হত্যা

নারী বিষয়ক গল্প: হত্যা। লিখেছেন উজ্জ্বল রায়

পাড়ায় পা রাখতেই টের পেলাম পাড়াতে কিছু একটা অঘটন ঘটেছে। একটু এগিয়ে জানতে পারলাম সালমা মারা গেছে।ভাবলাম যাক একদিকে ভালই হল।ওই দূর্বিসহ মৃত্যু যন্ত্রণার হাত থেকে তো রেহাই পেলো মেয়েটা। মনে হচ্ছে তো এমন কথা কেন বলছি? আপনারাই ভাবুন একটা মেয়ে বছর পঁচিশের মেয়ে তরতাজা শরীরের পঁচাওর শতাংস পুড়েও যদি সেই শরীর বাঁচার তীব্র লড়াই করে সেটা কতটা কঠিন হতে পারে।হুম, এমনই মৃত্যু যন্ত্রণার সঙ্গে দুইমাস নিরন্তর লড়াইয়ের পর আজ সালমা হার মেনেছে মৃত্যুর কাছে।আহ্ মৃত্যু! তোমারও কত রুপ। ভাবনার তাল কেটে দিল আমার দিকে ছুটে আসা সালমার মা’য়ের কান্নার রোল।পথ আটকে সামনে দাঁড়িয়ে ” সালমা আমার চলে গেল বাবা” বলে সূর করে কান্না করতে থাকল।বেচারা আমির সে যে কঠিন পরিস্থিতি বলে বোঝাতে পারব না।মনে হলো চিৎকার করে বলি, তোমরা সকলে মিলেই তো ওকে মারলে।এখন আবার এত কান্না কি? উহ,কাঁচা ঘা, এখন বলা ঠিক হবে না ভেবে নিজেকে সামাল দিলাম।বাড়ি ঢুকে বাগানে গিয়ে নির্জন একটা কোণে  বসতেই সালমার মুখটা ভেসে উঠল।মন বলে উঠল সালমা চলে গেল দুটি সন্তান রেখে।কিইবা বয়স হয়েছিল ওর।

এই বয়সে দু’টো বিয়ে দু’টো  সন্তান তারপর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জীবনের সব দায় মিটিয়ে দিয়ে গেল।সামাজিক নিয়ম মাফিক বিয়ে সবার হয় জীবনের দাবীতে। সময়ের দাবীটাকেও অগ্রাহ্য করা যায় না।সালমা সময়ের দাবীকে অস্বীকার করেই নাবালিকা অবস্হাতে বিয়ে করেছিল মা- বাবাকে গোপন করে।এমন খবর বেশিদিন চাপা থাকার নয়। থাকলও না।লোক জানাজানি হতেই ও পালিয়ে গিয়ে কাজী দিয়ে বিয়ে করল।দিন কয়েক পরে শ্বশুর বাড়ি এসে ঢুকল। বাপ ভাইয়েরা মানল না। মানল না তো বইয়ে গেল সালমার। ও দিব্যি স্বামী সোহাগি হয়ে সংসারে মন দিল।খুব সুখে আছে দেখে মা গোপনে যোগাযোগ শুরু করল।আস্তে আস্তে সকলে মিলে মিশে গেল।মা লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে সংসারের সব গোজ- গাজ দিতে লাগল।তারপর লোক দেখিয়ে দিল।অতঃপর পারিবারিক ভাবেই….। এই পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক ছিল।মেয়ের বাড়ির এমন আহ্লাদ দেখে বিগড়াতে শুরু করল ছেলের বাড়ির লোক। সম্পর্কের মাঝে এল তিক্ততা। তিক্ততায় পরিণত হল হলাহলে। সেই হলাহল শেষ করল সম্পর্ককে।তখন সালমা এক কন্যার মা।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠলাম আমি।উঠে এলাম নিজের ঘরে। তবুও সালমা আমার সঙ্গ ছাড়ে না। বার বার ও ওর বাল্যকালের ছবি নিয়ে ঘুরে ফিরে আমার চোখের সামনে খেলা শুরু করল।বালিকা সালমাকে প্রথম দেখেছিলাম আমাদের রিক্সার পিছনে পিছনে আসতে। আমার চাচাতো ভাইকে দেখে। আমরা বাড়ির সামনে নামতেই একমুখ হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে জানতে চাইল ‘ তুমরা এই বাড়ির মানুষ?  এই বাড়িতে থাকবে?  ছেলেটাও থাকবে?  আমি বলে উঠলাম কেন রে?

কি সুন্দর দেখতে ছেলে।আমাকে দেবে আমি কোলে নিয়ে ঘুরবো  বলতে বলতে কারো অনুমতি ছাড়াই সাবলীল ভাবে আমাদের বাড়িতে ঢুকল।আমাদের বাড়িতে সেই ওর পা রাখা।তারপর থেকেই রোজই আসত বাচ্চাটাকে নিয়ে খেলত।প্রায়ই সারাদিন থাকত।একসময় আমার মা ওর মা’ কে ডেকে বলল, তোমার আপওি না থাকলে সালমা আমার বাড়িতে থাক।সেই থেকে ও আমাদের বাড়িতে পাকাপোক্ত থাকতে শুরু করেছিল।কেবল রাতে ঘুমাতে যেত বাড়িতে। মাস ছয় – সাত পর ওর মা আমার মা’য়ের গৃহকর্মের সহযোগী হয়ে এল।ওর আসা কমতে কমতে বন্ধ হল।সময়ের শ্রোতে ওর আচরণ ও কথাবার্তায় অসম্ভব পরিববর্তন এল।একটা বেপরোয়া ভাব এসেছিল তার আচরণে। প্রেমে পড়ে কি অসম্ভব প্রগলভতা নিয়ে চলাফেরা করত।ছোট বড় মানত না।সবার মুখে মুখে চোপা করত।এক সময় ওর অমন আচরণ দেখে আমার মা এবং পাড়ার অনেকে ওর মা’ কে ওর সম্পর্কে সচেতন করেও ছিল।কিন্ত ঐ যেমন হয় আর কি? ওর মা ওসব মিথ্যা এবং ছোট বলে উড়িয়ে দিল। এমন সব কতশত ছোটখাটো ঘটনার উদযাপন দিয়ে দৈনন্দিন যাপন চলছিল।তার মধ্যে সালমার দূম করে বিয়ে করা, তার সমাজের ও পাড়ার সকল শ্রেনীর মানুষদের আসরকে জমিয়ে রাখল।তারপর পরেই সন্তানের মা হওয়া সেই জের বেশকিছু দিন টানল।ঝিমিয়ে আসা পাড়ার আসর আবার চাঙ্গা করে তুলল সালমার দাম্পত্য জীবনে প্রেমের জোয়ারে ভাটার সংবাদ।জা, ননদ শাশুড়ির চক্রপথ ধরে স্বামী- তার গায়ে হাত তুলতে শুরু করল।শারীরিক মানসিক অত্যাচারের বহু রুপে প্রকাশিত হল।বহুদিনের কচকচানি একে অপরকে গালিগালাজের ঢিল ছুড়াছুঁড়ির পর পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে দাম্পত্য জীবনের ইতি টানল সে।জীবনের একটা পর্বের ইতি টেনে সে বাপের বাড়ি এসে বসল।তার বিনিময়ে তার ছাড়ের টাকা ভায়ের হাতে তুলে দিতে হল।সেই টাকায় তার ভায়ের ব্যবসা চাঙ্গা হল।তার সেই সর্বনাশ দিয়েই ভায়ের সংসারে পৌষমাস শুরু হল।মটর বাইক এল তার ঘরে।কিন্ত সালমার ভাগ্যের পাশা খেলায় খোদা অন্য চাল চালছিলেন। সেই চালের টের সালমা পায় নি।না হলে এমন ভুল কি সালমা করত?
তার সেই ভুলের পরিণতি হল তার দ্বিতীয় বিয়ে। বেশ তো ছিল ও।নিজের মতোই বাপ ভাইয়ের বাড়িতে একটা পৃথক ঘরে। পৃথকভাবে মেয়েকে নিয়ে থাকত সে।অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করে নিজের মত করেই বাঁচার পথ তৈরী করেছিল। হঠাৎ এই বিয়ে কেন? ওর মা’কে বার বার জিগ্যেস করলে না কথা বললেও সত্যটা বলেনি কখনও।মা’য়ের ধর্মই সে পালন করেছে বলে তাকে দোষও দিতে পারি না। ওর মায়ের কথাটাই আমি সত্যি বলে মেনেছিলাম। ”ওর কাঁচা বয়স মা  বিয়া না দিলে হয়!  ভাল সম্মন্ধ ঘর বয়ে এল তাই সবাই সাতপাঁচ ভেবে জামাইদের সাথে আলোচনা করে বিয়া দিলাম”।

পাঁচটা লোক নিয়ে মৌলভিসাহেবকে ডেকে বিয়ে পড়ান হল,সালমার মা বলেছিল আমাকে। দ্বিতীয় বিয়ের হাতে হাত রেখে ও জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে শুরু করল।খেলতে খেলতে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। ক্লান্ত না হয় কেমনে!  প্রতিপক্ষ যে খুব জোড়াল।দুই মৃত সতীন, এক সতীন পুএ এক জাদরেল শাশুড়ি ও ননদ। সেই সঙ্গে পাড়ার ছোট বড় মোড়লের চামচাদের চড়বড়ানি। অসহায় ক্লান্ত বোধ করলে লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে মাঝে মাঝে পালিয়ে এসেছে।ভাইয়ের মাটির মেঝোতে যে তখন টাইলস  বসেছে। তাই সেই মোঝোতে তার পা রাখা কঠিন হল।
সমস্যা তার নিজের সংসারে ছিল না।সতীনপো ননদ- শাশুড়ি কেউই তার সংসারেও থাকত না।তবুও সেই সতীনপোকে নিয়েই যত গোল বাঁধল তার জীবনে। সালমা ছিল জেদি, হটকারি মুখরাও।তবে খুব গোছানি মেয়ে। প্রচুর যৌতুকের সঙ্গে নতুন আবেগী স্বপ্নকেও হয়ত জড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল।নতুন মানুষের হাত ধরে গিয়ে উঠেছিল নতুন আঙিনায়।নতুন সংসারে সে সুন্দর ভাবে বিছিয়ে দিয়েছিল তার নানা স্বপ্ন।তার সেই স্বপ্ন বাস্তব রুপ পেয়েছিল উঠোনের ধারে নিজের হাতে পোঁতা লাউ গাছের লতায়,পুঁইশাকের মাচায়।” সালমার মা পাড়ার সবাইকে ডেকে শুনিয়ে তৃপ্ত হতো ” সালমা,আমার সুখি হয়েছে।নিজের হাতে হাঁস মুরগী পালে।ডিম বেচে।নিজের হাতে টাকা পয়সা নাড়াচাড়া করে।কখনও কখনও ভাবিদেরও পাঠায়।সংসারে কত জিনিষ – সাজগোজ সবই করেছে! এসবই সালমার মা হাসি মুখে বলে বেড়াত।পাড়ার লোকেরা শুনে তারাও আওড়াত ‘ যাক সালমা,সুখি হয়েছে।ভালো থাক ও।আল্লা ওকে ভাল রাখুন।

আগের পক্ষের কন্যাকেও নিজের সাথে নিয়ে গিয়েছিল স্বামীর অনুমতিতে,না স্বামী তার খুব ভালো।এই মেয়েকে স্কুলে ভর্তী করে দিয়েছে।সাইকেল দিয়েছে।তাকে ভালবাসে।কেনাকাটা করে দেয়।এসবের মাঝেই সালমা পুএ সন্তানের মা হল।তারপর থেকেই তার সংসারের অশান্তি লোক  জানাজানি হল। তাল হয়ত কাটতে শুরু হয়েছিল ভিতরে ভিতরে। তাপটা প্রবল হলে সমাজ টের পেল সালমার সংসারে শনির দৃষ্টি পড়েছে।ভালোবাসার দেওয়ালে অবিশ্বাসের চিড়কে ফাটলে পরিণত করল সমাজ সংসারের ষড়যন্ত্র  নামক দূর্গন্ধময় আবর্জনা। মা’য়ের  বাড়ি আাসা – যাওয়া বৃদ্ধি পেল সালমার। যতবার এসেছে ততবারই তাকে শুন্য হাতে ফিরতে হয়েছে। তারপর এক সন্ধ্যায়  সালমার মা’য়ের গগনভেদী আর্তনাদ ঘোষণা করল সালমা গায়ে আগুন জ্বালিয়ে নিজের মনের জ্বালা মেটাতে চেয়েছে।
হুম। আজ তার মৃত্যুর খবর সবার কানে পৌঁছে গেল।গায়ে আগুন জ্বালিয়ে তাকে প্রমাণ করতে হল সে মরছে।পাড়াপড়শি, স্বজন- কূজন সকলে বলতে শুরু করল,আহা অমন করে মরতে আচে।হচ্ছিল না যখন তখন চলে এলেই পারত।অমন করে জান দ্যায়।আহা গো।বাচ্চা দুটোর কি হবে?বাচ্চা দুটো মুখ পানে চাইলি না। এসবের মাঝেই হাওয়ায় ভাসতে লাগল,ওই ছোড়ার সঙ্গে ছাড়ছুড় হওয়ার পরও আড়ালে আবডালে লুকিয়ে – চুড়িয়ে অমন দেখা না করলে তো এই বিয়েটা দিত না।এমন দিনও দেখতে হত না।কথাটা কানে এল। মা’য়ের কাছে জানলাম কথাটা মিথ্যা নয়।ওর মা রাস্তা ঘাটে লোকের বাড়িতে বলতে থাকল,এমন জানলে এবার আর জোর করে পাঠাতাম না গো।ও বেটি আমার এমন কাজ করবে কে জানত?

দগ্ধ শরীর নিয়ে এক অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে সালমা এক নতুন আর এক নতুন খেলা শুরু হল।আর একদিকে তার সহদর খেলল সাংঘাতিক  এক খেলা।সালমা জীবনের প্রতিটি খেলার মত এই খেলাতেও হেরে গেল।কিছুদিন পরেই সালমার মা সমাজের লোকের কাছে বলল ছেলে বলেছে, সালমা তো নিজেই গায়ে আগুন লাগিয়েছে।যে যাবার সে গেছে। থানা পুলিশ করে কি হবে? হসপিটালের খরচ তো বেশ করলো।খানা খরচ দিল।লোক খাইয়ে সালমার মৃত্যুর শোকের উদযাপন হল।লোক খাইয়ে মৃত্যুর সত্যতাকে সালমার সঙ্গেই দাফন করা হল।কয়েক মাস পর সালমার মা জানাল, মেয়েটির বিয়ের দায়িত্ব নিয়েছে জামাই।আরও কিছু টাকা দিবে বলেছে। শ্বশুর বাড়িতে আসা যাওয়া বেড়ে গেলো জামাইয়ের।আরও কিছু পরে সংসারে সমাজে সালমার মৃত্যুর শোক থিতিয়ে গেল।তারও কয়েক মাস পর তার ভাইয়ের একতলা বাড়ি দু’ তলা হল।বাড়িতে বসল গভীর নলকূপ – মটর – পানির ট্যাংক।

অনলাইনে ফ্রি বাংলা গল্প পড়তে আমাদের সঙ্গে থাকুন। প্রয়োজনে ওয়েবসাইট রিফ্রেশ করে সাইটের ‘বন্ধু’ হয়ে যান। সেক্ষেত্রে নতুন গল্প আপডেট হলেই শুধু নোটিফিকেশন পাবেন।

এ ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপলোড হবে বাংলা রোমান্টিক গল্প, বাংলা হরর গল্প, থ্রিলার গল্প , অতিপ্রাকৃত গল্প এবং বাংলা সায়েন্স ফিকশন গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *