আব্দুস সাত্তার সুমন
আমার নাম সুবহা রমজানের শেষ বিকেল হলেই আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত পাখি ডানা ঝাপটাতে থাকে। মনে হয় আজই বুঝি সেই রাত, যেদিন আকাশে বুকে ঈদের বার্তা লেখা হবে।
সেদিনও ঠিক তেমনই হলো। সূর্যটা নরম কমলার মতো গলে যাচ্ছিল পশ্চিমে। আমি আর আমার ভাই সাঈদুল ইসলাম ছাদে উঠলাম চাঁদ দেখতে। কিন্তু আমাদের আকাশটাকে খণ্ড খণ্ড দালানের দেয়াল এসে ঢেকে দিয়েছে। যতই তাকাই, চাঁদের দেখা নেই।
আমি ভাইয়াকে বললাম,
চাঁদ কি আজ অন্য কোথাও গেছে?
ভাইয়া চোখের ইশারায় বলল,
চলো, মাদ্রাসার মাঠে যাই। সেখানে আকাশ পুরোটা দেখা যায়।
আমরা দৌড় দিলাম। মাঠে গিয়ে যখন মাথা উঁচু করলাম, তখনই দেখি একফালি দুধসাদা আলো! চিকন, শান্ত, লাজুক একটা চাঁদ। যেন সাদা কাঁচের তৈরি ছোট্ট নৌকা ভাসছে নীল জলে।
আমার মুখ থেকে নিজে নিজেই বের হয়ে গেল
ঈদ! ঈদ! কাল ঈদ! ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক।
আমাদের চিৎকারে মাঠের বাতাস পর্যন্ত আনন্দে ভাসছে। আমরা দৌড়ে বাসায় ফিরলাম। খবর শুনে সবাই ছাদে উঠে গেল। মুহূর্তেই জ্বলে উঠল রঙিন বাতি যেন জোনাকিরা সার বেঁধে বসেছে।
এরপর সবাই মিলে তারা বাতি জ্বালিয়ে খুব মজা করলাম।
রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল দুধে সেদ্ধ সেমাইয়ের গন্ধ। আম্মু বললেন,
আজ কিন্তু হাতে মেহেদি না দিলে ঈদের চাঁদ রাগ করবে।
আমার হাতের তালুতে তিনি এমন নকশা আঁকলেন মনে হলো লতার ভেতর ছোট ছোট চাঁদ লুকিয়ে আছে। আমার বান্ধবীরাও এলো। আমাদের ঘরটা তখন গল্পের বাক্স হয়ে গেল মুখ খুললেই নতুন শব্দ বের হয়।
রাতে বাবার সাথে বাজারে গেলাম। বাজারটা আজ অন্যরকম। সেমাইয়ের প্যাকেটগুলো ঝুলছে সরু নদীর মতো, মাংসের দোকানগুলো লালচে আলোয় চকমকে, কাপড়ের দোকানে রঙের ঢেউ। মানুষের চোখেমুখে এমন ঝিলিক মনে হয় সবাই নিজের ভেতর একটা করে ঈদের খুশি লুকিয়ে রেখেছে।
ফজরের নামাজের পর ঈদের সকালটা হলো ধীরে ধীরে যেন নতুন বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা উল্টানো হচ্ছে।
আমরা সবাই সাদা জামা-কাপড় পরলাম। মনে হচ্ছিল আমরা সকালের কুয়াশা গায়ে জড়িয়ে আছি। বাবা বললেন,
একটা ছবি তোলা যাক, এই দিনটা কিন্তু বারবার আসে না।
ঈদগাহে গিয়ে দেখি মানুষের ঢেউ। নিচতলায় আমাদের নামাজের ব্যবস্থা, ভাইয়াদের দোতলায়।চারদিকে সাদা, সবুজ, নীল কাপড়ের মৃদু শব্দের ঝংকার, যেন বাতাসেও নামাজ পড়ছে।
নামাজ শেষে দোয়ার সময় আমার মনে হলো আকাশটা খুব কাছে নেমে এসেছে। মসজিদের গেটের পাশে বসে থাকা গরিব মানুষদের হাতে যখন আমরা দান-সদকা দিলাম, তাদের মুখে যে হাসি ফুটল তা দেখে মনের ভেতর প্রশান্তি এনে দিল।
বাসায় ফিরে নাস্তার টেবিল দেখে আমি থমকে গেলাম। সেমাই, পায়েশ, নুডুলস, পাস্তা, ফালুদা সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল স্বাদের রঙিন মানচিত্র।
আমি আর ভাইয়া প্রতিযোগিতা করে খাচ্ছিলাম। আম্মু শুধু হেসে বলছিলেন,
ধীরে খাও, ঈদ পালিয়ে যাচ্ছে না।
দুপুরে টেবিল ভরে গেল পোলাও, মুরগির মাংস, গরুর মাংস, খাসির মাংস, বোরহানি আর জর্দায়। ঘরটা তখন সুগন্ধি উৎসব।
বিকেলে আমাদের বাড়ির সামনে মেলা বসল। নাগরদোলাটা আকাশ ছুঁতে চায়। আমি যখন ওপরে উঠলাম, মনে হলো সেই চিকন চাঁদের কাছে চলে যাচ্ছি।
সালামির টাকা দিয়ে একটা পুতুল কিনলাম। তার চোখ দুটো চকচক করছে। আমি নাম দিলাম “পিংকি” ।
ভাইয়া তখন তার বন্ধুদের সাথে দৌড়ে ধুলো উড়াচ্ছে। আমরা আত্মীয়দের বাড়ি গেলাম। আবার নতুন করে খাওয়া, নতুন করে গল্প।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে আমরা সবাই একসাথে বসলাম। হাসি, গল্প, রঙিন পর্দার ভেতর নতুন নতুন দৃশ্য সব মিলিয়ে দিনটা ধীরে ধীরে সুন্দর ভাবে কাটলো আমাদের সকলের।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। চাঁদটা আর চিকন নেই, একটু ভরাট হয়েছে।
আমি মনে মনে বললাম,
আজকের দিনটা আমি কোথায় রাখব?
নিস্তব্ধ রাত উত্তর দিল,
মনের ভেতর রেখে দাও, কখনো হারাবে না।
আমি হাতের মেহেদির দিকে তাকালাম। রঙ গাঢ় হয়েছে। ঠিক আমার ঈদের দিনের মতো।
ঈদ মানে কখনো একা আনন্দ করা নয়! পাড়া-পড়শী, গরিব অসহায়, পথশিশুদের সাথে ঈদ ভাগাভাগি করাকেই ঈদের আনন্দ বলে। তাই ঈদের আলো ও রোজার আত্মত্যাগ যত্ন করে রেখে দিলাম, আমার ছোট্ট হৃদয়ের গোপনের খাতায়।
মানিকদি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বাংলাদেশ
