ধ্রুব নীল-এর ‘ডিমেনশিয়া’ গল্পটি মূলত মানুষের অস্তিত্বের সংকট, স্মৃতির বিভ্রান্তি এবং আত্মপরিচয়ের এক মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান। ‘ডিমেনশিয়া’ গল্পটি আবুল কাশেম নামের এক রহস্যময় বৃদ্ধকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, যাকে আমরা একটি চায়ের দোকানে প্রথম দেখি। তার পরনে ময়লা পাঞ্জাবী, ছেঁড়া লুঙ্গি এবং কাঁধে ঝোলানো একটি রহস্যময় কাঠের বাক্স। গল্পটি স্মৃতির অলিগলি এবং মানুষের চেনা-অচেনার দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছে।

ধ্রুব নীল
দোকানদার যখন চায়ের কাপ এগিয়ে ধরে বলে ‘কাশেম ভাই চা লন’ তখন দুটো বিষয় আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। প্রথম বিষয়, স্থির চোখের অবিরাম বিড় বিড় করতে থাকা লোকটার নাম সত্যিই আবুল কাশেম কিনা। দ্বিতীয়ত, লোকটার আধপাকা চুল দাড়ি, ময়লা পাঞ্জাবী আর কয়েক জায়গায় সামান্য ছেঁড়া লুঙ্গিটা দেখে হয়তো দোকানদার মনে করেছে এই লোকের নাম কাশেমই হবে, আর কাশেম হওয়ার কারণে নামের প্রথমভাগে আবুল জুড়ে বসে। আর আবুল কাশেমের কাঁধে একটা বাক্স ঝুলে আছে। আপাতদৃষ্টে বাক্সটা জীবনের মতোই ঝুলে থাকে। আমরা বাক্সটার কথা ভুলবো না বলে ঠিক করি।
আবুল কাশেম এমনভাবে তাকিয়ে চায়ের কাপ নেয় যেন সে আসলে চায়ের কাপ নেয়নি, মহাকালের কাছ থেকে হাত পেতে এক কাপ জীবন নিচ্ছে। জন্ম আর মৃত্যু, এর মাঝে কতগুলা চায়ের কাপ কেবল। আবুল কাশেম (আমরা ধরেই নিই যে তার নাম আবুল কাশেম) বলল, ‘এইবার আউশ ধানের জোৎ নাগসে গো। অহনতরী ভাতের গেরান পাই। গরম আউশ ভাতের লগে কচি গরুর গোস্তের ঝোল।’ প্রথমবার আবুল কাশেমের মুখে এই কথা শুনে পেটের খিদেটা টং করে মাথায় গিয়ে লেগেছিল দোকানদারের। কিন্তু পাঁচ মিনিটের বিরতিতে পর পর তিনবার শোনার পর গরম ভাত মনে হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে আর গরুর মাংসটাও জমে গিয়ে চর্বি চর্বি। চা পাতার কষা ঘ্রাণে খিদেটা ভোঁতা হয়ে গেছে তার। আবুল কাশেম যেহেতু কথাটা তিনবার পেড়েছে, তার মানে সে আবারো বলতে থাকবে।
সুতরাং এতে প্রমাণিত হয় যে আবুল কাশেমের ভুলে যাওয়ার রোগ আছে। ডিমেনশিয়া কিংবা আলঝেইমার্স। আবুল কাশেমের শূন্য দৃষ্টিতে ওই রোগের নিদর্শন ফসিলের মতো আটকে রয়েছে। চোখের আরো গভীরে তাকালে আবুল কাশেমের জীবনের কিয়দংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও হতে পারে। এরপর আবুল কাশেম তার জীবনের যতটুকু ভুলে গেছে, ধরে নিতে হবে সেটুকু তার জীবনে কখনও ঘটে নাই। বাদবাকি যেটা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছে (যেমন ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত ও গরুর মাংসের গল্প) সেটা স্থান কালের চক্রে এমনভাবে আটকে আছে যেন আবুল কাশেম ভাবতে বাধ্য হয় যে, ঘটনাটা বহুকাল আগে ঘটেছে এমন মনে হলেও ঘটনা আসলে আগে ঘটে নাই, এইমাত্র ঘটলো বলে। ফরাসি ভাষায় যার নাম দেজা ভু, আবুল কাশেমের সেটাই হচ্ছে হয়তো। চায়ে চুমুক দিতে দিতে তার মনে হয়, নিজের জীবনটাকে সে আগেও কোথায় যেন দেখেছে। তা না হলে অচেনা জায়গায় চায়ের দোকানে বসে গরম আউশ ভাতের ঘ্রাণ তার পাওয়ার কথা না।
আবুল কাশেম এইমুহূর্তে কোথায় আছে? চায়ের দোকানের সামনে পেতে রাখা বেঞ্চে? আবুল কাশেম নিজে কোথায় আছে? মানে আমরা জানতে চাই যে সে কোথায় আছে এ নিয়ে আবুল কাশেমের বক্তব্য কী? একথা নিশ্চিত যে আবুল কাশেমের ভেতরের স্থান কালের চাদরটা অসম্ভব রকম কুঁচকে গেছে। বসুর লন্ড্রির কথা মনে পড়ে আবুল কাশেমের। একবার মনে হয় সে ওইখানে কাজ করতো। না না, বসুর লন্ড্রি দোকানটা তার কোথাও আসাযাওয়ার পথে নজরে আসতো। আবুল কাশেম মনে হয় ক্ষেতে কাজ করতো। বর্গাচাষী। তা না হলে ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধ এত দূর থেকে পায় কেমনে?
দোকানের আশপাশে বসে থাকা শ্রমিক কিংবা হুট করে পাউরুটি ছিড়তে আসা রিকশাওয়ালারা ধরে নেয় আবুল কাশেম মনে হয় গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে এসেছে। শহর মানেই তাদের কাছে কাজ। শহরে কাজ করে গ্রামে গিয়ে খাবে। শহর একটা পাউরুটির মতো। ছিড়ে ছিড়ে যে যতটা পারে খেয়ে নেবে। কিন্তু আবুল কাশেমের রুগ্ন শরীর দেখে তারা প্রথমে চোখ কুঁচকায়, পরে আবুল কাশেম হয়ত একটা কিছু কইরা খায় এমনটা ভেবে তারা চলে যায়। আমরা যারা আবুল কাশেমের আসা-যাওয়ার রহস্য নিয়ে আপাতত চিন্তিত তারা জানি আবুল কাশেম শহরে কাজের সন্ধানে আসে নাই। হয়তো অন্য কিছুর খোঁজ করে।
‘দুফরে কই খাইবেন?’
‘জানি না। মনে নাইক্কা।’
থু থু ফেলার মতো করে বলা কথাটা বলে নিজে নিজে একচোট হাসতে দেখা গেল আবুল কাশেমকে। যেন কিছু একটা মনে পড়েছে এমন ভঙ্গি করে সে দোকানদারের দিকে তাকালো। দোকানদারও মনে করলো আবুল কাশেম বুঝি এইবার তার অনেকক্ষণ আটকে রাখা কৌতুহলের অবসান ঘটাবে। কিন্তু আবুল কাশেম কিছু না বলে আবার শূন্য চোখে সামনে তাকায়। দোকানদার ভাবে, আবুল কাশেমের কোনো ধান্দা থাকবার পারে।
আবুল কাশেম উঠে দাঁড়াতেই আমরা সচকিত হই। তার উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে এমন এক নির্বিকারত্ব আচ্ছন্ন হয়ে লেগেছিল যে দোকানদার আর চায়ের দাম চায় নাই। যাউকগা, এক কাপ চা-ই তো বা এ জাতীয় কিছু বলে সে তার কাপ ধোয়ায় মন দেয়। আমরা এদিকে আবুল কাশেমের পিছন পিছন হাঁটতে থাকি এটা জানার জন্য নয় আবুল কাশেমের ধান্দাটা কী, আমরা আসলে আমাদের জীবনে একটা বিভ্রান্ত কেঁচোর মতো আচমকা গজিয়ে ওঠা জীবনের রহস্য উন্মোচন করতে উৎসাহী হই।
আবুল কাশেমের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের দৃষ্টি মনযোগ আর মনের ভেতরের ছবিগুলো বদলাতে শুরু করে। আমরা অনেকের চেহারা দেখতে থাকি। আবুল কাশেম আমাদের সামনে জীবনের মতো একটা ধন্ধ হয়ে এগিয়ে চলে। আমরা তার পিছু নেওয়ার চেষ্টা করি। এই আড়াল। এই সামনে। লোকটা সুবিধার না। অবশ্যই ধান্দা থাকবার পারে। আবুল কাশেম ঘুরে ফিরে আবার আগের চায়ের দোকানে ফিরে আসে।
‘চা দেও।’
এক মিনিট পর।
‘কাশেম ভাই চা লন।’
পাঁচ কি দশ মিনিট পর।
‘দুফরে কই খাইবেন?’
‘কচি গরুর গোস্ত…।’
দোকানি আবার চা দেয়। এবারও টাকা নেয় না। আবুল কাশেমের চক্রে চায়ের দোকানদারও কিছুক্ষণ আটকা থাকবে বলে মনে হয়।
এরপর আবুল কাশেম আবার উঠে দাঁড়ায়। আমরা তার হাঁটার মধ্যে জীবনের একটা সম্পর্ক দেখি। আবুল কাশেম ভুলে গেছে সে কোথা থেকে এসেছে। কোথায় তার গ্রাম। তার নাকে শুধু গরম আউশ ভাতের স্মৃতি লেপ্টে আছে।
আবুল কাশেম হাঁটে। আবুল কাশেমের মতো আরও অনেক লোক হাঁটে। আমরা আবুল কাশেমকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। আবুল কাশেমের কাঁধে একটা বাক্স ঝুলে আছে। আমরা বাক্সটার কথা ভুলবো না বলে মনস্থির করি। বাক্সটায় কী আছে আমরা জানতে চাই। আবুল কাশেম হয়তো বাক্সটার কথা ভুলে গিয়ে থাকবে। কারণ তার কিছুই মনে থাকে না। তার শুধু মনে থাকে আউশ ধানের ঘ্রাণ (আর না হয় ভাতের, একটা হবে হয়তো)।
ধারণা করা হচ্ছে, আবুল কাশেমের পরিচয় অবধারিতভাবে তার পিঠে ঝোলানো কালিঝুলি মাখা বাক্সটা বহুকাল ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে। এমন বাক্সের ভেতর কেবল একটি কেটে যাওয়া জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়, কচি গরুর গোস্ত বা আউশ ভাত থাকবার পারে? অবশ্য এটাও সত্য মনে হয় যে আবুল কাশেমের জীবনের একটা বড় অংশ এখন কচি গরুর গোস্ত ও আউশ ভাতে (গরম ধোঁয়া ওঠা) ছেয়ে আছে। কাঠের বাক্সটা যখন অনেক পথচারীর নাকের ডগার সঙ্গে অল্পের জন্য লাগতে গিয়েও লাগে না অবস্থায় পেরিয়ে যায়, তখন কোনো কোনো উৎসাহী নাকে মরিচের মতো ঝাঁঝালো একটা গন্ধ এসে পড়ে। গন্ধটা অনেক কিছু বলতে গিয়েও পরে আবার মিলিয়ে যায়। বাক্সটা নড়বড়ে। তারপরও এর ভেতরের রহস্য বাক্সবন্দী পড়ে থাকে। আমাদের মনে হয়, এইভাবে বাক্সের ভেতরের রহস্য জানা যাবে না। রহস্য উন্মোচনের জন্য বাক্স খোলাটা অবধারিত হয়ে দাঁড়ায়। আমরা বা আমাদের মধ্যে কেউ একজন তাই পথচারী হিসেবে আবুল কাশেমের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
‘আপনের বাক্সে কী আছে?’
‘জানি না।’
‘জানেন না তো বাক্স নিয়া ঘুরেন ক্যান।’
‘জানি না।’
‘সব কথায় জানি না বলেন ক্যান? আপনার নাম কী?’
‘আমার নাম মনে হয় আবুল কাশেম।’
‘আপনার নাম আসলে আবুল কাশেম না, চায়ের দোকানদার আপনারে এই নাম দিসে।’
আবুল কাশেম আমাদের মধ্যে কেউ একজনের কথায় আলাভোলা হয়ে যায়। সে তার নাম নিয়ে দ্বিধায় পড়ে। আমরা জানি, নাম ভুলে গেলেও তো নিজের জীবনকে ভুলে থাকা যায় না। আবুল কাশেম আবার জীবনে ফিরে আসে।
‘আপনার বাক্সটা খোলেন।’
‘খুলুম না।’
‘তাইলে খোলার ব্যবস্থা করতেসি।’
আবুল কাশেমের জীবন রহস্যের আধার বাক্সটির ভেতর কী লুকিয়ে আছে তা না জানা পর্যন্ত আসলে আমরা বিপন্ন বোধ করতে থাকি। আমাদের অস্বস্তি লাগে এই ভেবে যে আমরা আমাদের নিজেদের বাক্সটা আমরা হাতের কাছে পাই না। কোনো এক পুরনো মাটিলেপা বাড়ির চৌকির তলায় মাকড়শার বসতিকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে প্রায় অস্তিত্বহীন অবস্থায় (মনে হবে বাক্সটা আসলে সেখানে নাই) সেটা পড়ে আছে।
আবুল কাশেমের সঙ্গে পথচারীর (যে কিনা আমাদের প্রতিনিধি) খানিক্ষণ হাতাহাতি হয়। এক সময় পথচারীর ধন্দে পড়ে যায় সে আসলে কী নিয়া হাতাহাতি করছিল। পরে আবুল কাশেম যখন আবারো উঠে পড়ে, তখন আমরা সচকিত হই। আমরা আবার তার পিছু নেই। আবুল কাশেম এইবার অন্য এক চায়ের দোকানে গিয়ে বসে।
‘কাশেম ভাই চা লন। দুফুর তো শ্যাষ, কী দিয়া ভাত খাইছেন?’
‘কচি গরুর…।’
প্রতিনিধি পথচারী এগিয়ে আসে। পাশে বসে।
‘ওই মিয়া আপনার বাক্সে কী আছে?’
‘আফনে বিরক্ত করবার লাগছেন ক্যান?’
‘আফনের নাম মিয়া আবুল কাশেম না। আফনে একটা ভণ্ড।’
আবুল কাশেম চিন্তায় পড়ে যায়। সে হয়তো বোঝার চেষ্টা করে সে আসলেই ভণ্ড কিনা কিংবা ভণ্ড হতে গেলে কী লাগে। এরপর পথচারী (যার গায়ে খুব একটা শক্তি নেই। আবুল কাশেমের মতো রোগা পটকা আলাভোলা মানুষটার হাত থেকে একটা মামুলি বাক্স নিতে পারে না) তার পাশে বসে। গায়ের জোরে কাজ হবে না ভেবে খাতির জমাবার চেষ্টা করে।
‘আফনের আসল নাম কী?’
‘আসল নাম জানি না। আমার নাম আবুল কাশেম।’
‘আফনে সব ভুইলা যান কেন?’
‘জানি না। আফনের সব মনে আছে? আফনেও তো ভুইলা গেছেন।’
‘আফনার বাক্সে কী আছে?’
‘বাক্স কই পাইলেন? কোন বাক্সের কথা কন।’
আমরা এবার নড়েচড়ে বসি। মেজাজ গরম হতে থাকে আমাদের। আবুল কাশেমের কাঁধে একটা ঝোলার মতো বাঁধা এবং ওটার চারকোণা কাঠামো দেখে এ ব্যাপারে একটুও সন্দেহ থাকে না যে সেখানে একটা বাক্সই আছে। আর যদি এমন ঝোলার ভেতর একটা বাক্স থেকে থাকে, তবে সেটা কালিঝুলি মাখাই হবে। আর সেটার গন্ধটাও হবে মরিচের মতো ঝাঁঝালো।
‘আফনে হাঁচা কইরা কন বাক্সে কী নিয়া ঘুরতাসেন।’
আবুল কাশেম উত্তর দেয় না। উঠে দাঁড়ায়। চায়ের দোকানি দাম নিল না। সে কাপ ধুয়ে চলে। চায়ের দোকানিরা আসলে তাকে চিনে না। চেনার ভাব ধরে আছে। আর আবুল কাশেমও ধান্দাবাজদের মতো আলাভোলা হবার ভাণ করে আছে। তার জারিজুরি ফাঁস করে দিতে আমাদের পথচারী আবুল কাশেমের পিছু নিয়েছে।
‘আবুল কাশেম কই যাও?’
‘জানি না। আমি কোথাও যাই না।’
‘তোমার গেরাম কই?’
‘মাটিয়ালি, না না রুপালি মনে হয়’
‘এইটা কেমন নাম! সত্যি কইরা কও।’
‘জানি না।’
‘তোমার নাতিপুতি আছে না?’
‘কেউ নাইক্কা।’
‘কই থাকে হেরা?’
‘নাই তো। আফনের নাম কী?’
‘জানি না।’
‘আফনে কই থেইকা আইছেন?’
‘জানি না।’
‘আফনের বাক্সে কী আছে?’
‘কই বাক্স? বাক্স কই পাইলেন? ফাইজলামি লন?’
‘আফনের কান্ধে এই যে ঝোলা। ওইটার ভিতরে কী আসে।’
‘আমার ঝোলায় বাক্স কই দেখলেন! আফনে মিয়া বড়ই ধান্দাবাজ। পলিটিক্স করবার লাগছেন।’
পথচারী বিভ্রান্ত হয়ে তার কাঁধের ঝোলার দিকে তাকায়। ঝোলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কালিঝুলি মাখা বাক্স। পথচারী বাক্স নিয়া কী করবে কার কাছে যাবে বুঝতে পারে না। আবুল কাশেম হাঁটছে। আবুল কাশেমের পিছু নিলো পথচারী।
‘ওই মিয়া। তুমি তোমার বাক্স আমারে দিলা ক্যান?’
‘আমার কোনো বাক্স নাই।’
‘আমারও তো কোনো বাক্স নাই।’
‘তোমার বাক্স ছিল। তুমি ভুইলা গেছ মিয়া।’
আবুল কাশেমের কথাবার্তা শুনে এখন আর মনে হচ্ছে না যে তার ডিমেনশিয়া আছে। তাকে আমরা পরদিন আবার চায়ের দোকানে দেখি।
‘কাশেম ভাই চা লন।’
আবুল কাশেম চায়ের পেয়ালা নিল।
‘দুফরে কই খাইবেন?’
‘জানি না। মনে নাইক্কা।’
আবুল কাশেম কোন পথে যাচ্ছে। আমরা আবার আমাদের সেই পথচারীর শরণাপন্ন হই। আমাদের অস্থির অস্থির লাগে। এই লোকটার নাম আবুল কাশেম না। ধান্দাবাজ হইবার পারে। পথচারী আবুল কাশেমের পিছু নেয়।
‘ওই মিয়া খাড়াও। তুমি কই যাও।’
‘আফনে মিয়া বড়ই বিরক্ত করতাসেন।’
‘তোমার বাক্সে কী আছে?’
‘আমার কোনো বাক্স নাইক্কা।’
‘তোমার নাম আবুল কাশেম না। তোমার ধান্দাটা কী?’
‘এক কথা আর কতবার কইবেন। আপনার কান্ধের বাক্সতে কী আছে?’
‘আমার কান্ধে বাক্স কই পাইলেন?’
আবুল কাশেম আমাদের পথচারীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হাঁটে। অনেক লোক হাঁটে। আবুল কাশেমের পা খুঁজতে গিয়ে আমাদের পথচারীর (অথবা আমাদের) মনে হয়, আমরা আবুল কাশেমকে আগেও কোথাও দেখেছি। সে মনে হয় গতকাল, না না অনেক দিন আগে একটা চায়ের দোকানের সামনে বসে গরম আউশ ধানের ভাত আর কচি গরুর গোস্তের কথা বলেছিল। এরপর আমরা আমাদের কাঁধে ঝোলানো মরিচের গন্ধওয়ালা বাক্সে কী আছে তা জানার চেষ্টা করি। আমরা মনে হয় ভুলে গিয়েছিলাম। তবে আবুল কাশেমের কাঁধে ঝোলানো বাক্সটার কথা ভুলবো না বলে ঠিক করি।
