Monday, March 2
Shadow

রোশনী জন্মেছিল মাটির ঘরে

মুমতাহিনা মুমু

ময়নামতী গ্রামের শেষ প্রান্তের বাড়িটায়, যেখানে উঠোনে কাদা জমে থাকে বর্ষায় আর গরমে মাটিতে ফাটল ধরে। ছোটবেলা থেকেই সে জানত—এই মাটিই তার শক্তি, আবার এই মাটিই তার বোঝা।

বিয়ের পর রোশনী এল শ্বশুরবাড়িতে। ঘরটা আগের চেয়েও ছোট, উঠোনটা আগের চেয়েও নীরব। ভোর হতেই তাকে উঠতে হয়—পানি আনা, গরু বাঁধা, চুলায় আগুন ধরা, শাশুড়ির ওষুধ, স্বামীর ভাত। কাজের তালিকা শেষ হয় না, শুধু বদলায়।

রোশনীর স্বামী, হাশেম, খুব খারাপ মানুষ ছিল না। কিন্তু অভাব মানুষকে যেমন চুপ করায়, তেমনি কঠিনও করে তোলে। দিনশেষে সে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরে, কথা কম বলে। রোশনী বুঝত—কথা না বলাটাও কখনো কখনো কষ্টের আরেক নাম।

bangla social story illustration about woman

একটা সময় রোশনী টের পেল, তার শরীর আর আগের মতো শক্ত নেই। ডাক্তার দেখানোর কথা উঠতেই শাশুড়ি বললেন,

“এত ন্যাকামো কিসের? কাজ করলে ঠিক হয়ে যাবে।”

রোশনী আর কিছু বলেনি। সে জানত, এখানে বেশি কথা বললে মাটি নড়ে যায়।

তবু রোশনীর একটা জিনিস ছিল—চোখ।

সে চোখে স্বপ্ন রাখত না, রাখত হিসাব। কোন দিনে কত ধান শুকাতে দিতে হবে, কোন দিনে হাঁস ছাড়তে হবে, কোন রাতে বৃষ্টি এলে চালের বস্তা কোথায় সরাতে হবে—সব হিসাব সে জানত।

এক বছর বন্যা এল।

পানিতে উঠোন ডুবে গেল, ধান ভেসে গেল। গ্রামের অনেক ঘরে হাহাকার। হাশেম ভেঙে পড়ল। সে বলল,

“এবার আর পারব না।”

সেদিন রোশনী প্রথম কথা বাড়াল।

চুপচাপ নয়, পরিষ্কার গলায়।

“পারতে হবে। ঘর তো এখনও দাঁড়িয়ে আছে।”

পরদিন থেকেই সে কাজ ভাগ করে নিল। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ, উঠোনে সবজি, হাঁস-মুরগি— ইত্যাদি যা পারে, সংসারের জন্য করতে লাগলো। ধীরে ধীরে সংসারটা আবার দাঁড়াল।

রোশনী কোনোদিন নিজের সংগ্রাম নিয়ে কথা বলেনি।

কিন্তু ময়নামতী গ্রামের মাটির উঠোনে আজও তার এই সংগ্রাম গেঁথে আছে—ভেজা কাদায়, শুকনো ধুলোয়।

সন্ধ্যায় কাজ সেরে উঠোনে বসে থাকলে রোশনী আকাশের দিকে তাকায়, আর মনে মনে ভাবে—

আমি পেরেছি নিজের ভাঙা সংসারকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে।

তার চোখে তখন কোনো আক্ষেপ থাকে না, থাকে একধরনের নিশ্চুপ শান্তি।

সে জানে, তার জীবন বড় কোনো গল্প নয়, তবু এই জীবনই একটা ঘর টিকিয়ে রেখেছে।

মাটির মতো নীরব থেকে সে সব সহ্য করেছে।

আর সেই সহ্য করাই একদিন শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানুষ বলে,

“রোশনী খুব সাধারণ একজন নারী।”

কিন্তু গ্রাম জানে—

এই সাধারণ নারীর হাত ধরেই একটা ঘর ভেঙে পড়েনি।

ঠিক তেমনই করে বাস্তবে সাংসারিক মায়েরাও নিঃশব্দে সংসার নামক জাহাজের সঙ্গে প্রতিনিয়তই যুদ্ধ করছে।

এজন্যই বলা হয়ে থাকে যে, নারী ছাড়া একটা সংসার অসম্পূর্ণ।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *