পল্লব (প-লয়ে-লয়ে-ব)
বেজার মুন্সি আট টাকা বাকিতে দুইটা ফুলকপি কিনে হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরছে। দোকানদার দুই ফুলকপির আংগুল গুলার মধ্যে কায়দা করে দড়ি দিয়ে বেধে দিয়েছে। বেজার মুন্সি ওই দড়ি ডান হাতের আংগুলে পেচিয়ে নিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে হাটছে। সে সপ্তাহের বাজার করতে বাজারে গিয়েছিল। আধা দিন বাজারে কাটিয়ে এখন ফুলকপি হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। বউয়ের হাতে এই ফুলকপি তুলে দিলে তার চেহারাটা কেমন দেখাবে সেইটা মনে করেই খুব আনন্দ পাচ্ছে বেজার। অবশ্য গত মাস দেড়েক হলো বউয়ের চেহারাটা অতটা ভালো লাগতেছে না তার। ইদানিং নামাজে ঝোঁক এসেছে বেজারের। জোহর আর আছরের নামাজটা জোড়াক্ষেতের মসজিদে পরতে যায়। বাকি ওয়াক্ত গুলা সে ঠিক করে রেখেছে খুব শীঘ্রই নামাজ পরা শুরু করবে। তবে জোড়াক্ষেতের মসজিদে নামাজ পরে দিলে-মনে বেশ আরাম পায়। মসজিদের ইমাম সাহেব খুব ভালো মানুষ। উনার বড় মেয়েও বেশ ভালো। সুন্দরী আর স্বাস্থ্য শরীরও সুন্দর। ঠিক এই ফুলকপির মত সুন্দর। পা চালিয়ে হাটছে বেজার। জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। হাটতে হাটতে সে ঠিক করে ফেলেছে নামাজের শেষে সুযোগ সুবিধা করে তরিকা বিবির হাতেই ফুলকপি দুইটা তুলে দিবে সে। ইমাম সাহেবের বড় মেয়ে তরিকা বিবি। মেয়েটা দেখতে ভালো।

মসজিদে সবাই সুন্নত সেরে নিয়েছে। ইমাম সাহেব ফরজ শুরুর আগে একটা হাদিস বয়ান দিচ্ছেন। বেজার দ্রুত অযু সেরে নিল। এই বয়ান খুব কম সময়ের হয়, তারপরেই নামাজ শুরু হয়। এটা জানে সে। কলের পানির মধ্যে দুই হাত একসাথে করে ভিজিয়ে নিলো। কুনুই পর্যন্ত ভিজলেই তো চলে! মুখে সমানে পানি মেরে, কানের লতি ভিজিয়ে, দুই পা ধুয়ে নিয়ে মসজিদে ছুটলো সে। তখন সবাই কাতার সোজা করছে। ঠেলেঠুলে সামনের কাতারে জায়গা করে নিল বেজার। ইকামত শুরু হয়েছে। বেজারের খেয়াল হলো তার পায়জামা টাকনুর নিচে আছে। সে উবু হয়ে পায়জামা ভাজ করতে করতে তাকবীর নিয়ে হাত বেধে ফেলেন ইমাম সাহেব। বেজার জলদি আশেপাশে দেখে কাধ পর্যন্ত হাত উঠিয়ে নামিয়ে হাত বাধলো। হাত বেধেই তার মনে হল বামে দাঁড়ানো লোকটা গতবছর ধরা খাওয়া মালু ডাকাত! বেজারের খুব ইচ্ছা হইতে লাগলো মুখটা ঘুরিয়ে একবার দেখে। কিন্তু নামাজের মধ্যে মুখতো ঘুড়ানোর নিয়ম নাই। আবার তার খেয়াল হল এই লোকের মুখে দাড়ি। নিশ্চয়ই গতবার মাইর খেয়ে কেটে যাওয়া গালের দাগ লুকানোর জন্য দাড়ি রাখছে মালু।
আল্লাহু আকবার!
সবার সাথে রুকুতে গেলো বেজার। সে লোকটার পায়ের আংগুল গুলা দেখে মিলানোর চেষ্টা করলো। এই লোকের পায়ের আংগুল গুলা কেমন জানি ভদ্র ভদ্র। আজকাল ক্রিমউরম মাখলে এমন হউয়া যায় বোধ হয়।
আল্লাহু আকবার!
সবাই রুকু থেকে উঠে দাড়িয়েছে। বেজার রুকুতেই পরে আছে। আংগুল দেখছে।
আল্লাহু আকবার!
বেজারের খেয়াল হলো সবাই সেজদায় চলে গেছে। সেও সেজদায় পরলো। মসজিদের ঠান্ডা মেঝেতে কপাল ছোয়াতেই অদ্ভুত এক আরাম পেলো বেজার।
আল্লাহু আকবার!
সবার সাথে সেজদা ছেড়ে বসলো বেজার, আল্লাহু আকবার! আবার সেজদায় গেলো। এবার আরামটা কপাল থেকে ঘাড় গলা বেয়ে পিঠ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মনে হল তার।
আল্লাহু আকবার!
সবাই উঠে দাড়ালো দ্বিতীয় রাকাতের জন্য। বেজার খুব মন খারাপ নিয়ে উঠে দাড়ালো। সিজদা একটু বেশি সময়ের জন্য করলে অসুবিধা কি? আজকে এমন আরামটা আগে পায়নাই বেজার। এইবার ইমাম সাহেবের দিকে খেয়াল করতে লাগলো সে। ইমাম সাহেব সিজদায় যাওয়ার সাথে সাথেই সিজদায় গেলো। হঠাৎ তার ফুলকপি দুইটার কতা মনে পরলো। মসজিদে ঢুকার আগে বেল্টঅলা সেন্ডেল খুলার সময় ফুল কপি দুইটা মাটিতে রেখে নিছিল। তারপর তাড়াহুড়া করে ফুলকপি দুইটা না নিয়াই নামাজে চলে আসে। ফুলকপি দুইটা যদি কেউ নিয়া যায়! এর মধ্যে এক সিজদা ছেড়ে সবার সাথে পরের সিজদায় গেলো সে। মসজিদে বড় বড় আয়না থাকার দরকার। বাইরে কি হইতেছে দেখা যাওয়া দরকার। স্যন্ডেল চুরি যাওয়া ব্যাপার না, ফুলকপি চুরি যাওয়া বিশাল ব্যাপার।
আল্লাহু আকবার!
উঠে বসেছে বেজার। আত্তাহিয়াতু পরতে হবে এখন। কিন্তু শুরুটা মনে পরতেছেনা তার। বেজার একটা কাশি দিলো। এরপর আরেকটা দিল। তখনই মিনে পরলো লাইনটা। সে পরতে শুরু করার সময় শুনতে পেলো পিছনে আরেক জন কাশি দিল। মনে মনে হেসে উঠলো বেজার। তাইলে সে একাই ভুলে যায়নাই। আরেকজন পাওয়া গেলো। সাথে সাথে আরেকজন গলা খাকারি দিলো, এরপর আরেকজন! কিছুক্ষনের মধ্যে আরো গোটা কয়েকজন কাশি আর গলা পরিস্কার করে নিল। ব্যাপারটা বেজারের বেশ মজা লাগছে। এর মধ্যে তৃতীয় রাকাতের রুকুতে চলে এসেছে বেজার সহ সবাই। টুং করে একটা আওয়াজ শোনা গেলো। কারো পকেট থেকে পয়সা পরলে এমন আওয়াজ হয়। পয়সাটা পরে কিছুদুর গড়ায় সামনে গিয়ে পরলো। কুন বেক্কল সামনের পকেটে পয়সা রাখছে!
আল্লাহু আকবার!
সেজদায় আছে বেজার। আজকে যে করেই হোক যে কোন তরিকায় তরিকা বিবির সাথে দেখা করতেই হবে। মেয়েটার নাম তার মতই সুন্দর। বিবাহ না করেই বিবি ডাকা যায়!
আল্লাহু আকবার!
চতুর্থ রাকাতের জন্য সবাই উঠে দাড়িয়েছে। পিঠের ঠিক মাঝখানে কি একটা হেটে গেলো মনে হল বেজারের। কেমন একটা অসস্তিকর ব্যাপার। এই সময় তো চুলকানোও যাবে না। তারপরো এক হাত বাধা রেখে আরেক হাত দিয়ে চেষ্টা করলো পিঠের ওই জায়গাটা চুলকায় নিতে। কিন্তু তার হাত ওই পর্যন্ত গেলো না। মেজাজ খারাপ হতে শুরু করলো তার, সে অন্য হাতটা দিয়েও চেস্টা করলো। পারলো না। তরিকা বিবির কাছে নিশ্চয়ই চুলকানী কাঠি আছে। এইটা আজকাল সব ঘরেই থাকে। চুলকানীর কোন গরিব আর বড়লোক নাই। মন্ত্রী আর প্রেসিডেন্টেরও চুলকানী হয়। সৌদি বাদশারও গা চুলকাবে এইটাই নিয়ম। চুলকানীর কোন শরিয়ত নাই। এইটা তরিকা বিবির চুলকানী কাঠির মত সত্য! রুকুতে গিয়ে বেজারের মনে হলো গত দুই সপ্তাহ নখ কাটা হয়নাই। পায়ের নখ গুলো বেশ বড় হয়েছে। অন্যদের নখের সাথে তার নখ গুলো খুবই বেমানান। সবার সাথে রুকু থেকে উঠে দাড়ালো বেজার। ইমাম সাহেম খুব সুন্দর করে আল্লাহু আকবার বলেন! শুনতে ভালো লাগে খুব।
আল্লাহু আকবার!
ইমাম সাহেব সিজদায় গেলেন। সবার সাথে বেজারও। চোখ বন্ধ করে আছে বেজার। এই কয়দিনের নামাজের অভ্যাসে শুধু মাত্র সিজদার ব্যাপারটাই ভালো লাগছে বেজারের। আল্লাহর কাছে সেজদায় খুব আরাম আর শান্তি আছে। এটাই তার উপলব্ধি। সবার সাথে দ্বিতীয় সেজদায় বেজার। আজকে নামাজ শেষে ইমাম সাহেবের থেকে জেনে নিতে হবে কোন নামাজের সেজদা অনেক বড়। বিষয়টা খুবই অদ্ভুত!
আত্তাহিয়াতু পরতে বসে দ্বিতীয় রাকাতের কথা মনে পরে গেলো তার। এইবার গলা খাকারি দিলো সে। প্রথমবার আস্তে, পরের বারটা একটু বেশি সময় নিয়ে। তারপরেই চারপাশে কেউ কাশি, কেউ কফ টানা, কেউ গলা খাকারি…. এমন চলতে থাকলো। নামাজে দাড়ায়ে মানুষ গুলা খুব মজার মজার কাজ করে। যেই মানুষটা চেয়ারম্যান সাহেবের সামনে তারে সন্মান আর ভয়ে ডরে সিদা হয়ে খারায় থাকে, সেই মানুষটাই নামাজে দাড়ায়ে কেমন জানি সামনে আর পিছনে দোল খায়! যেই আল্লাহপাক চেয়ারম্যানরে বানাইছেন মানুষ সেই আল্লাহরে ভয় না পাইয়া তার সৃষ্টিরে ডরায়। এইটা খারাপ, খুব খারাপ!
আসসালামুআলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ, আসসালামুআলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ!
মুনাজাতটা শেষ হইলেই তরিকা বিবির সাথে সাক্ষাৎ! মনের ভিতরে একটা হুড়াহুড়ি শুরু হয় বেজারের। ইমাম সাহেব উঠে দাঁড়িয়েছে। টুপিটা হাল্কা ঠিক করে বললেন, ” আইজ আপনাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবো। আল্লাহ্ পাক আদম সৃষ্টি করেছেন, শয়তানও আল্লাহ্ পাকের সৃষ্টি। এই শয়তান আল্লাহ্ পাকের নিকট থেকে আমাকে আপনাকে গুনাহ করাইবার পারমিশান নিয়া নিছে। সে আমাদের নাকে, কানে এমন কি লোমের গোড়ায়ও ঢুইকা বইসা থাকতে পারে। যে যখনি কাউরে আল্লাহ্ পাকের ইবাদত করতে দেখে, তখনই তার মনে ঢুইকা তারে কুবুদ্ধি দিতে থাকে যাতে তার ইবাদত ঠিক না হয়। বলা আছে, মহান আল্লাহ্ পাক ওই ব্যাক্তিরে মাফ কইরা দেন যে কিনা নামাজের সময় শয়তানের ফেতনা ফ্যাসাদে পইরা মনোযোগ নষ্ট হইয়া যাওয়ার পরেও আবার আল্লাহ্ পাকের ভয়ে নামাজের মইধ্যে ফিইরা আসে! সকলে বলেন সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ্ পাক যেন আমাদের শয়তানের ফেতনা ফ্যাসাদের হাত থেইকা বাচার তৌফিক দেন আর বেশি বেশি আমল করার তৌফিক দান করেন”! সবাই আমিন বলে উঠলো। ইমাম সাহেব মুনাজাত শুরু করলেন।
দুইহাত তুলে মুনাজাতে রয়েছে বেজার। হুজুরের কথায় তার মনটাও খুব বেজার হইছে। পুরা নামাজে শয়তানের ফেতনা ফ্যাসাদে পইরা সুরা তজবিহ কিছুই পরা হয়নাই। ইমাম সাহেব কি তার অন্যমনস্ক হওয়ার ব্যাপারটা টের পাইলো? ছি ছি তাইলে কি একটা শরমের ব্যাপার হবে….!
বেজারের কেমন যেনো গরম লাগছে। মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো। নামাজে বইসা কত কি ভাবছে বেজার তার টেপরেকর্ডার বাজতে শুরু করলো বেজারের মাথার ভিতরে। একটা সময় আর সহ্য না হওয়াতে উঠে দাড়ালো সে। এমন একটা শয়তানরে আল্লাহ্ কেমনে আজাদ কইরা দিছে এইটা বুঝা অনেক কঠিক ব্যাপার।
ইমাম সাহেব মৃত বাবা মা, শশুর শাশুড়, আত্মীয়-স্বজনদের জন্য কবরের আজাবের জন্য মাফ চাচ্ছেন। বেজারের গা বেয়ে ঘাম বের হচ্ছে। এই শয়তানের কারনে সে ইমাম সাহেবের কাছে নামাজে অমনোযোগের জন্য ধরা খেয়েছে। এখন তরিকা বিবির সাথে দেখা হওয়ার ব্যাপারটা অতটা সুবিধার হবে না। বেজার মোনাজাত ধরা অবস্থায় উঠে দাড়াল। আজ হয়তো তরিকার সাথে দেখা হবে না! বুকে বেশ চাপ অনুভব করলো বেজার। সাথে চোয়ালেও কেমন একটা অসার ভাব। বেজার মসজিদ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসলো। জোরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু এতে বুকের চাপটা আরো বাড়লো। হঠাৎ একটা ভেজা কাপড় ঝাড়ার শব্দ শুনে বেজার তাকায় মসজিদের দক্ষিন দিকে। গোসল সেরে আসা তরিকা বিবি শাড়ি শুকাইতে দিতেছে। দুই হাত দিয়ে তারের উপরে শাড়ি মেলানোর সময় তরিকার শরীরের অনেক সুন্দর্য দেখতে পায় বেজার! শরম পেয়ে মাথা ঘুরায় ফেলে। আবার ইচ্ছা হয় দেখতে। বেজার মনে মনে শয়তানরে গালি দেয়। আবার মাথাও ঘুড়ায়। বেজার অবাক হয়ে তাকায় থাকে। সে দেখে তার নিজের স্ত্রী তারের উপরে ভিজা শাড়ি মেলতেছে। একটু আগে দেখা তরিকা বিবি তার স্ত্রীর মত দেখতে হইলো কেমনে! বুকের চাপটা আরো বাড়ে তার। মুখ হা করে নিশ্বাস নেয়ার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। সে খেয়াল করে তার স্ত্রী তরিকা বিবির থেকেও সুন্দর। তার সৌন্দর্য ফুলকপির থেকেও সুন্দর। বেজার দুই হাতে বুকচেপে ধরে তার স্ত্রীকে ডাক দেয়ার চেষ্টা করে।
মোনাজাত শেষে ইমাম সাহেব বলেন, শয়তান আমাদের চাইর দিক দিয়া আটকানোর চেষ্টা করবেই। আমাদের জ্ঞ্যান বুদ্ধি দিয়া সেইখান থেকে সইরা আসতে হবে। আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। আমাদের জ্ঞ্যান বুদ্ধি অন্য সব প্রানী থেইকা বেশি। এই জন্য আমাদেরই শয়তানের ফেতনা ফ্যাসাদ থেকে দূরে থাকতে হবে। কথায় কথায় শয়তানরে দুস দিলে হবে না। আমরা তখন নিজেরাই পাপের ভাগিদার।
মাটিতে নিজের শরীর টেনে টেনে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বেজার। উদ্দেশ্য তার স্ত্রী যদি তাকে এই অবস্থায় দেখে তাকে ধরতে এগিয়ে আসে। মনের মইধ্যে অনেক আফসোস লাগে বেজারের। শয়তানের কুফার জইন্য সে তার স্ত্রীর সৌন্দর্য্য দেখতে পায় নাই, তরিকা বিবির দেখতে পাইছে। আইজ তার নামাজটাও নিয়ম অনুযায়ী পরা হয়নাই। সব দোষ এই শয়তানের।
ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসে বেজার। পরে থাকে অসার হয়ে পরে থাকা ফুলকপি আর স্যান্ডেলের মত।
