কুসুমপুরে সিন্ডারেলা

খাওয়া শেষে ভাবতে বসল দু’জন। রিন্টু গভীর মনযোগ দিয়ে ভাবছে। সিন্ডারেলা একটু পরপর ফুঁপিয়ে উঠছে। রূপকথার দেশে ফেরার কোনো উপায় জানা নেই তার।
‘পাইছি! কিউরেকা! না না ইউরেকা!’
তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো রিন্টু। সিন্ডারেলার চোখও খুশিতে চকচক করে উঠলো।
‘শোনো, রূপকথার গল্প তো আমাদের লেখকরা লেখে। তাদের কাছে গেলেই তো হয়! তারা তোমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখলেই তো তুমি ফিরে যাবে!’ সিন্ডারেলা আরেকটু হলে খুশিতে কেঁদেই ফেলত।
‘ইশশ.. দারুণ বুদ্ধি তোমার। থ্যাংক ইউ। কিন্তু..। কিন্তু লেখক পাবে কোথায়?’
‘চিন্তা নাই! আমাদের সাজু ভাই আছে। কবিতা টবিতা লেখে। উনি গল্প লিখতে পারে। আমাদেরকে অনেক অনেক গল্প শোনায়। এক কাজ কর, তোমাকে দেখলে গ্রামের লোকজন ভিড় করতে পারে। তুমি বাড়ি চলে যাও, আমি সাজু ভাইকে খুঁজি।’
সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রিন্টুর মা সিন্ডারেলাকে ভাপা পিঠা খেতে দিয়েছেন। সম্ভবত বিদেশি রূপকথার গল্পে এ পিঠার কথা কেউ লেখেনি। আর এ জন্যই সিন্ডারেলা এত মজা করে খাচ্ছে।
‘আরো দিন! অনেক মজা!’
শরিফা বেগমের ইচ্ছে করছে না, তবু বললেন কথাটা। ‘তোমার বাড়ির মানুষ চিন্তা করতাসে না মা?’
‘হুম..। করছে। করুক গে। আমি আরো পরে যাব।’
‘তুমি যাবা কেমনে? কই থাক?’
‘রিন্টু আমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে গেছে। একটু পরই যাব।’
‘রাইতে আর যাইবা ক্যান। রাতটা থাকো।’
‘আজকে রাতে যদি গল্প লেখা হয়ে যায় তাহলে আজই চলে যাব।’
শরিফা বেগমের মন খারাপ হয়ে গেল। তবে চিন্তাও হতে লাগল। সিন্ডারেলাকে না দেখে তার বাসায় নিশ্চয়ই এতক্ষণে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে।

রিন্টুর কথামতো মোহাম্মদ সাজু মিয়া সঙ্গে খাতা কলম নিয়ে এসেছেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনবার ফেল করার পর পুরোপুরি সাহিত্যচর্চায় নেমে পড়েছিলেন তিনি। বাজারে তার অনেক বই। সবই ছোটদের জন্য লেখা। রূপকথার বই তেমন একটা লেখেন না। কিন্তু এখন সমস্যা গুরুতর। লিখতেই হবে। উপায় নেই।
সাজু মিয়ার সঙ্গে সিন্ডারেলার টুকটাক কথা হয়েছে। তিনি এখন চা খাচ্ছেন আর ভাবছেন।

ভাবনার কিছু নাই সাজু বাই। লেইখা দেন, সিন্ডারেলা বাড়িত গেসে।
রিন্টুর কথায় সাজু মিয়া বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ করলেন না। লেখক কী লিখবে না লিখবে সেটা লেখক জানে। তবে সিন্ডারেলার উপর রাগ করতে পারছেন না সাজু মিয়া। মেয়েটা রূপকথার বইয়ের চেয়েও বেশি হাসিখুশি। কেমন যেন পুতুল পুতুল চেহারা।

সাজু ভাই, আপনি যাই লেখেন না কেন, এমন একটা ব্যবস্থা করেন যেন রূপকথার রাজ্য থেকে আমি মাঝে মাঝে এখানে আসতে পারি। ভাপা পিঠা খাওয়ার জন্য।

হুমম। তার আগে জাদুকর মিউনির রাহু কাটাতে হবে। ভাবছি..। হুম..।
সুরুৎ করে চায়ের কাপে ফাইনাল চুমুক দিয়ে কলম চেপে ধরলেন রাজু মিয়া। বারণ করা সত্বেও দুজন উঁকি মেরে দেখছে কী লেখা হচ্ছে। রাজু মিয়া লিখতে শুরু করলেন।

সিন্ডারেলাকে এখন পাখির সঙ্গে গান গাইতে হবে। পাখির সঙ্গে গান না গাইলে এ জাদু কাটবে না। কিন্তু রিন্টুদের বাড়ির উঠোনে মস্ত বড় এক কাক। কাক তো আর গান গায় না। এখন পাখি পাবে কোথায়? সিন্ডারেলা গেল উঠোনে। তার মাথায় অনেক বুদ্ধি। পকেট থেকে বের করলো নীলপরী প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির চকোলেট। উঠোনে ছুড়ে দিতেই ছোঁ মেরে ওটা গিলে ফেলল দাঁড়কাকটা। কী আশ্চর্য ব্যাপার! একটু পর আর কা কা বাদ দিয়ে আরামসে শিষ বাজিয়ে যাচ্ছে কাকটা। সিন্ডারেলাও তার সঙ্গে শিষ বাজাতে লাগলো। রিন্টু আর রিন্টুর মা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সিন্ডারেলা আস্তে আস্তে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে! যাওয়ার আগে সিন্ডারেলা রিন্টুর দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল, গুডবাই রিন্টু। আবার দেখা হবে। এরপর আসলে তোমাদের সবাইকে নিয়ে যাব রূপকথার দেশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *