Saturday, January 24
Shadow

জীবন

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া

আমি মৃত্তিকা ৷ সর্বংসহা ধরণীর মত লক্ষ্মী মেয়ে৷
এই যে সকালবেলা কলম খুঁজতে গিয়ে একটা লম্বা চওড়া মাঝারী ওজনের চড় আমার স্বামী ফর্সা গালে বসিয়ে দিলেন তাতে আমি কিছু মনে করিনি৷
আত্মসম্মানবোধ সেই কবেই বিসর্জন দিয়েছি। আগে একটুতেই চোখে পানি আসতো।  একটু কটু কথাও সহ্য হতো না। এখন গায়ে হাত তুললেও কিছুই মনে হয় না।
বরং গালে হাত বুলাতে বুলাতে, ছলছল চোখে হাসিমুখে তাকে দেখিয়ে দিলাম কলমটা তার পকেটে৷
ছোট্ট একটা sorry  উচ্চারণ করে উনি চলে গেলেন৷ আমিও কাজে মন দিলাম৷

bangla husband wife story romantic sad

বিছানার উপর হাত পা নেড়ে তিন মাসের ছোট্ট যে মেয়েটি খেলছে সে আমার মেয়ে চেতনা৷ 
ওর জন্মে এ  বাড়ির কেউ খুশি হয়নি৷
প্রথম সন্তান পুত্র হবে, বৃদ্ধ বয়সে বাবার সংসারের হাল ধরবে,
বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে৷ এ প্রত্যাশা ছিল কায়েসের পরিবারের৷
অবশেষে আঙুর ফল টকের মত কায়েস বলেছে, প্রথম সন্তান কন্যা হয় ভাগ্যবানের৷
পরেরটা কিন্তু ছেলে চাই৷

আমি খুব লক্ষ্মী বউ৷
আমার চেতনা নামটি হিন্দু নাম বলে সবাই যখন বাতিল করল আমি তখন একটুও প্রতিবাদ করিনি৷ এমনিতেই আমার নিজের নাম নিয়ে হাজারটা অভিযোগ আমার শ্বশুর বাড়ির সবার।

চেতনার বাবা ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা৷
ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে অপেক্ষা করি৷
প্রতিদিনই রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে ঘরে ফিরে কায়েস৷  গজগজ করতে করতে অফিসের নানাজনকে গালি দিতে দিতে  হাতমুখ ধুতে থাকে।
আগে ওর অশ্লীল বাক্যে অবাক হতাম৷ এখন হই না৷ খেতে বসে কোন তরকারীই পছন্দ হয় না৷
এক্ষেত্রেও রাগারাগিতে কিছু মনে করি না৷

আসলে সময়টাই সব৷ একদিন যা মানুষকে আঘাত করে সময়ে সেটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
সময়ে একদিন সব ঠিক হয়ে যায়৷
যে যত মেনে নিতে পারে সে ততটাই লক্ষ্মী মেয়ে৷

এভাবে একদিন সবকিছু মেনে নেবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবো বলেই হয়ত বাবা নাম রেখেছিলেন মৃত্তিকা৷

দুই

পূর্ণিমার চাঁদ,জোসনার প্লাবন আমার নয়৷ বিড়বিড় করে নিজেকে বলি৷ অন্ধকারে স্পষ্ট হয় যে মুখটি তাকে মুছে ফেলতে চাই প্রাণপনে৷
   তবুও সে স্পষ্ট হয়৷ তার নিঃশ্বাস অনুভব করি ঘাড়ে ৷অদৃশ্য স্পর্শে আমি রোমাঞ্চিত হই। কানের কাছে ফিসফিস শব্দ “বউ, আমার লক্ষী বউ” ৷

আচমকা ভুলে যাই অন্ধকার ঘর, স্বামী, সন্তান সব৷ এখন দাঁড়িয়ে পুকুর ঘাটে, চাঁদের রহস্যময় আলোয় এক বলিষ্ঠ বাহুর বন্ধনে৷ যার বলিষ্ঠ বাহু আমায সাহস জোগায়, যার বিস্তৃত বক্ষ আমায় আশ্রয় দেয়, যার স্পর্শ আমায় জগৎ সংসার ভুলিয়ে দেয়৷ আমার মাঝে জেগে ওঠে অন্য এক আমি৷
হঠাৎ চেতনা কেঁদে ওঠে৷ আমি চমকে তাকাই৷ নিজেকে আবিস্কার করি কায়েসের বুকের মাঝে৷ শীতল হয়ে যাই সহসাই৷ কায়েস বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, ধাৎ৷
আমি পাথর হয়ে তাকিয়ে থাকি চেতনার দিকে৷ আমার ছোট্ট  মেয়ে চেতনা৷ কায়েস পাশ ফিরে শুতে শুতে বলে, কী যে হয় তোমার বুঝি না৷ মুহূর্তেই পাল্টে যাও৷
ঘোর লাগা দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি৷ কোথায় আছি হঠাৎ বুঝতে পারি না৷
শূণ্য বুকে হাহাকার করে ওঠে৷ মেয়েকে চেপে ধরি বুকের মাঝে। দুচোখের প্লাবনে আমার রাজকন্যা ভিজে যাচ্ছে৷
আমি  ফিসফিস করে  নিজেকেই বলছি, এত বড় একটা জীবন আমি কী করে পাড়ি দেব?

তিন

গ্রামের কলেজে পড়ি তখন। বান্ধবীর বোনের বিয়েতে পরিচয় হলো তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ভাইয়ের সাথে।
চমৎকার গান গাইত  জামিল।  বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে গান শুনেই প্রেমে পড়ে গেলাম তার।

এক কান দুই কান করে অভিভাবকদের কানে পৌঁছে গেল খবর।
দুই পরিবারই শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।

আমার এইচ এসসি পরীক্ষা শেষ হলে বিয়ে।
জামিলের অনার্স শেষ। ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলে থাকে তখনো।
স্বৈরশাসক এরশাদের  শেষ সময়। উত্তাল ঢাকা শহর।
জামিলের কথা শুনতাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো। চোখে স্বপ্ন আর বুকে আগুন। গণসংগীত গেয়ে রাস্তায়  রাস্তায় ঘুরত ওদের সাংস্কৃতিক দলটি। গানের মধ্যে ছিল আগুন আর মুক্তির কথা।
জামিল তখন এমনভাবে কথা বলতো, মনে হতো এই স্বৈরশাসকের পতনের পরই সব সমস্যার সমাধান।
গণতন্ত্র আসবে। মুক্তি আসবে। আসবে বৈষম্যহীন সমাজ।
আমি তাকিয়ে থাকতাম ওর মুখের দিকে। পৃথিবীর কোন ভয়ই যেন স্পর্শ করত না তখন।

কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারি না।জামিলের জন্য মন কেমন করে।

মন খারাপ। ঢাকা শহর উত্তাল।  জামিল প্রায় একমাস হয়ে গেল গ্রামে আসে না। চিঠি লিখেছে।
আমি একাত্তর দেখিনি। দেখেছি ৯০ – এর আন্দোলন।  অপেক্ষায় কেটে যায় সময়। আতংকে কাটে সময়।
শেষবার আমাদের দেখা হয়েছিল পুকুর ঘাটে। তাই সময় পেলেই একা একা বসে থাকি পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে।

অবশেষে দীর্ঘ বিরহের পালা শেষ হলো। জামিল এলো ঢাকা থেকে। পুরো গ্রাম এলো সাথে।
কফিনে এসেছিল জামিল।
আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে একটা চিৎকার। এটুকুই মনে আছে।
শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল মনে নেই। পুরো একটা বছরের কোন স্মৃতি মনে ছিল না। 

চার

   আকাশে বিশাল একখানা চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী। বড় বড় অট্টালিকার ফাঁক দিয়ে একটুকরো আকাশ।
ঢাকাশহরে না আছে আকাশ, না জোসনা।
মন কেমন করা এই জোসনায় দরজা খুলে চলে যেতে মন চায় দূরে বহু দূরে।
একই চাঁদ। তবু শহর আর গ্রামে তার চেহারা আলাদা।
গ্রামের মেঠোপথ,  শস্যক্ষেত,  সবুজ গাছে চাঁদের আলোর মায়াবী রূপ।
ঘর ছাড়া জোসনা ডাকে। সব ছেড়ে সিদ্ধার্থের মত দেশান্তরি হতে মন চায়।
আকাশে আছেন তিনি।যিনি তাকিয়ে আছেন আমার পানে।
বিড়বিড় করে তাঁকে বলি, আরো কতোদিন বাকি?

এক মিথ্যাবাদী আমায় বলেছিলো, স্বৈরশাসকের পতনের পরই ঘুচবে আঁধার। আলোর স্বপ্ন দেখিয়ে নিজেই সে হারালো গাঢ় অন্ধকারে।
আমি দীর্ঘ এক জীবনের হাহাকার নিয়ে বসে থাকি মুক্তির অপেক্ষায়।
জীবনের পথ এতো দীর্ঘ কেন?

পরিচয়ঃ
লেখিকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম. এস. এস, তিন দশকেরও বেশি তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। ২০০০ সালে শিশু অধিকারের ওপর গল্প লিখে লাভ করেন সুনীতি অ্যাওয়ার্ড। ২০১২ সালে ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। ‘উজান স্রোতের নদী’ গ্রন্থের রচয়িতা, ঢাকার ‘খেয়ালী নাট্য গোষ্ঠী’র সাবেক সহ-সভাপতি, বর্তমানে দৈনিক ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্ট।

মেইলঃshakilanasrin100@gmail 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *