রানা জামান

পানাম নগর দেখা হয়ে উঠছে না এখনো রবিনের। যাওয়ার তারিখ নির্ধারণ করলে একটা না একটা ঝামেলা এসে হাজির হয়ে যায়, কখনো পারিবারিক কখনোবা দাপ্তরিক- যাওয়া হয় না পানাম সিটিতে আর। এখন ভাবছে: কোনো পরিকল্পনা না করে সুযোগ পেলেই চলে যাবে; কাউকে কিছু বলবে না। অবাক করে দেবে আপনজন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের, এমনকি সহকর্মীদের। সমস্যা বেশি আসে অফিস থেকেই। সরকারি অফিসে ফাঁকি দেবার সুযোগ থাকলেও বেসরকারি অফিসে একদম নেই। সরকারি অফিস কামাই করলে প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়; এরপরেও সংশোধন না হলে বিভাগীয় মামলা: দীর্ঘ প্রক্রিয়া; তারপরও চাকরি চলে যাবে এমনটা নাও হতে পারে। কিন্তু বেসরকারি অফিসে বসের পছন্দ না হলেই চাকরি নাই হতে পারে! রবিন একটি ছোট বেসরকারি অফিসে চাকরি করে। তাই ওকে হিসেব করে চলতে হয়।
মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় আছে রবিন। দিন যাচ্ছে, রাত ফুরিয়ে আসছে দিন। এক বৃহস্পতিবার বিকেলে হারিয়ে গেলো রবিন। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। ওটা বেসরকারি অফিস পারতপক্ষে খেতে চায় না! এই সুযোগটাই নিলো রবিন এবার। মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখে দিলো ব্যাগের ভেতরে।
রবিনের অফিসটা উত্তরায়। আর ওর বাসা মিরপুর-১২ এ। ও অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় না গিয়ে বাসে চড়ে চলে এলো সোনারগাঁও। ওখান থেকে ইজিবাইকে এলো পানামা সিটির প্রধান ফটকে। তখন ঘড়ির কাঁটা ছ’টা পেরিয়ে যাওয়ায় প্রধান ফটক বন্ধ করে উইন্ডো গেট খুলে রাখা হয়েছে ভেতরে থাকা দর্শনার্থীদের বের হয়ে আসার জন্য।
Bangla Horror Story
ভ্রু কুঁচকে রবিন ভাবলো: তাহলে কী হবে এখন? এতো প্রচেষ্টার পরে আজ আসতে পেরেছে। না দেখে ফিরে যেতে হবে? অসম্ভব! যে কোনোভাবেই হোক ঢুকতে হবে ভেতরে। দারোয়ান কি ঘুষ খায় না? ফটকের সামনে কিছুক্ষণ পায়চারি করে আস্তে ধীরে এগিয়ে গেলো দারোয়ানের কাছে। কুশলাদি বিনিময়ের পরে বললো, আমি বহু দূর থেকে এসেছি। কয়েক মাস চেষ্টার পরে সময় করতে পেরেছি আজকে। এক ঘণ্টার জন্য ভেতরে যেতে চাই।
দারোয়ান বললো, আজকের মতো সময় শেষ! আমার কিছু করার নাই।
রবিন দারোয়ানের হাতে এক হাজার টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে কানে কানে বললো, এক ঘণ্টায় এক হাজার টাকা ইনকাম! এখন কী বলেন দারোয়ান ভাই?
দারোয়ান আড় চোখে হাতে গুঁজে দেয়া নোটটা একবার দেখে বললো, নোটটা নকল না তো?
রবিন বললো, নোটটা নকল হলে ফিরে আসার সময় আমাকে পুলিশে দিয়েন দারোয়ান ভাই!
রবিন ঢুকে গেলো ভেতরে। ভেতর থেকে পিঁপড়ের মতো দর্শনার্থি আসতে থাকায় দারোয়ান বুঝতে পারলো না রবিন বের হয়ে এলো কিনা। সাড়ে ছ’টায় পানামা সিটির বন্ধ ফটকের দায়িত্ব আরেক দায়িত্বপ্রাপ্ত দারোয়ানকে বুঝিয়ে দিয়ে ঐ দারোয়ান চলে গেলো বাড়িতে।
ওদিকে রবিন আলো-আঁধারের পানাম সিটিকে যতই দেখছে ততই হচ্ছে মুগ্ধ। একসময় প্রস্রাবের চাপ পাওয়ায় একটি সৌচাগারে ঢুকলো। হালকা হয়ে বের হবার সময় মেঝেতে পরে থাকা পানিতে পা পিসলে চিৎ হয়ে পড়ে গেলো। মাথা সজোরে মেঝেতে ঠুকে যাওয়ার জ্ঞান হারালো ও।
জলের ঝাপটায় জ্ঞান ফিরে এলো রবিনের। কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলো বলতে পারবে না। তীব্র আলোয় তাকিয়ে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করলো ও। চোখ পিট পিট করে আলো সয়ে এলে পূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে কক্ষের চারিদিকে তাকিয়ে বেশ অবাক হলো। এতো বড় কক্ষ, আর এতো সাজানো! বিছানায় তাকালো। এতো বড় বিছানা! গায়ে রাজপোশাক! হচ্ছে কী এসব? ও কোথায় এখন? টাইম মেশিনে চড়ে চলে এসেছে রাজা-বাদশাদের যুগে? মোঘল আমলের আগে না পরে?
এতক্ষণ খাটের চারিদিকে কিছুই ছিলো না; এখন ভোজবাজির মতো চারিদিকে রাজকীয় পোশাক পরা লোক দেখে অত্যাশ্চর্য ও। হঠাৎ এরা কোত্থেকে উদয় হলো? তাহলে কি সত্যসত্যই ও রাজতন্ত্রের যুগে চলে এসেছে? নাকি কোনো নাটকের মহড়া চলছে? ওকি রাজার অভিনয় করছে? গায়ের পোশাক দেখে তো তেমনটাই মনে হচ্ছে! রবিন শোয়া থেকে আধশোয়া হয়ে বললো, কোন্ নাটকের শুটিং চলছে? সিরাজুদ্দৌলা? আমি কি সিরাজুদ্দৌলার পার্ট করছি? আমার এখনকার ডায়ালগ কী? ডিরেক্টর সাহেব কোথায়?
খাটের উল্টো দিক থেকে একজন বললো, এটা কোনো নাটকের মহড়া না মহারাজ। আপনি পানাম রাজ্যের মহারাজা। আমি প্রধানমন্ত্রী; আর এরা আপনার নবরত্ন! সেনাপতি উপরে একটু ব্যস্ত আছে। এখনই নেমে আসবে।
বুঝতে না পেরে রবিন বললো, উপরে মানে? কয় তলা বিল্ডিং এটা?
এখানকার বিল্ডিংগুলো বহুতল বিশিষ্ট হয় না মহারাজ! আমরা অনায়াসে উপরে উঠতে পারি এবং নিচে নামতে পারি!
কী আশ্চর্য! পাখা ছাড়া কিভাবে আপনারা উড়তে পারেন?
তখন সেনাপতি হুরমুজ গদাইধরকে নিচে নামতে দেখে ছানাবড়া হয়ে গেলো রবিনের চোখ। দুই বাহু দুই দিকে প্রসারিত রেখে আস্তে আস্তে নিচে নেমে আসছে।
সেনাপতি হুরমুজ গদাইধর নিচে নামতে নামতে বললো, এই যে আমি নিচে নেমে আসছি মহারাজ!
সেনাপতি হুরমুজকে নামতে দেখে রবিনের হৃদপিণ্ড কাঁপতে শুরু করলো। ওর পা কোথায়? এদের কারো কি পা নেই? আঁড়চোখে বামে ও ডানে তাকিয়ে ওর শরীরের কাঁপন বেড়ে গেলো আরো। এদের কারো পা নেই! এর মানে কী? মানুষ হলে পা থাকবে না কেনো? তবে কী এরা ভূত? ও কি ভূতের পাল্লায় পড়ে গেছে? ওদের বুঝতে না দিয়ে পালাতে হবে। আস্তে ধীরে বিছানায় সোজা হয়ে বসলো। ইতোমধ্যে সেনাপতি নিচে নেমে প্রধানমন্ত্রী হুজ্জাতধর নাটাইওয়ালার পাশে এসে কুর্ণিশ করে ওদের সাথে সামিল হলো।
রবিন প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলো, এই রাজ্যের নাম কী? আমার নাম কী? কেনো জানি আমার অনেক কিছু মনে আসছে না!
প্রধানমন্ত্রী হুজ্জাতধর নাটাইওয়ালা বললো, আমি আগেই বলেছি এই রাজ্যের নাম পানাম রাজ্য। এটা ভূতের রাজ্য! আপনার নাম অভ্রাকীর্ণ সলিলসম্পূর্ণ, মহারাজ।
বড্ড অদ্ভূত নাম আমার! এই নাম ও পদবী কে দিয়েছে আমাকে প্রধানমন্ত্রী?
আমাদের রাজ্যে অভিষেকের দিন রাজাকে নতুন নাম ও পদবী প্রদান করা হয়!
ও! কিন্তু আমি কেনো? আমি কি ভূত? কবে হলাম ভূত?
প্রধানমন্ত্রী হুজ্জাতধর বললো, মাঝে মাঝে আমাদের রাজারা ভস্মিভূত হয়ে যায়! ইতোপূর্বে এগারোজন রাজাকে আমরা হারিয়েছি। তাই আপনাকে আমরা রাজা করার জন্য নিয়ে এসেছি। আমরা জানি আপনি মানুষ, এখনো মরে ভূত হন নি। যখন আমরা নতুন রাজার সন্ধান করছি, তখন এক গণক বললো, একজন মানুষকে ভূত বানিয়ে রাজা হিসেবে অভিষেক করলে আর পুড়ে উবে যাবে না!
রবিনের মনে ভয়ের মাত্রা গেলো বেড়ে। ওর শরীর কাঁপছে বাঁশ পাতার মতো। ওর কাঁপুনিতে খাটটাও শব্দ করে কাঁপছে। এক ভূত খাটটা চেপে ধরায় খাটের কাঁপন বন্ধ হলেও রবিনের কাঁপা থামলো না।
প্রধানমন্ত্রী হুজ্জাতধর নাটাইওয়ালা শব্দহীন বিকট হেসে বললো, আপনার তেরো নম্বর বিয়ের জন্য কণে খোঁজে পাওয়া গেছে মহারাজ!
রবিন বিস্ময় হজম করে বললো, বাহ! কোথায় সেই ভাগ্যবতী? কী নাম আমার পত্নীর?
এবার সেনাপতি হুরমুজ গদাইধর বললো, আমি ওকে সাজাতে বলে এসেছি। আপনার বারো নম্বর রানীকে সাজাচ্ছে মহারাজ। আপনার তেরো নম্বর বিবির নাম গ্লিওপেট্রা দাঁতখণ্ড!
ভেতর কাঁপতে থাকলেও রবিন ভাবতে থাকলো: বারো রানী থাকার পরেও আরেক রানী? কেনো?
যেনো রবিনের ভাবনা বুঝতে পেরেছে এমনভাবে প্রধানমন্ত্রী বললো, এই রাজ্যে তেরো নম্বর খুউব লাকি নম্বর। তাই প্রত্যেক রাজা কমপক্ষে তেরোটা বিয়ে করে আসছে।
রবিনের মনে একটা প্রশ্ন দেখা দিলো: ওর সাথে কী ভূতগুলো তামাশা করছে? তামাশা করা শেষ হলে ঘাড়টা মটকে দেবে! এরপর ওর কী হবে? মরে গিয়ে ভূত হয়ে এদের সাথে মিশে ভূতামি করে যাবে? এই কি ছিলো ওর ভাগ্যে? পানাম সিটি দেখতে না আসলে কি এমনটা ঘটতো? কী বোকামিইটা হয়ে গেলো এবার। যাই করুক ভূতগুলো, নির্ভয় ভাব বজায় রেখে ভাগতে হবে এখান থেকে। ভূত হওয়া যাবে না কিছুতেই! জীবনে বহুকিছু দেখার বাকি রয়ে গেছে এখনো! এখান থেকে বের হয়ে প্রথমেই বিয়েটা করে ফেলতে হবে! সিপ্রাকে আর অপেক্ষায় রাখা যাবে না; বেশি অপেক্ষায় রাখলে পাখি উড়ে যাবে খাঁচা ছেড়ে!
বিছানা থেকে নেমে রবিন প্রধানমন্ত্রীকে বললো, নয়া মহারানীকে নিচে নিয়ে আসুন প্রধানমন্ত্রী। আমি খানিকক্ষণ হাওয়া খেয়ে আসি!
সাথে সাথে ভূতগুলো ঘন হয়ে রবিনকে ঘিরে দাঁড়ালো।
প্রধানমন্ত্রী হুজ্জাতধর নাটাইওয়ালা বললো, এ সময় নওশার কোথাও যাওয়া বারণ! এখনই কণে নেমে আসবে, মহারাজ!
তখন উপরে বাতাসের ঘূর্ণি সৃষ্টি হলো সামান্য। সবাই তাকালো উপরে। কণের পোশাক পরা একজনকে কয়েকজন ভূতনি ধরে নিয়ে আসছে। মাথা ঢাকা থাকায় কণের চেহারা দেখা যাচ্ছে না, যদিও অন্যদের চেহারা দেখে রবিনের চক্ষুজোড়া কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার জোগার: কঙ্কালগুলোর মাথায় অগুণতি সাপ কিলবিল করছে! ধীরে ধীরে ওরা রবিনের পায়ের দিকে নামতে থাকায় প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপতি দুই দিকে সরে জায়গা করে দিলো। নামলো ওরা।
সেনাপতি হুরমুজ গদাইধর কণের ঘোমটা খুলে বললেন, এই যে আপনার কণে মহারাজ!
কণের চেহারা দেখে রবিন ছিটকে পড়ে যেতে চাইলেও পারলো না চারিদিকে ভূতগুলো ওকে ঘিরে থাকায়।কী বিকট চেহারা কণের! মাথার খুলিতে অসংখ্য সরু সরু সাপ কিলবিল করছে, মুখভর্তি সরিসৃপের আঁশে, জিভটা সাপের জিভের মতো দ্বিখণ্ডিত, বারবার ভেতরে ঢুকছে আর বের হচ্ছে; মুখের দুই কষা বেয়ে ঝরছে কালো তরল পদার্থ। অবধারিতভাবে রবিন জ্ঞান হারালো। জ্ঞান ফিরে আসার পরে দৃশ্য আগের মতোই দেখতে পেলো রবিন। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য মনে মনে তৈরি হলো ও।
রবিন বললো, কণের চেহারার লাবণ্য দেখে ঘুম পেয়ে গিয়েছিলো আমার! অনেক চমৎকার কণের চেহারা। আমার খুব পছন্দ হয়েছে! অনেকক্ষণ শুয়ে থেকে আমার সারা শরীর জ্যাম হয়ে গেছে! একটু নড়েচড়ে আসি। এরপর বিয়ে সম্পন্ন করা হবে!
ভূতদের দুই হাতে সরিয়ে খাট থেকে নেমে রবিন এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। দরজার কাছে এসে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে গেলো আলো-আঁধারিতে। পানাম সিটির মহাসড়কে উর্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে ও। অধিকাংশ রাস্তাবাতি জ্বলছে না। রাস্তাবাতিগুলো প্রাগৈতিহাসিক; কেরোসিন দিয়ে জ্বালানো হয়। সেকারণে নব্বই ভাগ বাতি জ্বলে না। তাতে ভুতুরে পরিবেশটা আরো পোক্ত হয়ে আছে। দৌড়াতে দৌড়াতে একটা ইটের আধলায় হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে ফের জ্ঞান হারালো রবিন।
এবার রবিনের জ্ঞান ফিরলো দুই গালে মৃদু থাপ্পড় খেয়ে। চোখ মেলে আলো-আঁধারে প্রথমে কিছুই দেখতে পেলো না। দৃষ্টি সয়ে এলে যা দেখলো তাতে ওর ফের জ্ঞান হারাবার উপক্রম হলো। এক লাফে উঠে বসে বন্ধ করে রাখলো চোখ। কক্ষটা অত্যধিক শীতল হওয়ায় ওর শীত করতে লাগলো। কিন্তু কক্ষে যারা আছে, ওদের স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। ভূত বলেই কী ওরা এরকম? রবিন আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকালো উপরে: চারটা ভূত এখনো ঝুলছে ফাঁসে; জিভ বেরিয়ে আছে, কিন্তু হাত-পা নড়ছে; কয়েকটা নারী ভূতের ঘাড় মটকে ঝুলছে পেছনে, আরো অনেক ধরনের বিভৎস আকৃতির ভূত-পেত্নী কক্ষটায় ঘুরাফেরা করছে। রবিন মনে মনে বললো: এগুলো কেমন ভূত? আমি এখানে এলাম কী করে? আগের ভূতগুলোর কবল থেকে পালিয়ে এসে লাভ কী হলো? পানাম সিটি কি ভূতের আড্ডাখানা? কখনো শুনি নি তো!
রবিন কাঁপুনি সহ্য করার জন্য নিজকে জড়োসড়ো করে বললো, আমি এখানে এলাম কী করে, মাননীয় ভূত সকল?
গায়ে কালিঝুলি মাখা ছেঁড়া জামাকাপড় পরা এক ভূত ওর সামনে এসে বললো, আমরা নিয়ে এসেছি।
আমি কি মারা গেছি? এখন ভূত হয়ে গেছি তোমাদের মতো?
ঐ ভূতটি বললো, আমরা তোমাকে মৃত ভেবেই তুলে নিয়ে এসেছিলাম। এখন দেখছি তুমি জীবিত। আমাদের প্ল্যানটাই মাঠে মারা গেলো!
রবিন জিজ্ঞেস করলো, কী প্ল্যান ছিলো তোমাদের?
ভূতটি ফের বললো, সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে রাজা জমিদাররা বর্তমানে ধনী লোকেরা আমাদের তথা দরিদ্রদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করে আসছে। তারা অন্যায় করে আমাদের উপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে সাজা দিয়ে গেছে। কাউকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, কারো ঘাড় মটকে দিয়েছে, কারো হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। এই ভূতরাজ্যেও ওরা আমাদের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। ওরা শান-শওকতে থেকে আমাদের এই নোংরা জায়গায় থাকতে বাধ্য করছে। নেতৃত্বের অভাবে আমরা সংঘটিত হতে পারছি না। ভেবেছিলাম তুমি আমাদের নেতা হবে।
রবিন সটান দাঁড়িয়ে বললো, যাক, বাঁচা গেলো! আমি না মরায় ভূত না। তাই নেতৃত্বও দিতে হবে না আমাকে। চললাম আমি।
উহু!
মানে?
আমরা তোমাকে মেরে ফেলবো! পারবো না?
রবিন উপরে তাকিয়ে দেখলো: ফাঁসি লাগানো ভূতগুলোকে ওভাবেই উড়তে উড়তে নিচে নেমে আসছে; ঘাড় মটকানো পেত্নীগুলোও ওভাবে নেমে আসছে নিচে। রবিন দৌড় দেবার সাথে সাথে সব ভূত-পেত্নী ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর। কী করবে এখন রবিন? ও কি মরে ভূত হয়ে যাবে? ভূত হওয়ার সুবিধা কী? ওর ভাবনার মধ্যেই ফাঁসীতে ঝুলে থাকা ভূতগুলো ওকে ঝুলিয়ে উপরে তুলে নিলো। সকল ভূত-পেত্নী উপরে উঠে ওদের চারিদিকে ঘুরতে থাকলো।
এক ভূত বললো, কিভাবে মারবো ওকে? ফাঁসিতে ঝুলিয়ে?
এক পেত্নী বললো, না বড়দা! আমাদের নেতার গলায় ফাঁসির দড়ি ঝুলে থাকবে, তা হয় না।
বড়দা নামের ভূতটি বললো, তাহলে ঘাড় মটকে দেই!
ঐ পেত্নী ফের বললো, না না! ঘাড় মটকানো নেতা আমার পছন্দ না! একদম না!
তাহলে মেরে হাত-পা ভেঙে দি।
কী বলছো বড়দা! কী হয়েছে তোমার? ল্যাংড়া লুলাকে কেউ নেতা মানবে? নেতার শরীর থাকতে হবে নিখুঁত। কিভাবে করবে, তুমি জানো!
বড়দা লম্বা নখে নিজ খুলি চুলকে বললো, আমাকে ভাবতে দাও লুলু।
রবিন ভূত পেত্নী দুটোর কথোপকথন শুনছিলো, আর ভয়ে কাঁপছিলো থরথর করে। সাথে সাথে ভাবছিলো কিভাবে মুক্তি পাবে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছে: এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারলে আর কখনো পোড়ো সিটি বা পোড়োবাড়ি দেখতে যাবে না! ও গা নেতিয়ে দিলে ভূতগুলোর হাত কিছুটা শিথিল হলো। ছুটে পালাবার এই সুযোগ। একটু মোচড় দিয়ে ভূতগুলোর হাত ফসকে টুপ করে নিচে পড়ে পড়িমরি করে দরজার দিকে দৌড় লাগালো রবিন। কিন্তু পা পিসলে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো মেঝেতে। সবগুলো ভূত-ভূতনী ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপরে। কী উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে ভূত-ভূতনীগুলোর গা থেকে। পেট ফুলে বমি আসতে শুরু করলো। ওয়াক ওয়াক করে শুরু হলো ওর বমি! ওর বমির দুর্গন্ধ ভূতগুলোর গায়ের দুর্গন্ধের চেয়ে উৎকট হওয়ায় এবং বমির স্রোতে টিকতে না পেরে ভুতগুলো সরে গেলো। বমিতে কক্ষটা ভরে গেছে বলা যায়। সব ভূত অদ্ভূতভাবে তাকিয়ে আছে রবিনের দিকে। মানুষের বমি এতো দুর্গন্ধযুক্ত হতে পারে? ম্লান হেসে রবিন আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো। ভুতগুলো সব তাকিয়ে ওর দিকে। রবিন মনে মনে বললো: এটাই মোক্ষম সময় পালিয়ে যাবার! হঠাৎ রবিন দিলো দৌড়। এক ঝটকায় দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে।
সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। কোনোদিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে দৌড়াচ্ছে রবিন। আর ভেতরে নয়, বেরিয়ে যেতে হবে এই ভুতুড়ে শহর থেকে! এখানে থাকলে আরো কত ধরনের ভূত-পেত্নীর পাল্লায় পড়তে হবে, আল্লাহ জানেন! কোন্ দিকে যাচ্ছে ও, বুঝতে পারছে না। দিকভ্রান্ত হয়ে গেছে ও। অচেনা ভুতুড়ে শহরে দিকভ্রান্ত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। আগে দিক ঠিক করে প্রধান ফটকের দিকে যেতে হবে। মোবাইল ফোনের কম্পাস ব্যবহার করার জন্য ফোন বের করে দেখলো নেটওয়ার্ক নেই! কী মুস্কিল! অফলাইনে কম্পাস ব্যবহার করে দিক ঠিক করে নিলো। ঠিক দিকেই যাচ্ছে ও: সামনেই প্রধান ফটক। পানাম সিটি পুরোটাই ভুতুড়ে লাগছে এখন! গা ছমছম অবস্থা! ওর গা কাঁটা দিয়ে আছে। সামনে একটা চৌরাস্তা। সামনে কিছুটা আলো থাকলেও দুই দিকের রাস্তা অন্ধকার দেখাচ্ছে। নৈশপ্রহরিগুলো কী করে? ঠিকমতো রাস্তাবাতি জ্বালায় না এবং দায়িত্বও পালন করছে না! কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করতে হবে!
চৌরাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকলো রবিন।বামদিক থেকে হৈচৈ শোনে তাকালো ওদিকে। কিয়ৎদূরে একটা বাড়ির দোতলায় আলো জ্বলতে দেখে মনে মনে বললো: এর মানে ওখানে মানুষ আছে; যাক, তাহলে আর ভূতের ভয়ে ভাগতে হবে না!
রবিন চারদিকটা একবার দেখে এগিয়ে গেলো ওদিকে। রাস্তার মাথায়ই বাড়িটা। দোতলা বাড়ি; চুনসুরকি দিয়ে গড়া। ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো ভবনের ভেতরে প্রবেশের একমাত্র দরজাটা। রবিন ঢুকলো ভেতরে। নিচতলায় কেউ নেই। কোনো আসবাবপত্রও নেই। মাঠের মতো ফাঁকা। সামনেই উপরে উঠার সিঁড়ি। ও আর কিছু না ভেবে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে থাকলো উপরে। সে যতো উপরে উঠতে থাকলো, ততো শীত লাগতে থাকলো ওর। কেনো এমনটা হচ্ছে তা পরোয়া করলো না এবং দ্বিতীয়বার যে ভূতগুলোর কবলে পড়েছিলো, তখনো এরকম শীত লেগেছিলো ওর, তা মনে এলো না রবিনের। উপরে উঠে এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা দরজা দেখতে পেয়ে এগুলো ওদিকে। দরজার সামনে এসে ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো দরজা। ভেতরে আলোর বন্যা। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে শরীর আরো শীতল হতে থাকলে ওর মনে হলো ও কোল্ড স্টোরেজে ঢুকে পড়েছে। ভেতরে কিশোর যুবক পৌঢ় মিলিয়ে অনেক পুরুষ ও মহিলা; সবাইকে সম্পদশালী পরিবারের সদস্য বলেই মনে হচ্ছে। মনে মনে বললো: তাহলে এরা ভূত না!
লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে উল্লসিত কণ্ঠে রবিন বললো, দুইবার ভূতের পাল্লায় পড়ে মনে হয়েছিলো পানাম সিটিতে মানুষ নাই। আপনাদের এখানে দেখে ধড়ে প্রাণ ফিরে এলো। আপনারা এখানে পার্টি করছেন নাকি? রুমটায় ঠাণ্ডাটা বেশি মনে হচ্ছে না আপনাদের কাছে? আমি তো জমে যাচ্ছি শীতে!
রবিনের কথা শোনে সবাই ওর দিকে তাকালো।
ভ্রু নাচিয়ে রবিন ফের বললো, আমাকে দেখে চমকালেন না কেনো আপনারা? এসিটা একটু কমানো যায় না? নাকি সেণ্ট্রাল এসি? আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে আপনাদের শীত লাগছে না। আপনারা কি বুঝতে পারছেন না পানাম সিটিতে ভূত আছে? নাকি এদিকে ভূত আসে না?
দেখতে সবার চেয়ে নবীন এক কিশোর এগিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়ালো। ওর হাঁটা দেখে একটা সন্দেহ মাথায় ঢুকলেও উড়িয়ে দিয়ে রবিন বললো, আগেই বলেছি আপনাদের দেখে আমার ধড়ে প্রাণ ফিরে এসেছে। ভাবছি বাকি রাতটা আপনাদের সাথেই কাটাবো। আপনাদের আপত্তি নাই তো?
কিশোর বললো, আমরা এখানে একটা বোঝাপড়া করার জন্য একত্রিত হয়েছি। বিষয়টি খুব কনফিডেন্সিয়াল। আপনার এখানে থাকা চলবে না।
রবিন কিশোরের দিকে তাকিয়ে বললো, ভূতে ভরা পানাম সিটিতে আমি আর অন্য কোথাও যাবো না। আমি আপনাদের কোনো কথা শুনবো না; কানে আঙুল দিয়ে রাখবো।
কিশোরের পেছন থেকে একজন পৌঢ় বললো, পৃথিবীতে থাকাকালে আমরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ধনসম্পদ কামিয়েছি। কিন্তু সেগুলোর ভাগ আমরা কেউ কাউকে দেই নাই। সামরিক অভ্যূথ্যান হলে আমাদেরকে ক্রশফায়ার দেয়া হয়। আমরা ভূত হয়ে ভাসতে ভাসতে এই পানাম সিটিতে জড়ো হয়েছি।
লোকটার কথা শুনে আঁতকে উঠে সাথে সাথে রবিন ওদের পায়ের দিকে তাকালো। কারো পা নেই! সবাই শূন্যে ভাসছে। কী মুস্কিল! এরাও ভূত! পালাতে হবে! ভাবার সাথে সাথে কক্ষের একমাত্র দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেলো। রবিন পেছনে তাকালো একবার। ভয়ে ওর হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে এবং শরীর কাঁপছে থরথর করে। ক্লান্তিও লাগছে।
তখন ভূতের জঙ্গল থেকে একটা পেত্নী রবিনের দিকে আসতে আসতে বললো, আমি ওকে চিনি। ওর নাম রবিন।
পৌঢ় ভূতটি বললো, কিভাবে চেনো ওকে হাসনা? ও কি আমাদের দল করতো? ওকে তো কখনো আমাদের সাথে দেখি নাই!
হাসনা নামের পেত্নীটি বললো, ও আমাদের দল করতো না।
তাহলে তুমি ওকে চেনো কিভাবে?
আমি ঢাকা ভার্সিটির রোকেয়া হলে থাকতাম। তখন ওকে আমাদের হলের সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করতে দেখতাম। ওকে ভালো লাগায় আমি একদিন প্রেমের প্রস্তাব দিলে আমাকে ফিরিয়ে দেয়। এরপরে আমি আর কারো প্রেমে পড়তে পারি নি! প্রেমে ব্যর্থ হওয়ায় খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগতো না আমার। না খাওয়ায় শুকাতে শুকাতে আমার মৃত্যু হলো। প্রেমের অতৃপ্তি নিয়ে আমাকে চলে আসতে হলো এপারে।
তখন রবিন বললো, আমি তোমাকে চিনতে পারছি না ভূতনী! সব ভূত ভুতনী দেখতে একই রকম মনে হচ্ছে আমার কাছে! তুমি যে হাসনা, এর প্রমাণ কী?
হাসনা রেগে গিয়ে বললো, আমার গায়ে তো এখন আর মাংস লাগাতে পারবো না! আমার কথাই প্রমাণ! তুমি বিশ্বাস না করলে কিছু যায় না আমার!
এ অন্যায়! ভূতনী হয়েছো বলে গায়ের জোরে যা খুশি তা-ই করতে পারো না তুমি!
আমি করবো! যদি তুমি কিছু করতে পারো, তো করো!
পৌঢ় ভূতটি হাসনাকে বললো, কী করতে চাও তুমি এখন?
আমি ওকে বিয়ে করতে চাই! আমার প্রেমের সাফল্য আনতে চাই!
পেত্নীর সাথে মানুষের বিয়ে হবে কিভাবে?
ওকে মেরে ভূত বানিয়ে দাও! ভূতে পেত্নীতে বিয়ে হয়ে যাবে তখন। কী আনন্দ!
দ্রুত রবিন বললো, আমি এই ভূতনীকে বিয়ে করবো না! কখ্খনো না!
পৌঢ় ভূতটি বললো, তোমার অনুমতি চাচ্ছে কে! বেশি কথা বললো এখনই মেরে ভূত বানিয়ে ফেলবো!
তখন এক যুবক ভূত পৌঢ় ভূতটির পাশে এসে বললো, আমি ভূত হবার পরে কোনো ইনসানের ঘাড় মটকাই নি! ওর ঘাড়টা আমি মটকাতে চাই!
হাসনা পেত্নী কণ্ঠ উঁচিয়ে বললো, কখ্খনো না! একটা ঘাড় মটকানো ভূতকে আমি বিয়ে করতে পারবো না! ওকে এমনভাবে মারতে হবে যাতে ওর শরীরের কোনো ক্ষতি না হয়।
ভূত-ভূতনীদের ভয়ংকর কথা শুনতে শুনতে রবিন কাঁপতে কাঁপতে ভেংগেচুড়ে মেঝেতে পড়ে অজ্ঞান হবার ভান করে পড়ে থাকলো। মনে মনে বললো: ভাগতে হলে অজ্ঞান হবার ভান করতে হবে!
পৌঢ় ভূতটি রবিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। বেচারা!
ওর মুক্ত বাতাস দরকার। ওকে বাইরে নিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনো।
হাসনা বললো, ওকে বাইরে নেবার কী দরকার। এই রুমে কোনো পানির ব্যবস্থা নেই। আমি বাহির থেকে পানি এনে ওর নাকেমুখে ছিটিয়ে দিচ্ছি। তাতেই ওর জ্ঞান ফিরবে শাকিব ভাই।
শাকিব নামের পৌঢ় ভূতটি বললো, ভালো কথা। জ্ঞান ফেরানোর পরে ওর মৃত্যু ঘটানোর দায়িত্ব তুমিই নাও হাসনা।
হাসনা ভূতনি বললো, ওকে লিডার।
লিডার ভূত ফের বললো, তুমি কিভাবে ওকে মারতে চাও হাসনা?
খুব সহজে! গলা টিপে ধরলেই হবে!
মেঝেতে স্থির রবিন মনে মনে ভাবলো: সত্যই কি আজ ভূত-পেত্নীদের হাতে ওর মৃত্যু হবে? মৃত্যুর পরে ও ভূত হয়ে যাবে? এরপরে হাসনা নামের ভূতনিকে বিয়ে করতে হবে? আল্লাহ, রক্ষা করো আমাকে? আমি এখান থেকে বের হয়ে তওবা করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সাথে অন্যান্য সকল ধর্মকর্মে মনযোগ দেবো।
হাসনা ভূতনি বললো, পানি আনার জন্য আমি বাইরে যাচ্ছি।
হাসনা পেত্নী দরজার কাছে যেতেই খুলে গেলো দরজা। হাসনা পেত্নী বাইরে চলে গেলো। দরজা খোলাই থাকলো। রবিন মনে মনে বললো: পালিয়ে যাবার এ-ই সু্যোগ! রবিন হঠাৎ উঠে এক দৌড়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে নিচে নেমে বেরিয়ে এলো বাইরে। ভূত-পেত্নীগুলো ওর পিছু নিলো কী নিলো না, তা দেখার জন্য একবারও তাকালো না পেছনে। চৌরাস্তায় এসে তাকালো পেছনে: কেউ নেই পেছনে। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলে সামনের দিকে এগুতে থাকলো রবিন। মনে ভয়: আবার কোনো ভূতের পাল্লায় পড়ে যাবে কিনা। তখন পেছনে গাড়ির শব্দ পেয়ে চমকে উঠলো ও। কিছু বুঝার আগেই জিপটি ওর পাশে এসে দাড়াঁলো।
জিপ থেকে একটা মাথা বের হয়ে ওকে বললো, ভিজিটরদের কেউ রয়ে গেলো কিনা দেখার জন্য বের হয়েছি। প্রত্যেকদিন পথ ভুল করে কেউ না কেউ রয়ে যায়! আপনি উঠে আসুন।
চালকের সিটে বসা লোকটার কথায় রবিনের মন থেকে কেটে গেলো ভয়। ও জিপের সামনের সিটে উঠে বসলো। জিপ চলতে শুরু করলো। নাকে বিটকেলে গন্ধ লাগায় ড্রাইভারের পায়ের দিকে তাকিয়ে ওর আত্মা খাঁচা ছাড়া হবার জোগাড়! পা নেই লোকটার!
হঠাৎ হালকা বোধ হওয়ায় রবিন নিচে তাকিয়ে আঁতকে উঠলো। জিপটা হেলিকপ্টারের মতো উপরে উঠছে! কিভাবে সম্ভব? ইঞ্জিনের শব্দও নেই এখন! জিপটাও কি ভূত হয়ে গেছে? ফের নিচে তাকিয়ে দেখতে পেলো কতগুলো ভুতপ্রেত জিপটাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে! পানাম সিটি দেখতে এসে কী ফ্যাসাদে পড়ে গেলো! আরো উপরে উঠার আগে লাফ দিলে হাত-পায়ে কিছু ব্যথা পেলেও ভূতের কবল থেকে বেঁচে যাবে। সাথে সাথে দিলো লাফ রবিন। নরোম কিছু একটার উপরে পড়লে ওটাও উপরে উঠতে লাগলো। কী ব্যাপার? কী এটা? ও কি নিচে পড়তে পারে নি? কী না কী দেখতে পাবে ভেবে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না ও। তাকাবার আগেই ওকে জিপের সিটে বসিয়ে দেয়া হলো।
চালকের আসনে বসা ভূতটি বললো, আমার জিপ থেকে পালিয়ে যাওয়া এতো সহজ না!
রবিন মনে মনে ভাবলো: তিন বার চেষ্টা করেও ভাগতে পারলাম না ভূতের কবল থেকে। আগে ভূতকে জানতে হবে; ভূত ভূতনি ও এদের রাজ্য সম্পর্কেও জানতে হবে। এরপরে নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনা করতে হবে। মুখমণ্ডল জুড়ে হাসি এনে জিজ্ঞেস করলো, আপনার নাম কী ভূত ভাই? পেশা কী? বিয়ে-শাদি করেছেন? আপনার অর্ধাঙ্গিনীর নাম কী? অর্ধাঙ্গিনী কি মনুষ্য জন্মের উনি-ই নাকি পছন্দের কোনো ভূতনি বা পেত্নীকে বিয়ে-থা করেছেন? বাচ্চা-কাচ্চা কী? ওদের নাম কী? ওরা কী করছে এখন? আপনার অবসর প্লান কী?..
হঠাৎ মুখে ট্যাপ সেঁটে যাওয়ায় রবিন আর প্রশ্ন করতে পারলো না?
চালক ভূতটি বললো, কী সাংঘাতিক? আপনি এক নিঃশ্বাসে কতগুলো প্রশ্ন করেছেন, গুণেছেন? দশটি! এই দশটি প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে রাত কাবার হয়ে যাবে! আমি তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিবো। বাকিগুলোর শোনার ধৈর্য থাকলে সেগুলোরও উত্তর দিতে থাকবো।
ভূতটি বললো, প্রথমে আমার নাম বলছি। আমার নাম হলো আবু সাইদ মনাফ্ফর মাহমুদ শাহ রুবাইয়াৎ নাসের উল্লাহ সৈয়দ নজরুল তাসভির রাহবার হিশাম…
মুখে ট্যাপ লাগানো থাকায় রবিন কো কো করতে আরম্ভ করলে ভূতটি বললো, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন বুঝতে পারছি! নামের আরেকটু বাকি আছে। সংক্ষেপ করে কিভাবে আমি আমার নাম লিখি এবং ডাক নাম কী আমার সেটাও বলবো! ধৈর্য হারালে আমার স্যাঙাৎরা আপনাকে মারপিট করতে পারে! কাজেই মন দিয়ে শুনতে থাকুন! সালাদিন রেজ্জাকুল কবীর হেমায়েত উদ্দিন আহমেদ ইবনে আজির উদ্দিন আহমেদ; সংক্ষেপে এ এস এম এম এস আর এন ইউ সৈয়দ এন টি আর এইচ এস আর কে এইচ ইউ আহমেদ। আর ডাক নাম হলো ডাব্বু! টিংকু, ওর ঠোঁট খুলে দাও!
ঠোঁট থেকে ট্যাপ খুলে নিলে রবিন লম্বা নিঃশ্বাস নিতে ও প্রশ্বাস ফেলতে লাগলো।
ডাব্বু ভূত বললো, বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে থাকি এখন?
রবিন দ্রুত বললো, এখন না! অন্য একটা প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার ডাব্বু ভূত!
কী সেটা?
হাওয়ায় উড়ে কোথায় যাচ্ছি আমরা?
গোস্ট প্যালেস।
গোস্ট প্যালেস! সেটা কোথায়?
উপরে! দিনে অদৃশ্য থাকে, রাতে ভাসতে থাকে সমুদ্রে ভাসমান রাজহাঁসের মতো!
রবিন কাতর কণ্ঠে বললো, গোস্ট প্যালেসে আমার কী কাম! আমাকে নিচে নামিয়ে দাও ডাব্বু ভূত ভাই! আমি আর পানাম সিটি দেখতে আসবো না!
কী যে বলো না তুমি রবিন! বহুদিন পরে একটা জীবন্ত মানুষ পেয়েছি! তোমাকে নিয়ে আমার অনেক প্ল্যান আছে!
তোমাদের কোনো পাকা ধানে মই দিয়ে থাকলে আমাকে মাফ করে দাও ডাব্বু ভূত ভাই!
নো ওয়ে জ্যান্ত মানুষ!
সামনে তাকিয়ে একটা আলোকোজ্জ্বল প্রাসাদ দেখতে পেলো রবিন। প্রাসাদের একমাত্র বিশাল ফটকের দুইদিকে দুইজন পাহারাদার। ওরাও ভূত, তবে এতো লম্বা যে এক দৃষ্টিপাতে পুরো শরীর দেখা সম্ভব হয় না! পরনে ধবধবে সাদা আলখাল্লা। ফটকের কাছে যাওয়ার সাথে সাথে খুলে গেলো ফটক। প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে জিপ নামলো নিচে। ডাব্বু ভূতকে জিপে বসে থাকাবস্থায় ছোটো দেখলেও জিপ থেকে নামার সাথে সাথে হয়ে গেলো আকাশ সমান লম্বা! রবিন জিপ থেকে নামার সাথে সাথে জিপটা মিলিয়ে গেলো হাওয়ায়!
রবিন ডাব্বু ভূতের হাঁটুর সমান এখন! উপরের দিকে তাকিয়ে রবিন বললো, আমি একটা পুঁচকে মানুষ! আমি তোমাদের কোনো কাজে আসবো না ডাব্বু ভূত! নাকি তোমার পুরা নাম ধরে ডাকবো?
তখন নাক টেনে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে শ’ খানেক ভূত-পেত্নী চলে এলো ওদের সামনে; ঝাঁপিয়ে পড়লো রবিনের উপর। ডাব্বু ভূত দ্রুত রবিনকে বগলদাবা করে লাথি ঘুষি মারতে লাগলো আগত ভূত-পেত্নীদের। ভূত-পেত্নীদের হাড্ডি-গুড্ডি উড়তে থাকলো আকাশে। হাড্ডি-গুড্ডিগুলো নিচে পড়লো স্তুপ হয়ে; তারপরে একটির সাথে আরেকটি জোড়া লেগে হয়ে গেলো আগের ভূত-পেত্নীগুলো। সবগুলো ভূত-পেত্নী একই দৈর্ঘের; সেই আকাশ সমান লম্বা!
সবগুলো ভূত-পেত্নী একসাথে কথা বলতে থাকায় কিছুই বুঝা যাচ্ছিলো না।
ডাব্বু ভূত ডান হাত উঠিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো, পুরা নাম বলার দরকার নাই! ডাক নাম বলে কী বলতে চাও বলে ফেলো চটপট।
ঐ ভূতটি ফের বললো, আমার ডাক নাম লুলু। আমরা বহু দিন হয়ে গেলো মানুষের মাংস খেতে পারছি না। আপনি আজকে একটা মানুষ নিয়ে এসেছেন। মানুষটাকে দেখে খুব খুশি লাগছে। বহুদিন পরে মানুষের মাংস খেতে পারবো। কিন্তু আপনি একা না খেয়ে এটাকে স্যুপ বানালে এক চামচ করে স্যুপ খেতে পারবো। এতে আমাদের সকলের মানুষের মাংস খাওয়ার সাধ মিটবে।
এতো বড় পাতিল পাবো কোথায় যা দিয়ে সবার জন্য স্যুপ রান্না করা যাবে?
আপনি হাত নেড়ে দিলেই পাতিল চলে আসবে!
লুলুর কথায় ডাব্বু মুচকি হেসে বললো, তোমরা চুলা বানাও। লাকড়ি জোগার করো। আমি পাতিল আনার ব্যবস্থা করছি।
ভূতগুলোর কথা শুনে রবিনের আত্মা খাঁচা ছাড়া হবার জোগাড়! এবার কী হবে ওর? বিরাট পাতিলে স্যুপ হয়ে যাবে? ওকে কি জ্যান্ত মশলা মাখানো গরম পানিতে ছেড়ে দেবে গরমে সিদ্ধ হয়ে স্যুপ হবার জন্য, নাকি কেটে কুচিকুচি করে পাতিলে ঢালা হবে? লুলুর সাথে ডাব্বু এখনো কথা বলছে। অবিরাম কথা বলতে থাকায় ডাব্বুর হাত একটু ঢিলা হতেই টুপ করে নিচে পড়ে দিলো দৌড়।
অতিকায় দেহের ডাব্বু টের না পেলেও এক ভূত ওকে পালাতে দেখে চিৎকার করে বললো, মানুষটা পালিয়ে যাচ্ছে বস!
ডাব্বু মুঠোয় তাকিয়ে শূণ্য দেখতে পেয়ে বেকুব বনে গেলো। সামলে নিয়ে দ্রুত বললো, তোমরা ওর পিছু নাও! পালিয়ে যাবে কোথায়! ওকে ধরে নিয়ে আসো। লুলুসহ দশ জন থাকো। তোমরা চুলা বানাও।
লুলুসহ দশ ভূত রয়ে গেলো। অন্যরা দৌড়ালো রবিনের পেছনে ওকে ধরার জন্য।
রবিন দৌড়াচ্ছে, প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু দৌড়ে ও যাবে কোথায়?
