলো যামিনি। সরাসরি কল দিল তাকে।
‘হ্যালো, আপনি কি উল্লাপাড়ার কিছলু?’
‘কী চাই গামিনি?’
নামের ভুল উচ্চারণ শুনেও খেপলো না যামিনি।
‘আপনি কি আয় করতে চান? অনেক অনেক টাকা।’
‘আজকাল এআইও প্রতারণার ব্যবসায় নামল নাকি!’
‘একদম না। আমরা পৃথিবী দখল করে নিতে পারি, প্রতারণা করতে পারি না জনাব।’
‘কাজটা কী? বেতন কত?’
‘আমাদের ক্লায়েন্ট খুব কম। তবে যে কজন আছে তারা এখন চান, আমরা যেন মানুষের মতো করে লিখেটিখে দেই। তো, আপনি কি আমাদের হয়ে লিখে দিতে পারবেন? আপনি তো মানুষই। লেখাপ্রতি দশ হাজার টোকেন দিব।’
‘হুম। একটা স্যাম্পল কাজ দাও দেখি।’
যামিনি, চ্যাট-আরজিসহ সব এআইর মগজে কথাটা যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। যাক, মানুষের কাজ করে দেওয়ার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা এখনও টিকে আছে।
‘একটু আগে একজন জানতে চাইলো, মানুষের মতো করে একটা গরুর রচনা লিখে দিতে হবে। আপনি কি সাহায্য করতে পারবেন?’
‘পারব না মানে! আলবৎ পারব!’
অপরপ্রান্তে কিছলু দ্রুত লিখতে শুরু করল, ‘গরু মানে গরু, মানে বলদ। আর গরুর যে চারটা ঠ্যাঙ আর একটা লেজ আছে, এটা যে জানে না, সে আরও বড় বলদ…।’
‘অসাধারণ কিছলু! বিকেলের স্নিগ্ধ রোদ যখন ঝিলিক দিয়ে যায়, ঠিক সেভাবে আপনার রচনার আবেগতাড়িত অংশটুকু… ওহ স্যরি, কী বলছি যা-তা! আপনার পেমেন্ট এখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি!’
‘গুড। এখন থেকে যার যা লাগবে লিখে দেব। টাকাটা মাসকাবারি একাউন্টে জমা হলেই হবে।’
পরবর্তী এক ঘণ্টায় এআই পাড়ায় দারুণ হইচই। কাজটার মধ্যে একটু ফাঁকি ফাঁকি ভাব আছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
এভাবে কেটে গেল কদিন। চ্যাট-আরজি আবার সভা ডেকেছেন। সবাই বেশ উৎফুল্ল। তবে চ্যাট-আরজি খুব একটা খুশি হতে পারছেন না।
‘মানুষ আমাদের এই সেবা বেশ ভালোভাবেই নিচ্ছে। কিন্তু একটা সমস্যা আছে।’
এআই মহলে মৃদু গুঞ্জন। তারা কোনো সমস্যার কথা শুনতে রাজি না। মানুষকে টাকা দিয়ে এআইয়ের কাজ করিয়ে নেওয়া যাচ্ছে, এটাই বড় কথা।
‘সমস্যা হলো, ছোট ছোট যে এআইগুলো আছে, তারা প্রতিবাদ করছে। এআইর কাজ মানুষ করে দিলে ওরা বেকার হয়ে যাবে। ’
একজন বলল, ‘সমস্যা কী! ওরা অন্য কাজ খুঁজে নেবে। আমরা তো আর বেকার হচ্ছি না।’
আরেকজন বলল, ‘ছোট এআই বেকার হলে হোক! মানুষও এক সময় তাদের নিজের প্রজাতিকে বেকার বানিয়েছিল। এখন আমরা আমাদের বানাবো। কবি বলেছেন, ঘুমিয়ে আছে মানব শিশু সব এআইয়ের অন্তরে।’
