হরর ভৌতিক গল্প: রাজেন্দ্র সরকারের অপমৃত্যু

লেখক: ধ্রুব নীল

‘আজ রাত বারোটায় আত্মহত্যা করবো। মর্ত্যলোক ত্যাগের চূড়ান্ত ক্ষণের খুব বেশি বাকি নেই।’

‘জি জ্যাঠামশাই।’

‘ভাদুড়িকে সব বলা আছে। চব্বিশে আষাঢ়। সব ঠিকঠাক! সব! গাড়ি নিয়ে আসবে পৌনে একটায়। আমার ডেডবডি কফিনে ঢোকানোর দায়িত্ব তোমার। পরে যা করার ভাদুড়ি করবে। পারবে তো?’

‘জি জ্যাঠামশাই।’

‘বৈদ্যকে বলবে হাত লাগাতে। কফিন আটকে ভালোমতো লক করবে। ঝড়ও আসবে। ইলেকট্রিসিটি থাকবে না। যাও এখন বিদেয় হও।’

বয়স সত্তর ছুঁলেও মুগুরভাজা শরীর রাজেন্দ্র সরকারের। যমের মতো ডরায় বিজন। মা-বাপ হারা ছেলেটাকে কোলেপিঠে নয়, কেলিয়ে-পিটিয়ে বড় করেছেন। জাঁদরেল স্বভাবের কারণে নিজের সংসার হয়ে ওঠেনি। আবার বাইশ বছরের ভাইপোকে একটিবারের জন্য নিজের সন্তানও ভাবতে পারেননি। বিজনের সঙ্গে রাজেন্দ্র সরকারের সম্পর্কটা তাই প্রভু-ভৃত্যের মাঝামাঝি এক আলো-আঁধারিতে দোদুল্যমান।

রাজেন্দ্র সরকারের কণ্ঠের সঙ্গে রাজা বাজ খাঁনের মিল নেই। গলায় ভারিক্কি থাকলেও বাতাস বেরোয় খড়খড় করে। তবে, রাজা বাজের মতো চেষ্টা করেন গলাটাকে বাজখাঁই করে গুন ‍গুন করে গান ভাজতে। ভাইপোকে বকাঝকার পর হাঙ্গেরিয়ান গান গ্লুমি সানডে’র দুঃখি সুরটা ঠিকঠাক বসাতে পারছেন না। বিরক্তও হতে পারছেন না। সূক্ষ্ম অস্বস্তি লেপ্টে আছে কোথাও।

আষাঢ় মাসের চব্বিশ তারিখ সংক্রান্ত স্মৃতি বিজনের নেই। রাজেন্দ্র সরকার হয়তো এ ব্যাপারে বিজনকে আগাম কিছু বলেননি। রাজেন্দ্রর মতো অত্যাচারীর আগাম মৃত্যুর সংবাদ বিজনের জন্য নিতান্তেই সুখকর। তবে দিনক্ষণ ঠিক করে আত্মহত্যার বিষয়টা বুকে চেপে আছে অস্বস্তির চাদর হয়ে।

মিনিটখানেক পর আবার ডাক পড়লো।

‘আসছি জ্যাঠামশাই।’

“কফিন ন’টা নাগাদ আসবে। সংস্থামুক্তি ফার্নিচারস থেকে। দেখেশুনে এখানটায় রাখবে। খবরদার লেবারদের সঙ্গে হাত লাগাতে হবে না। কালিমন্দিরের রাস্তায় কাদা জমেছে। তুমি ধরতে গেলেই ফেলে দেবে। এ কাজটুকুও তোমাকে দিয়ে হবে না জানি।”

‘জি জ্যাঠামশাই।’

‘আর শোনো, খবরটা আগেভাগে বলতে যেও না কাউকে। পাড়াশুদ্ধ লোক তোমাকে সন্দেহ করবে। আমি চাই না আমার আত্মহননের কৃতিত্ব নিয়ে তুমি ফাঁসিতে চড়ে বসো।’

কয়েক দশকের পুরনো পাঁচিলঘেরা পাকা বাড়ির কংকালটা টিকে আছে বলা যায়। বাইরে থেকে সহসা চোখে পড়ে না। কংকালতুল্য বাড়িটার বিচ্ছিন্ন একটা হাড় হলো প্রবাল বৈদ্যর হেঁশেল।

প্রাচীন গাছের শুকিয়ে আসা গুঁড়ির মতো লোকটা। অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলে। কথা বলার সময় তাকে মানুষ বলে মনে হয় না। পাথর চোখের লোকটাকে দেখে জীবন্মৃত মনে হয় বিজনের। ভাবে, লোকটা মরে গেলে প্রেতাত্মা হয়ে রাতবিরেতে লোকের হেঁশেলে হানা দেবে। হাত কচলে বলবে, ‘আমি নয়াপাড়া চার্চের ফাদার টমাসের জন্যও রেঁধেছি। হ্যামবার্গার থেকে বিরিয়ানি, সব তিন আঙুলের ডগায়। চাকরিটা দিন স্যার।’

রাত বারোটায় জ্যাঠামশাই মারা গেলে প্রবাল বৈদ্য লোটাকম্বল গুটিয়ে চলে যাবে? কোথায় যাবে লোকটা?  

‘রান্না হলো? আজ তো জ্যাঠা মরবেন। ভালোমন্দ কিছু খাওয়াবে না বৈদ্য?’

‘কে? কে মরলো আবার এই বিষ্টি বাদলায়। পাটশাকের চচ্চড়ি আর শোলের ঝোল হচ্ছে। বাজারে কিছু ছিল না যে। সরকার মশাই যে কয় পয়সা দিয়েছেন তাতে আর কিছু হবে না।’

রাত আটটা। বহু সময় বাকি। এরপর কী! সেটাও নিশ্চয়ই জ্যাঠামশাই ঠিক করে রেখেছেন। পত্রপাঠ বিদায় হওয়ার লোক তিনি নন।

কেটে গেল আরও ষাটটি মিনিট। বিজন এতক্ষণ বিশেষ কিছু ভাবেনি। হেকিম মুন্সি নামের এক লেখকের হরর গল্প নিয়ে বসেছিল। অপঘাতে মরে যাওয়া তরুণীর আত্মা বারবার ফিরে আসতে চাইছে প্রেমিকের কাছে। শোকাতুর প্রেমিকের আতঙ্কে উন্মাদ হওয়ার দশা।

রাজেন্দ্র সরকারের আত্মহত্যাজনিত উত্তেজনায় বই পড়া এগোলো না। গোটা বাড়িতে সুনসান নীরবতা। তবু বিজনের মনে কান পাতলে শোনা যাবে দূরবর্তী কোণে মৃদু ঢাকের বাদ্য।

রাতের খাবার সেরে নিল খানিক আগে। জ্যাঠামশাই খাননি। মরার আগে এক বেলার খাবার বাঁচিয়ে যাবেন সম্ভবত।

প্রবাল বৈদ্য ঝোলা নিয়ে হাজির। পুরনো গাছের মতো বিজনকে এক পলক দেখে ধীর পায়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বিজনের শুধু মনে হলো জ্যাঠামশাই মরার পরও বৈদ্যর জন্য একটা কাজ রেখেছিলেন। পেছন হতে ডাকতে ইচ্ছে করলো না। আর তো কয়েক ঘণ্টা। এরপর খেলা শেষ। নরকে যাবে রাজেন্দ্র সরকার।

‘বিজন!’

‘আসছি জ্যাঠামশাই।’

একতলা বনেদি আমলের বাড়িটা বিজনের কাছে এখনও গোলকধাঁধা। কৈশোরে টাইফয়েডের পর স্মৃতিশক্তিও কমেছে। বাড়িটার অনেক স্মৃতি ভূতের মতো হানা দেয় আচমকা। স্মৃতি বলতে মূলত জ্যাঠামশাইয়ের হাতে মার খাওয়া। কমন শাস্তিটা ছিল বাড়ির পাশের বাগানের অন্ধকার কুয়োর পাড়ে এক পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকো। বিজনের ভয় ছিল কুয়োতলা থেকে এই বুঝি উঠে আসবে গাছের মোটা শেকড়ের মতো লিকলিকে দুটো হাত।

‘সতীনাথ উকিলের কাছে কাগজপত্র বুঝিয়ে দেওয়া আছে। আত্মহত্যার বিষয়টা সে জানে না।’

‘জি।’

“উত্তরের জমিটা তুমি পাচ্ছো। বাকিগুলো আমার কিছু দুঃসম্পর্কের বোনেরা পাবে। ড্রয়ারে দশ হাজার টাকা রাখা আছে। ওতে তোমার বেশ ক’মাস চলে যাবে। পরে নিজের সংস্থান করে নিও। ধর্মকর্মে যদিও আমার বিশ্বাস নেই, তবে বাড়িটা চার্চকে দিয়ে যাচ্ছি। তোমার মতো অথর্ব এটা সামলে রাখতে পারবে না। ভালো কথা, নবাবজাদারা এখনও কফিন নিয়ে আসছে না কেন!”

‘আমি কি বাজারে গিয়ে…।’

“না। তোমার কাজ আছে এখানে। দড়িটার এ মাথা ওই হুড়কোয় লাগাও। গেরো আমি দেবো। আই উইল মেক আ পারফেক্ট হ্যাংম্যান নট। প্রথমে একটা ‘এস’ বানাও, তারপর দড়ির মাথাটা ধরে নিচের সারকেলটার নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে উপর দিকে আনতে হবে..। তোমার শুনে কাজ নেই। ইউ ডোন্ট হ্যাভ দ্য গাটস ফর ইট। বৈদ্যকে চা বানাতে বলো।”

বৈদ্যর বিদায় প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল বিজন। পাছে আবার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন রাজেন্দ্র। বিজন নিজেই চা বানাতে ছুটল। রাত সাড়ে নয়টা। চা বানানো যাবে সময় নিয়ে।

পৌনে এগারটায় এলো সংস্থামুক্তি ফার্নিচারসের কফিন। তিন মিস্ত্রি হাঁচড়েপাঁচড়ে প্লাস্টিকে মোড়ানো ঝাঁ চকচকে কেরোসিন কাঠের ভারী কফিনখানা রাখল রাজেন্দ্র সরকারের শয়নকক্ষে। সটান দাঁড়িয়ে থাকা ছয় ফুটের পেটা শরীর আর পুরনো ওক কাঠের মতো রাজেন্দ্রর মুখখানা দেখে ‘কে মারা গেল’ ‘দেহ কোথায়’ জানতে চায়নি কেউ।

দড়ি ঝোলানো হলো। দড়ি ছুঁয়েই বিজন বুঝেছে যেন তেন শণ নয়। বিদেশ থেকে আনা তুলতুলে দড়ি। পিচ্ছিল। দড়িরও যেন প্রাণ আছে। কারও গলা চেপে ধরতে যেন নিশপিশ করছে। দমবন্ধ ভাবটা কাটাতে বিজন বলেই ফেলল—

‘কত নিল জ্যাঠামশাই।’

‘জে থার্টিফোর সুতো। মোটা সুতার ওপর তুলার প্যাঁচ। মোম ঘষা দড়ি। ম্যানিলা রোপ কোয়ালিটি। দাম শুনে কাজ নেই। তোমার তো ইহজীবনে এর প্রয়োজন হবে না। ভালো কথা, বডি কফিনে ঢোকানোর পর দড়িটা পুড়িয়ে ফেলবে।’

‘মোম লাগানো হয় কেন জ্যাঠামশাই? দড়ি জ্বালানোর জন্য?’

‘গাধার মতো কথা! যা যা বলেছি সব মনে আছে?’

‘জি আছে জ্যাঠামশাই।’

‘বৈদ্যকে ডাক দেবে আগে! বডি তুমি একা তুলতে পারবে? দুটো কুমড়োই তো একসঙ্গে তুলতে পারো না।’

‘জি। বৈদ্য তো বাইরে গেল। আসবে পরে। ড্রয়ার থেকে দুইশ টাকা দিয়ে দেব তাকে। ভাদুড়ি আংকেল এসে নিয়ে যাবেন…।’

‘পুলিশি ঝামেলা হলে সে সামলাবে। তবে কঠিনভাবে বলা আছে কোনো পোস্টমর্টেম হবে না।’

বিজন মুখ ফসকে বলেই দিচ্ছিল, মরেই যখন যাবেন, তখন পোস্টমর্টেম হলেই বা কি।

বিজনের মনে হলো ব্রোঞ্জে মোড়ানো অতিকায় দেয়ালঘড়িটাও জানে কী ঘটতে চলেছে। সিলিংয়ের আংটায় ঝুলছে দড়ি। কয়েকবার টেনে গেরোটা পরীক্ষা করেছেন রাজেন্দ্র সরকার। ফাঁসির আসামিদের মতো বালির বস্তা দিয়ে পরীক্ষা করতে পারলে স্বস্তি পেতেন। সেটা সম্ভব হলো না। বারোটা বাজল বলে।

বিজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে? পরে ফেঁসে যাবে না তো?

‘মিনিমাম পনের মিনিট। দশ মিনিটেই কাজ হয়ে যাওয়ার কথা।’

‘জি জ্যাঠামশাই?’

‘পনের মিনিট! এর পর আমার দেহখানা নামাবে! তার আগে না।’

‘মরতে এতক্ষণ লাগে বুঝি।’

রাজেন্দ্র সরকারের অগ্নিদৃষ্টি দেখে সরে গেল বিজন। মরার আগে মানুষের মাথায় কী না কী ঘোরে আবার।

মগজে দুটো সংকেতই কড়া। দৃশ্যটা দেখব, দৃশ্যটা দেখব না। শেষে দুই পক্ষের রফা হলো। জ্যাঠামশাই ঝুলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উঁকি দিয়ে দেখবে। দশ মিনিট তাকিয়ে থাকবে ঘড়ির দিকে। এরপর দেহখানা নামাবে। কাঠের পুরনো একটা মই রাখা আছে। তাতে চড়ে দড়ি কেটে দিলেই নিচে রাখা তক্তপোষে পড়বে নিথর দেহ। তারপর সেটাকে কফিনে ভরো।

‘বিজন!’

চমকে উঠল বিজন।

‘জি জ্যাঠামশাই।’

রাজেন্দ্র তার লম্বা চেয়ারখানায় সওয়ার হয়েছেন। গলায় দড়িটা এখনও ঢোকাননি। বিজন কি তার পায়ে দড়ি বাঁধবে? ফাঁসির আসামিদের বাঁধতে হয় জানে। জ্যাঠামশাই তো আসামি নন।

ঘড়ির কাঁটা গুলিয়ে ফেলছে বিজন। সম্ভবত এগারোটা ঊনষাট বেজে গেছে। নিঃশব্দে বাজতে শুরু করেছে জীবনের শেষ সেকেন্ডগুলো।

‘তুমি চলে যাও। চলে যাও। আমি চললুম। অনন্ত অসীমে চললুম।’

মানে বুঝলো না বিজন। আর মিনিট দশেক। এরপর সব শেষ। এরপর জ্যাঠামশাইকে ভয় পেতে বয়েই গেল তার।

প্রথম মিনিট নিজেই শ্বাস আটকে রেখেছিল। পরে ভাবল, এভাবে থাকা যায় না। দম নিয়ে তাকাল।

ছায়াটা দুলছে। ঝাঁকি খাচ্ছে লৌহকঠিন পা জোড়া। আচমকা বজ্রপাত। ঝড় শুরু। জানালার ফাঁক গলে আসা বাতাসের ধাক্কায় ঘুরে গেল রাজেন্দ্র সরকারের দশাসই দেহখানা। বিদ্যুৎ চমকের আলো রাজেন্দ্রর মুখে পড়তেই কলজে কেঁপে উঠল বিজনের।

‘ওহ! কী ভয়ানক!’ চোখ সরাতে পারছে না বিজন। সরাসরি বিজনের চোখে চোখ পড়ল রাজেন্দ্রর। আত্মারাম বুকের খাঁচা ছেড়ে আসার যোগাড় এবার। এমন বীভৎস দৃশ্য কল্পনাও করেনি সে। চোখদুটো কোটরছাড়া। গালের কাছে মাংস জমাট বেঁধে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। জিভ বেরিয়েছে আধহাত। টকটকে লাল মুখ ফেটে এই বুঝি রক্তধারা ছুটে আসলো! বাতাসের জন্য কাতর ঠোঁটজোড়া কি কিছু বলতে চাইছে?

হাত নাড়াতে পারছেন না রাজেন্দ্র। চোখেমুখে উপচে পড়া আর্তনাদ। চোখ ফেরাতে গিয়েও পারল না বিজন। পা দুটো পাহাড়ের মতো ভারী। জ্যাঠামশাই কি চোখের ইশারায় বাঁচানোর আদেশ দিচ্ছেন? যে আদেশ বিজনকে মানতেই হবে। মানতেই হবে?

ভেজা বাতাসের মতো ভীতির ঝাপটাও বিঁধছে বিজনের বুকে। ভয় আর অস্বস্তিতে ফের তাকাল প্রাগৈতিহাসিক দেয়ালঘড়িটার দিকে। জ্যাঠামশাই কত মিনিটের কথা বলেছিলেন? ঘড়ির কাঁটার হিসাব নিকাশ সব গুলিয়ে ফেলল বিজন।

স্থির হলো রাজেন্দ্র সরকারের দেহ। দড়ির মতো ঘড়িও আটকে গেল। মাথায় বাজছে জ্যাঠামশাইয়ের নির্দেশ। ধারালো চাকু তৈরি আছে। কাটতে হবে দড়ি। দ্রুত কাটতে হবে। তা না হলে মহা অনর্থ ঘটবে যেন।

দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা মই বেয়ে উঠতে গিয়ে ফের থমকে গেল বিজন। বাতাসে জ্যাঠামশাইয়ের দেহখানা ঘুরে ফের তারা মুখোমুখি। এবার একদম কাছে। চোখ দুটো লাভার মতো গনগনে। পলকহীন চেয়ে আছে বিজনের দিকে।

সমস্ত সাহস এক করে দেহখানা ঘুরিয়ে দিল বিজন। এখনও উত্তাপ বেশ। জলদি করতে হবে! জলদি! জ্যাঠামশাই যেন নিরবেই নির্দেশ দিয়ে চলেছেন হড়বড় করে।

ঝাড়া কয়েক মগ পানি ঢালার পর বিজনের মনে হলো কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলে অনর্থ ঘটে যাবে। অথবা সেটা হয়তো এরইমধ্যে এসে পড়েছে। টেলিফোন কাজ করছে না। এমন ঝড়ে ভাদুড়ি আংকেল আসবেন তো?

বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির প্রাবল্য বেড়েছে। এতক্ষণে মন্দিরের খাল উপচে পড়েছে নির্ঘাৎ। টর্চ হাতে গেলে দেখা যাবে উঠোনে খাবি খাচ্ছে কৈ মাছ। দম আটকে ছটফট করেই যাচ্ছে ওরা। দম! মনে পড়ে গেল রাজেন্দ্র সরকারের কথা। ওটা কি আর রাজেন্দ্র সরকার আছে? নাকি স্রেফ দমহীন শব?

বিজন সটান দাঁড়াল। মাথা এমনভাবে ঝেড়ে মুছলো যেন আট-দশটা আষাঢ়ের মতো আজও বৈদ্য খিচুড়ি খেতে ডাকবে। বৈদ্য নেই জেনে বুকটা মোচড় দিয়ে ‍উঠল। গোটা বাড়িতে সে আর রাজেন্দ্র সরকারের হাঁকডাকহীন শবদেহখানা। বারবার মনে হলো জ্যাঠামশাই চলে গেলেও তার আদেশগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়ির এ গলি থেকে ও গলি।

‘বিজন!’

‘আসছি জ্যাঠাবশাই।’

নাহ, বিজনকে কেউ ডাকেনি। ব্যাপারটা কল্পনা করলো বিজন। ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলো। আর এমন ভীতকর ডাক শুনতে হবে না। কখনও না।

জানালার কপাট বাড়ি খেল। বাতাস বেড়েছে। বিজন টের পেল ভয়খানা চুপিসারে মোটা চাদরের মতো চেপে বসছে ঘাড়ে।

মরে গেছে রাজেন্দ্র সরকার। মৃত রাজেন্দ্র যেন জীবিতর চেয়েও বড় আতঙ্ক। এখনও বিস্ফারিত চোখে বিজনকে নিরবে বলে যাচ্ছে, ‘হারামজাদা! লাশটা এখনও কফিনে ভরিসনি! তোকে আজ…।’

বিজনের ইচ্ছে হলো না ওই কুৎসিত চেহারাটা দেখতে। এই ঝড়ের রাতে কাউকে পাওয়া যাবে না। হাত লাগাতেই হবে।

পঁচিশ মিনিট কি এক ঘণ্টা পেরোলো। সময়জ্ঞান নেই বিজনের। অমানুসিক খেটে দেহটাকে তুলল কফিনে।

রাজেন্দ্রর মুখটা পড়েছে নিচে। ‘পড়ুকগে। মরাই তো। উপুড় হলেই বা কী যায় আসে।’

দামি আচকানটা খুলে রাখতে পারলে ভালো হতো। কফিন থেকে দেহটা ফের নামানোর ইচ্ছে হলো না। ডালা লাগিয়ে আটকে দিল তালা। পাশে ছুড়ে ফেলল চাবি। এ চাবির কি আর দরকার হবে?

দেহ কফিনবন্দি হতেই বিজনের চোখে নেমে এলো রাজ্যের ক্লান্তি। কপাট খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁটে মেঝে ভিজে গেছে। তাতেই চাদর পেঁচিয়ে শুয়ে পড়ল। ভয়ানক বীভৎস দৃশ্যটা মুছে ফেলতেই যেন চোখ দুটো নিজের গরজে বুঁজে এলো।

‘বিজন। বিজন।’

‘জি জ্যাঠামশাই।’

‘শেষকৃত্য করবি না?’

‘কীভাবে করবো জ্যাঠামশাই? ভাদুড়ি আংকেল আসেনি তো।’

ওপাশে নিরবতা। খানিক পর খসখস শব্দ। কফিনের ছোট জায়গায় রাজেন্দ্র সরকারের আচকান ঘষা খাচ্ছে। বাজখাঁই গলাটা উধাও। ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে কথা বলতে গিয়ে যেন সমস্ত বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে।

‘আমাকে বের কর। অন্ধকার।’

‘আপনি তো মরে গেছেন। দশ মিনিট ঝুলতে দেখেছি। তারপর দড়ি কেটে নামিয়েছি।’

নিরবতার পর ফের হিসহিস।

‘বের কর! বিহহহজন।’

‘জি জ্যাঠামশাই করছি। চাবিটা কোথায়.. হ্যাঁ ওই তো।’

বিজনে শরীর দুলছে। ভারসাম্য হারালেও পড়ে গেল না। বাইরে রাত কাঁপিয়ে ডেকে উঠল নিমপ্যাঁচা। নিম! নিম!

নিম প্যাঁচা ডাকছে মানে কাউকে না কাউকে মরতেই হবে? রাজেন্দ্র সরকারকে নিয়ে যায়নি নিমপাখি? ভাবছে আর চাবি খুঁজছে বিজন। পাচ্ছে না।

কফিনের ভেতর আচকানটা ঘষা খাচ্ছে খুব। জানালার কপাটেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে চলেছে। অপ্রকৃতস্থের মতো খটাস খটাস প্রতিবাদ জানাচ্ছে ওটা। নাকি বিজনকে সাবধান করতে চাইছে, খুলবে না কিন্তু! শন শন বাতাসটাও পরিষ্কার বলল, কফিনের ডালা একবার লাগালে তা আর খুলতে নেই বোকা!

ওই তো চাবি! হাত একটুও কাঁপছে না বিজনের। ঘোলাটে চোখে এবার হাতড়ে নিল কফিনের তালা। চাবিটাও যেন তৈরি ছিল। প্রথম চেষ্টাতেই ঢুকে গেল। মোচড় দিতেই মাধ্যাকর্ষণকে তুচ্ছ করে উঠে এলো ডালা।

‘উফফ! কী ভয়ানক!’ পিছু না হটে বরং সামনে ঝুঁকলো বিজন।

রাজেন্দ্রর ফোলা অক্ষিগোলক ঝুলে পড়েছে। বিস্ফারিত চেয়ে আছে বিজনের দিকে। ঠোঁট-মুখ নীলচে। গলায় কালশিটে। শবটাকে উল্টো করে রেখেছিল। সোজা হলো কী করে? মুহূর্তে খপ করে বিজনের গলা চেপে ধরল রাজেন্দ্র সরকারের দুই হাত।

ধড়ফড় করে উঠল বিজন। ধাতস্থ হতে সময় নিল। জানালাটাও শান্ত।

ঘড়িতে রাত দুটো। সারা রাত পড়ে আছে। সারা রাত কীসের জন্য পড়ে আছে? এমন দমকা হাওয়ায় গভীর রাতে কোথায় যাবে বিজন।

উঠে গিয়ে জানালা লাগাবে, তার আগেই মেঝেতে আসবাব ঘষা খাওয়ার শব্দ। নড়ে উঠল কফিনটা। স্বপ্ন নয় নিশ্চিত। চেতনে বা অবচেতনেই কফিনের ডালায় হাত রাখলো বিজন। লাশের মতোই শীতল ওটা। সাহস সঞ্চয় করে অসাধ্য সাধন করেই ফেলল। কান পাতল কফিনের ডালায়। ঝটকা মেরে সরে এলো। মৃদু ঘরঘর শব্দটা কান ফুঁড়ে সোজা বুকে গিয়ে বিঁধল। সেই ফ্যাসফ্যাসে গলাটাই শুনতে পেল আবার।

‘বিহহ জ..ন। বের কর।’

‘মরে যাননি জ্যাঠামশাই? আপনি মরে যাননি?’

মনে হলো গোঙ্গানির শব্দটা আসছে বহু দূর থেকে।

‘বিহহজন।’

‘আমি নিজ হাতে দড়ি কেটে নামালাম। দশ মিনিট..।’

মুহূর্তে অলীক আতঙ্ক অস্থির হয়ে পড়ল বিজন। মনে পড়ল জ্যাঠামশাই পনের মিনিটের কথা বলেছিলেন। তবে কি..।

‘আহহমি আবার ফাঁস নিব। দম যায়নি। আমার দম যায়নি!’

কথাগুলো গলা থেকে বের না হতেই বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে বারবার।

‘আবার ফাঁসসস নিতে হবেহহ!’

কফিনের চাবিটা সামনেই। ওটা আঁকড়ে ধরল বিজন।

‘বিজন! বিজন!’

গলার স্বর রাজেন্দ্রর মতো নয়। কিছুতেই নয়। ওটা কিছুতেই জ্যাঠামশাই হতে পারে না। মনে মনে বেশ ক’বার নিজেকে বলার পর বিজন ঘুরে দাঁড়াল।

নড়ে চড়ে উঠল কফিন। ডালায় নখের আঁচড়ের তীক্ষ্ম শব্দ। ডালা ভেঙে বেরিয়ে আসবে রাজেন্দ্র সরকার?

বিজনের মনে হলো সে অনন্তকাল হাঁটছে। অথচ রুম থেকে বের হতে পারছে না। কফিনটা সরে আসল আরও খানিকটা।

‘বিজ-ন!’

যেন অদেখা কোনো ভুবন হতে শোনা গেল রাজেন্দ্র সরকারের বাজখাঁই গলা। যে গলা মন্ত্রের মতো ভর করে বিজনের ওপর। নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই এগিয়ে গেল বিজনের পা জোড়া। চাবি হাতে ধীরেসুস্থে খুলল তালা। কফিনের ডালা মেলে ধরতেই দপ করে নেমে এলো নিরবতা। আগের সেই ঝুলে পড়া রক্তিম কোটরছাড়া চোখ দুটো স্থির চেয়ে আছে। একদম নড়ছে না। মুখ হাঁ হয়ে আছে।

বিজন জেনে গেল, কফিনের ডালা বন্ধ করলেই জেগে উঠবেন রাজেন্দ্র সরকার! নখের আঁচড়ে কাঠ চিরে চিরে বের হতে চাইবে আবার। বীভৎস শব্দটা থেকে মুক্তি নেই বিজনের।

ঘড়ির কাঁটাগুলো কি ঠিকপথে ঘুরছে? আরও দশ মিনিট অপেক্ষা করবে কি?

‘বিহহজন! বিজন!’

কফিনের পাশে হাঁটুমুড়ে বসল বিজন। কফিন যথারীতি নড়ছে, কাঁপছে। একটু আধটু ঝাঁকিও খেল।

‘জি জ্যাঠামশাই।’

‘আমার দম যায়নি! বের কর।’

‘আপনি মারা গেছেন জ্যাঠামশাই।’

‘না!’

কফিনে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে প্রতিবাদ জানাল রাজেন্দ্র সরকার। শুরু হলো আঁচড়ের তাণ্ডব। কাঠ আর নখের সংঘর্ষ কানে বাধছে ভীষণ। কান চেপে ধরার শক্তিটুকুও পাচ্ছে না বিজন।

‘বিহহজন। বের কর! বের কর! আমি বলছি!’

আবার সেই কড়া আদেশের সুর! রাজেন্দ্র জীবিত থাকতে বিজন অবজ্ঞা করতে পারেনি যে ডাক।

‘বিজন! আমাকে বের কর!’

‘জি জ্যাঠামশাই করছি।’

ভারী শোনাল রাজেন্দ্র সরকারের গলা।

‘অপদার্থ! পনের মিনিট বলেছিলাম! দশ মিনিটের মাথায় নামিয়েছিস দেহটা! আমাকে আবার ঝুলতে হবে। আমার দম আটকে আছে গর্ধভ!’

বিজন মাথা চেপে ধরল। আচ্ছা করে চুল টানলো।

‘সব শোনার ভুল। চোখের ভুল।’ বিড়বিড় করে আওড়ে গেল। লাভ হলো না। কফিনের ভেতর কালবৈশাখী ভর করেছে। প্রবল ঝাঁকুনিতে পাকা মেঝেতেও চিড় ধরবে নির্ঘাৎ।

চাবিটা মোচড় দিতে যাবে, অমনি কাঁধে একটা শুকনো খড়খড়ে হাত। আতঙ্কে জমে গেল বিজন।  কানের কাছে গরম শ্বাস।

‘একদম না বিজন বাবু! একদম না!’

‘ওহ! ওহ! বৈদ্য! বাঁচাও আমাকে! জ্যাঠামশাই! জ্যাঠামশাই মরেনি।’

‘না না। বাবু। দেখি চাবিটা দাও দিকিন। এই যে। রাখলুম আমার কাছে। ওরা এমন করে বুঝলে?’

‘কারা! বৈদ্য কারা!’

জবাব মিলল না প্রাগৈতিহাসিক লোকটার কাছ থেকে। কখন এলো বৈদ্য? নাকি সে যায়নি বাড়ি ছেড়ে? সেও কি চোখের ভুল? গাছের মতো দেখতে লোকটা ঠায় কফিনের দিকে চেয়ে আছে।

কফিনবন্দি একটা কিছু বেরিয়ে আসার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।

‘ভয় পেয়ো না। আমরা চাইলেই সে বের হতে পারবে বিজন বাবু। তার আগে নয়।’

‘কে বৈদ্য?’

‘ওটা।’

‘জ্যাঠামশাই?’

‘না।’

আবার কফিন থেকে শোনা গেল ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলাটা। যে গলাটা নিজেকে রাজেন্দ্র সরকার প্রমাণ করতে চাইছে বারবার।

‘বৈদ্য! ডালাটা খুলে দে! খোল বলছি! নইলে তোদের নির্বংশ করে ছাড়ব!’

কান চেপে ধরল বিজন। তবু শুনতে পেল বৈদ্য বলছে।

‘চুপচাপ শুয়ে থাক। তোর মুক্তি নেই। মুক্তি নেই। তুই ঘুমা।’

‘বৈদ্য..।’

এবার আর রাজেন্দ্রর কণ্ঠ শোনা গেল না। বহুদূর থেকে ভেসে আসা জমাট বাঁধা বাতাসের মতো গলা।

আচমকা উঠে দাঁড়াল বৈদ্য। ড্রয়ার খুলে কী যেন নিল। সম্ভবত টাকা। গুনে দেখল না। ঘুরে দাঁড়াল। যথারীতি বিজনের দিকে না তাকিয়েই বলল—

‘নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমাও বিজন বাবু। অনেক উল্টোপাল্টা শুনবে। খবরদার কফিনের ডালা খুলবে না। আমি চললুম।’

ফ্যালফ্যাল করে বৈদ্যর চলে যাওয়া দেখল বিজন। এত রাতে লোকটা কোথায় যাবে সেটাও ভাবল না একবার।

রাত তিনটা। পেছনের কুয়োতলার বাগান থেকে ভেসে ভেসে আসছে বিষণ্ন খাটাসের ডাক। নিমপ্যাঁচা থেমেছে। কফিনটা মাঝে কিছুক্ষণ নড়াচড়া করেনি।

এখন আবার নড়ছে। ধীরলয়ে। বৈদ্যর কথামতো নিজের রুমে গিয়েছিল বিজন। ঘুমুতে পারেনি। চোখ বুঁজলেই কোটরছাড়া একজোড়া চোখ বারবার হানা দিচ্ছিল মুখের সামনে।

‘চোখ বোঁজা যাবে না কিছুতেই। জেগে থাকা চাই। চোখ বুঁজলেই গভীর খাদ। মরণকুয়োর খাদ।’ নিজেকে বোঝাল বিজন।

‘বিজন! দড়ি তৈরি কর। মনে আছে গেরোটা? হ্যাংম্যান নট। আবার ফাঁস নিতে হবে যে আমাকে।’

‘আপনি মরে গেছেন জ্যাঠামশাই। বিশ্বাস করুন। আমি নাড়ি দেখেছি।’

‘তুমি চাও আমি মরে যাই। তুমি চাও আমি মরে যাই?’

আগের চেয়ে আরও গোছালো ও পরিষ্কার কণ্ঠে কথাগুলো আসছে কফিনের ভেতর থেকে। তবে এলোমেলো ভাবখানা যায়নি। কিছু শব্দ এখনো হাওয়ার ভর করে আছে।

বিজন দোটানায়। জ্যাঠামশাই সত্যিই আবার ঝুলবেন? দড়ি তৈরি করবে বিজন?

‘বিজন! আমি তোর ধর্মপিতা। আমার কথা মানতেই হবে।’

‘জি জ্যাঠামশাই।’

‘বিজন কুয়োর পাশে গিয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাক! যাহ! হা! হাহ! হাহ!’

‘না জ্যাঠামশাই। আমায় ক্ষমা করুন! আমায় ক্ষমা করুন!’

‘হাহাহাহহহ। হাহ। আমার কথা না শুনলে মরবি বিহহহজন। যাহ! যাহ! খোল! খোল! মুক্ত কর আমাকে! আহহহ।’

‘পারবো না জ্যাঠামশাই!’

‘বিজন! মারবো চড়! লাঠিটা দেখেছিস? এই নে! এদিকে আয়! আয় বলছি! সন্ধ্যা সাতটায় বাড়ি ফেরার কথা! এখন বোঝাচ্ছি তোকে!’

রাজেন্দ্র সরকারের খুলির ভেতর থেকে কেউ যেন খুবলে খুবলে নিচ্ছে পুরনো স্মৃতিগুলো।

‘মারবেন না জ্যাঠামশাই! আমায় ক্ষমা করুন!’

বাইশ বছরের বিজন এমন করে কেঁদে উঠল, যেন এইমাত্র তাকে রাত করে বাড়ি ফেরার জন্য কান মুচড়ে ছিটকে ফেলে দিলেন রাজেন্দ্র, ঠিক যেমন মারধর করতেন বছর দশেক আগে।

‘যাবি! নাকি কুয়োতলায়..।’

‘ওহ! না! না! জ্যাঠামশাই! খুলে দিচ্ছি! আমি এখুনি খুলে দিচ্ছি! চাবি! চাবি কোথায়! বৈদ্য নিয়ে গেছে! এখন কী করবো জ্যাঠামশাই!’

‘আমায় বের ক….র! খো..হহ.. ল। বিহহহহজন! নো ডিনার ফর ইউ! নিলডাউন! নিলডাউন!’

‘না জ্যাঠামশাই! কফিনের ডালা ভাঙবো। আপনাকে বের করব জ্যাঠামশাই। আমায় শাস্তি দেবেন না!’

ঘোরগ্রস্ত বিজন ছুটে গেল বাড়ির পেছনে সমাধির মতো দাঁড়িয়ে থাকা বৈদ্যর হেঁশেলে। হামানদিস্তায় চোখ গেল সবার আগে। দুহাতে আঁকড়ে ফের ছুট লাগাল।

ঘোর লাগানো স্যাঁতস্যাঁতে ভয়ের গন্ধ ছড়ানো রুমটার ভেতর ঢুকতেই হিম হয়ে গেল বিজন। কফিনের ডালা চিরে গেছে বেশ খানিকটা। হাড় জিরজিরে লম্বা আঙুলটা থেকে খসে গেছে মাংস। তেঁতুল কাঠে ঘষা খাচ্ছে হাড়খানা। খসে পড়ছে কাঠের টুকরো।

এবার কি তবে নারকীয় শাস্তি পেতে চলেছে বিজন! ওই যে চাবি। কফিনের পাশেই তো। বৈদ্য ফেলে গেছে? নাকি সে আসেইনি?

কফিনের পাশে হাঁটু মুড়ে বসল বিজন। মাথা নুইয়ে রেখেছে। রক্তচোখা বীভৎস চেহারাটা এড়াতে চায়। হামানদিস্তা মেঝেতে রেখে হাতে নিল কফিনের চাবি।

‘খুলছি জ্যাঠামশাই! আমায় শাস্তি দেবেন না!’

থামল আঙুলটা। ধীরে ধীরে নেমে গেল কফিনের অন্ধকূপে।

কাঁপা হাতে ডালাটা তুলল বিজন। থলথলে গালের সঙ্গে লেপ্টে থাকা অক্ষিগোলক দুটো সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। নড়ে উঠল গালের পেশি। চেহারাটা আর রাজেন্দ্রর নেই। নেই হামবড়াই ভাবটাও। আছে শুধু বীভৎসতা। চওড়া ঠোঁটে কদর্য কুৎসিত হাসি। ঠোঁট নড়ছে না, তবু পরিষ্কার শুনতে পেল বিজন।

‘বিজন। যা! যাহ! কুয়োতলায় যা। তোকে ডাকছে ওরা। যাহ!’

‘না! জ্যাঠামশাই না!’

পিছু হটতেই হামানদিস্তা হাতের সঙ্গে লেগে পড়ে গেল। শীতল লোহার টুকরো আঁকড়ে ধরলো বিজন।

রাজেন্দ্র সরকারের খড়খড়ে হাতদুটো কফিনের দুপাশ ধরে ওঠার চেষ্টা করল। দেহটা সোজা হয়ে বসলেও মাথাটা ভীষণরকম হেলে রইল পেছনে। বিজনের মনে পড়ল ফাঁস নেওয়ার সময়ই ঘাড় মটকে গিয়েছিল। কিছুতেই ওটা জীবন্ত কিছু হতে পারে না।

‘বিহহজন! কুয়োর ভেতর আয়। আমি তোর জ্যাঠামশাই! এ আদেশ তোকে মানতেই হবে!’

গগনবিদারি চিৎকার দিল বিজন। চুল আঁকড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে গিয়ে বুঝল গলা দিয়ে একচুল শব্দও বের হচ্ছে না।

কফিন ছেড়ে আসা অক্ষিগোলক দুটো যেন চোখের ইশারাতেই বিজনকে নিয়ে যাবে কুয়োতলায়।

থপ!

প্রথম আঘাতেই থেঁতলে গিয়ে হামানদিস্তা খানিকটা দেবে গেল জীবন্ত শবদেহের মাথায়।

থপ থপ!

পরপর দুটো আঘাতে ছিটকে গেল চোখজোড়া। নড়তে থাকা দেহটা নির্বিকার। জেদ চেপে গেল বিজনের। মরণ জেদ! অন্ধের মতো কফিনের ভেতর হাত চালাল ভয়ার্ত যুবক। দুই হাতে চেপে ধরা হামানদিস্তায় কফিনের সঙ্গেই মিশিয়ে দিতে লাগল রাজেন্দ্রর দেহখানা।

খড়খড়ে হাত দুটো কিছু একটা আঁকড়ে ধরার শেষ চেষ্টা চালালো। নড়ে উঠল মরা মুখটার পেশিও। বিজনের মনে পড়ল, এভাবে শবদেহের পেশি নড়তে আগেও দেখেছে। গোঙ্গানির মতো শব্দটা কানের ভেতর লাভার মতো ফুটলো যেন। কণ্ঠনালী বরাবর বসিয়ে দিল আরও গোটাকতক ঘা। এরপর আর কোনো আদেশ ভেসে এলো না কফিনের ভেতর থেকে। রাজেন্দ্র সরকারের গলা চিরতরে স্তব্ধ হলো অবশেষে।

[লেখক সম্মানি বিকাশে পাঠাতে: 01976-324725]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *