বদরাগী হেডমাস্টারের মতো প্রচণ্ড ঝড়টা একটু পরই তেড়ে আসবে। মেঠো পথটার ওপর পড়ে থাকা পাতলা পলিথিন আর কাগজের ঠোঙাগুলো দুষ্টু ছাত্রদের মতো পড়িমড়ি করে পালাচ্ছে। কেউ কেউ আবার আকাশে উড়ে চলে গেল। দিন দুপুরের আকাশ কাঁপিয়ে কালবৈশাখির কাজল কালো মেঘ। জানালা দিয়ে অনেক্ষণ ধরে বাতাসের নাচন দেখছে অন্তু। গ্রামের লোকজন এদিক সেদিক ছুটে চলে গেছে অনেক আগেই। লিকলিকে এক চাষীর গামছাটা সাপের ফণার মতো লকলক করছে বাতাসে। ধুলাউড়ি নামের গ্রামটায় আজ সত্যি সত্যি ভীষণ ধুলো উড়ছে।
ঝড়টা একেবারেই আলাদা। এত বাতাস আর কালো মেঘ আগে দেখেনি। মুখে হঠাৎ হঠাৎ ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা লাগছে। গায়ে জ্যাকেট থাকার পরও শীতে কেঁপে কেঁপে উঠছে আট বছরের অন্তু।
চোখের সামনে মড়মড় করে আম গাছের ডাল ভাঙলো। উড়ে গিয়ে সোজা পড়লো মেঠো রাস্তার পাশে ডোবার মতো দেখতে ঝোপঝাড়ে ভরা পুকুরটার গায়ে। তির তির করে কাঁপতে থাকা কচুরিপানার ফুলগুলো হুড়মুড় করে জায়গা করে দিল ডালটাকে। কাঁচা ডালটা পুকুরে ভাসতে লাগলো নতুন অতিথির মতো। পুকুরপাড়ে দুটো হাঁস ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মাটির হাঁস না তো? না না ওই তো পালক ঝাড়লো! জ্যান্ত হাঁস। ঝড় নিয়ে একদমই চিন্তা নেই তাদের। দূরে কোথাও সাইরেনের শব্দ। মনে হলো দৈত্যের মতো বড় একটা অ্যাম্বুলেন্স চেঁচিয়ে উঠলো কয়েকশ মাইল দূর থেকে। ঝড়ের মধ্যে গাছগুলো আহত হলে ওদেরও সম্ভবত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। ঝড় মানে কি যুদ্ধ? শোঁ শোঁ শোঁ। ঝড় আর গাছের যুদ্ধ। মানুষগুলো যুদ্ধের ভয়ে পালাচ্ছে। সাইরেনের বিকট শব্দটাকে মাঝে মাঝে বাড়ি দিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দমকা বাতাস। সাঁই সাঁই সাঁই। কোত্থেকে একটা টিনের চাল ঝনাৎ করে এসে গড়াগাড়ি খাচ্ছে সামনের খোলা সবজির মাঠে। আকাশ ফাটিয়ে বজ্রপাত হলো। বিজলি চমকাচ্ছে বহুদূরে। খোলা মাঠের পাশে জঙ্গল। জঙ্গল ঘেঁষে এগিয়ে চলা মেঠো পথে চোখ যেতেই চমকে উঠলো অন্তু। একটা ছোট্ট মেয়ে বসে আছে বাঁশঝাড়ের সামনে। খালি গা হাফ প্যান্ট। দূর থেকে মেয়েটার চেহারা দেখতে পাচ্ছে না। বাতাসে টালমাটাল বাঁশঝাড়। একটু পর পর বিকট গর্জন ছুড়ে মাথাটাকে নুইয়ে ফেলছে। মেয়েটা কি ভয় পাচ্ছে? এতদূর থেকে ভয় পাচ্ছে কিনা বোঝার উপায় নেই। এখন বৃষ্টি পড়ছে না, তবে একটু বাদেই হুড়মুড় করে শুরু হবে কালবৈশাখি যুদ্ধ।
আলনা থেকে ঝটাং করে রেইনকোটটা নিয়ে হুড়মুড় করে পরে ফেলল অন্তু। একে তো দমকা হাওয়া, আরেকদিকে টিনের চাল উড়ে এসে মাথায় পড়ার ভয়। অন্তুর ভয় লাগছে না। একটাই চিন্তা, তাড়াতাড়ি বাঁশঝাড়ের কাছে পৌঁছানো চাই।
মেয়েটার বয়স পাঁচ কি ছয়। ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে আছে। অন্তু কাছে এতে দাঁড়াতেই মাথা নাড়ালো। কী যেন বলল। বাতাসের তোড়ে কথা শোনা গেল না। বাতাসের ধাক্কায় অন্তুর রেইনকোট গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। বৃষ্টি খুব একটা পড়ছে না। শুধু বাতাসের সঙ্গে পানির ছিটে এসে পড়ছে ঠিকই।
‘তোমার নাম কী?’
‘সুখি’
‘তুমি এখানে কী কর! বাড়ি যাও। ঝড় আসছে।’
‘আসুকগা।’
‘তোমার শীত লাগে?’
‘লাগে’
‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
‘ওই যে, উই পারে। দুই তালগাছের মাঝখান দিয়া সুজা। তারপর একটা গাব গাছ। পলাশগো গাব গাছ। গাব গাছের অই পারে বাড়ি।’
‘চল, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’
‘তোমার বাপে পিডাইবো না?’
‘আমার বাবা নেই।’
‘পলাশগো গাব গাছে যাইবা? তুফানে গাব পড়সে। আমি খাইসি।’
‘চলো তোমাকে পৌঁছে দেই।’
‘তুমি যাইবা? চল।’
পথের দুই পাশে গাছপালা থাকায় ঝড়ো বাতাসটা গায়ে লাগছে না। মেঠো পথ ডানদিকে বেঁকে সুপারি বাগানে ঢুকেছে। সুপারি বাগান পেরোতেই একটা ছোট খাল। খালের ওপর বিলি কেটে দুটো সাপ যেতে দেখলো। অন্তুর একবার ইচ্ছে হলো খালের পারে দাঁড়িয়ে সাপ গুনে দেখে। দূরে আরো একটা দুটা দেখা যাচ্ছে। মেয়েটা খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবতে লেগে গেল।
‘পানি উইঠা গেসে। অখখন আমরা যাইতে পারুম না।’
‘না না পারবো। একটা ভেলা বানাই। ওই যে দেখ দুটো কলাগাছ পড়ে আছে। চলো নিয়ে আসি।’
অন্তু খালের পাশ ঘেঁষে হাঁটতে লাগলো। সুপারির পাশে আম, জাম আর অনেকগুলো কলাগাছ। নাম না জানা বড় গাছগুলোর পাতার সঙ্গে ঝড়ো বাতাসের যুদ্ধ চলছে। মাঝে মাঝে বোমার মতো আকাশটা ফেটে চৌচির।
কলাগাছ কুড়ানো শেষ। এবার বাঁধার জন্য দড়ি চাই। নাম না জানা একটা লতানো গাছ পেয়ে গেল। তিন কোণা পাতা।
‘রিফুজি লতা দিয়া বান দিবা?’
‘হুম।’
‘দেও। জুরে গিট্টু দিবাইন।’
‘খুলবে না।’
ভেলা বানানো শেষ। এবার খাল পার হতে হবে। খালের ওপর ভেলা নামিয়ে তাতে চড়লো দুজন। পানির ওপর বিলি কেটে চলে যাচ্ছে চার পাঁচটা রঙিন সুতোর মতো সাপ।
‘এই সাপ কামড় দেয় না। ডরাইও না।’
অন্তুরও মনে হলো, সে যেন অনেকদিন আগ থেকেই জানে এ কথা। সাপগুলো রঙিন সুতোর মতো সাঁতার কেটেই চলছে। খালের ওপর ভেলাটা এগিয়ে যেতে লাগল তরতর করে। আশপাশে সাপের সঙ্গে যোগ দিয়েছে কয়েকটা বড় বড় মাছ। ওরা অন্তু আর সুখির দিকে চোখ বড়বড় করে তাকাচ্ছে। ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কী যেন বলছেও। অন্তু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
‘এডি হইল ফুসকুনি মাছ। মানুষের মতো কথা কইতে পারে।’
‘তা বুঝলাম, কিন্তু তোমার বাড়ি কোন দিকে? ঝড় তো এদিকে চলে আসছে!’
দূরে ঝড় হচ্ছে বেশ। ঝড়ের কথা মনে হতেই যেন ভেলা দুলে উঠলো। আরেকটু হলে পড়েই যেত দুজন। ভাগ্যিস খালের পাড়ের বড় বড় গাছের শেকড়ে আটকে গিয়েছিল ভেলাটা।
‘তুমি ডরাইও না। কলাগাছ ডুবে না।’
‘কিন্তু সামনে তো স্রোতের গতি বাড়ছে! দেখ, একটা ঘূর্ণি! পড়লে একেবারে পাতালে চলে যাব!’
‘ডরাইও না। কিসসু হইব না।’
সুখির কথায় ভয় কেটে গেল অন্তুর। মেয়েটার অনেক সাহস। ভেলার গতি বাড়ছেই। সুখি ইশারা করতেই ভেলা আঁকড়ে বসে রইল অন্তু। একসময় ঘূর্ণিটা হয়ে গেল একটা প্রকাণ্ড জলপ্রপাত। অন্তুর কাছে মনে হলো পানির স্রোত বুঝি খাড়া কয়েকশ হাত নিচে নেমে গেছে।
ধীরে ধীরে ভেলাটা পানির স্রোতের সঙ্গে নিচে পড়ে যেতে লাগলো। অন্তু ভাসছে। সুখিকে দেখে মনে হলো ও যেন হঠাৎ করে পাখি হয়ে গেছে। দুহাত মেলে ভাসছে সুখি। অন্তু পানির ঝরনা দেখতে লাগলো। পানির বড় বড় ফোঁটার সঙ্গে সেও নিচে পড়ে যাচ্ছে।
‘ওই তো নিচে খাল! খালে পড়লে আবার ভেলা চলবে!’
অন্তুর কথায় হেসে ফেলল সুখি। তার চোখে হাসি লেপ্টে আছে। সুখি ভাসতে ভাসতে আবার ভেলায় গিয়ে বসলো। তরতর করে আবারো খালের পানি ধরে চলতে লাগলো ভেলা। একসময় চলতে চলতে থেমে গেল স্রোত। দুজনে উঠে এসেছে একটা মেঠো রাস্তায়। ঝড় অনেক পেছনে। এখন শুধু ঠাণ্ডা বাতাস। রাস্তার দুপাশে লাল ফুলের গাছ। কৃষ্ণচূড়ার মতো, কিন্তু কৃষ্ণচূড়া নয়।
‘এইগুলান হইল বিরিন্তা ফুল।’
অন্তুর কাছে মনে হলো এই ফুল সে বহুদিন আগেও একবার দেখেছে। কিন্তু নামটা মনে করতে পারলো না। হুট করে ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টিটা কুয়াশার মতো পথ আগলে রেখেছে। চোখে বারবার ঝাপটা এসে লাগছে। সুখিকে মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছে না অন্তু। এই আছে এই নেই। সুখি অনেকদূর এগিয়ে গেছে। অন্তুর দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। এদিকে বহুদূরে আবারো ঝড়ের দৈত্যটা সাইরেন বাজানো শুরু করলো। প্রচণ্ড বাতাস তাড়া করছে। হঠাৎ করে অন্তুর মনে হলো, বিরিন্তা নামে তো কোনো ফুল নেই! অন্তু বুঝে গেল, সে আসলে স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু স্বপ্নটা এখনো ভাঙেনি। সুখি নামের মেয়েটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। সে হয়তো তার বাড়ি পেয়ে গেছে। অন্তু পেছনে তাকালো। যতদূর চোখ যায় রাস্তার দুপাশে বিরিন্তা গাছের সারি। মেঠো রাস্তা ধরে দৌড়াতে শুরু করলো অন্তু। ঝড় তাকে ধরেই ফেলল প্রায়। অন্তু ভয় পাচ্ছে না। স্বপ্নের মধ্যে আকাশ কাঁপানো ঝড়ে হারিয়ে যেতে বাধা নেই।
লেখক: ধ্রুব নীল