Friday, January 16
Shadow

পাপমুক্তি 

শরীফা সুলতানা 

রাহেলার খুন্তি নাড়ানোর শব্দে কাজের ব্যঘাত ঘটছে আবুলের। এই কাজটা করেই সে সংসারের ঘানি টেনে চলেছে। এবার ভালো দান মারার ইচ্ছা। তাই ভূয়া রিপোর্ট আনতেও কিছু মাল ছাড়তে হয়েছে। বড় রকমের অসুখ বলে কথা! মানুষ আর মানুষ নাই বলার যুগেও কেউ কেউ মানবিকতার পরিচয় দেয়। ঘটনা যাতে লোকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয় তার জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে ফন্দি ফিকির করতে হয়।

ছেলেপুলেরা মাংস ছাড়া খেতে চায় না। কিন্ত তার ছেলে সজলের বেলায় উল্টো। ঢেঁড়শ ভাজি হলে তার আর কিছু লাগে না। প্রায় দিনই ছেলের জন্য রাহেলা করে থাকে। আজও করছে। কিন্ত অতিরিক্ত নাড়াচাড়া। এই অতিরিক্ত খুন্তি নাড়ানাড়ির মানে সে রেগে আছে। কেন রেগে আছে এটাও অজানা নয় আবুলের কাছে। তার স্বামী দুই নাম্বারী করে তাদের খাওয়াচ্ছে এটা মোটেই পছন্দ করে না সে।  নুন ভাত খেতে রাজি কিন্ত হারাম খেতে রাজী নয়। তার একটাই কথা। মরাতো লাগবে। আল্লাহর কাছে কী জবাব দিবে? পরকালের ঠিকানা সে কনফার্ম করতে চায় না দোজখে। 

আবুল বউ এর কথা মোটেই পাত্তা দেয়না। অবশ্য মাঝে মাঝে মনে হয় ভালো একখান বউ পেয়েছে বটে! যার কোনও লোভ নাই। ছেলেটাও তেমনি। মায়ের নেওটা। বউ এর জন্য মাঝে মধ্যেই সে গর্ব অনুভব করে। কিন্ত কখনো রাহেলাকে বুঝতে দেয় না। কিছু কিছু বিষয় অপ্রকাশিত থাকাই ভালো।

দুপুরে খেতে বসে রাহেলার চূড়ির অতিরিক্ত ঝনঝন শব্দে বুঝে নেয় রাগ একটুও কমেনি। ঢেঁড়শ ভাজি মুখে তোলা যাচ্ছে না। কেমন কাচা রয়ে গেছে। কিছু না বলে ভাজি একপাশে সরিয়ে এক টুকরো মাংস পাতে নিতে যাবে তখনই রাহেলার অসন্তোষজনক প্রশ্ন,

” এতো হারাম খেয়ে শরীরের গোস্ত বাড়ানো ছাড়া আর কী লাভ?” 

মাইনাসে মাইনাসে প্লাস। এই কথাটা বন্ধু হারেসের কাছে শোনা। মানে রাগের সাথে রাগ মেলালে অশান্তির শেষ থাকে না। রাগ মানেই তার কাছে মাইনাস। কথাটা তার ভালো লেগেছে। তাই বন্ধুর কথা মেনে কন্ঠস্বর নিচু করে বলে, 

” শোনো, পাপপূন্যের কথা বললে অনেক কিছুই আসে। এই যে আমার কথাই ধরো। করতাম সামান্য একটা চাকরি। মাস শেষে যা পেতাম তা দিয়ে কতো কষ্ট করে চলতে তুমি। ছেলের স্কুলের বেতনটাও দেওয়া হতো না। সাধে কি চাকরি ছেড়ে এই পথে নেমেছি?”

রাহেলা জানে তার স্বামী ঠিক কথাই বলছে। কিন্ত মন থেকে মানতে পারে না। সে চেষ্টা করতেই পারে স্বামী যাতে খারাপ পথে না যায়। তারই ধারাবাহিকতায় বলে,

” এই যে, মানুষ ঠকিয়ে টাকা কামাচ্ছ, তা কী ঠিক?”

” তোমার কথা মানলাম ঠিক না। কিন্ত যাদের অনেক আছে। ফেলে চুরে খায় তাদের কাছ থেকেই তো নেই”

রাহেলার প্রশ্নের উত্তর দেয় সে।

” অনেকেই তো দুইশ টাকা পাঠায়। তোমার কী মনে হয় তাদের অনেক টাকা?”

রাহেলার প্রশ্নের কোনো যুতসই জবাব তার কাছে নাই। তবুও বলে-

” এতে মনুষ্যত্বের পরীক্ষা হয়, বুঝলা? মানুষও বাছাই হয়”

” তুমি নিজেই তো মানুষ না। মানুষ বাছাইয়ের কী বুঝ?”

কথাটা পেড়ে রাহেলা রান্নাঘর বরাবর হাঁটা দেয়। আবুল খাওয়াতে মনোযোগ দেয়।

কম্পিউটার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবুল। কম্পোজ করতে হবে। ঝিম মারা দুপুরে বের হয়েছে যাতে ভীড় এড়ানো যায়। কিন্ত তা আর হলো কই? স্কুল, কলেজের পোলাপানে গিজ গিজ করছে দোকানের ভিতরে। কম্পোজ করা লোকটি কোনরকমে মাথাটা বের করে একগাল হেসে বলেছে

” বাইজান বইন”

কম্পোজ সবসময় এখান থেকেই করে। তাই খাতির যত্ন আছে। গরমে অস্থির লাগলেও সে অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ সবকিছুর একটা সৌন্দর্য আছে। তাছাড়া যেমন গুড় তেমন মিষ্টি। আশি লক্ষ টাকা সাহায্য চাইবে কাগজটাও তো তেমন হতে হবে? সবাইকে তো আর দুই নাম্বারীর সাক্ষী রাখা যায় না।

পাশে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাতে যাবে তখনই স্যুট টাই পড়া একজন তার সামনে এসে দাঁড়ায়। এই গরমে এমন পোশাক তাকে অস্বস্তি দিলেও বড়লোকের কারবার বলে মেনে নেয়। সে তার সিগারেট ফুঁকাতে মনোযোগ দিতে যাবে তখনই লোকটি প্রশ্ন করে বসে,

” আপনি কি আবুল মিয়া?”

সম্পূর্ণ অচেনা কারো মুখে নিজের নাম শুনে হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নেয়। এতো দুর্বল হলে এই জগতে টিকে থাকা কষ্টকর। 

হ্যা বা না কোনোটাই না বলে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করছে। আবার পুলিশ ফুলিশ কীনা! হয়ত কেউ তার সুখ সহ্য করতে না পেরে থানায় খবর দিয়েছে। 

” কী হলো, জবাব দিচ্ছেন না যে, আপনিই তো আবুল মিয়া। অসুখ বিসুখের মিথ্যা রিপোর্ট তৈরি করে মানুষের টাকা মেরে খান?”

কথাটা আবুলের আত্মসম্মানে লাগলেও মেনে নিতে হয়। কারণ কথাটা শতভাগ সত্য। 

এখান থেকে সটকে পড়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে ভেবে দোকানের পিছন দিকটাতে চলে যায়। ওখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। যদিও পলিথিন, বিস্কুট, সিগারেটের প্যাকেট ফেলে ফেলে যাচ্ছে তাই অবস্থা। তার উপর প্রস্রাবের দুর্গন্ধ। একপাশে এইকাজ করার জন্য ছোটখাট ব্যবস্থা আর কি!

ততক্ষণে লোকটাও তার কাছাকাছি চলে এসেছে। ভণিতা না করেই বলে,

” আমি আপনার কাছে একটা কাজে এসেছি”

অবাক হয় আবুল। তার মতো ছাপোষা লোক মানুষের কী কাজে লাগতে পারে?

” আমাকে একটা ছোট কাজ করে দিতে হবে। বিনিময়ে পাবেন এককোটি টাকা”

আবুল নিজের কানকেই অবিশ্বাস করে। ঠিক শুনছে তো! বাকি জীবনে আর কিছু করার দরকার পড়বে না। ছেলেটা ভালো মতো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। আর সে তওবা করে আল্লাহর পথে চলে যাবে। বউ খুশী, সেও খুশি।

” কী হলো?”

চোখের সামনে তুড়ি মারে লোকটি।

” কাজ টা কি?”

” এই সুটকেস টা একজনের কাছে পৌছে দিতে হবে। এখন পাবেন পঁচিশ হাজার। বাকীটা কাজ শেষে”

সামান্য কাজ। রাজী হয় আবুল।

এমনিতে রাত দশটার ভিতর বাড়ি ফিরে আবুল। কিন্ত আজ ইচ্ছাকৃত দেরি। কারণ হাতে সুটকেস দেখলে রাহেলার প্রশ্নে টেকা যাবে না। আর রাহেলা সারাদিন সংসারের ঘানি টেনে বেশি রাত অবধি জেগে থাকতে পারে না।

বিড়ালের মতো নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে আবুল। ছেলের ঘরে লাইট জ্বলছে মানে সে পড়ছে। রাতজাগাটা কতোটা ক্ষতিকর এখনকার ছেলেপুলেরা বুঝেনা! আলমারীর কাছাকাছি গিয়ে ফিরে আসে আবুল। পাল্লাটা কদিন ধরে বেশ ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে। রাহেলার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। একরাতের ব্যাপার। রেখে দেয় খাটের নীচে। 

শোয়ার আগে টাকাগুলো নাকের কাছে নিয়ে কতোক্ষণ গন্ধ শুঁকে বালিশের নিচে রেখে দেয়। আজ আর ঘুম আসবে না। তবুও গা এলিয়ে দিতে যাবে তখনই রাহেলার প্রশ্ন,

” সুটকেসে কি?”

আচমকা রাহেলার কন্ঠ শুনে সে ভড়কে যায়। এখনতো তার ঘুমিয়ে থাকার কথা। বিষয়টা কী?

” জেগে আছো যে?”

” কোমড়ের ব্যথাটা বেড়েছে”

“ওষুধ খেয়েছ?”

” হু, তাছাড়া ছেলেটা কী একটা মালিশ করে এইতো পড়তে গেল”

“ঘুমাতে যখন পারছই না, তখন একটা কথা বলি”

বেশ আন্তরিকতা নিয়ে স্ত্রীর পাশে বসে আবুল। অনেকদিন পর তাকিয়ে দেখে তার স্ত্রীর চোখে রাজ্যের ক্লান্তি। একহাতে সব সামলায়। তবুও কোনদিন কোনো অভিযোগ করেনি। তার একমাত্র চাওয়া আবুল যেনো সৎভাবে উপার্জন করে।

” কী না বলবা”

ব্যথাটা দাঁতে চেপে বলে রাহেলা।

” আমি ভেবে দেখলাম তোমার কথাই ঠিক। কদিনের দুনিয়া। আজ মরলে কাল দুইদিন। সুযোগ যখন পাওয়া গেছে সেটা কাজে লাগাই”

“কী সুযোগ ?”

মাঝপথে প্রশ্ন করে। আবুল বিরক্ত না হয়ে বলা শুরু করে,

” আজ হঠাত আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা। মস্ত বড়লোক এখন। আমারে দেখে আফসোস করল। তাই একটা কাজও দিল। সুটকেসটা একজনের কাছে পৌছে দিলে ভালোই টাকা দিবে। কিছু টাকা নগদ দিয়েছে। বাকিটা কাজ শেষে দিবে। পোলাডার ভবিষ্যত নিয়া চিন্তা থাকল না। টাকাটা ব্যাংকে রাখলে যা আসবে তাতে আমাদের বেশ চলে যাবে”

” তা না হয় বুঝলাম। কিন্ত এই সামান্য কাজে এতো টাকা–“

কথাটা শেষ করতে দেয়না আবুল। বলে,

” ওসব পরে ভাবা যাবে। এখন ঘুমাও “

অনেকদিন পর স্বামীর গা ঘেঁষে শোয় রাহেলা। স্বামীর পরিবর্তনে সে খুব খুশি। আর আবুল মিয়াও মিথ্যা গল্প ফেঁদে ধরা না পড়ার তৃপ্তি নিয়ে গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

অনেকদিন পর বউয়ের হাসিমুখ দেখে কাজে যাচ্ছে আবুল। আজ থেকে পাপমুক্তি তার!

মোড়ে এসে রতনের দোকান থেকে একখিলি পান মুখে পুড়ে যখন অটোতে উঠতে যাবে তখনই রতনের প্রশ্ন,

” ওতে কী গো, আবুল বাই?”

” কিছুনা। পরে বলব”

সিটে বসতে বসতে আবুল সিদ্ধান্ত নেয় কিছু টাকা রতনকেও দিবে। দোকানে মাল নাই বললেই চলে। পাশের বাড়ির রোমেলাকে পছন্দ রতনের। কিন্ত টাকার অভাবে ঘরে তুলতে পারছে না।

এমনিতে পান খেলে সে কয়েকবার পিক ফেলে। আজ উত্তেজনায় তা ভুলে গেছে। ভিতর ভিতর অস্থির সে। ঠিকমতো কাজটি করতে পারবেতো! লোকটি আসবে তো!  ভাবতে না ভাবতেই দেখতে পায় লোকটি লাল শার্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

লোকটির কাছাকাছি যতো হচ্ছে ততো তার মনে আনন্দ ভর করছে। এইতো শেষ হলো বলে পাপের জীবন।

আচমকা ব্রেক কষাতে কপালটা গিয়ে লাগে ড্রাইভারের পিছনে থাকা লোহার রডটাতে। সাথে সাথে কপালটা ফুলে যায় ফোড়ার মতো। রাগ করতে গিয়েও থেমে যায় আবুল।  আজ একটা শুভ দিন। তবুও নীচু স্বরে বলে,

” আস্তে চালাইলেই হয়”

ড্রাইভার ঢোক গিলতে গিলতে বলে,

“পুলিশ!”

পুলিশ কী জন্য। এখানেতো দুই নাম্বারী নাই। 

” এই নাম”

ওর দিকে তাকিয়ে তুই তোকারী করছে পুলিশ। বিরক্ত হয় সে। কিন্ত কিছু করার নাই। পুলিশ ছুলে আঠার ঘা এটাও সে জানে।

এতোক্ষণে সুটকেস পুলিশের হাতে চলে গেছে। এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে লোকটিকে খোঁজার চেষ্টা করেও পেল না। নিমিষে লোকটি হাওয়া!

” তা ইয়াবার ব্যবসা কতোদিন?”

পুলিশের প্রশ্ন শুনে সে ঘামতে শুরু করেছে। 

কয় কী? এর চেয়ে ধান্দার ব্যবসাই ভালো ছিল। বেশি লোভ করে এখন কোন জালে আটকে গেল!

” স্যার, থানায় নিয়ে ডলা দিলেই সব তথ্য বের হবে”

“হু, ভ্যানে তোলো”

ঊর্ধ্বতনের কথা মানতে তৎপর হয় অধস্তনেরা। হাতকড়া দেখেই সে  ভুল সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয়। কারণ তারজন্য ঘরে ক্লান্ত একজোড়া চোখ অপেক্ষা করছে, ছেলের অসহায় অবস্থা ভেবে মোটা মাথার আবুল মোটা সিদ্ধান্তটা নিতে বাধ্য হয়। হেচকা টানে এক পুলিশ সদস্যকে ফেলে লাগায় দৌড়।

” দাঁড়া বলছি”

পুলিশের কথা শোনার মতো সময় নাই। দৌড়ের গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর করার আপ্রাণ চেষ্টা আবুলের। তা থামিয়ে দিতে পিঠ বরাবর একটা গুলি তাকে সহযোগিতা করে। গুলিটা যখন তার শরীরে প্রবেশ করে তখন আকাশসীমায় অবস্থানরত পাখিরা জায়গা বদলে তৎপর হয়। মানুষের কিছু কিছু বিষয় ওদের অস্থির করে তোলে।

শরীফা সুলতানা , ময়মনসিংহ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *