আসাদুজ্জামান খান মুকুল
প্রথমবার ওদের দেখা হয়েছিল এক সাধারণ বিকেলে। তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সেমিস্টারে পড়ছে। লাবনী জানালার পাশে বসেছিল। আলো পড়েছিল চুলে,সোনালি রোদে নরম কেশগুচ্ছ যেন ছোট ছোট আলোর রেখা। অয়ন একবার ঘুরে তাকাতেই চোখে চোখ পড়ে,লাবনী তখন লজ্জায় দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। সেই নীরব দৃষ্টি হয়তো দু’জনের মনে কোথাও স্থান করে নিয়েছিল।
দিন গড়ায়। ক্লাস শেষে লাবনী লেকের ধারে হাঁটতে যেত। অয়ন নানান অজুহাতে ছূটে যেত পিছনে পিছনে। একদিন বৃষ্টিতে দু’জন গাছতলায় আশ্রয় নেয়। অয়ন নিজ থেকেই বলে উঠে —
“তুমি তো ভিজে গেছো।”
লাবনী হেসে বলে —
“বৃষ্টি আমাকে ভালোবাসে, তাই ছাড়েনা।”
এই কৌতুকপ্রদ কথাতেই দুজনের মাঝে হাসির স্রোত বয়ে যায়।
সেই হাসির ভেতরেই যেন অনাগত বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ জন্মেছিল।
ধীরে ধীরে কথা বাড়ে। প্রথমে ক্লাসে, পরে ক্যান্টিনে। এভাবেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। তারপর ছুটির পর একসঙ্গে হাঁটা, রাতে ছোট ছোট মেসেজ। অয়নের জিজ্ঞাসা —
“ঘুমাবে না?”
লাবনী —
“তোমার কণ্ঠ না শুনলে ঘুম আসে?”
জোছনা রাতে লাবনীর পাঠানো ভিডিও দেখে
অয়ন —
“তোমার চোখের মতো উজ্জ্বলতা কোথাও পাইনি।”
তাদের প্রেমে ছিল না চাঞ্চল্য বরং ছিল নীরবে মিশে যাওয়ার স্রোত।
হঠাৎ লাবনীর ঘরে আলো নিভে যায়–
ফোনে নীরবতা। পরে জানা যায় পরিবারের চাপে ওর বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। অয়নের বুক জমে যায় বরফের মতো। শেষবার শুধু লাবনী কথা —
“আমার বুকটা এমনভাবে কাঁদছে, যে শব্দ করতে পারছে না। আমি ক্লান্ত অয়ন, খুব ক্লান্ত।”
অয়ন কেবল বলে–
“ভালো থেকো।”
বিয়ের পরও মাঝে মাঝে লাবনীর ফোন আসে রাতে। খুব নীরবে। বলে —
“আজও মনে পড়ে লেকের ধারের বিকেলটা… যখন জানতাম না এই হাসিটা শেষ হাসি।”
অয়ন বলে–
“আমি আজও সেখানে যাই, শুধু তুমি ছাড়া।”
বছর ঘুরে যায়। এক শরতের বিকেলে অয়ন নদীর পাড়ে হাঁটছে। তার ফোনে আসে লাবনীর কল। ওপাশে নীরবতা, তারপর প্রশ্ন–
“তুমি এখনো আমাকে মনে রাখো?”
অয়ন হেসে বলে — “তুমি তো কখনো যাওনি, শুধু দূরে গেছো। দূরের জিনিসগুলোই তো বেশি উজ্জ্বল লাগে।”
ওপাশে ফুপিয়ে কান্না।তারপর লাইন কেটে যায়।
অয়ন নদীর পানে তাকিয়ে দেখে–অস্ত আলোয় ভেসে উঠছে লাবনীর মুখ যেমনটা প্রথম দেখেছিল। সে জানে, এই সম্পর্ক আর ফিরে আসবে না। তবু এই অপূর্ণতাতেই প্রেম পূর্ণতা পেয়েছে। কারণ– জীবনের প্রতিটি লগনে নীরবে জেগে থাকবে সেই অমলিন বিরহ– লাবনীর মতো, আর অতীতের স্মৃতির মতো।
নান্দাইল ময়মনসিংহ
