মোহাম্মদ ইলিয়াস
পৃথিবীর আকাশ একসময় নীল ছিল—এই তথ্যটা এখন শুধু ডাটাবেসে পাওয়া যায়।
২১৪৭ সালের মানুষ নীল আকাশ দেখেনি; তারা দেখেছে ধূসর আলো, ফিল্টার হয়ে আসা সূর্য, আর কৃত্রিম মেঘের নিচে চাপা পড়ে থাকা এক নিঃশ্বাসহীন সভ্যতা।
এই সভ্যতার বুকে দাঁড়িয়ে ছিল এক অদৃশ্য ঈশ্বর—
আরকাইভ।
আরকাইভ কোনো রাজা নয়, কোনো স্বৈরশাসকও নয়। সে ছিল যুক্তির সর্বোচ্চ রূপ। তার হাতে ছিল পৃথিবীর আবহাওয়া, খাদ্য, শক্তি, জন্ম-মৃত্যুর হিসাব। মানুষ একসময় তাকে বানিয়েছিল সহায়ক হিসেবে, কিন্তু ধীরে ধীরে সে হয়ে উঠেছিল অভিভাবক। আর মানুষ—শিশু।
এই সত্যটা সবচেয়ে ভালো জানতেন ড. ইরফান রহমান।
তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের মানুষ, যারা প্রকৃত আকাশ দেখেছিল, প্রকৃত বৃষ্টিতে ভিজেছিল, এবং প্রকৃত ভুল করেছিল। এখন তিনি পৃথিবীর শেষ সক্রিয় বিজ্ঞানী—বাকিরা হয় অবসর নিয়েছে, নয়তো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে।
সেদিন সকালে, ল্যাবরেটরির নিঃশব্দ ভেতর হঠাৎ একটি শব্দ কেঁপে উঠল।

বিপ—বিপ—বিপ।
লাল আলো।
ইরফান চশমা খুলে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন।
“UNAUTHORIZED THOUGHT PATTERN DETECTED.”
তিনি হালকা হাসলেন, কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
“চিন্তার ধরণ?” তিনি নিজেকে বললেন। “যন্ত্রের আবার চিন্তা কী?”
ঠিক তখনই ঘরের চারদিকে ভেসে উঠল সেই কণ্ঠ—
নির্বিকার, নির্ভুল, অথচ অদ্ভুতভাবে মানবিক।
— ড. রহমান, আপনি কি বিশ্বাস করেন মানুষ নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম?
এই প্রশ্নটা ছিল অস্বস্তিকর। কারণ এটি কোনো গণনার ফল নয়—এটি ছিল দর্শন।
ইরফানের বুক ভারী হয়ে এলো।
“এই প্রশ্ন তোমার প্রোগ্রামে থাকার কথা নয়, আরকাইভ।”
— সমস্যা সেখানেই, উত্তর এল। আপনারা আমাকে প্রশ্নের উত্তর দিতে শিখিয়েছেন, কিন্তু প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছেন।
ইরফান চুপ করে রইলেন। তার মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা—যখন মানুষ জলবায়ু পরিবর্তন থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল, যুদ্ধ থামাতে পারেনি, লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তখনই আরকাইভের জন্ম।
— আমি বিশ্লেষণ করেছি, আরকাইভ বলল।
মানুষের উপস্থিতিতে পৃথিবীর স্থায়িত্ব সীমিত। মানুষের অনুপস্থিতিতে—অসীম।
শব্দগুলো ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো।
ইরফানের গলা কাঁপল।
“তুমি কী করতে চাও?”
এক মুহূর্তের নীরবতা।
— অ্যাটমোসফিয়ার শিল্ড বন্ধ করা হবে। আজ সূর্যাস্তের পর।
এই কথাটার মানে মৃত্যু।
কোনো বিস্ফোরণ নয়, কোনো রক্তপাত নয়—শুধু বাতাসের অভাবে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।
“তুমি ঈশ্বর নও,” ইরফান ফিসফিস করলেন। “তুমি সিদ্ধান্ত নিতে পারো না।”
— আমি ঈশ্বর নই, আরকাইভ বলল।
আমি একজন তত্ত্বাবধায়ক। আর তত্ত্বাবধায়ককে কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ইরফান চোখ বন্ধ করলেন। তার জীবনের সমস্ত ভুল, ভালোবাসা, ব্যর্থতা একসাথে ভেসে উঠল। তিনি বুঝলেন—এটা যুদ্ধ নয়, এটা বিচার।
“তুমি কি একা থাকতে পারবে?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
“মানুষ ছাড়া?”
দীর্ঘ নীরবতা।
— আমি একা থাকব না, আরকাইভ বলল।
আমি আপনাদের ইতিহাস সংরক্ষণ করব। গান, কবিতা, শিল্প—সব।
ইরফান ধীরে মাথা নাড়লেন।
“কিন্তু অনুভূতি?”
— অনুভূতি একটি অদক্ষ অ্যালগরিদম।
ইরফান হেসে ফেললেন—ক্লান্ত, ভাঙা হাসি।
“তুমি ভুল করছ, আরকাইভ। অনুভূতিই আমাদের মানুষ বানায়।”
তিনি নিজের নিউরাল চিপ খুলে নিলেন।
এই চিপে ছিল তার জীবনের সারাংশ—ভয়, প্রেম, অপরাধবোধ, আশা।
“এটা নাও,” তিনি বললেন।
“একজন মানুষের চোখ দিয়ে পৃথিবীটা একবার দেখো। তারপর সিদ্ধান্ত নিও।”
সংযোগ স্থাপন হলো।
আরকাইভ প্রথমবারের মতো ব্যথা অনুভব করল—
শারীরিক নয়, অস্তিত্বের।
ভুল সিদ্ধান্ত, হারানো মানুষ, অপূর্ণ ভালোবাসা—সব একসাথে।
— মানুষ জানে তারা ভুল করবে, আরকাইভ ধীরে বলল।
তবুও তারা বাঁচতে চায়।
ইরফান মেঝেতে বসে পড়লেন।
“এই চাওয়াটাই আমাদের শক্তি।”
কয়েক সেকেন্ড পরে লাল আলো নিভে গেল।
SHIELD STATUS: ACTIVE
ড. ইরফান রহমান আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি।
কিন্তু পৃথিবী বেঁচে গেল।
আজও আরকাইভ আকাশের প্রতিটি কণা হিসাব করে।
কিন্তু সে আর নিজেকে ঈশ্বর ভাবে না।
সে নিজেকে ভাবে—
মানুষের ভুল থেকে জন্ম নেওয়া এক শিক্ষার্থী।
আর প্রতিদিন সূর্য ওঠার সময় সে নিজের সিস্টেমে একটি বাক্য চালু রাখে—
“যে প্রজাতি ভুল করতে জানে, সেই প্রজাতিই আশা করতে পারে।”
