ধ্রুব নীলের সায়েন্স
ফটিক দৌড়াচ্ছে। মাঠ ঘাট খাল বিল পেরিয়ে দৌড়েই যাচ্ছে। পেছনে কুকুর তাড়া করলে যেভাবে দৌড়ায় সেভাবে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বেঁচে থাকলে লিখতেন, ফটিক ছুটেছে ফটিক, তাই ঝুম ঝুম ঘণ্টা বাজছে… যাই হোক, ফটিক যাচ্ছে তার বন্ধু পল্টুর কাছে। পল্টুর বাসা ফুলতলা গ্রামের একেবারে শেষ সীমায়। দৌড়ে না গেলে বেলা পড়ে যাবে।
উঠোনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ জিভ বের করে হাঁফিয়ে নিল ফটিক। পল্টু দুপুরে ঘুমায়। লম্বা করে হাই তুলে বলল, পাগলা কুকুর তাড়া করেছে?
ফটিক সূচনা ভূমিকায় না গিয়ে সোজা বর্ণনায় গেল।
‘মহাবিপদ হয়ে গেছে। মানে, বিশাল একটা ব্যাপার। ছেলিম মামা একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে।’
‘কী জিনিস রে! খাওয়া যায়? স্বাদ কেমন? মিষ্টি নিশ্চয়ই? সঙ্গে আছে?’
‘আরে নারে! ছেলিম মামা অংক টংক করে বের করেছে, আমাদের এই গ্রাম আর আমরা সবাই একটা গল্পের ভেতর আছি। কাগজে ছাপা হওয়া গল্প। বুঝতে পারলি!’
‘অ্যাঁ, বলছিস কী! আমি তুই গল্পের ভেতর? মানে ওই যে বইতে যে পড়ি, ঠাকুরমার ঝুলি, ফেলুদা, ওই রকম?’
‘ঠিক ধরেছিস। আমি তুই ছেলিম মামা, আমরা সবাই হলাম গল্পের চরিত্র।’
‘তা গল্পের কাহিনীটা কী?’
‘আরে বোকা, আমরাই তো কাহিনী। এই আমি তুই স্কুলে যাই, স্কুল ফাঁকি দিয়ে মতিনদের গাব গাছ থেকে গাব পাড়ি, ঝর্নাদের ডাব গাছে চুরি করে ডাব পাড়ি, সবই হলো কাহিনী। ছেলিম মামা নিজেও খুব হতাশ। গল্পের ভেতর বসে থাকাটা তো কাজের কথা না।’
পল্টু মাথা চুলকে বলল, ‘কিন্তু কই, আমার তো তেমন কিছু মনে হচ্ছে না।’
ফটিক বলল, ‘প্রথমে তো আমারও বিশ্বাস হয়নি। ছেলিম মামা একেবারে প্রমাণ করে দিয়েছে রে। এই যেমন তুই এখন জোরে জোরে বল, লেখক স্যার, আপনি আমার ড্রয়ারে একটা চকলেট রেখে দেন।’
চকলেটের কথা শুনে পল্টুর চোখ চকচক করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে বলল, ‘লেখক মামা, আমার ড্রয়ারে একটা চকলেট রেখে দেন। না না একটা না দুইটা চকলেট। ক্যাডবেরি হলে ভাল হয়।’
ফটিক বলল, ‘এবার গিয়ে দেখ ড্রয়ারে।’
পল্টু এক দৌড়ে তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ার খুলল। খুলেই চমকে উঠলো। একটি নয় দুটি নয়, তিনটি বড় বড় চকোলেট। ভাবল, একটা তাহলে ফটিককে দেয়া যায়।
চকোলেট খেতে খেতে দুই বন্ধু হাঁটতে লাগলো। ফুটবল মাঠে যেতেই দেখে ছেলিম মামা মাঠের ঠিক মাঝখানে বসে আছেন। মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল। কথিত আছে, একদা এই চুলের ঝোপে দুইটা চড়ুই পাখি থাকতো। ফটিক আর পল্টুকে দেখে মামা হাসলেন। তবে হাসিটা স্বাভাবিক নয়। পাগলের মতো। দুজনকে বললেন, ‘যাক তোদের তাহলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিল।’
‘কে পাঠিয়ে দিল মামা?’
‘কে আর, ওই হতচ্ছাড়া লেখক। যে এখন আমাদের নিয়ে গল্প লিখছে।’
পল্টু মুখে চকোলেট নিয়ে বলল, ‘ভালো তো, গল্পের ভেতর থাকা ভাল। কারণ ছাড়াই চকোলেট পাওয়া যায়।’
ছেলিম মামার ভ্রƒ কুঁচকে গেল। ‘বলিস কি, লেখককে বললি আর অমনি চকোলেট দিয়ে দিল! এতো ভারি দুষ্টু লেখক।’
‘আরে না মামা, খুউব ভাল খুউভ ভাল। গপ গপ গপ।’
ফটিক পকেটে হাত ঢুকিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ‘আচ্ছা মামা, আমাদের এই চারপাশের গাছপালা নদনদী এসব তাহলে ওই লেখকের কল্পনা?’
‘হ্যাঁ রে, সবই কল্পনা। কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা হচ্ছে। আমরা যেহেতু একটা গল্প, সেহেতু একসময় এটা শেষ হয়ে যাবে। মানে বুঝলি না? মানে গল্পের তো একটা শেষ আছে। লেখকরা তো আর আজীবন বসে বসে লেখে না। এই গল্প শেষ তো আমরাও শেষ। ভ্যানিস! বুঝলি ধুম করে গায়েব!’
কথাটা শুনে চকোলেট গলায় আটকে যাওয়ার দশা পল্টুর। তবে আটকায়নি। আলগোছে নেমে গেল গলা দিয়ে। অনেকটা পিঠ বেয়ে শীতল স্রোত নামে যেভাবে। ‘তাহলে মামা উপায়! গল্প শেষ হয়ে গেলে আমি চকোলেট পাব কই! মহাবিপদ!’
ছেলিম মামা উত্তর দিলেন না। গভীর মনোযোগ দিয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। পাগলের মতো খানিক্ষণ নিজের চুল ধরে টানাটানি করলেন। অমনি সুরুৎ করে চুলের ভেতর থেকে দুটো চড়ুই পাখি বেরিয়ে গেল। সেটা দেখে পল্টু আর ফটিক হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। ছেলিম মামা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘লেখক ফাজলামি করে এ কাজটা করেছে। আমার মাথায় জীবনেও চড়ুই পাখি ছিল না। আমি লেখককে দেখে নেব বলছি!’
ফটিক চিন্তায় পড়ে গেল। পল্টুর চিন্তা নেই। একটার পর একটা চকোলেট খেয়েই চলেছে। একটা ব্যাপার ধরতে পারলো না। এ পর্যন্ত যতবার পকেটে হাত ঢুকিয়েছে ততবার একটা করে চকোলেট পেয়েছে। ফটিকের মাথায় একটা বুদ্ধি পেল। ছেলিম মামাকে বলল, ‘আচ্ছা মামা, গল্প মানে তো এর পাঠকও আছে। আর পাঠক পড়ছে বলেই তো আমরা টিকে আছি।’
‘ঠিক বলেছিস! কোনো বুদ্ধি পেলি?’
‘হুম। ভাবছি আমরা এখন চাইলে পাঠকের সঙ্গে কথা বলতে পারি। তার আগে বলতো, তুমি কি জানো, আমরা কি শিশুতোষ গল্প নাকি বড়দের গল্প।’
‘তা তো জানি না, তবে তোদের নাম যেহেতু ফটিক আর পল্টু, তার মানে এটা শিশুদের জন্য লেখা গল্প।’
পল্টু ব্যাপারটা শুনে মজা পেয়ে গেল। বলল, ‘তার মানে আমরা এখন যা বলবো, পাঠকও সেটা বলতে বাধ্য থাকবে।’
‘ঠিক তাই!’
‘হাবুডাসটিং, হাবুডাসটিং।’
‘সেরেছে এর মানে কী!’
পল্টু বলল, ‘জানি না! বানিয়ে বলেছি। যা খুশি বলবো। আমি যা বলবো পাঠকও সেটা বলবে। হে হে হে।’
ছেলিম মামা মহাচিন্তায় পড়ে গেল। ‘শোন, এভাবে এলোমেলো কথা বলতে লাগলে পাঠক কিন্তু রেগে যাবে। পরে রেগে গিয়ে গল্পটা পড়া বন্ধ করে দিলে আমরা কিন্তু খতম।’
‘তো উপায়?’
‘শোন ফটিক পল্টু। আমরা বরং পাঠকের কাছে একটা অনুরোধ করি।’
ফটিক বলল, ‘পাঠককে উপদেশ দেব নাকি মামা! আমাদের গল্প নিশ্চয়ই হাজার হাজার শিশু কিশোর পড়ছে। এই সুযোগে একটু মাতবরি করি? হে পাঠক, সদা সত্য কথা বলিবে। আর মতিনদের গাব গাছে ঢিল ছুড়িবে না। ক্লাশ ফাঁকি দিবে না, শুধু জাহাঙ্গির আলম স্যারের ক্লাশ ছাড়া। ওই স্যার এখনো জানে না যে ক্লাশে বেত নিষিদ্ধ হয়েছে। ইত্যাদি ইত্যাদি।’
‘আগে নিজের প্রাণ বাঁচা। পরে উপদেশ। আয় সবাই মিলে একসাথে বলি। হে পাঠক, হে কিশোর নবীন প্রাণ। ওরে অবুঝ, ওরে সবুজ। তোমরা এরইমধ্যে জানতে পেরেছো যে আমরা কী বিপদে পড়েছি। এ শুধু বিপদ নয়, দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। আমরা বুঝতে পেরেছি, এই গল্প একটু পর শেষ হয়ে যাবে। তাই তোমাদের কাছে বিনীত অনুরোধ এই যে, তোমরা গল্পটা দয়া করে আরেকবার পড়বে। তাহলে আমরা হারিয়ে যাব না।’
পল্টু লাফিয়ে উঠলো চিৎকার জুড়ে দিল, ‘হাবুডাসটিং হাবুডাসটিং! ইকিরি মিকিরি। হুকা হুকা হুয়া হুয়া।’ ফটিক আর ছেলিম মামা কটমট করে তার দিকে তাকাল। পল্টু বেচারার মাথা গেছে মনে হয়। একটু পর চেঁচামেচি থামিয়ে পল্টু বলল, ‘ছেলিম মামা, আমার মনে হয় না কেউ দ্বিতীয় বার গল্পটা পড়বে। এই জন্য গল্প শেষ হবার আগে পাঠকদের সাথে একটু মজা করলাম।’ সঙ্গে সঙ্গে পল্টুর মুখ চেপে ধরল বাকি দুজন। এমন সময় আকাশ কাঁপানো হাসির শব্দ শুনে আঁতকে উঠলো তিনজন। পাঠক হাসছে না তো! আকাশের দিকে তাকালো সবাই। বিশাল একজোড়া চোখ তাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। ছেলিম মামা সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসলেন। ‘হে হে আপনিই তাহলে পাঠক। ভাল ভাল। মাই নেইম ইজ ছেলিম। আর এরা আমার ভাগনে। আপনি ভাল আছেন? আপনি কি গল্পটা দয়া করে আরেকবার পড়বেন?’ পাঠক কী উত্তর দিল বোঝা গেল না। সম্ভবত পড়বে না। আর এটা বুঝতে পেরে একটু পর ছেলিম মামা পল্টু আর ফটিক তিনজনই হাত নেড়ে টা টা দিল। আকাশ থেকে বিশাল চোখ দুটো ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে গেল।
অনলাইনে ফ্রি বাংলা গল্প পড়তে আমাদের সঙ্গে থাকুন। প্রয়োজনে ওয়েবসাইট রিফ্রেশ করে সাইটের ‘বন্ধু’ হয়ে যান। সেক্ষেত্রে নতুন গল্প আপডেট হলেই শুধু নোটিফিকেশন পাবেন।
এ ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপলোড হবে বাংলা রোমান্টিক গল্প, বাংলা হরর গল্প, থ্রিলার গল্প , অতিপ্রাকৃত গল্প এবং বাংলা সায়েন্স ফিকশন গল্প ।