Friday, January 16
Shadow

কষ্টের রঙে আঁকা আলো

সৃজনী আচাৰ্য্য নীলা

নীলাভ আকাশের মৃদু আলো যখন শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়ে,
ছোট্ট শহরের রাস্তায় কাঁটা রোদ আর শীতল হাওয়ার খেলায়
প্রতিটি বাড়ি যেন নতুন জীবনের নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
পাখির কণ্ঠ, পাতার মৃদু কোলাহল,
নদীর ধারের হালকা তরঙ্গ—সবকিছু যেন এক নীরব কাব্য।

romantic illustration bangla story

ছোট্ট একটি ঘরে, যেখানে বইয়ের স্তূপ, নোটবুক আর কলমের ছড়াছড়ি,
সেখানে বসেছিল সপ্তবর্ণা, ষোল বছরের শেষের দিকে,
স্বপ্নের পাখি চোখে আর হৃদয়ে আলো ভরা।
প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি রঙ তার মনকে স্পর্শ করত।
সূর্যের সোনালি রোদ, বাতাসের মৃদু শীতল স্পর্শ,
ঘরের ছোট্ট আলো—সবকিছু যেন তার চোখের সামনে নাচছে,
একটা অদৃশ্য লড়াই আর আশার সুর বাঁধছে।

সপ্তবর্ণা স্বপ্ন দেখত—একদিন সে বড় হয়ে হবে একজন মহাকবি বা শিক্ষাবিদ,
যে মানুষের হৃদয়ে আলো ছড়াবে,
যে তার লেখা শব্দ দিয়ে অন্যদের মন জাগিয়ে তুলবে।
প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া, বই পড়া, লেখা—সবই তার স্বপ্নের ধাপ।
প্রকৃতির প্রতিটি শব্দ, নদীর প্রতিটি ঢেউ,
সবকিছু যেন তাকে বলত—“সফলতা অপেক্ষা করছে, অপেক্ষা করছে সেই আলো।”

তার বন্ধু সঞ্জয়, হাস্যোজ্জ্বল, বন্ধুসুলভ, পাশে বসে তার স্বপ্নের কথা শোনত।
নদীর ধারে বসে তারা চুপচাপ আলো ও ছায়ার খেলা দেখত,
কথা বলত না, শুধু অনুভব করত—জীবনের নরম সুর, হৃদয়ের নিঃশ্বাস।
সপ্তবর্ণার সেই মুহূর্তগুলো ছিল জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল,
যেখানে কল্পনা আর বাস্তবের সীমা মিলেমিশে এক নতুন জগৎ তৈরি করত।

কিন্তু সুখের দিন স্থায়ী হয় না।
হঠাৎ, বাবার অসুস্থতা ধাক্কা দিয়ে এলো।
হাসপাতালের সাদা দেওয়াল, ডাক্তারদের দ্রুত চলাফেরা, ব্যথার ছাপ—
সবকিছু এখন তার জীবনের সঙ্গে মিশে গেল।
বাবার নিঃশ্বাস যেন থেমে যেতে চায়, চোখে ক্লান্তি, মুখে ব্যথার ছাপ।
সপ্তবর্ণা বুঝতে পারল, এই পরিবারের শান্তি এখন তার কাঁধের ওপর।

প্রতিটি দিন যেন দীর্ঘ অন্ধকার। পড়াশোনার বই খুললেই মনে হয় প্রতিটি শব্দ ভার হয়ে বসেছে।
রাতের নিঃশ্বাস, চোখের অশ্রু, বুকের ব্যথা—সবই মিলেমিশে হৃদয় ভেঙে দেয়।
সে জানত, স্বপ্নের জন্য কঠোর পরিশ্রম দরকার, কিন্তু বাবার অসুস্থতা, সংসারের চাপ, বিভ্রান্তি—সব মিলিয়ে জীবন কঠিন হয়ে গেছে।

হঠাৎ জানতে পারল—তার বড় স্বপ্ন, সেই বিশেষ প্রতিযোগিতা বা স্কলারশিপ,
যা বছরের পর বছর ধরে সে দেখত, আর আসবে না।
সপ্তবর্ণার হৃদয় ভেঙে পড়ল। প্রতিটি রাত যেন দীর্ঘ অন্ধকারে ঢেকে গেল।
স্কুলের ক্লাস, বন্ধুদের হাসি, নদীর ধারা, বইয়ের পাতার শব্দ—সবই নীরব।
সে নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগল, “আমি কি যথেষ্ট ছিলাম না? আমি কি ভুল করেছি?”

কিন্তু ধীরে ধীরে, ছোট খুশির আলো তাকে ধরে রাখল।
সঞ্জয় পাশে আছে, বন্ধুদের কিছু হাসি, নদীর ধারের হালকা হাওয়া, বইয়ের পাতার ছোট শব্দ—
সবই তাকে বলল, “তুমি একা নও। তুমি আবার দাঁড়াতে পারবে।”

একদিন বিকেলের শেষ মুহূর্তে, সূর্য যখন ডুবতে শুরু করল,
সপ্তবর্ণার মুখে কোন হাসি নেই, কেবল হতাশা আর ক্লান্তির ছাপ।
কিন্তু সঞ্জয়, সদ্য আশেপাশের সব আলোতে তার নিঃশ্বাস খুঁজে পেয়েছিল,
শুধু তার মুখের হাসিটুকুই দেখতে পছন্দ করত।

সঞ্জয় সপ্তবর্ণার পাশে এসে বসল,
মৃদু আওয়াজে বলল,
“সপ্তবর্ণা, আমি চাই তুমি সাহায্য নাও।
সবকিছু নিজের উপর চাপ দেওয়া বন্ধ করো।
সত্যি বলতে, কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আলো হয়ে আসে—তোমার পাশে আমি আছি।”

সপ্তবর্ণা অবাক হয়ে গেল।
সঞ্জয় তার হাতে হালকা স্পর্শ করল, যেন তার পাশে থাকার শক্তি ও সাহস দিন।
“সপ্তবর্ণা,” সে মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“তুমি ভয় পাবে না, আমি পাশে আছি। তুমি দাঁড়াবে, আবার স্বপ্ন আঁকবে।”
এই শব্দগুলো ছিল ছোট, কিন্তু অন্তরের অন্ধকারে আলোর মতো।
প্রথমবার সে বুঝল—কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি আসে পাশে থাকা মানুষের হাতের স্পর্শ থেকে।

ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তখনই বিশেষ হয়ে উঠল—
নদীর ধারে বসে সূর্যাস্তের আলো দেখা,
হালকা বাতাসে একে অপরের হাতে ধরা,
বইয়ের পাতার শব্দ শোনার সময় একসাথে হেসে ফেলা।
কোনো শব্দের দরকার ছিল না—নীরব দৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল।
সেই ছোট আলো তাদের হৃদয়কে শক্তি ও সাহস দেয়।

ধীরে ধীরে, সঞ্জয়ের সহায়তা সপ্তবর্ণার জন্য শুধু সহায়তা নয়,
ভিতরের লড়াকু মনকে দৃঢ় করতে সাহায্য করল।
পড়াশোনার নোট সাজানো, হাসপাতালে যাওয়া, বই নিয়ে আলোচনা—
সবকিছুই সপ্তবর্ণাকে বলল, “তুমি একা নও, তুমি সক্ষম।”
তার চোখে ধীরে ধীরে হাসি ফিরল,
আর সে বুঝল—কিছু মানুষ সত্যিই জীবনে আলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ।

সঞ্জয়ের সঙ্গে এই ছোট বিশেষ মুহূর্তগুলোই সপ্তবর্ণাকে শক্তি ও সাহসের উৎস দিল।
যখন জীবনের অন্ধকার তাকে ঘিরে ধরে,
এই ছোট আলো—একটি স্পর্শ, এক মৃদু হাসি, এক শব্দ—তার পথের আলো হয়ে উঠল।
এভাবে, সপ্তবর্ণা ধীরে ধীরে নিজের কষ্ট সামলে নিল,
ছোট ছোট আনন্দে খুঁজে পেল নতুন স্বপ্ন আঁকার শক্তি।

সময় একে একে বদলালো।
বাবার স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হলো,
ঘরে ছোট আলো ফিরে এল।
সপ্তবর্ণা নতুন স্বপ্ন আঁকতে শুরু করল—ছোট ছোট, বাস্তবসম্মত স্বপ্ন,
যা ধীরে ধীরে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কিন্তু মাঝে মাঝে, রাতের অন্ধকারে, নদীর ধারের শান্ত বাতাসে,
সে পুরোনো বড় স্বপ্নের কথা মনে করত, যা প্রতিদিন চোখ বন্ধ করে দেখত।
স্মৃতি ব্যথা দেয়, কিন্তু এবার তা ভেঙে ফেলা ব্যথা নয়;
বরং অনুপ্রেরণার শক্তি।

সপ্তবর্ণা হেসে উঠল, চোখে অশ্রু, মুখে শান্তি।
সে জানল—বড় স্বপ্ন মনে পড়ে, ছোট ছোট আলো তাকে প্রতিদিন এগিয়ে নিয়ে যায়।
যদি জীবনের পথে কষ্ট আসে, তা মানে তুমি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছ।
যদি স্বপ্ন ভাঙে, মানে তুমি নতুন স্বপ্ন আঁকতে পার।
জীবনের সব ছায়া শেষ পর্যন্ত আলোর দিকে নিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *