প্রশ্নটা গলা পর্যন্ত এসেও বের হচ্ছে না। কিছুতেই না। রাকিব জানে প্রশ্নটা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবু করতে ইচ্ছে করছে। অনেক্ষণ ভাবার পর যেই প্রশ্নটা করতে যাবে, তার আগেই ছেলেটা বলল-
‘নাও ধরো, সাবধানে ধরবে। ফেটে গেলে তুমি.. না না তুমি ফেরত দেবে কী করে, তুমি তো কাক না, মানুষ। তুমি কাকের ডিম পাড়বে কী করে।’
উত্তেজনায় রাকিবের হাত কাঁপছে। এ প্রথম সে একটা কাকের ডিম দেখছে। হুট করে মনে হলো, অনেক কিছুই এখনো সে প্রথমবারের মতো দেখেনি। ডিমটা ক্রিকেট বলের মতো পুরোপুরি গোল নয়। হাতের তালুতে সাবধানে আঁকড়ে ধরে আছে।
‘চেপে ধোরো না। ফেটে যাবে।’ কথাটা বলতে বলতে ছেলেটা এক দৌড়ে সামনের একটা ঝোপ থেকে একটা লম্বাটে চিকন কী যেন ছিঁড়ে নিল। ফুলের মতোই দেখতে। হাত দিয়ে ঘসে ওটার ফুলগুলো ফেলে কেবল কাণ্ডটা রাখলো। ঝটপট একটা গিট্টুও দিল। রাকিব ভাবছে, ছেলেটা এতো কিছু জানে কী করে। একই গাছ থেকে আরেকটা ডগা ছিঁড়লো। সেই গিট্টুর মধ্যে ডগার গোড়া থেকে বের হওয়া সাদা সাদা রসটা লাগিয়ে নিলো। এরপর জোরে ফুঁ। রাকিব মহা অবাক। ছোট ছোট অনেকগুলো বাবল বের হয়েছে গিট্টু থেকে! এতো রীতিমতো ম্যাজিক!
ছেলেটার সঙ্গে রবির আগে কখনো দেখা হয়নি। কিন্তু হুট করেই অনেক বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ছেলেটা খুব মিশুক।
‘তোমার নাম কী?’
যাক অবশেষে প্রশ্নটা করতে পেরেছে রাকিব। কিন্তু ছেলেটা কিছু বললো না। বোধহয় শুনতে পায়নি। আর না হয় সে তার নাম বলতে চায় না।
‘তুমি একটা আস্ত বোকা। হিহিহি। চল তোমাকে খাল দেখাই।’
রাকিব বুঝতে পারছে না, খালের মধ্যে দেখার কী আছে। তারপরও ছেলেটার কথা শুনে মনে হচ্ছে অনেক কিছু আছে। তা না হলে ওকে এতো খুশি খুশি দেখাতো না।
‘বললে না তো, তোমার নাম কী?’
‘আমার নাম অন্তু। আর তোর নাম রাকিব, আমি জানি।’
ছেলেটা কী সহজে তাকে তুই করে বলে ফেললো। যেন কতোদিনের বন্ধু। তবে রাকিবের খারাপ লাগছে না। ভালোই তো, এমন আজব একটা বন্ধু থাকলেই ভালো।
‘তুমি এ গ্রামে কেন এসেছো অন্তু?’
‘আমরা ঘুরে বেড়াই। গতমাসে আমরা গিয়েছিলাম মৌরিতানিয়ায়। এখন আবার বাংলাদেশ দেখবো।’
‘মৌরিতানিয়া? ওটা আবার কী?’
‘তুই আসলেই একটা বোকা। মৌরিতানিয়া একটা দেশের নাম। ওখানে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা ট্রেনটা আছে। আমরা ওটাতেও চড়েছি।’
‘আমরা মানে? আর কে?’
‘আমি আর আমার বাবা। আমরা দুই জন ঘুরে বেড়াই।’
রাকিবের ইচ্ছে হলো একবার জিজ্ঞেস করে, তোমার মা কোথায়। কিন্তু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো না। যদি আবার অন্তুর মন খারাপ হয়ে যায়।
‘তুই কেন এসেছিস। গ্রাম দেখতে?’
‘নাহ.. আমার বাবা কী যেন কাজে এসেছে। বাবার কাজ শেষ হলেই চলে যাব ঢাকায়।’
‘হুহ। ঢাকা একটা যাওয়ার জায়গা হলো! শুধু গাড়ি আর গাড়ি।’
ছায়াঢাকা গ্রামের মেঠোপথে অন্তুকে দেখে মনে হচ্ছে সে এ গ্রামেরই ছেলে। অথচ রাকিবের এখনো কেমন যেন নিজেকে অতিথি অতিথি মনে হচ্ছে।
‘এই দেখ, খাল। খালের ওপারে ঐ যে জঙ্গলটা দেখছিস, ওটা হচ্ছে পেত্নিবাগ।’
‘অ্যাঁ.. ভূত?’
‘হিহিহি। নাহ। ভূত টুথ নেই। ওখানে নাকি একসময় রাত হলে পেত্নিরা নাচানাচি করতো। যাবি?’
রাকিবের একটা ভিডিও গেমসের কথা মনে পড়ে গেল। একটা দুর্গম এলাকায় ভূত-পেত্নিরা ঘুরে বেড়ায়। তার কাজ হচ্ছে গেমসের নায়ককে নিয়ে সেই ভূতদের মেরে ফেলা। কিন্তু এখন নিজেকেই গেমসের নায়ক মনে হচ্ছে। কিন্তু অভিযানে নামার সাহস পাচ্ছে না!
‘তুই একটা ভীতু।’
‘এ্যাঁ.. না মানে.. আচ্ছা ঠিকাছে চলো। কিন্তু যাবো কী করে?’
‘বেত গাছ চিনিস তো। এই যে খালের দুপাশে লম্বা লম্বা লাঠি দেখছিস, এগুলো বেত গাছ। স্কুলের স্যারের হাতে যেগুলো থাকে আর কি। তোদের শহরের স্কুলে তো মনে হয় বেত টেত নাই।’
অন্তুকে এখন সত্যিকারের সবজান্তা ভাবছে রাকিব। খালের ওপারে পেত্নিবাগে যাওয়া ওর জন্য নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার না। কিন্তু রাকিব ভাবছে অন্যকথা। কম্পিউটারে ভিডিও গেমসে সে নিজে কতো দুঃসাহসী অভিযানে গিয়েছে। কতো বুদ্ধি খাটাতে হয়েছে। কিন্তু এখন সাধারণ একটা খাল পাড়ি দেয়ার কথা ভাবতেও পারছে না।
অন্তু এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। রাকিব একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পেত্নিবাগের দিকে। খালটা খুব একটা সরু নয়। তবে দুপাশে কাঁটাওয়ালা গাছের জঙ্গল। সাপ টাপ থাকতেই পারে। পড়ন্ত দুপুরেও খালের পানিতে এতোটুকু সূর্যের আলো পড়ছে না। রাতে আরো ভয়ংকর দেখাবে নিশ্চয়ই। একটু এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে। শেষটা কোথায় তা দেখা যাচ্ছে না। তবে একটু দূরে হাল্কা জঙ্গলে ছাওয়া সমতল জায়গাটা হঠাৎ করে মনে হচ্ছে খুব কাছে। আবার হুট করে দূরে।
‘ঐ যে দেখ। পেয়ে গেছি।’
অন্তু কী পেয়েছে দেখার জন্য তাকালো রাকিব। কিন্তু বুঝতে পারলো না। কিন্তু অন্তু মহা খুশি। সে লাফিয়ে দুটো ঝোপ পার হয়ে খালের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালো।
‘কলাগাছ! হুররে!’
রাকিব কাকের ডিমটা শার্টের পকেটে রেখে এগিয়ে গেল।
‘কলাগাছ থাকতে আর চিন্তা নাই। এবার দড়ি খুঁজতে হবে।’
রাকিব এখনো বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা। হা করে তাকিয়ে দেখছে।
অন্তু এক দৌড়ে কোথায় যেন চলে গেল। ফিরলো টানা দশ মিনিট পর। হাতে অনেকগুলো মোটা দড়ি। তবে ঠিক দড়ির মতো নয় ওগুলো।
‘বটগাছের ঝুরি। অনেক শক্ত। টারজান দেখিসনি? ঐরকম আর কি।’
রাকিবও হাত লাগালো। অন্তুর দেখাদেখি কলাগাছ তিনটেকে বটগাছের দড়ি দিয়ে জুড়ে দিতে খুব একটা সমস্যা হলো না। দড়িতে গিট্টু লাগানোর সময় রাকিবের মনে হচ্ছে সে এখন সত্যিকারের গেমস খেলছে। আপাতত লেভেল ওয়ানে আছে।
‘ব্যস হয়ে গেছে। এবার একটা লগি লাগবে।’
‘লগি?’
‘তুই… না থাক। তোকে আর বকা দেবো না। শহরে থাকিস। লগি তোর চেনার কথা না।’
‘তুমি কোনোদিন শহরে থাকোনি?’
‘হ্যাঁ.. অনে..ক। কিন্তু আমার বাবা এক জায়গায় বেশিদিন থাকে না। আমারও এখন আর ভালো লাগে না।’
অন্তু আর কিছু বললো না। রাকিব জানেই না লগি কী জিনিস। তাই সেও চুপচাপ বসে আছে। অন্তু কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকালো। এরপর আবার দে ছুট। একটু পর হাতে একটা লম্বা বাঁশ নিয়ে হাজির। ওহ.. এই তাহলে লগি। এটা তো..। রাকিবের ভাবনা দূর করতে অন্তু বললো, ‘বৈঠা হচ্ছে পানির মধ্যে ধাক্কা দিয়ে নৌকা চালানোর লাঠি। আর লগি হচ্ছে যেটা দিয়ে একেবারে মাটির মধ্যে গুঁতো দিতে হয়। লগি দিয়ে চালালে অনেক দ্রুত যাওয়া যায়।’
রাকিবের বার বার মনে হচ্ছে বুক পকেটে রাখা কাকের ডিমটা ফুটে বাচ্চা বের হয়ে যেতে পারে। তবে ভয় নেই। অন্তু নিশ্চয়ই আবার বাচ্চাটাকে বাসায় মায়ের কাছে রেখে আসবে।
কলাগাছের ভেলাটা খালে ফেলতেই পাড় থেকে হুট করে একটা ইয়া বড় গুই সাপ সুরুৎ করে ঝোপের আড়ালে চলে গেল। অন্তুর ওসবে খেয়াল নেই। রাকিব কিছুটা ভয় পেলেও প্রকাশ করছে না। ভেলার ওপর বসতেই কলাগাছের অনেকখানি পানিতে দেবে গেল। তবে ডুবলো না। অন্তু দাঁড়িয়ে আছে। রাকিব শক্ত হয়ে দড়ি আঁকড়ে ধরে রাখলেও অন্তু অবলীলায় বাঁশ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বাঁশ দিয়ে খালের তলায় গুঁতো দিতেই চলতে শুরু করলো ভেলা।
রাকিবের চোখ বারবার খালের ওপাশের মোটা মোটা গাছের শেকড়ের দিকে যাচ্ছে। আরো একটা গুইসাপ দেখেছে। তবে ওরা খুব ভীতু টাইপের।
হুট করে রাকিবের মনে হলো সেও একটা গুইসাপ হয়ে গেছে। পানির ওপর দিকে তরতর করে হেঁটে যাচ্ছে। অন্তু বকবক করেই যাচ্ছে। কিছুই শুনছে না।
দশ মিনিট বা আধ ঘণ্টা। কতোক্ষণ ভেলায় চড়েছে বলতে পারবে না রাকিব। অন্তু তাগাদা দিতেই নড়েচড়ে বসলো।
‘পেত্নিবাগ এসে গেছে। নেমে পড়।’
রাকিবের মনে হলো সে অনেকবার এখানে এসেছে। ঐ যে দূরের ইয়া বড় একটা গাছ। রাকিব জানে এখুনি অন্তু গাছটার নাম বলবে।
‘ওটা শিলকড়ই। ওটার গোড়াতেই আসর বসতো। ভয় পাসনে এখন আর ওসব নেই।’
রাকিব হাঁটছে জঙ্গলের ভেতর। অন্তু কিছুটা পেছনে পড়ে গেছে। ভেলা থেকে নামার সময় অন্তু পকেট থেকে একটা বোতল বের করে রাকিবের পায়ে কী যেন একটা পানি ঢেলে দিয়েছে। ওটার গন্ধ পেলে নাকি সাপ টাপ পালিয়ে যাবে। তবে রাকিব এতোটুকু ভয় পাচ্ছে না। পকেটের কাকের ডিমটা ফুটে গেলে বেশ হতো। ওটাকে জঙ্গলে ছেড়ে দেয়া যেত।
মোটা গাছের শেকড়ের ফাঁকে ইয়া বড় টিকটিকি। অন্তু ওদের নাম দিয়েছে ডায়নোসরের ছানা। রাকিবের ইচ্ছে হলো ওদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে। ও জানে, ও যদি সামনের ঐ ঘন লতানো গাছগুলোর আড়ালে গিয়ে লুকায়, তাহলে গিরগিটিগুলো তাকে কিছুতেই খুঁজে পাবে না।
‘চল, তোকে গাব গাছ দেখাই। এখানে অনেক আছে। চাইলে খেতেও পারবি। আরেকটু পর পেয়ারাও পাবি।’
রাকিব এখন সত্যিকার গেমসের মধ্যে আছে। পেয়ারা হচ্ছে তার পয়েন্ট। পেত্নিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেগুলো তাকে খেতেই হবে। শিলকড়ই গাছের ইয়া মোটা কাণ্ডের ফাঁকে পাখির বাসা। নির্ঘাৎ কোনো ফাঁদ। কিন্তু অন্তুর কোনো ভয় নেই। সে দুদ্দাড় করে হেঁটে বেড়াচ্ছে। কোত্থেকে যেন দুটো ফলও নিয়ে এসেছে।
‘এই নে, এটাকে পানিফল বলে। অনেক মজা।’
রাকিব পানিফল খেতে খেতে হাঁটছে। হুট করে খুশিতে যেন লাফিয়ে উঠলো সে। বুক পকেটের কাকের ডিমটা নড়ছে। শিলকড়ই গাছের ডালেই তো ওটার বাসা। অন্তু গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে রাকিবের দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেছে।
‘দে রাকিব, কাকের ছানাটা দে। বাসায় রেখে দেই।’
রাকিব বুক পকেটে হাত দিলো। ডিমটা আরো জোরে নড়ছে। এখুনি ফুটবে বুঝি!
‘হুম.. স্বপ্নের মধ্যে আবার হাসেও দেখছি। ওঠ! স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
রাকিব চোখ পিট পিট করে তাকালো। অনেকদিন পর আবার সেই অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্নটা দেখেছে। আগে প্রায়ই এ স্বপ্নটা দেখতো। অনেক অনেক দিন আগে গ্রামে বেড়াতে গিয়ে অন্তু নামের একটা ছেলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার। প্রথমদিনেই বন্ধুত্ব। এরপর কতো যে ঘোরাঘুরি। খাল, নদী, উঁচু টিলা এবং প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে ভয়ংকর সেই পেত্নিবাগেও গিয়েছিল তারা। ছেলেটা বেশ মজার। এখন কোথায় আছে কে জানে। রাকিব আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। টেবিলের ওপর কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকালো। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভিডিও গেমসের সিডি। রাকিব মনে মনে হাসলো। স্বপ্নের সেই পেত্নিবাগ কতো বড়, আর এই মনিটরটা কত্তো ছোট…।
লেখক: ধ্রুব নীল