ছোটদের গল্প : পিপির প্ল্যান

পিপির মন খারাপ। মা আজও বকেছে। সে নাকি বসে বসে শুধু চিনি খায় আর ঘুমায়। কিন্তু সে যে মস্ত বড় বিজ্ঞানী এটা কারো মাথাতেই ঢোকে না। সে-ই প্রথম প্রমাণ করলো, শুধু মরার সময়ই পিঁপড়ার পাখা গজায় না, এর আগেই চাইলে পিপড়ারা পাখা লাগিয়ে উড়তে পারে। ইলেকট্রনিক পাখা বানানোর জন্য গত বছর সেরা পিবিজ্ঞানীর পুরস্কার পেয়েছিল সে। আর বিজ্ঞানীরা তো একটু বেশি ঘুমাবেই।


টিটিনপুর পাশেই আছে ইয়া বড় এক দালান। সেখানে আবার রেড ইন্ডিয়ান পিপড়াদের কলোনি। অবশ্য এখন পর্যন্ত মিলেমিশে আছে সবাই। লাল পিঁপড়ের দল খাবার খোঁজার সময় ঘাড় উঁচিয়ে টিটিনপুরের দিকে তাকালেও কখনও কিছু বলেনি।


ওদের নিয়েই চিন্তায় আছে পিপি। যদি আক্রমণ করে বসে! চিন্তা করা ছাড়া আপাতত কাজও পাচ্ছে না। কারণ অন্যদের মতো লাইন ধরে খাবার খুঁজতে তার ভাল লাগে না। সবাই খাবার জমা করার কাজে ব্যস্ত। সামনে নাকি বর্ষার মৌসুম। কিন্তু পিপি জানে, বর্ষা হলেও তার খাবার খুঁজতে সমস্যা হবে না। মাকড়শার জাল আর প্লাস্টিক দিয়ে একটা জাহাজ বানিয়েছে ও। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বর্ষার সময় তাদের ঢিবিতে না আবার হামলা চালায় লাল পিঁপড়ের দল। যতদূর শুনেছে ওদের নাকি ঢিবিই নেই। আর চিহির কাছে শুনেছে ওরা নাকি টিটিনপুরে হামলা করার ফন্দি আঁটছে। চিহি হলো পিপির বন্ধু। মোটকু পিঁপড়া। ও আবার টুকটাক গোয়েন্দাগিরিও করে। এদিকে পিপির কথা সহজে কেউ বিশ্বাসও করতে চায় না। তাই পিপি ভাবল সোজা গিয়ে রানীর সঙ্গে আলাপ করবে।


‘হাই পিপি! ঘাসের ডগায় কী কর? চলো প্যারাসুট জাম্প দেই।’
‘না চিহি। আমি চিন্তায় আছি। আর এখনতো গোলফুল ফোটেনি। প্যারাসুট জাম্প দিতে পারবো না। তারচেয়ে চলো লেবু পাতায় চড়ে খানিকটা সার্ফিং করি। তাতে যদি দুশ্চিন্তা কমে।’
‘কিন্তু আমার কাছে যে খবর আছে তাতে তোমার চিন্তা আরো বেড়ে যাবে। লাল পিঁপড়েরা পরশু আক্রমণ করবে। ওদের কথা আমি শুনেছি। আমাদের সব জমানো খাবার লুটে নেয়ার ফন্দি করেছে ওরা।’
‘হুম। তাহলে আর দেরি করা ঠিক হবে না। তোমাকে যা বলেছি তা করেছ তো?’
‘হ্যাঁ পিপি। এবার আর ভুল করিনি। ওদের সব কথা ভিডিও করে এনেছি।’
‘ঠিকাছে চলো আমার সঙ্গে। রানীকে দেখাব।’


একদৌড়ে দুজন গেল রানীর কাছে। পিপিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে রানী মুচকি হাসলেন। ‘কিহে পিবিজ্ঞানী পিপি। আজ আবার কী বানালে?’
‘মহাবিপদ হার হাইনেস (রানীদের এভাবে সম্বোধন করতে হয়)। রেড ইন্ডিয়ানরা আক্রমণ করতে আসছে। আমার কাছে প্রমাণ আছে।’
চিহি দ্রুত তার ক্যামেরাটা বাড়িয়ে ধরলো পিপির দিকে। কয়েক মাস আগে ন্যানোটেকনোলজি নামের একটা প্রযুক্তি খাটিয়ে ওটা বানিয়েছে পিপি। সময় নষ্ট না করে দ্রুত ওটা অন করে রানীর সামনে বাড়িয়ে ধরলো। দুটো লাল পিঁপড়ার আলোচনা দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার।
প্রথম লাল পিপড়া: কী রে মিককু, ওস্তাদ কী বলল রে? কাল না পরশু?
দ্বিতীয় লাল পিপড়া: কালই যাব। আজ সব অস্ত্র রেডি করবো। এরপর দেখবো টিটিনপুর ঢিবিকে বাঁচায় কে। উহাহাহা।

রানী মহা চিন্তায় পড়ে গেলেন। একবার পিপির দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার চিহির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আবার ঢিবিতে ঢুকে পড়লেন। ফিরে এলেন তিন সেকেন্ডের মধ্যেই। হাতে একটা সিল বসানো লেটুস পাতা আর দুটো চিনির দানা। পিপির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে রানী বললেন, ‘এই নাও। চিনির দানাদুটো তোমরা খেও। আর সিলমোহর বসানো পাতাটা দিলাম। এটা দেখিয়ে যার কাছে যা চাইবে সব পাবে। তোমরা এখন রানীর বিশেষ কর্মী।’


রানীকে ধন্যবাদ জানিয়ে সময় নষ্ট করলো না পিপি। চিহিকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করলো কারখানার দিকে। রানীর সিল আছে তার কাছে। যার কাছে যা চাইবে সব পাবে। তার কথামতো কাজ করতে হবে সবাইকে। প্রথমেই চোখে পড়লো মিষ্টি বাহিনী। রানীর সই করা কাগজ দেখাতেই সঙ্গে সঙ্গে পাঁচটা মিষ্টি পাথর কণা দিল ওরা।


কারখানায় গিয়ে রানীর আদেশপত্র দেখাতেই শোরগোল বেধে গেল। পিপির দিকে সমীহ করে তাকাচ্ছে সবাই। কিন্তু আনন্দিত হওয়ার সময় নেই। দ্রুত একটা লম্বা পাইপ নিল, একটা বিশেষ আঠাওয়ালা পাতা আর তীর-ধনুক নিলো।


টিটিনপুরের পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। ওই গিরিখাতটা গিয়ে মিশেছে টিটিনপুরের জলপ্রপাতে। মানুষরা যাকে বলে ড্রেন। তারপর ওই ড্রেনের পানি গিয়ে মিশেছে প্রশান্ত মহাসাগরে। মানুষরা ওটার নাম রেখেছে পুকুর। অন্যদিন নামটা শুনলে হাসি পায় পিপির। কিন্তু আজ আর পেল না। হাতে আছে মোটে একটা দিন। এদিকে যন্ত্রপাতি তৈরি করতে সন্ধ্যে হয়ে এল। সারারাত কাজ করতে হবে।


ভোরের খানিক আগেই ঘুম ভাঙলো পিপির। রানীর দেয়া চিনির দানা দিয়ে আয়েশ করে নাস্তা সারলো। চিন্তা করতে গেলে মিষ্টি খেতে হয় নাকি। তবে খুব বেশি খায় না পিপি। এতে আবার ডায়াবেটিস হতে পারে।
ঢিবির সব পিপড়ারা এখনো ঘুমোচ্ছে। লম্বা পাইপ, তীর ধনুক আর মিষ্টি পাথর ঝোলায় পুরে এগিয়ে গেল ড্রেন নামের ওই গিরিখাতটার দিকে। বিশাল নদীর মতো। তবে এঁকেবেঁকে না গিয়ে সোজা মিশেছে সাগরে। ডোবা নামের ওই সাগর থেকে একটা নালা চলে গেছে মহাসমুদ্রে, আরেকটা গেছে জঙ্গলের ভেতরের গিরিখাতে। পিপি গেল দ্বিতীয় নালাটার মুখে। সেখানে গিয়ে একটা পাইপ বসিয়ে দিল। পাইপের একটা মাথা ডোবার দিকে রাখলো। এখন ড্রেনের মুখের ভেতর পাইপটা বসিয়ে দিলেই ওপাশ দিয়ে হুড়মুড় করে পানির স্রোত বের হবে। কিন্তু পিপি এখন তা বসালো না। পাইপের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ওটা নিয়ে উঠে গেল ড্রেনের ওপরে। পিপিকে সাহায্য করতে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল চিহি।


‘পিপি! কী করতে যাচ্ছ শুনি?’
‘একটা ফাঁদ বানাচ্ছি। পাইপটাকে ধরে ওপরে তোলো চিহি।’
কথা না বাড়িয়ে পিপিকে সাহায্য করলো মোটাসোটা চিহি। পাইপটা ড্রেনের ওপরে তুলে ধরতেই একটা পাতা দিয়ে ওটাকে আটকে দিল পিপি। এখন পাতাটা সরে গেলেই ড্রেনের মুখে পড়বে পাইপটা। তখুনি অন্য প্রান্ত দিয়ে গড়িয়ে যাবে পানির স্রোত।
পাইপের শেষ মাথায় গুনে গুনে পাঁচটা মিষ্টি পাথর রেখে দিতে ভুল করলো না পিপি। যাক, ভালয় ভালয় তৈরি হয়ে গেল ফাঁদটা।
তীর ধনুক নিয়ে হেঁটে চলল পিপি আর চিহি। কাছেই মাউন্ট এভারেস্ট পাহাড়। বাগানের মাঝে খাড়া হয়ে উঠে গেছে পাহাড়টা। মানুষগুলো বেশ অদ্ভুত। ওরা প্রায়ই বিকেলে এভারেস্টের উপর বসে পা দোলায়। পাহাড়টাকে ওরা বেঞ্চ নামে ডাকে!
পাহাড়ের উপর থেকে লাল পিঁপড়াদের আস্তানা পরিষ্কার দেখা যায়। মিককু নামের পিঁপড়াটাকে দেখল বাড়ির ফোকরের মুখে হেলান দিয়ে আয়েশ করে পাতা চিবুচ্ছে। পিপি আর চিহিকে দেখে পরিহাস করে বলল, ‘যত পারিস ঘুরে নে। আজই তোদের পথে বসতে হবে। হা হা হা।’


পিপি রাগ করলো না। বুদ্ধি করে বলল, ‘তা তো ঠিক। তোমাদের তো গায়ে অনেক জোর। তোমাদের সঙ্গে পারবো না। আমাদের জোর নেই তাই সাগর তীরে পড়ে থাকা মিষ্টি পাথরগুলোও আনতে পারিনি।’
‘মিষ্টি পাথর!’
একছুটে ভিতরে চলে গেল মিককু। দুই সেকেন্ডের মধ্যে শোরগোল শোনা গেল। তীর ধনুক এভারেস্টের উপর শুয়ে পড়লো পিপি আর চিহি।
রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে ভীষণ হট্টগোল বেঁধে গেল। কয়েক শ লাল পিঁপড়া গিজগিজ করতে করতে লাইন ধরে বের হতে লাগলো। দুদ্দাড় করে সবাই ছুটলো ডোবার দিকে। মিষ্টি পাথরগুলো দেখতেই কে কার গায়ে আছড়ে পড়লো তার হিসাব নেই। পাথর নিয়ে চলছে কাড়াকাড়ি। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা তীর এসে পড়লো ড্রেনের ওপরে। পিপি ছুড়েছে ওটা। কিন্তু জায়গামতো লাগেনি! ভাগ্যিস রেড ইন্ডিয়ান পিঁপড়েগুলো তা টের পায়নি। ওরা পাইপের বিপরীত প্রান্তে রেখে দেয়া মিষ্টি পাথরের ভাগাভাগিতেই ব্যস্ত। এমন সময় বেশ ভারি গলায় চিহি বলল, ‘পিপি, তুমি তো বিজ্ঞানী। তুমি তো গুলতি ছোড়া শেখনি। আমাকে দাও তীর ধনুক। আমি ঠিক লাগাতে পারবো।’
ঝাড়া পাঁচ সেকেন্ড সময় নিয়ে তাক করলো চিহি। এরপর ছেড়ে দিল তীর। সোজা গিয়ে লাগলো ড্রেনের ওপর রাখা পাতাটার গায়ে। সরে গেল পাতাটা। পাইপটা গিয়ে পড়লো ড্রেনের মুখে। অমনি পাইপের ভেতর হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো পানি। অপরপ্রান্তের লাল পিঁপড়ার দল টের পাওয়ার আগেই তাদের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো একরাশ পানি। হুড়মুড় করে মিষ্টি পাথরসহ সবাই গিয়ে পড়লো ডোবায়। যারা পেরেছে সাঁতরে কোনো একটা পাতার ওপর উঠেছে। আর বাকিরা খড়কুটো আঁকড়ে কোনরকম পানি গিলে চলে গেছে ওই পারে। টিটিনপুরে তারা আর ফিরে আসবে বলে মনে হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *