কিশোরদের জন্য লেখা ধ্রুব নীলের মজার বাংল গল্পটি প্রথম প্রকাশ হয় কালের কণ্ঠ পত্রিকার শিশুদের পাতা টুনটুন টিনটিন-এ।
বণিকবাবু মাস্টারি থেকে অবসর নিয়েছেন বছর দুই হলো। এরপরও ভুল করে মাঝেসাঝে আনন্দপুর পাইলট হাইস্কুলে ঢুকে পড়েন ক্লাস নিতে। অন্য শিক্ষকরা ব্যাপারটা হালকাভাবে নিয়েছেন। ছাত্ররাও তার ক্লাস মনযোগ দিয়ে করে। ক্লাসের ফাঁকে যখন বণিক বিশ্বাসের মনে পড়ে ঘটনা, তখন চুপ হয়ে যান। কাষ্ঠ হাসি টেনে বলেন, তোরা কিছু মনে করিস না, আমার আবার কিছু মনে থাকে না।
আজ সকালে বাজারের ব্যাগ হাতে বের হয়েছিলেন। তার মনে হলো একটা বড় দেখে মিষ্টি কুমড়া কেনা দরকার।

বাজার ভুলে চলে এলেন স্কুলে। বন্ধ ফটক দেখেই জিব কেটে বললেন, আজ তো সরকারি ছুটি!
স্কুল থেকে বের হয়ে বণিক বাবু গেলেন মিতালী স্টোরে। এখানে ঢুকলেই তার বড় মেয়ে নীলিমার কথা মনে পড়ে। নীলিমা ছোট থাকতে তাকে নিয়ে এই দোকানে এসে খেলনা টেলনা কিনতেন। নীলিমার বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর হলো। কত বছর হয়েছে বণিক বাবুর মনে নেই। তবু তিনি একটা পুতুল আর পুতুল সাজানোর জিনিসপত্র কিনলেন। প্যাকেটটা নিয়ে বের হতেই মনে পড়ল, আরে! কালিরহাট বাজারে তো আজ মাছের মেলা বসার কথা। মেলায় গেলে আবার ক্লাস নিতে দেরি হবে কিনা সেটা ভাবতে ভাবতে চিনাবাদাম কিনলেন বণিক বাবু। এরপর ঘটল আজব এক ঘটনা।
দুটো শক্তপোক্ত লোক এসে বণিকবাবুকে রীতিমতো চ্যাংদোলা করে তুলে নিল একটা গাড়িতে। গাড়িতে তোলার সময় তারা বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘জনাব বণিক বাবু, আপনাকে কিডন্যাপ করা হলো। চুপচাপ গাড়িতে বসে থাকবেন। চেঁচামেচি করবেন না। করলে আদেশক্রমে আপনাকে হাত-পা বেঁধে নেওয়া হবে।’
কারা কিডন্যাপ করলো, কেন করলো, কিছুই বুঝতে পারছেন না বণিক বাবু। তবে খানিক পর তিনি ভুলেই গেলেন যে তিনি কিডন্যাপ হয়েছেন।
‘কী মুশকিল, গরম লাগছে কেন, গাড়িতে এসি নেই নাকি।’
‘চুপ থাকুন। বলেছি তো আপনি কিডন্যাপ হয়েছেন। আর এসিটা কাজ করছে না। একটু কষ্ট করুন।’
বণিক বাবু ভাবলেন, কিডন্যাপার হলেও লোকগুলো ভালো। আপনি করে বলছে।
‘শুধু বসিয়েই রাখবে? একটু চা-টা..।’
‘একটু পরেই খাবেন। চায়ের সঙ্গে টোস্ট খাবেন, কেক খাবেন, পোলাও মাংস খাবেন।’
বণিক বাবুর মনে হলো লোকটা বুঝি রাগ করে বলেছে। কিন্তু তাকে কিডন্যাপ করলো কেন? বণিক বাবু অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না, তিনি কি সাধাসিধে মানুষ নাকি অঢেল সম্পদের মালিক।
‘আজ্ঞে, তোমাদের ভুল টুল হয়েছে নাকি? আমার মতো নিরীহ একজনকে কেন ধরে নিয়ে যাচ্ছ?’
‘আপনি বণিক বাবু না? আনন্দপুর হাই স্কুলে অংক করাতেন?’ এবার বলল গাড়িচালক। পাশেরজন সম্ভবত তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
‘তা তো ঠিক। তবে বিশ্বাস করো, আমার কাছে টাকা-পয়সা নেই। থাকলেও জানি না কত টাকা আছে, কোথায় আছে।’
‘টাকা-পয়সা কে চাইছে আপনার কাছে!’
এবার ধমকের সুরে কথাটা বলল অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকটা।
কিছুক্ষণ পর বিড় বিড় করে বলতে শুরু করলেন বণিক বাবু, ‘কী কুক্ষণে যে আজ সকালে সিনেমা দেখতে বের হয়েছিলাম। তারপর বন্ধু মনির দিল ফোন। ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভুলে গেছি যে আজ স্কুলে পরীক্ষা ছিল…।’ এরপর বণিক বাবুর মনে পড়ল তিনি যা বলছেন, সেটা তিন দিন আগের ঘটনা। আজ সকালে তিনি সিনেমা দেখতে যাননি মোটেও।
‘ড্রাইভার ভাই। আস্তে চালাও বাপু। তোমার সঙ্গে ও কে? গাড়ি ভাড়া করেছি আমি, আর তুমি প্যাসেঞ্জারও নিয়ে এসেছো?’
দুই কিডন্যাপার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেও কিছু বলল না। বণিক বাবুর ভুলে যাওয়ার বাতিকের বিষয়ে সম্ভবত তারা জানে।
‘তোমরা শুধু আমাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? বাড়িতে চলো, মালতি, মানে আমার স্ত্রী আছে। ও আবার টেনশন করবে।’
‘কেউ টেনশন করবে না। চুপ করে বসে থাকুন। আর বেশিক্ষণ লাগবে না।’
‘মালতি বাসায় একা একা..।’
‘কেউ বাসায় নেই!’
কিডন্যাপারের ধমকে মিইয়ে গেলেন বণিক বাবু। খানিক পর গাড়ি থামল একটা দোকানের সামনে।
‘চুপচাপ নামুন। একটা কথাও না। দোকানে ঢুকবেন। আমরা সাইজ মতো আপনাকে কাপড় দেব। আপনি ভেতরের ওই রুমটায় ঢুকে কাপড় বদলাবেন। ঠিক আছে?’
‘ও আচ্ছা। কিডন্যাপ করলে বুঝি নতুন জামা-কাপড় দিতে হয়?’
‘হ্যাঁ হয়! এবার চলুন!’
চুপচাপ দোকানে ঢুকে নতুন পাঞ্জাবি আর প্যান্ট পরে বণিক বাবু আবার শান্তশিষ্ট হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলেন। এবার বসলেন আরাম করে। যেন দূরে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছেন। বণিক বাবুর মনে প্রশ্ন, পৃথিবীর সব কিডন্যাপার কি এমন ভালো মানুষ হয়?
আধাঘণ্টা পর গাড়িটা থামল একটা বাড়ির সামনে। বণিক বাবুকে অনেকটা জোর করেই নামানো হলো গাড়ি থেকে। তিনি নামতেই চাচ্ছিলেন না। বারবার বলছিলেন, এখনও রাঙ্গামাটি আসেনি, সেখানে না গেলে সমুদ্র দেখব কী করে!
চেঁচামেচি শুনে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক বৃদ্ধা ও এক তরুণী। তরুণীর কোলে একটা কন্যাশিশু। শিশুটিকে দেখেই একগাল হেসে বণিক বাবু বললেন, ‘ওরে আমার টুনিপাখি! অ্যাঁ, টুনিপাখি দেখি বড় হয়ে গেছেরে! গতকাল না ও ট্যাঁ ট্যাঁ করছিল?’
তরুণী বলল, ‘না বাবা, ও গতকাল হয়নি। ওর বয়স দেড় বছর। আর আমি ঠিকই জানতাম তুমি আমার জন্মদিনের কথা ভুলে যাবে না।’ এরপর বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে তরুণী বলল, ‘ঠিক বলেছি না মা!’ এরপর আবার বণিক বাবুকে বলল, ‘এবার আমার গিফট দাও বাবা।’
বণিক বাবু গাড়ির ভেতরে রাখা পুঁটলি থেকে বের করে আনলেন মিতালি স্টোর থেকে কেনা পুতুল আর খেলনা। তরুণী হাসিমুখে সেগুলো তুলে দিল তার কোলে থাকা কন্যাশিশুর হাতে।
সঙ্গে থাকা দুই লোকের দিকে প্রশ্নবোধক চোখে তাকালেন বণিক বাবুর স্ত্রী মালতি। যে লোকটা গাড়ি চালাচ্ছিল সে হেসে বলল, ‘বণিক বাবু আমাদের অনেক আগে ভাড়া করে রেখেছিলেন। আমরা যেন তাকে আজ ধরে বেঁধে হলেও নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে এ বাড়িতে নিয়ে আসি। এ জন্য আমাদের অনেকগুলো টাকাও দিয়েছেন তিনি। হে হে হে।’
বৃদ্ধা আর তরুণী হা করে তাকিয়ে রইল বণিক বাবুর দিকে। বণিক বাবুর এসব ঘটনা মনে পড়ল কিনা কে জানে। তবে যথারীতি মুখে চওড়া হাসি টেনে বললেন, ‘কী করবো বল, আমার আবার কিছু মনে থাকে না।’
