‘মিস্টার খরগোশ আমি আবারো বলছি ও অ্যালিস নয়!’
‘ইয়ে স্যার, তা ঠিক। কিন্তু..।’
‘কিসের কিন্তু! ও একটা ছেলে আর অ্যালিস একটা মেয়ে! আর অ্যালিসের বাড়ি ইংল্যান্ডে। এর বাড়ি কোথায় কে জানে!’
‘স্যার.. ওর বাড়ি বাংলাদেশে। আনন্দপুর গ্রামে থাকে।’
‘তো একে এখানে এনেছো কেন! হোয়াই! ইউ ইডিয়ট! আর শোনো স্যার বলবে না, রাজামশাই বলবে।’
‘স্যার, এটা একটা দীর্ঘ কাহিনী। দীর্ঘ করে বলবো, নাকি সংক্ষেপে?’
‘সংক্ষেপে বল হাঁদারাম!’
হাল্কা কাশি দেওয়ার চেষ্টা করলেন উইলিয়াম খরগোশ। কিন্তু পারলেন না। গলা দিয়ে ভোঁতা একটা শব্দ বের হলো। হড়বড় করে দাড়ি কমা বাদ দিয়ে বলতে শুরু করলেন। ‘স্যার আমি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম কিন্তু অ্যালিসকে অনেক খুঁজেও তার বাড়িতে পাইনি, পরে একটা ম্যাগাজিনের মধ্যে দেখি অ্যালিস এখন অনেক বড় নায়িকা হয়ে গেছে, হলিউডে অভিনয় করে, জনি ডেপের সঙ্গেও নাকি তার একটা সিনেমা…।
‘আমি বলেছি সংক্ষেপে!’
‘ওহ আচ্ছা। তারপর অ্যালিসকে খুঁজতে গেলাম হলিউডে। কিন্তু সেখানে তখন অ্যাভাটার নামের একটা সিনেমার শ্যুটিং চলছিল। আমাকে দেখে পরিচালক জেমস ক্যামেরন বললেন, আমি অভিনয় করবো কিনা.. না মানে স্যার, ইয়ে তারপর অ্যালিসকে খুঁজে পাই। কিন্তু ও কিছুতেই ওয়ান্ডারল্যান্ডে আসবে না। আমি বললাম, কেন আসবে না? ও বলল, ওর নাকি এখন ডিজনিল্যান্ড ভাল লাগে, ওয়ান্ডারল্যান্ড নাকি তার কল্পনার জগত। এটার নাকি অস্তিত্বই নেই!’
‘হোয়াট!’
রাগে থরথর করে কাঁপছেন মহান শুঁয়োপোকা। যুগ যুগ ধরে তিনি ওয়ান্ডারল্যান্ডের রাজা। অথচ তাঁর রাজ্যের কথা অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখিয়েছে অ্যালিস! বলে কিনা তাঁর রাজ্যের অস্তিত্ব নেই!
‘হোয়াট! কী বললে! আমাদের অস্তিত্ব নেই! অ্যালিসের এত বড় সাহস!’
‘ঠিক তাই রাজামশাই। এরপর আমি মনের দুঃখে বাংলাদেশে চলে যাই। একটি সবুজ ছায়াঘেরা গ্রামে গিয়ে আরামসে দুটো গাজর খাই। আহা গাজর.. মিষ্টি.. কুটুস কুটুস কাটুস কাটুস…।’
‘খরগোশ!’
‘ওহ, ইয়ে সরি স্যার.. আই মিন রাজামশাই.. গাজর খাচ্ছিলাম চোখ বুঁজে। তখুনি গায়ে একটা গোলা এসে লাগলো। ঠিক এইখানটায়।’
‘গোলা! গোলা খেয়ে বেঁচে আছো কী করে!’
‘ওটা গোলা ছিল না, ওটা ছিল ঢিল। গুলতি দিয়ে মেরেছিলাম। কিন্তু সত্যি আমি জানতাম না যে এই খরগোশটা কথা বলতে পারে।’
অন্তুর কথা শুনে কপাল কুঁচকে গেল শুঁয়োপোকার। খরগোশের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন। খরগোশ কিছুটা বিব্রত।
‘আসলে স্যার। ওটা ঢিল হলেও গোলার মতো লেগেছে আমার গায়ে। আমি নিশ্চিত এই গোলা দিয়ে আমাদের শয়তান ভালুকটাকে মারতে পারবে ছেলেটা। কেননা, ওর কাছে আছে ভয়াবহ এক অস্ত্র। কী যেন নাম।’
‘ওটার নাম গুলতি।’
মহান শুঁয়োপোকা অন্তুর দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করলেন। তবে মেজাজ এখনো তিরিক্ষি হয়ে আছে দেখে হাসিটা গালের মধ্যে লেপ্টে গেল।
‘কী নাম খোকা?’
‘আমার নাম অন্তু। ক্লাশ ফাইভে পড়ি।’
‘ক্লাশ ফাইভ! ওটা কী জিনিস! কিভাবে পরতে হয় ওটা?’
‘জ্বি না। ওটা পরার জিনিস নয়। পড়ার জিনিস। ওটাকে লেখাপড়া বলে। আমি স্কুলে যাই।’
‘স্কুল! ওহ আচ্ছা। তাই বল। তা তুমি গোলা ছোড়ার পাশাপাশি আর কী কী শিখেছো? মাকড়সার জাল বুনতে পারো? কুড়িয়ে পাওয়া ডিম ফুটিয়ে ছানা বের করতে পারো? চিচিং পাখিকে বশ করে ওটার পিঠে চড়ে আকাশে উড়তে পারো?’
‘আমি ঐকিক নিয়মের অংক করতে জানি। ছড়া মুখস্থ করেছি। ইংরেজি পারি। মাই নেইম ইজ অন্তু।’
‘এ হে হে হে! এসব কি বলছো তুমি! তুমি দেখি কিছুই পারো না। খরগোশ! এই ছেলে কী করে ভালুককে শায়েস্তা করবে শুনি!’
‘ইয়ে নো প্রবলেম স্যার। সব শিখিয়ে দেব। দুটো দিন সময় দিন।’
‘আমি কিছুই শিখবো না। আমি বাড়ি যাব। সন্ধা হয়ে গেলে আম্মু বকা দেবে।’
শুঁয়োপোকা বহু কষ্টে মেজাজ ঠান্ডা রাখলেন। অ্যালিস না আসায় এমনিতেই তিনি বিরক্ত। তার মধ্যে খরগোশ কোত্থেকে একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে এনেছে যে কিনা বলতে গেলে কিছুই জানে না।
‘শোনো খোকা, ভয়ের কিছু নেই। ওয়ান্ডারল্যান্ডে পৃথিবীর সময় অচল। তুমি এখানে যতক্ষণ খুশি ঘুরে বেড়াও, বাড়িতে গিয়ে দেখবে সবে বিকেল হয়েছে।’
অন্তু ব্যাপারটা বুঝতে পারলো না। সে বেশ চিন্তিত। প্রত্যেক শুক্রবারের মতো আজও সে দুপুর বেলায় গুলতি নিয়ে বের হয়েছিল। কলিদের বাড়ির পেছনে ছোট্ট একটা রাস্তা সোজা চলে গেছে বিলের দিকে। বেশ নির্জন রাস্তা। দুপাশের জঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে গুইসাপ বের হয়ে আসে। তবে ওগুলো বেশ নিরীহ। গুলতি ছুড়তেই দুদ্দাড় করে পালায়। এরপর একটু এগিয়ে যেতেই একটা অদ্ভুত বড় মাছরাঙ্গা দেখে।
ঝোপের ওপাশে খালের দিকে মূর্তির মতো তাকিয়ে ছিল ওটা। অন্তু ওটাকে তাক করে গুলতি ছোঁড়ার আগেই খরগোশের গাজর খাওয়ার শব্দ আসে কানে। ছোট্ট একটা টি-শার্ট গায়ে দেওয়া খরগোশ দেখেও চমকে ওঠেনি অন্তু। কেন ওঠেনি তা জানে না। এরপরই গুলতি দিয়ে ঢিল ছোড়ে। কিন্তু কী আজব! ঢিলের গুতো খেয়েও খরগোশ নড়ে চড়ে না। উল্টো আঙুলের ইশারায় অন্তুকে তার পিছু পিছু যেতে বলল! অন্তুও বোকার মতো খরগোশের পিছু নিয়ে ঢুকে পড়লো একটা ঝোপের ভেতর। তারপর খেল একটা ধাক্কা। আর সুরুৎ করে ঢুকে গেল আজব এ রাজ্যে।
ঘাস বিছানো রাস্তা দিয়ে হাঁটছে অন্তু মিয়া আর উইলিয়াম খরগোশ। রাজা শুঁয়োর সঙ্গে পরিচয় পর্ব শেষ। এবার রাজ্য ঘুরে দেখার পালা। অন্তুর কাছে এখন আর ব্যাপারটা স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। স্বপ্ন এত পরিষ্কার হয় না। কিন্তু রাস্তার পাশের গাছগুলো এমন ঘাড় ঘুরিয়ে কী দেখছে! গাছগুলো কি তাকেই দেখছে! ফিসফিস শব্দও পাচ্ছে সে। সম্ভবত একটি গাছ আরেকটি গাছকে কানে কানে বলছে, ‘ওমা এ তো ছেলে। তুই না বললি বইটার নাম অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড? এ অ্যালিস হতেই পারে না! অসম্ভব!’ সঙ্গে সঙ্গে কে যেন উত্তর দিল, ‘আরে ধুর বোকা, এ অ্যালিস হতে যাবে কেন! এ হচ্ছে.. সম্ভবত বন্দি। আমাদের রাজ্যের প্রথম বন্দি। দেখছিস না হাফপ্যান্ট পরে আছে।’
অন্তুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ইচ্ছে হলো গুলতি মেরে গাছগুলোকে একটা শিক্ষা দেয়। কিন্তু এখন সে এ রাজ্যের অতিথি। উটকো ঝামেলায় জড়ানো ঠিক হবে না।
‘তো অন্তু তোমার প্রথমে শিখতে হবে। ইয়ে.. কী যেন শিখতে হবে। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, প্রথমে জানতে হবে আমাদের কেন মৌচাকগুলোকে শয়তান ভালুকের হাত থেকে বাঁচাতে হবে।’
‘হুমম.. কেন?’
‘কারণ, ভালুকটা আমাদের মৌচাকগুলো নষ্ট করে দিচ্ছে।’
‘মৌচাক নষ্ট হলে কী হবে?’
খরগোশ দাঁড়িয়ে গেল। অন্তুর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, এমন বোকা ছেলে সে জীবনেও দেখেনি এবং সে ভীষণ দুঃখও পেয়েছে বোঝা গেল। তবে দ্রুত সামলে নিল নিজেকে। অন্তুর দিকে না তাকিয়ে কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘শোনো খোকা, মৌচাক হচ্ছে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। মৌচাক নষ্ট হলে মৌমাছিরা থাকবে কোথায়? সবাই মারা যাবে।
‘মৌমাছি মারা গেলে আমাদের কী।’
‘উফফ। রাজা ঠিকই বলেছেন, তুমি আসলেই কিছু জান না। মৌমাছি না থাকলে গাছে আপেল ধরবে না, নাশপতি ধরবে না, এমনকি কোনো শিমও হবে না। হাজার হাজার গাছ মারা যাবে। কারণ আপেলের ফুল থেকে মধু না খেলে ওই ফুল থেকে আপেল হবে না কোনোদিন। শুধু ওয়ান্ডারল্যান্ড নয়, এটা পৃথিবীতেও হবে।’
‘বুঝলাম। এখন আমাদের শয়তান ভালুককে গিয়ে বোঝাতে হবে সে যেন মৌচাক নষ্ট না করে?’
‘ওকে বোঝানো অনেক কঠিন।’
হাতের গুলতিটার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত চেহারায় অন্তু বলল, ‘আচ্ছা ভালুকের চামড়া কি অনেক মোটা? টিভিতে দেখেছি। কম্বল গায়ে ঘুরে বেড়ায়।
‘ওটা কম্বল নয়, ওটাই ওর চামড়া। অনেক পশম। তোমার এই গোলায় কাজ হবে কিনা সন্দেহ হচ্ছে আমার।’
‘তাহলে আমাকে নিয়ে এলে কেন?’
অন্তু রাগ করতে পারছে না। কারণ ওয়ান্ডারল্যান্ডটা তার অনেক পছন্দ হয়েছে। অনেক সুন্দর সুন্দর ফুল। রাস্তায় একটুও ময়লা নেই। চাইলে এই জঙ্গলের রাস্তাতেই ঘুমিয়ে পড়া যাবে। কেউ কিছু বলবেও না।
অন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে ওয়ান্ডারল্যান্ডের পাউরুটি গাছ দেখে। পাউরুটি গাছের প্রত্যেক ডালে সারি সারি ব্রেড ঝুলছে। ফুল থেকে চিপে বের করা মিষ্টি জেলি মেখে দুই পিস খেয়েছে সে। আর পানি তো সবখানেই আছে। নদী, পুকুর, ডোবা সব পানিই পরিষ্কার। খাওয়ার পর খরগোশের কুড়েঘরে খানিক জিরিয়ে নিল অন্তু। ঘরের ভেতর একটা কম্পিউটার আর বড় মনিটরও দেখতে পেল অন্তু। খরগোশ বলল, ওটা দিয়ে সে পৃথিবীর সিনেমা দেখে। কথার ফাঁকে এটাও বলল, তার হলিউডের সিনেমায় অভিনয় করার খুব শখ।
আরেকটা মজার ব্যাপার হলো ওয়ান্ডারল্যান্ডের বিকেলটা নাকি অনেক বড় হয়। সূর্যটা সহজে ডুবতে চায় না। আর তাই বাড়িতে ফেরার তাগাদাও বোধ করছে না অন্তু। কিন্তু খরগোশ তাকে এখনো ভালুকের কাছে নিয়েও যাচ্ছে না। বলেছে ওর নাকি অনেক কিছু শিখতে হবে।
দুদিন পর। ওয়ান্ডারল্যান্ডের সব মোটামুটি দেখা হয়েছে অন্তুর। তেমন কিছুই শেখা হয়নি। তবে আরো অনেক শহর আছে যেখানে এখনো সে ঢুকতে পারবে না। ওই সব শহরে যেতে ভিসা নামের একটা জিনিস লাগে। ওটা পেতে নাকি তাকে অনেকগুলো মিশন শেষ করতে হবে। আপাতত প্রথম মিশন হলো শয়তান ভালুকের হাত থেকে মৌচাক বাঁচানো।
জঙ্গলের শেষপ্রান্তে ভালুকের আস্তানায় পৌঁছাতে সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হলো না। জঙ্গলের ভেতর নাকি বিকেলটা একটু বেশিক্ষণ থাকে। অন্তু ভেবেছিল অন্ধকারের আড়াল থেকে দু’চারটে গুলতি ছুড়ে চলে আসবে। কিন্তু তা বোধহয় হবে না।
‘শোনো ভালুক কিন্তু শব্দ শুনলে চমকে যাবে। আর তখন সে পালিয়ে যাবে। কিন্তু তাকে শায়েস্তা করতেই হবে।’
অন্তু নিজে নিজে ভাবছে। খরগোশের পরামর্শে কান দিয়ে লাভ নেই। সে ভাবছে, ভালুককে গুলতি মারাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এতে ভালুক নিশ্চয়ই খেপে গিয়ে তেড়ে আসবে। আর ভালুকের সঙ্গে দৌড়েও পারবে না সে। বিকল্প ভাবতে হবে।
বড় একটা বট গাছ বেছে নিল খরগোশ। বয়স্ক গাছ। একটু পরপর খুক খুক করে কাশছে। অন্তুকে দেখে একটু হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু লম্বা লম্বা ঝুরির ফাঁক গলে সেই হাসি ঠিক বোঝা গেল না।
‘কি খোকা। ভালুককে মারতে এসেছ বুঝি। দেখ কিছু করতে পার কি না। আমাকে তো আঁচড় কেটে কেটে একেবারে.. খুক খুক খুক।’
অন্তু গাছের গায়ে হাত দিয়ে গিয়েও দিল না। বুড়ো গাছ। যদি আবার ব্যথা পায়। একপাশে উঁকি দিতেই ভালুকের ঘরটা দেখতে পেল অন্তু। বেশ সুন্দর গোছাল একটা কুড়ে ঘর। সামনে সুন্দর বাগান। বাগানে আবার চেয়ার টেবিল। টেবিলের ওপর একটা বাটিতে সুন্দর করে মধু সাজানো। কিন্তু ভালুককে দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় বুড়ো গাছ বলল, ‘ভালুক গেছে মৌচাক আনতে। সে মধু জমা করে রাখছে। কার কাছে নাকি শুনেছে গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে ওয়ান্ডারল্যান্ডের তাপ বেড়ে যাবে। আর মৌমাছিরাও নাকি সব চলে যাবে। তখন আর মধু পাওয়া যাবে না।’
‘কী গ্যাস বললেন?’
এবার চটপট উত্তরটা দিল উইলিয়াম খরগোশ। ‘ওটা হচ্ছে একটা ক্ষতিকর গ্যাস। তবে শুধু পৃথিবীর জন্য ক্ষতিকর, ওয়ান্ডারল্যান্ডের জন্য নয়। ভালুক নিশ্চয়ই পৃথিবীর কোনো চ্যানেলে খবর দেখেছে। তা না হলে তো গ্রিনহাউস গ্যাসের ব্যাপারে তার জানার কথা না।’
জ্ঞান দেওয়ার চান্স সহজে মিস করেন না বুড়ো বট। তিনি আবার বলতে লাগলেন, ‘শোনো খোকা। তোমাদের জগতে তো গাছেরা কথা বলতে পারে না। পারলে বুঝতে পারতে এই গ্রিনহাউস গ্যাস কী সব্বোনাশ ঘটিয়ে দিচ্ছে। ওইখানে গাছেদের না জানি কত কষ্ট করতে হচ্ছে। ওহ আচ্ছা বলাই তো হয়নি। তা গ্রিনহাউস গ্যাসটা হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও এর মতো আরো কতগুলো গ্যাস। মানুষের কারণেই ওটা বেড়ে যাচ্ছে খোকা।’
অন্তু মনযোগ দিয়েই শুনলো। কিন্তু গ্রিনহাউস সমস্যার সমাধানের আগে ভালুককে শায়েস্তা করতে হবে। গুলতিটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছে। কারণ নতুন একটা আইডিয়া এসেছে মাথায়।
বুড়ো বটের কথা মতো ভালুকের ফিরতে এখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। এই এক ঘণ্টার মধ্যেই কাজটা সারতে হবে। কিন্তু কাজ সারার মতো জিনিসপত্র…। পকেটে হাত দিতেই চোখ চকচক করে উঠলো অন্তুর। গাছ থেকে বরই পেড়ে খাওয়ার জন্য কাগজে মুড়ে লবণ নিয়েছিল সে। ওটা এখনো পকেটে আছে। দেরি না করে এক দৌড়ে ভালুকের ডাইনিং টেবিলের সামনে হাজির দু’জন। খরগোশ কিছু বুঝতে না পেরে শুধু এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। অন্তু পকেট থেকে সবগুলো লবণ ঢেলে দিল মধুর বাটিতে। ভালুক বেটা মনে করবে মধু সব লবণাক্ত হয়ে গেছে।
‘খরগোশ দাদা, ওয়ান্ডারল্যান্ডে বোম্বাই মরিচ পাওয়া যাবে? খুব ঝাল?’
কিছুটা লজ্জা পেলেন উইলিয়াম খরগোশ।
‘না খোকা, এত ঝাল তো আর আমরা খেতে পারি না। এটা পাওয়া যাবে না। তবে আমি এক দৌড়ে পৃথিবী থেকে এনে দিতে পারি।
‘আমাদের বাড়ির উঠোনের গাছেই পাবে। জলদি নিয়ে এসো।’
খরগোশ চলে যেতেই অন্তু আবার বুড়ো বটের আড়ালে চলে গেলো। শুধু লবণ দিয়ে কাজ নাও হতে পারে। ভালুককে বোঝাতে হবে যে তার উপর রাগ করে মৌমাছিরা ঝাল মধু সংগ্রহ করা শুরু করে দিয়েছে।
অন্তু গাছের গোড়ায় বসে আরেকটু হলে ঘুমিয়েই যেত। তার আগে টুংটাং শব্দ শুনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বুড়ো বট ফিসফিস করে বলল, ‘খোকা! ভালুক এসেছে। ওটা ওর সাইকেলের বেল’।
‘হুমম.. বুদ্ধিমান ভালুক। তবে আমার চেয়ে বেশি নয়।’
গাছের আড়াল থেকে উঁকি দিতেই চোখ কপাল ছাড়িয়ে মাথায় উঠে গেল। এ তো রীতিমতো বিজ্ঞানী ভালুক। কাঠ দিয়ে বানানো একটা সাইকেল চালিয়ে হেলেদুলে আসছে। মাথায় আবার বিদেশি হ্যাট। চোখে সানগ্লাস। আর পুরো শরীর জুড়ে নভোচারীদের মতো অদ্ভুত এক পোশাক পরে আছে। মৌমাছির কামড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য মনে হয়। ভাগ্যিস গুলতিটা বের করেনি অন্তু। গুলতি মারলে কাতুকুতুও লাগবে না ভালুকটার।
‘এই নাও বোম্বাই মরিচ।’
‘থ্যাংকু খরগোশ দা। কিন্তু এমন লাফাচ্ছো কেন?’
‘ইয়ে মানে। না। হুহ হাহ। ভেবেছিলাম গাজরের মতো.. একটু কামড়। হুহ..। আমি যাই। একটু পানি খেয়ে আসি।
খরগোশকে আর আটকে রাখলো না অন্তু। বেচারা বোম্বাই মরিচের স্বাদ নিতে চেয়েছিল। যাই হোক, মরিচ গুলো নিয়ে এখন সাহস করে এগিয়ে যেতে হবে।’
ভালুককে না দেখার ভান করে মরিচ হাতে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অন্তু। বাড়ির সামনের রাস্তায় আসতেই তাকে দেখতে পেল ভালুকটা।
‘হে হে। আমার আঙিনায় কে রে! ট্যাক্স না দিয়ে যাচ্ছে কে?’
‘জ্বি ইয়ে। ভালুকদা আমি অন্তু।’
‘হে হে। কি হাস্যকর নাম। এদিকে আসো বাছা। ট্যাক্স দিয়ে যাও।’
‘কিন্তু ভালুকদা আমার কাছে এই বিলেতি আপেল ছাড়া আর কিছু নেই।’
‘আর কিছু চাচ্ছে কে শুনি! ওটাই তো দরকার।’
‘কিন্তু ভালুকদা শুনলাম, বাগানের সব মধু নাকি বিষাক্ত হয়ে গেছে।’
‘অ্যাঁ বলিস কিরে!’
‘মধু যারা খেয়েছে তাদের কাছে নাকি এখন কোনো খাবারই আর ভাল লাগবে না।’
‘জলদি আপেলগুলো দে তো। একটু খেয়ে দেখি।’
‘সবগুলো একসঙ্গে এক কামড়ে খেতে হবে কিন্তু। তা না হলে কোনো মজাই পাবে না।’
‘তাই হবে। জলদি দে! নইলে এক কামড়ে তোকে খাব!’
এরপর কী কী ঘটেছে সেটা সবাই আন্দাজ করতে পারবে। তবু সংক্ষেপে বলছি বাকিটা। এক কামড়ে সবক’টা বিলেতি আপেল খেয়ে ভালুকের কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের ওপর রাখা একবাটি মধু সাবাড় করে দিল সে। কিন্তু এ তো একেবারে দেশি বোম্বাই মরিচ, ওয়ান্ডারল্যান্ডের নয়। ঝাল কি আর সহজে যায়! তার ওপর এমন বিস্বাদ মধু জীবনেও খায়নি সে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করলো আর মধুও খাবে না, আপেলও না। ওদিকে মহান শুঁয়োপোকা খুশি হয়ে অন্তুকে ওয়ান্ডারল্যান্ডের আজীবন ফ্রি টিকিট দিয়ে দিলেন। অ্যালিসকেও ওটা দেননি তিনি। আর খরগোশের সঙ্গে আবার আনন্দপুর গ্রামে পৌঁছে গেল অন্তু। কী অবাক কাণ্ড! এতকিছু ঘটে গেল অথচ এখনো বিকেল গড়ায়নি! আর তাই ঝোপ থেকে বের হয়ে আবার জঙ্গলে ঢাকা রাস্তা ধরে গুলতি হাতে এগিয়ে গেল অন্তু।