ভূতের গল্প : মাছরাঙা ভূত

মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন

সুন্দরপুর গ্রাম। গ্রামের পাশে ছলছলা নদী। নদীর পাশেই স্কুল। বাঁধ দেওয়াতে এবারের বর্ষায় বড় ধরনের ভাঙন নেই। তাই স্কুলটার রক্ষে। এই স্কুলেই পড়ে ফয়েজ। নবম শ্রেণিতে। ঝিলের খানিক দূরেই তার বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত। কেউ তাকে কোথাও ডাকলে মানা নেই। রাত কয়টা বাজলো সেদিকে খেয়াল নেই। দে ছুট। একটা জোড়ালো শখ তার মধ্যে আছে। সেটা হলো মাছ ধরার শখ। বরশি দিয়ে টেঁটা দিয়ে কিংবা পোলো দিয়ে মাছ ধরা তার অন্যরকম শখ। আজ রাতে বৃষ্টি হয়েছে। রাত এগারোটা পর্যন্ত স্যারের কাছে পড়তে এসে আটকে পড়ে যায়। রাত সাড়ে এগারোটায় বাড়ি ফেরে। ঝিলের পাশ দিয়েই ওর যাওয়ার রাস্তা। হাতে টর্চলাইট। হঠাৎ দেখল ঝিলের কিনারে লাফিয়ে উঠছে অনেক মাছ। তেলাপিয়া, কই শিং ইত্যাদি। শরীর থেকে শার্ট খুলে মাছ ভরতে লাগল। অনেক হয়েছে। শার্টে আর জায়গা নেই। ওজনও হয়েছে বেশ। ভালো করে গিট মেরে মাছ কাঁধে ফেলে দ্রুত বাড়িতে চলে গেল। মাছের আনন্দে ফয়েজের বুকটা ভরে গেছে। কিন্তু আফসোস সব মাছ সে আনতে পারেনি। মাছের লোভ সংবরণ করতে পারছে না। বাড়িতে গিয়ে মাকে ডেকে মাছগুলো হাতে তুলে দিয়ে বলল, মা, আমি একটু আসছি। 

মা জিজ্ঞেস করলেন, এত রাতে কোথায় যাবি আবার? 

এই তো, আমি এক্ষুণি আসছি। 

বলতে বলতেই একটা ব্যাগ হাতে আবার ছুটল ও ঝিলের ধারে। ঝিলের ধারে পৌঁছাতেই দেখতে পেলো একটা বিশাল বড় মাছ কাত হয়ে পড়ে আছে। একটুও নড়াচড়া করছে না। যখনই মাছটি ধরতে গেছে আচমকা বাতাস মাছের উপর দিয়ে বয়ে গেল। শরীরে হঠাৎ করে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। লোমগুলো কাটা দিয়ে উঠল। হঠাৎ মনের মধ্যে একটা ভয় আশ্রয় নিলো। মনে হলো কেউ পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক-ওদিক টর্চ মেরে দেখল কেউ আছে কিনা। না তো, কেউ নেই। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখল, রাত সাড়ে বারোটা বাজতে চলেছে। টর্চলাইট মাটিতে রেখে দুই হাত দিয়ে মাছটা ধরে ব্যাগের ভেতরে রাখতেই টর্চের আলো নিভে জায়গাটা অন্ধকার হয়ে গেল। অনেক হাতড়িয়েও টর্চলাইট খুঁজে পেলো না। ভীষণ অন্ধকার। রাস্তাঘাট কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভীষণ ভয় করছে। অন্ধকারে অনুমান করে করে পা বাড়াতে লাগল। ভয় দমন করার চেষ্টায় জোরেসোরে গান ধরল- আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, চিরদিন তোমার…। আচমকা কিসের মধ্যে পা পড়তেই ‘ম্যাঁও’ করে একটা আওয়াজ হলো। বুঝতে অসুবিধা হলো না, পা বিড়ালের উপর পড়েছে। মনের ভেতর একটা প্রশ্ন ক্রমাগত ঘোরপাক খাচ্ছে, এতো রাতে এই রাস্তায় বিড়াল এলো কোথ্থেকে? মানুষ না হয় অন্ধকারে দেখে না, বিড়াল তো দেখে। তাহলে মানুষ দেখেও বিড়ালটি সরে গেল না কেন? ফয়েজ মনে মনে আরও ভাবল, আজ তার সঙ্গে যা-ই হোক না কেন মাছ হাতছাড়া করবে না। অনেক কষ্টে মাছটি পেয়েছে সে। হঠাৎ কিছুদূরে আলো দেখতে পেলো। সেদিকে লক্ষ্য করেই এগোতে লাগল। একটু অগ্রসর হতেই কিসের সাথে একটা ধাক্কা খেলো। নিজেকে সামাল দিয়ে আবার হেঁটে চলল। বলা নেই কওয়া নেই ঝপ ঝপ করে বৃষ্টির ফোটা মাথায় পড়তে লাগল। মুহূর্তই বৃষ্টি থেমে গেল। আজব তো! ফয়েজ বুঝতে পারল, বৃষ্টির ফোটা নয়, কী বিচ্ছিরি গন্ধ পানিতে! গন্ধ নাকে ধ্বক করে লাগার সঙ্গে সঙ্গে ফয়েজ সাহস সঞ্চয় করে চিৎকার করল, কে রে?  

চিঁ চিঁ গলায় অন্ধকার থেকে বলে উঠল, আমি মাছরাঙা ভূত।

ফয়েজ বুঝতে পারল, তার শরীরে ভূতের পেশাব পড়েছে। সে ভূতের খপ্পরে পড়েছে। সাহস করে আবার বলল, সাহস থাকে তো সামনে আয়, এক ঘুষায় নাক ফাটিয়ে দেবো!

আমি মাছরাঙা ভূত। 

তুই কী চাস এখানে?

এখানেই আমার বাড়ি।

এখান থেকে তুই সরে যা।

আগে বল তুই আমার মাছ নিয়েছিস কেন?

এই মাছ আমি ঝিলে থেকে ধরে এনেছি। 

মাছটা আমায় দে বলছি!

না দেবো না।

দিবি না! 

বলতে বলতে ভূতটি গাছের মধ্যে ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে মটমট করে একটা ডাল ভাঙল। ফয়েজের গলা একদম শুকিয়ে গেছে। এতোদিন শুধু ভূতের গল্পই শুনেছে, আজ সত্যি সত্যি ভূত দেখছে। কিন্তু একটা ব্যাপার সে জানে, ভূত শুধু ভিতু মানুষকেই ভয় দেখায়। সাহসী মানুষ পেলে ভূত ভয় পায়। সাহস দেখালে কিছুই করতে পারবে না। ফয়েজ ভূত তাড়ানোর দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করল। তারপর এক মুঠ মাটি হাতে নিয়ে ‘ফুঁ’ দিয়ে গাছের দিকে ছুঁড়ে মারল। আর অমনি হাউমাউ করে ভূত কোথায় গেল দেখতেই পেলো না ফয়েজ। হঠাৎ একটা আলো তার মুখের ওপর এসে পড়ল। কিছু বলার আগেই শব্দ এলো- কে রে?

আমি।

আমি কে?

আমি ফয়েজ।

দুজন মানুষ এগিয়ে এলো ফয়েজের দিকে। ভালো করে লাইটের আলোতে ছেলেটির মুখ দেখে নিয়ে অবাক সুরে জিজ্ঞেস করল, আরে ফয়েজ! এতো রাতে তুই এখানে কী করছিস?

লিমন আর সফিক। দুজনেই পাড়ার ছেলে। ফয়েজ বলল, অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি। তোরা কোথায় যাচ্ছিস?

সফিক বলল, হাসপাতাল থেকে এলাম। খালা অসুস্থ। রিকসা, গাড়ি না পেয়ে হাঁটছি। তুই রাতে একা যাচ্ছিস টর্চলাইট সঙ্গে রাখিছ না কেন?

ফয়েজ ক্লান্ত গলায় বলল, এখন আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না, আমাকে একটু বাড়ি পৌঁছে দে।

ঠিক আছে চল।

বাড়ি পৌঁছে ফয়েজ মাছের ব্যাগটা মায়ের হাতে দিয়ে উঠানের মধ্যে বসে পড়ল। মা বললেন, কী রে, এভাবে বসে আছিস কেন? মুখহাত ধুয়ে আয়। আমি ভাত দিচ্ছি। 

ফয়েজ বলল, আমি ভাত খাব না। এক গ্লাস পানি দাও।

মা পানি নিয়ে এলেন। ঢকঢক করে গিলল ফয়েজ। তারপর নিজের ঘরে চলে গেলো। যেতে যেতে বলল, মা, মাছটা লবন দিয়ে রেখে দাও। 

ফয়েজের মা ব্যাগ খুলতেই চিৎকার করে উঠলেন, ফয়েজ! এটা তুই কী এনেছিস?

ফয়েজ দৌড়ে উঠানে চলে এসেছে। বাবারও ঘুম ভেঙে গেছে। তিনিও উঠে এসেছেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?

ফয়েজের মা বললেন, দেখো দেখো ফয়েজ মাছ আনতে গিয়ে কী এনেছে।

তিন জোড়া চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। উঠানে একটা মরা দাঁড়কাক! ফয়েজ বুঝতে পারল, ওটা আসলে মাছ ছিল না। তাকে ফাসানোর জন্য ভূতের একটা ফাঁদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *