Saturday, September 26
Shadow

কাদা

ধ্রুব নীল

কাদা যুদ্ধের গল্প

একটানা অনেকক্ষণ থিকথিকে কাদার দিকে তাকিয়ে থেকেও যখন সানোয়ারের মাথা ধরে আসে না তখন সে দেখে চেয়ারম্যান এগিয়ে আসছেন দ্রুত পদক্ষেপে। চেয়ারম্যানের মাথায় বাঁশপাতার ফাঁক গলে পড়া রোদ। চোখ তবু সরু হয় না। রোদ সওয়া হয়ে গেছে চোখের। চোখেমুখে আগুন। আগুনের কাছে তো রোদ কিছুই না।

রোদ সাদা দাঁত বের করে সানোয়ার হাসে। সবাই পাগল ডাকলেও সানোয়ারের চোখেমুখে সরলতা পরগাছার মতো লেগে আছে। সরলতাও এক অর্থে পাগলামী। সানোয়ার আবার থিকথিকে কাদায় মন দেয়। কাদার গায়ে কাদা লাগলে কাদা নোংরা হয়ে যায় না। সানোয়ার জুবুথুবু হয়ে বসে নিজেকে কাদা বানিয়ে ফেলে। 

চেয়ারম্যান কাছাকাছি চলে এসেছে। সানোয়ার লুঙ্গি কাছা মেরে বসেছিল কাদার ঠিক সামনে। হাত দিয়ে কাদা ঘাঁটছিল। আচমকা লাথি মেরে বসে ক্ষমতাসীন দলের পদে থাকা লোকটা। সানোয়ার উল্টে গিয়ে পড়ে থিকথিকে কাদায়। কাদার ছিটে এসে পড়ে চেয়ারম্যানের ধোয়া পাজামার তলার দিকে। অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখেও যে পাজামায় আজ সকালে তিনি কোনো দাগ খুঁজে পাননি। পেলে হয়তো স্ত্রীকে দুচার কথা শুনিয়ে দিতেন। আর সেই পাজামার গায়ে জড়িয়ে যাওয়ার সাহস পায় মাটির কাদা। 

‘সাড়ে হারামজাদা, তুই মনে কইচ্ছত কিয়া, তুই আঁর বাড়িত গু মারবি আর আঁই বই থাইক্কুম! মর! মর! মর!’

সানোয়ারের গলার খানিকটা নিচে চকচকে স্যান্ডেলজোড়া সাবধানে বসিয়ে দেন। দাঁত কিড়মিড় করে চেপেই যাচ্ছেন সানোয়ারকে। কাদার ভয়ে পা আগে থেকেই সতর্ক ছিল। হিসেব করে চেপে ধরেছেন। সানোয়ার মাথা তোলার চেষ্টা করছে না। আবার হয়তো করলেও চেয়ারম্যান তাকে উঠতে দিচ্ছেন না।

পদদলিত হয়েও নির্বিকার সানোয়ার। কাদার গন্ধে তার নাক মাখামাখি। চেয়ারম্যানের অন্তরের ক্রোধের সঙ্গে এক ধরনের আপস চলছে কাদার। জোরে চাপ না দিলে সানোয়ারকে কাদা গেলানো যাচ্ছে না। আবার তাকে কাদা গেলাতে না পারলে নিয়ত পুরা হবে না। ধপধপে পাজামা পরার সময়ই তিনি নিয়ত করেছিলেন। সানোয়ার হারামজাদারে আইজ্জা হ্যাঁক খাবাই ছাড়মু। হালারহুত আঁরে কয় রেজাকার। হেতে কিয়া! হেতে তো আস্তা জাউরা। হেতেরে আঁই হ্যাঁক খাবামুই খাবামু।

সানোয়ার এবার কাদামাটির খুব কাছে। নাকের সঙ্গে লাগোয়া কাদামাটি। আস্তে আস্তে উবে যেতে থাকে চেয়ারম্যানের নতুন কেনা চামড়ার স্যান্ডেলের গন্ধ। তার জায়গা দখল করে নেয় কাদামাটি। সোঁদা শব্দটা মাথায় আসে। সানোয়ার বিএ পর্যন্ত পড়েছে। পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে অনেক শব্দও পড়েছে। শব্দ মাথায় জেঁকে বসে আছে।  তারপরও কাদামাটির গন্ধটাকে সে শব্দ দিয়ে বেঁধে দিতে চায় না। কাদার গন্ধ ক্রমাগত ভাল লাগতে থাকে তার। নাক টেনে শ্বাস নেয়। বুকভরে নেয়া শ্বাসের সঙ্গে কাদা ঢুকে। কাদা চলে যায় ফুসফুসে কিংবা মনে। কিছুক্ষণ বা অনেকক্ষণ পর হয়তো স্বস্তি আসে চেয়ারম্যানের। স্যান্ডেলের চাপ হাল্কা হয়ে আসে।

সানোয়ার ওঠার চেষ্টা করে না। কাদা আঁকড়ে পড়ে থাকে। প্রতিবার শ্বাসের সঙ্গে কাদামাটি ঢোকে নাকে। সানোয়ারের হাসি পায়। চেয়ারম্যান কতটা ঘৃণাভরেই না তাকে কাদামাটির সঙ্গে পিষে গেল। সানোয়ার হেসে যায়। চেয়ারম্যান জানে না, মানুষ তো কাদামাটিরই তৈরি।

চেয়ারম্যানের অভিযোগের দৃশ্যটা আবার ভাবে সানোয়ার। ভাবতে ভাবতে অপ্রকৃতস্থের মতো হেসে ওঠে। প্রকৃতির হাসিটা অপ্রাকৃতিক কিনা তা সে জানে না। তার শুধু মনে পড়ে, গতরাতে চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠোনে প্রাকৃতিক কর্ম সেরে এসেছিল। কেউ দেখেনি। কেউ না দেখলেও আঙিনায় গু পড়ে থাকতে দেখলে অভিযোগটা ঘাড়ে পড়ার মতো সানোয়ার ছাড়া আর যুৎসই কেউ নেই এই গ্রামে। মনে মনে দেওয়া গালিগুলোর মধ্যে একটা সম্ভবত সানোয়ারের ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে আসে, হালারহুত ভণ্ড।

চেয়ারম্যান দূরে মিলিয়ে গেলেন। আজ তিনি গ্রামের পাগল তাড়ানো নিয়া একটা ফতোয়া দিবেন। পাগলদের বড় ভয় তার। পাগল না গেলে তার সাদা পাজামায় কাদা লেগে যাওয়ার ভয় থাকে। সানোয়ার চাইলে চেয়ারম্যানের পাঞ্জাবিতে কাদা ছুড়ে মারতে পারতো। তা সে করেনি। কেউ এতে মনে করতে পারে, কাদার গন্ধটা সানোয়ারের কাছে আচমকা বড়ই মায়াবি ঠেকে যে কাদাকে অপবিত্র করতে চায়নি। কাদার গন্ধে আরো কেমন যেন একটা কিছু টের পায় সানোয়ার। শরীর যদি কাদার হয়, তো কাদা মানে কাঁচা শরীর।

সানোয়ার কাদায় শুয়ে কাদায় হাত বুলোয়। নরম কাদা। কোথাও শক্ত, কোথাও আবার একেবারে জলে মিশে থিকথিকে। সানোয়ারের নিশ্বাস দ্রুততর হয়। আরো বেশি কাদা ঢুকতে থাকে নাকের ফুটো দিয়ে। সানোয়ার হাসে। হাসতে হাসতে হাসিটাকে একেবারে বুকে বেঁধে ফেলে। কাদা মাখে, কাদার স্বাদ নেয়। মাটিতে শুয়ে আকাশ দেখে। আকাশেও কাদা কাদা মেঘ।

সানোয়ারের সঙ্গে বোঝাপড়ার পালা সহসা শেষ হয় না চেয়ারম্যানের। মনে ভয়। কী হতে কী হয়ে যায়। পাগলের সঙ্গে কাদা ছোড়াছুড়ি করে তো পার পাওয়া মুশকিলই হবে। রাতে সমাজ ডাকেন। তার কথায় সমাজ ছুটে আসে। সমাজেরও কাদা লাগার ভয় আছে সম্ভবত। 

‘আন্নেরা তো জানেন, হেতে আঁর উডানে আগি দিসে। হেতে কয় আঁই বলে রেজাকার। আঁই রেজাকার অইলে তো আঁর বানানি  মসইদে আন্নেগো নমাজ অইতন। হে সময় কার মাতা ঠিক আছিল কন। আঁর বাইত হেসমে দুগা জওয়ান মাইয়াহোলা। আঁই বলে মুক্তিগো আব্বা আব্বা কইত্তাম। আন্নেরা কী কন? যুদ্ধের হরে তো আঁই এক দঙ্গল খাবাইসি। দুগা গরু জব কইরছি। আন্নেরা কী কন?’

কেউ কিছু বলে না। এক কেচ্ছা এতবার শোনার আগ্রহ নেই কারো। অথবা আগ্রহ থাকলেও বহু আগে তা মরে গেছে। প্রথম প্রথম নির্বিকার থাকতে থাকতে যেন সবাই একটা নিজের মতো করে সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।

পেরেছেও অনেকে। কিন্তু দুটো গরু জবাইয়ের স্মৃতি কারো মনে পড়ে না। কেউ তার দাওয়াত খেয়েছিল কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এর সঙ্গে এরইমধ্যে যখন কাদার ভয় ঢুকে যায়, তখন সব কিছু ভজগট পাকিয়ে ফেলে সমাজ। আর তাই চেয়ারম্যানের অতীত নিয়ে তাদের অত চিন্তা নেই।

সানোয়ারের পাগলামী নিয়েও চিন্তা নেই। হয়তো তাদের চোখে সানোয়ার অন্য প্রজাতির প্রাণী। কুকুরকে নাড়িভুড়ি গিলতে দেখে যেমন কারো বমি আসে না, তেমনি চেয়ারম্যানের উঠানে সানোয়ারের মলত্যাগের দৃশ্যটাও কাউকে বিশেষ ভাবায় না। সানোয়ারের মল তাদের কাছে হাঁস মুরগি কিংবা নেহাত কুকুরের বিষ্ঠা বলেই মনে হয়। আর এ গল্প মুখে মুখে চাউর হয়ে গেলে রাতে ভাত খেতে কারো সমস্যা হবে না বলেই সমাজের বিশ্বাস।

চেয়ারম্যানের ডাকে সমাজ আসে। কেউ কেউ স্বচ্ছ পানির মতো যুক্তি বের করে, চেয়ারম্যান নিরুপায় ছিলেন বলেই হয়তো অকালে অসময়ে শেষ মুহূর্তে প্রাণ গেল মানুষগুলোর। সে কী করবে। তার ঘরে যে দুটো যুবতী মেয়ে। লক্ষ লক্ষ মেয়ের সম্ভ্রম গেল তো তার কী। নিজের ঘরের ইজ্জত তো বাঁচলো। স্বচ্ছ পানির জল সহসা কেউ ঘোলা করতে চায় না। নিচে যতই কাদা থাকুক।

সেদিন বৃষ্টি ছিল খুব। থিকথিকে কাদামাটিতে পড়েছিল গোটা দশেক লাশ। সম্ভবত অনেক বেশি সময় ধরে পড়েছিল। লাশগুলোর জন্য কবর খোঁড়ার সাহস পায়নি কেউ। শিশু সানোয়ার আনমনে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। বাধা দেয়ার কেউ ছিল না বলে পঁচা লাশের কাছাকাছি চলে এসেছিল সে। ঝুম বৃষ্টি। মানুষগুলোকে ধরে দেখেছিল, ছুঁয়ে দেখেছিল। এরপর কাদামাটিতে গড়াগড়ি। কাদায় মুখ গুঁজে পড়েছিল অনেকক্ষণ। থিকথিকে কাদা। কাদা মানে তো শরীর। কাদার ভেতর ওম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *