ছোটন ও কাক

ইমরান চৌধুরী : ছোটন, ছোটন। কেউ যেন ডাকছে তাকে এই ভেবে পেছনে ফিরে তাকাল ছোটন। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেল তার পেছনে পেছনে একজন বয়স্ক লোক হেঁটে আসছে। লোকটাকে দেখে তাঁর মুখের দিকে তাকাল ছোটন। না, লোকটা চেনা জানা মনে হচ্ছে না। তবু সালাম দিয়ে জানতে চাইল,

আপনি কি আমাকে ডাকছেন?

লোকটা ছোটনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কই নাতো দাদু! বলে লোকটা হাঁটা শুরু করল।

দাদু শব্দটা ছোটনের খুব প্রিয়। হয়তো বা উনি কারও দাদু হবেন। লোকটার সঙ্গে দু-চারটা কথা বলার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার। কিন্তু সে সুযোগ হলো না। কী আর করা লোকটার পেছনে পেছনে ছোটনও শুরু করল হাঁটা।

প্রতিদিন এ সময়ে ছোটন স্কুলে যায়। সে এখানকার নামকরা স্কুল ‘ওয়ান্ডার’ এর প্রভাতী শাখার ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র। সকাল ৭-২৫ মিনিটে তাদের ক্লাস। সময়টা মাথায় রেখে সে হাঁটতে থাকে। কিছুটা পথ যাওয়ার পর আবার শুনতে পেল ‘ছোটন ছোটন’ ডাক। আবার পেছনে ফিরে তাকাল ছোটন। না, এবার তার পেছনে ডানে বামে কেউ নেই। হঠাৎ কা কা করে একটা কাক ডাক দিয়ে ইলেকট্রিকের তারের উপর উড়ে এসে বসে পড়ল।

এই যে ছোটন, আমি ডাকছি তোমাকে।

আমি! আমি কে? আমিতো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না।

দেখতে পাচ্ছো না, উপরের দিকে তাকাও। ছোটন একবার পাশের বিল্ডিং এর দিকে, আরেকবার এ বিল্ডিং ঐ বিল্ডিং এর দিকে তাকাতে লাগল। কাকটা এবার বলল, বিল্ডিং এর দিকে না, তাকাও তোমার সামনে কাকের দিকে। ছোটন এতক্ষন পর খেয়াল করল ইলেকট্রিকের তারে একটা কাক দোল খাচ্ছে।

ছোটন এর আগে কখনো কোনো পাখির কথা বলতে শুনেনি। তবে তার এক বন্ধুর বাসায় এক টিয়ে আছে যেটি নাকি অবিকল মানুষের মতো কথা বলে। কাকও যে মানুষের মতো কথা বলতে পারে ছোটন আজই তা শুনল। কাক বলল, তোমার বাম হাতে কি?

ময়লা ভরা পলিথিন।

তো ওটা ফেলে না দিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছ কেন?

বয়ে বেড়াচ্ছি না! ফেলতে নিয়ে যাচ্ছি।

কোথায় ফেলবে?

ডাস্টবিনে।

ওখানে ফেলার দরকার কি? এখানেই ফেলে দাও।

না।

কেন?

মা বলেছে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলতে নেই।

সবাইতো ফেলে। তুমি কেন খামাখা কষ্ট করবে। কাকের কন্ঠে ছোটনের প্রতি দরদ উপছে পড়ল।

সবাই ফেলুক। আমি ফেলব না। মা বলেছে যেখানে সেখানে ময়লা ফেললে পরিবেশ দূষিত হয়। স্যারও সেদিন ক্লাসে বলেছে-যেখানে সেখানে ময়লা ফেললে তা পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। সে সাথে ছড়িয়ে পড়ে নানা রোগ জীবাণু। এই যেমন ডায়রিয়া, আমাশয়, যক্ষ্মার জীবাণু।

কাকের সাথে ছোটনের কথা বলার ফাঁকে আট নয় বছরের একটি মেয়ে এসে ছোট এক বালতি উচ্ছিষ্ট গলির এক কোণে ফেলে চট করে চলে গেল। তা দেখে এক উড়ালে কাকটি ওখানে গিয়ে এটা ওটা নিয়ে টানাটানি শুরু করল। এরই মধ্যে উড়ে এসে জুড়ে বসল আরো দুটো কাক। এরা খুব মজা করে উচ্ছিষ্টগুলো খেতে লাগল। ছোটন এগুলো এক পলক দেখেই হাঁটা শুরু করল তার পথে।

ছোটনদের বাসার আশেপাশে কোনো ডাষ্টবিন নেই। যদিও গলিটার এখানে ওখানে অনেকেই তাদের বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট অনায়াসে ফেলে যায়। যেমনটি ফেলে গেল এখন মেয়েটি। ছোটন কিন্তু কখনো তা করে না। অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে ছোটন প্রতিদিনই স্কুলে যাওয়ার পথে মায়ের কথা মত ময়লাগুলো ডাষ্টবিনে ফেলে, তারপরেই যায় স্কুলে।

দু’মিনিটের মধ্যে ছোটন পৌঁছে গেল ডাস্টবিনের কাছে। দেখতে পেল তার এক বন্ধু ডাস্টবিনের কাছে এসে ময়লা ডাস্টবিনে না ফেলে ছুঁড়ে মারল ডাস্টবিনের বাইরে। ফলে তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল রাস্তায়। আর ছোটন ফেলল ডাস্টবিনের মধ্যে। বন্ধুটি ছোটনের এভাবে ময়লা ফেলা দেখে অবাক হলো। বলল, কিরে ছোটন! এত যত্ন করে ময়লা ফেলার মানে কি?

মা বলেছে ময়লা যেন ডাস্টবিনের মধ্যেই ফেলি। ময়লা বাইরে ফেললে পথচারীর হাঁটতে কষ্ট হবে।

ছোটনের কথা শুনে বন্ধুটি তার ভুল বুঝতে পারল। বলল, ছোটন; তোমার মা ঠিক কথাটি বলেছে। আমিও কাল থেকে তোমার মতো ডাস্টবিনেই ময়লা ফেলব। আর কখনও ভুল হবে না।

মোমিন রোড, চট্টগ্রাম 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *