লেখক: প-লয়ে-লয়-ব
পুরানো রেডিও টার ব্যাক কভার খুলে পার্টস গুলো টেবিলের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিয়ে বসে আছে পিয়াস। এটা তার বাবার রেডিও। একবার বিদেশ ঘুরে আসার সময় নিয়ে এসেছিলেন। এটা দিয়েই যুদ্ধের সময় সারাক্ষণ কান পেতে থাকতেন নাকি। এটা অবশ্য শোনা কথা। তখন তো পিয়াসের জন্মই হয়নি। এখন অবশ্য এটা নষ্ট। ইলেকট্রনিকস এর প্রতি পিয়াসের খুব আগ্রহ। কিছু একটা পেলেই খুলে ভেঙ্গে দেখে, এলোমেলো জোড়াতালি দিয়ে দেখে কি হয়। তাদের বাসার কাছেই মেশিন কাক্কুর টিভি সারাইয়ের দোকান। বিকেলে খেলতে না গিয়ে পিয়াস মেশিন কাক্কুর দোকানে গিয়ে বসে থাকে। মেশিন কাক্কু বাবার বন্ধু। উনি নাকি যে কোন মেশিনই ঠিক করে ফেলতে পারেন। তার নাম মহাসিন মিয়া। বাবা তাকে মেশিন মিয়া ডাকেন আর পিয়াস ডাকে মেশিন কাক্কু। উনি অবশ্য এতে রাগ করেন না বরং পিয়াস তার পাশে বসে থেকে এটা সেটা জানতে চায় বলে তিনি খুব খুশি হন। একবার তো বাবাকে বলেছেনই, দেখিস তোর ছেলে বড় হলে ইঞ্জিনিয়াস হবে। ও এখনই বোঝে কোথায় পাওয়ার শর্ট কোন ক্যাপাসিটর নষ্ট। আমি মরে গেলে আমার দোকানটা তোর ছেলেকে দিয়ে যাবো! এসব শুনে বাবা শুধু হাসেন। বলেন, আমি ভেবেছি পিয়াসকে গ্রামে পাঠিয়ে দিবো গরু চড়াবে! পড়াশোনার তো বালাই নেই। তুই যখন বলছিস দোকানটা দিয়ে দিবি, তাহলে আর পাঠাবো না, হাহ হাহ হাহ হাহ হা…!

মেশিন কাক্কুর দোকান থেকে পুরানো ঝালাই মেশিন, রাং, ক্যাপাসিটর, ডায়োড আর বেশ পুরোন একটা মিটার নিয়ে এসেছে। তার পরেই সে ঠিক করেছে বাবার রেডিওটা খুলবে। এরই মধ্যে সে কিছু ক্যাপাসিটর আর ডায়োড খুলে ভিন্ন কালারের ডায়োড বসিয়ে দিয়েছে। পাওয়ার সাপ্লাইটায় আরও তার পেঁচিয়ে দিয়েছে, দুটো ক্যাপাসিটরও বসিয়ে দিয়েছে। মেশিন কাক্কু অবশ্য রেডিওটায় আলাদা একটা পোর্ট করে দিয়েছেন যেটা দিয়ে পিয়াস পাওয়ার ব্যাংক দিয়েই অন করতে পারবে, অযথা ব্যাটারি খরচ করতে হবে না।
পিয়াস রেডিওটা সব পার্টসগুলো গুছিয়ে নিয়ে পাওয়ার ব্যাংক থেকে লাইন দিয়ে বড় নবটা ঘোড়াতেই খস খস শো শো শব্দে চালু হয়ে গেলো। এটার পেছনে থাকা এন্টেনাটা আগেই ভেঙ্গে গেছে। পিয়াস তাদের বাসার ছাদে নষ্ট বারো ডান্ডার টিভি এন্টেনার সাথে তার জোড়া দিয়ে তার ঘর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। ওই তারের সাথে রেডিওটার ভাঙ্গা এন্টেনার পয়েন্টে জোড়া দিতেই খস খস শো শো আওয়াজ কিছুটা কমে এলো।
পিয়াস, ভাত খেতে আয়! মা ডাকলেন।
পিয়াস তার ঘড়ির দিকে তাকাতেও দেখলো রাত ১০ টা বাজে! এই মাত্রই না সন্ধ্যা ছিলো! পিয়াস সিগনাল এর গোল নবটা ঘোরাতে লাগলো। কোথাও কোথাও শুনশান নিরবতা আবার কিছু কিছু জায়গায় অস্পষ্ট কথা শোনা যাচ্ছে। পিয়াস নবটা খুব আস্তে আস্তে ঘোরাতে লাগলো।
তুই আসবি নাকি সব কিছু ফ্রিজে রেখে দিবো? মা আবারও ডাকলেন।
আসছি মা… পিয়াস চৎকার করে বলে। তারপর ওই অবস্থায় সব রেখেই খেতে চলে গেলো পিয়াস। এদিকে পিয়াসের রেডিওতে হাল্কা হাল্কা কথা শোনা যেতে শুরু করেছে। ভালো করে খেয়াল করে শুনলে বোঝা যাবে এই কথা গুলো হচ্ছে ট্রাফিক বিভাগের ওয়ারল্যাসের কথা। কোন এক রাস্তা দিয়ে এক মন্ত্রী যাবেন তার জন্য রাস্তা ক্লিয়ার করতে বলা হচ্ছে। অন্য এক রাস্তায় পুলিশের গাড়ি একটা প্রাইভেট কারকে ধাক্কা দিয়েছে, পাবলিক জড়ো হয়েছে বলে পুরো রাস্তায় জ্যাম। ট্রাফিক হেড কোয়ার্টারে সব জানাচ্ছেন আরেকজন সার্জেন্ট।
কোনরকম ভাত গিলে দৌড়ে রুমে ফিরে এলো পিয়াস। দরোজা বন্ধ করে দিলো। তারপর আবার নবটা ধীরে ধীরে ঘোরাতে লাগলো। কিছু কিছু কথা খুব অস্পষ্ট। দু একটা কথা কান পেতে থাকলে বোঝা যায় কিন্তু আশেপাশে শব্দ হলে আর বোঝা যায় না। কাল শুক্রবার স্কুল বন্ধ, পিয়াস মনে মনে ঠিক করে রেডিওটা কাল সকালেই মেশিন কাক্কুর দোকানে নিয়ে যাবে। মেশিন কাক্কু নির্ঘাত এর একটা ব্যাবস্থা করে দেবেন।
রেডিওটা নাড়ালে ভেতরে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। নিশ্চয়ই কোন পার্টস বা স্ক্রু ভেতরে রয়ে গেছে। পিয়াস রেডিওর ব্যাক কভারটা খুলতে শুরু করে।
আচ্ছা? তোমার ছেলে যে দিনরাত নাটবল্টু আর স্ক্রু নিয়ে পরে থাকে সেটা দেখেছো? রাত বাজে ১২টা। এখনো ওই রেডিওটা নিয়ে খুটুর খাটুর করছে। মা বিছানা ঝাট দিতে দিতে বললেন। হুম, ও তো দেখছি মেশিন মিয়ার হেল্পার হবে। ও নাকি আবার ওর দোকানটা পিয়াসকে দিয়ে দিবে হাহ হাহ হাহ হা..!
চুপ করতো! মা এবার একটু রাগ হলেন। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন উদ্ভট চিন্তা কোন বাবা করে? তুমি কি বলতো? আর শোন, ওই মহাসিন ভাই থেকে পিয়াসকে দুরে রাখো। গত ৪ মাসে এ পাড়া থেকে ৩ টা ছেলে গায়েব। গতকাল রাতে আরো ১ জন। এরা সবাই মহাসিন ভাইয়ের দোকানে কাজ শিখতো। ইদানিং পিয়াসও যেয়ে তার দোকানে বসে থাকে। আমার খুব ভয় করে। পিয়াসের মা খাটের মশারীর স্ট্যান্ড ধরে দাড়িয়ে আছেন। তার গলা ধরে এসেছে। বাবা উঠে দাড়িয়ে পিয়াসের আম্মুর কাছে গেলেন। আরে এতো কিছু ভেবো না তো। মাত্র তো স্কুলে পড়ছে। আর লেখাপড়ায় তো পিয়াস মোটেও খারাপ না। ও যেভাবে আছে থাকতে দাও। একসময় ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া এই সময়টায় বাধা দিলেই বরং সমস্যা। আর ওই চারটা ছেলেকে নিয়ে ভেবো না। ওরা তো বড় বড় ছেলে। সবাই কলেজে নাহয় ভার্সিটিতে পড়ে। নিশ্চয়ই কোথাও এডভেঞ্চারে বের হয়েছে। নাও শুয়ে পড়।
পিয়াসের বাবা আহমেদ আলী সাহেব ঘুমাতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেন না। আসলেই পিয়াসের মা ভুল বলেনি। গত ৪ মাসে মোট ৪ টা ছেলে হঠাৎই নিখোঁজ। এদের সবারই কোন নো কোন ভাবে মহাসিনের সাথে যোগাযোগ ছিলো। এদের মধ্যে দুজন তো তার কাছে কাজ শিখতো। আর বাকি দুজন প্রায়ই কোন না কোন ইলেকট্রনিকস নিয়ে তার দোকান থেকে সারাই করেছে। ইদানিং তো আবার এই বয়সী ছেলেরা জঙ্গিগোষ্ঠীর দলে যোগ দিচ্ছে। এসবই কথাই পুরো পাড়ায় রটে গেছে। কিন্তু আলী সাহেব জানেন মহাসিন এমন মানুষ না। সে একজন মুক্তিযোদ্ধা। তারা দুজনে একই ক্লাসে পড়তেন। যুদ্ধের শুরুতে রাজাকার বাহিনী মহাসিনদের বাড়িতে গভীর রাতে আগুন ধরিয়ে দিলে তার বাবা, মা ভাইবোন সবাই পুড়ে মারা যায়। ভাগ্যক্রমে মহাসিন সে রাতে বাড়িতে ছিলো না। ভাড়ায় ফুটবল খেলতে গিয়েছিলো পাশের শহরে। আলী সাহেব ভয়ে যুদ্ধে যাননি কিন্তু মহাসিন বসে থাকেনি। এমন দেশপ্রেমিক আর যাই হোক জঙ্গি হতে পারে না। তবে দুবছর আগে সে মাস ছয়েক কোথায় ছিলো তার কোন হদিস আজো পাওয়া যায়নি। ওকে জিজ্ঞেস করলে বলে, এই ধর দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গিয়ে টিভিটুবি সারাই করলাম আরকি। বিয়েশাদি করেনি মহাসিন। তাই সে কি করলো না করলো তা নিয়ে কেউ ভাবে না। সারাদিন ইলেকট্রনিক সারাইয়ের দোকান নিয়ে থাকে। কেউ আগ্রহী হলে বিনে পয়সায় কাজ শেখায়। এলাকায় কোন সাতপাঁচে নেই। সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। এমন মানুষ আর যাই হোক জঙ্গি হবে না। তবে একটা ব্যাপারে খটকা লাগে আলী সাহেবের। মহাসিন কোন কালেই ইলেকট্রনিকস বুঝতো না। ছাত্র হিসেবেও কোনদিন ভালো ছিলো না। অথচ মাঝখানে ছয়মাস গায়েব থাকার পর ফিরে এসেই দোকান খুলে বসে। ইদানিং ওর কাছে ঢাকা থেকেও মানুষ আসে পরামর্শ নেয়ার জন্য, বড় বড় কারখানার ইঞ্জিনিয়ার আসে তার থেকে কথা শোনার জন্য। ছয় মাসে এতো কিছু কিভাবে হয়? ছয়মাসে এমন ইঞ্জিনিয়ার হওয়া সম্ভব? আলী সাহেবের চোখ জড়িয়ে এসেছে। তিনি ঘুমিয়ে পরেন।
পিয়াস তার খাটে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। এই বাতাসের ভেতর দিয়ে রেডিও সিগনাল হয়ে কথা গুলো কিভাবে দৌড়ায় এটা খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। মেশিন কাক্কু ফ্রিকোয়েন্সী, ওয়েভলেন্থ এসব নিয়ে একদিন গল্প করছিলেন। সবটা না বুঝলেও খুব মজা পেয়েছে পিয়াস। এই যেমন রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী ছাড়া স্যাটেলাইট চলতোই না, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী ওয়েভ শুধু যোগাযোগ এর মাধ্যম হিসেবেই কাজ করে না, এটার এনার্জি দিয়ে প্লাস্টিক, চামড়া এমন আরো অনেক কিছু মোল্ড বা গলানোর কাজে ব্যাবহার করা হয়। এই ফ্রিকোয়েন্সী যত ছোট হয় সে তত দ্রুত বেশি বেগে ছুটতে পারে। লো ফ্রিকোয়েন্সী দিয়ে অনেক দুর বা গভীরে যোগাযোগ করা যায়। সাবমেরিন, প্লেন এসবের সাথে লো ফ্রিকোয়েন্সী কাজে লাগে। আর হাই ফ্রিকোয়েন্সী দিয়ে বেশি দুরে যোগাযোগ করা না গেলেও এটা কাছাকাছি একটা শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যাবস্থা তৈরি করতে পারে। এটা দিয়েই তৈরি হয় ব্লুটুথ আর ওয়াই-ফাই। রেডিও ওয়েভ এর প্রতি ইউনিটের নাম হলো হার্টজ। জার্মান বিজ্ঞানী হেনরীচ হার্টজের নামে এই নাম। হার্টজ হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে একটা ওয়েভের সমান। কিন্তু রেডিও ওয়েভ আসলে কিলোহার্টজ দিয়ে হিসেব করা হয়। কিলোহার্টজ হচ্ছে এক সেকেন্ডে এক হাজার ওয়েভ। মেগাহার্টজ হচ্ছে এক সেকেন্ডে এক মিলিয়ন ওয়েভ আর গিগাহার্টজ হচ্ছে সেকেন্ডে এক বিলিয়ন ওয়েভ। মেশিন কাক্কু বলেছিলেন স্যাটেলাইট আর ইউনিভার্স ওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সী শেখাবেন। পিয়াস চমকে গিয়ে বলেছিলো এলিয়েনদের কথা শোনা যাবে কাক্কু? মেশিন কাক্কু হেসে বলেছিলেন, তুই যেভাবে শিখছিস এলিয়েন পেয়েও যেতে পারিস। আর পেলে একটা মেয়ে এলিয়েন ধরে আনিস তোর কাকী বানাবো। প্রতিদিনের এই রান্না আর পারিনা রে। এলিয়েন মেশিন কাক্কুর বউ হবে শুনে খুব হেসেছিলো পিয়াস। কিন্তু তার মাথায় এলিয়েন ব্যাপারটা ঢুকে গেছে। সত্যিই কি এলিয়েন আছে? ওরা কি পিয়াসকে দেখতে পায়?
আলী সাহেবের ঘুম ভেঙে গেলো। খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। একটা জঙ্গিবাড়ি পুলিশ ঘিরে রেখেছে। তার ভেতর থেকে পিয়াস নাটবল্টু, স্ক্রু-ড্রাইভার বোমা ছুড়ে মারছে। তিনি বিছানা থেকে উঠে দরোজা খুলে পিয়াসে ঘরে গেলেন। দেখলেন পিয়াস বালিশে না শুয়ে খাটের মাঝামাঝি জানালার নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। ওর গায়ে কাথা দিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলেন আলী সাহেব। না, আর যাই হোক পিয়াস কখনো জঙ্গি হবেনা এই বিশ্বাস তার আছে।
সকাল খুব হইহট্টগোল এর শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো পিয়াসের। তখনই দৌড়ে বাসা থেকে বের হতে চাইলে মা বারন করেন। তারপর একতলার ছাদে উঠে পিয়াস ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু মায়ের ডাকাডাকিতে থাকতে না পেরে নিচে নেমে আসে। একটু পরে বাবা আসার পর জানতে পারে ঘটনাটা। মেশিন কাক্কুকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য পুলিশ এসেছিলো। তারা বলতে চাইছিলো মেশিন কাক্কু তাদের ইলেকট্রনিকস এর কাজ শিখিয়ে জঙ্গিদের দলে ভিড়িয়ে দিয়েছেন। আজকাল নাকি বোমা বানাতে এই সমস্ত জিনিস জানা থাকতে হয়। হারিয়ে যাওয়া ছেলেদের বাবা মা ওরাও নাকি এসেছিলো। ওরা আবার বলছে মেশিনকাক্কু ওদের কিডন্যাপ করে থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশ বলছে জঙ্গি হতে পারে। এই দুইপক্ষ কেউ কারো কথা শুনছে না। আবার এলাকার কেউই মেশিন কাক্কুকে জঙ্গি বা কিডন্যাপার বলতে রাজি না। এমনকি হারিয়ে যাওয়া ছেলেদের বাবা মাও কাক্কু কে জঙ্গি না বলে পুলিশকে বলেছেন। তারপরও যখন পুলিশ শুনছে না সবাই মিলে পুলিশকে ঘিরে ধরলো। অবস্থা বেগতিক দেখে বাবা তার কলেজের বন্ধু এসপি কাক্কুকে ফোন করলেন। তিনি এসে সবাইকে শান্ত করলেন আর মেশিন কাক্কুকে তার পারমিশন ছাড়া কোথাও যেতে বারন করলেন। এরপর সবাইকে যার যার বাসায় বা কাজে চলে যেতে বলে তিনি নিজেও চলে গেলেন। বাবা বাসায় চা খাওয়ার কথা বললেও জরুরি কাজ আছে বলে তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। কিন্তু যাবার আগে এসপি আংকেল তার নষ্ট মোবাইলটা ঠিক করার জন্য লুকিয়ে মেশিন কাক্কুর হাতে যে দিলেন এটা বাবার চোখ মোটেও এড়ায়নি। বাবা মুচকি মনে মনে বলেছিলেন, এ যাত্রায় মেশিন মিয়া বেচে গেলো!
দুপুরে ভাত খেয়ে বাবা মা যখন শুয়ে গল্প করছে তখন স্কুলের ব্যাগ খালি করে তার মধ্যে রেডিওটা ভরে মেশিন কাক্কুর দোকানে চলে এলো পিয়াস। কাক্কু তখন খুব মনোযোগ দিয়ে একটা অদ্ভুত যন্ত্র নিয়ে কাজ করছেন। যন্ত্রটা ছোট হলেও দেখতে খুবই অদ্ভুত। একটা ছোট তরকারির বাটির চারদিকে নানান রকম ছোট আইসি বসানো। অনেকগুলো এলইডি লাইটও বসানো আছে। বাটিটা খাড়া করা আর তার নিচে একটা পেন্সিলের মত কাঠি লাগানো। আর নিচে একটা বেইজ আছে। কাজ করতে করতে পেছনে না তাকিয়েই কাক্কু বললেন, কিরে এলি? সারাদিন আসিস নি কেনো? তোর মা ভয় পেয়েছে নাকিরে?
না কাক্কু, আজ সকাল থেকে পরীক্ষার পড়া করছিলাম। বলে পিয়াস।
তোর আর ওসব করে কাজ নেই। তুই তো আমার দোকান চালাবি। তোর বাবার সাথে আমার পাকা কথা হয়ে গেছে। আমি যেদিন থাকবো না সেদিন থেকে এই দোকান তোর। কি বলিস? পারবি না?
খুব পারবো কাক্কু। কিন্তু মা মনে হয় না রাজি হবে! মন খারাপ করে বলে পিয়াস।
হো হো হো হো হো হো… তোর মার জন্য একটা রেগুলেটর বানিয়ে নিস। বেশি রাগ হলেই রেগুলেটর ঘুড়িয়ে রাগ কমিয়ে দিস ফ্যানের বাতাসের মত। এতে তোর বাবাও খুশি হবে! পিয়াস আর মেশিনকাক্কু দুজনেই হেসে ওঠে।
রাত এগারোটা বাজে। চটজলদি খেয়ে পিয়াস তার ঘরে দরোজা লাগিয়ে বসেছে। খাবারের টেবিলে বাবা স্কুলের পরীক্ষার প্রিপারেশন এর কথা জিজ্ঞেস করেছিলো। পিয়াস কোন কথা না বলে জলদি জলদি খেয়ে তার রুমে এসে দরোজা লাগিয়ে বসেছে। সেই থেকে মা এখনো বাবার সাথে চেচামেচি করছে,…….. বেয়াদব ছেলে, দেখেছো দেখেছো? তোমার আসকারা পেয়ে পেয়ে এমন বেয়াদব হয়েছে। আরো হবে। আজকে কথার জবাব দিচ্ছে না, কাল কথা শুনবে না, পরশু তাকাবেও না, তরশু পরীক্ষায় ডাব্বা মারবে, তারপরের দিন গুন্ডাগিরি করবে…!
আহা থামোতো! সপ্তাহের ৫ দিন কি কি হবে বলে ফেলেছো। বাকি দুদিন ছুটি। এবার চুপ কর। শান্তিমত খেতে দাওতো! বাবা প্লেটের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন।
হু, আমি বল্লেই তো সমস্যা। সেই অতটুকু থেকেই তো গায়ে গায়ে রেখে বড় করেছি। এখন হাত পা লম্বা হয়েছে আর তোমার তাল পেয়েছে। এখন তো আর আমার কথা ভালো লাগবেই না। আল্লাহ, আমার ছেলে পরীক্ষায় ফেল করে গুন্ডাপান্ডা হওয়ার আগে যেনো তুমি আমাকে নিয়ে যেও..। মা চেয়ারে বসে কান্না।শুরু করেন। বাবা খাওয়া বাদ দিয়ে উঠে মার কাধে হাত রেখে বলেন, যে ছেলেকে তুমি জন্ম দিয়েছো সেই ছেলে গুন্ডা হয় কেমন করে? আরে তোমার সুন্দর চেহারা পেয়েছে। তোমার মত চোখ। এমন ছেলে কখনো গুন্ডা হয় নাকি? মায়াবী চোখের গুন্ডা দেখেছো কখনো?
পিয়াসের মা কান্না থামিয়ে ফুপাতে ফুপাতে বললেন, বলছো? গুন্ডা হবেনা?
আরেহ না, কি যে বলোনা তুমি!
তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু অমন করে চলে গেলো যে?
হয়তো কোন মেয়ে চিঠিটিঠি দিয়েছে…
কান টেনে ছিড়ে ফেলবো আমি তাহলে। শয়তান ছেলে…
দেখো পিয়াসের মা, এটা আবার বাড়াবাড়ি। আমি কিন্তু তোমাকে এই বয়সের চিঠি দিয়েছিলাম!
হু, চুপ কর। এসব বলে আর ছেলের মাথা খেতে হবে না! তুমি ওই বিলম্বু দিয়ে টক ডালটা নাও। ওটা বেশ হয়েছে।
পিয়াসের বাবা মুচকি হেসে আবার খেতে বসলেন। বউ ঠান্ডার ১০১ টা উপায় নিয়ে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা ছাপা যেতে পারে। কিন্তু আজকে পিয়াসের এমন আচরণটা আসলেই অদ্ভুত। খাবার টেবিলে বাবা ছেলের খুব আড্ডা হয়, ডিবেট হয়, প্রেম রোমান্সের আলাপও হয়। আলী সাহেব মুক্তমনা মানুষ। তিনি ছেলেকে সেভাবেই বড় করতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু পিয়াস আজকে পুরো খাবার সময় কোন কথা না বলে, কথার উত্তর না দিয়ে একপ্রকার দৌড়েই নিজের ঘরে গিয়ে দরোজা লাগিয়ে দিলো। তিনি মনে মনে বললেন, ছ্যাকা খেয়েছে নাকি! খেয়াল রাখতে হবে!
স্কুল ব্যাগটা খুলে রেডিওটা খাটের উপরে নিয়ে বসলো পিয়াস। তারপর ব্যাগ এর ভেতর থেকে বের করলো মেশিন কাক্কুর বানানো ওই অদ্ভুত ছোট যন্ত্রটা। তিনি নাকি এটা পিয়াসের জন্যই বানিয়েছেন। পিয়াস রেডিওফ্রিকোয়েন্সী বিষয়টায় অনেক এগিয়েছে বলে কাক্কু তাকে এটা গিফট করেছেন। এই যন্ত্রটা নাকি একটা এন্টেনা। আজকে কাক্কু তার রেডিওটা খুলে দেখেছেন। পিয়াস নিজে থেকে রেডিওটার যেসব যন্ত্রপাতি লাগিয়েছে সেসব দেখে খুব অবাক হয়েছেন। তিনি রেডিওটা অন করে নবটা ঘুরিয়েই পিয়াসকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, তুই-ই আমার পঞ্চতন্ত্র! একমাত্র তুই পারবি! আজকে আমি বলছি, একদিন তুই হবি মেশিন কাক্কু! তারপরে তিনি পিয়াসকে এন্টেনা টা দেন। বলেন এটা হচ্ছে ইউনিভার্স এন্টেনা। এটার সাহায্যে তুই যে কোন ওয়েভলেন্থে যেতে পারবি, কথা শুনতে পারবি, মাইক্রোফোন লাগিয়ে কথা বলতেও পারবি মানে ফ্রিকোয়েন্সী পাঠাতে পারবি। কথা গুলো বিশ্বাস হয়না পিয়াসের। কিন্তু মেশিন কাক্কুর কথা অবিশ্বাস করার উপায়ও নেই। সে রেডিওটার সাথে নতুন এন্টেনাটা কানেক্ট করে। তারপর পাওয়ার ব্যাংক সেট করে রেডিওটা অন করে। কানে হেডফোন পরে নেয় আর খুব কম সাউণ্ড দিয়ে ফ্রিকোয়েন্সী নবটা আসতে আসতে ঘোড়াতে থাকে। প্রথমেই ট্রাফিক পুলিশের ফ্রিকোয়েন্সী পাওয়া গেলো-
হ্যালো স্যার, না বুইঝা এসি স্যারের শালীর বান্ধবীর বোনের গাড়িতে রেকার লাগায় দিছি। এখনতো স্যারের শালী ফোন কইরা মাথার মধ্যে জ্যাম লাগায় দিছে। কি করবো স্যার? ওভার
কার শালী? ওভার
এসি স্যারের। ওভার
শালীর নাম কি? ওভার
স্যার নামতো বলেনাই। ওভার
এসি স্যারের তো তিন বউ, এর মধ্যে একজন জেলে, অন্যজন পালায় গেছে। কোন জনের শালী বুঝতে পারলে গুরুত্ব বুঝা যাইতো। ওভার
তাইলে স্যার ওয়েট করি। ওভার
পিয়াসের খুব হাসি পায়। বাহ বেশ মজা তো! সে আবার নবটা ঘোরাতে থাকে, হঠাৎ কথা শুনতে পেয়ে থেমে যায়।
স্যার টাউট টারে পাইছি স্যার। ওভার
মেয়েটার ডেডবডি কই? ওভার
ডেডবডি এখনো কার্নিশে আছে স্যার, ফায়ার ব্রিগেড খবর দিছি স্যার, ইন দা ওয়ে। ওভার
সাথে আর কে কে ছিলো? বলছে কিছু? ওভার
সে সময় পাইলাম কোথায় স্যার, অলরেডি একডজন কল পাইছি স্যার ছেড়ে দেয়ার জন্য। ওভার
কেইস টা খুব জটিল, সাবধানে হ্যান্ডেল করতে হবে। ওভার
ইয়েস স্যার, ওভার
পলিটিক্যাল ম্যাটার জড়িত আছে। অনলাইনেও বেশ নাড়াচাড়া হচ্ছে। উই কেন নট লেট পিপল প্লে উইথ আওয়ার ইমেজ। ওভার
ইয়েস স্যার, ওভার
গায়ে হাত দিও না, ধমক ধামক দিয়ে হাল্কা করে জানতে চাও আর কে কে ছিলো রেইপ করার সময়। ওভার
ইয়েস স্যার, তবে আপনার ছেলের কথা শুরুতেই বলছে স্যার। ওভার
ব্লাডি বাস্টার্ড, একে পেছনের রাস্তায় নিয়ে সি অফ করে দাও। এ অনেক বড় গেম খেলছে। ডু ইট নাও। বাকি আমি দেখছি। ওভার এন্ড আউট।
পিয়াস কথাগুলো পুরোপুরি বুঝতে পারলো না। সে আবার নব ঘোরাতে লাগলো।
হ্যালো, নাইন নাইন নাইন প্লিজ….
দিস ইস নাইন নাইন নাইন, হাউ মে আই হেল্প ইয়ু ম্যাম?
মাই লিটল বেবি ইস নট এরাউন্ড, হি ওয়াজ হিয়ার… ওহ মাই গড..
ম্যাম প্লিজ কাম ডাউন, উই আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়োর প্রবলেম। হোয়াটজ ইয়োর বেইবিজ নেইম?
ওহ! হিজ নেইজ ইস টাকি, হি ইজ জাস্ট ২….. ওহ জিসাস হোয়ার ক্যান আই ফাইন্ড হিম….
ম্যাম প্লিজ কাম ডাউন, টাকি ইজ হিস মিডল নেইম?
নো নো, টাকি হিজ অনলি নেইম।
ওকে ম্যাম, উই আর সেন্ডিং আ টিম দেয়ার। ইন দা মীন টাইম প্লিজ চেক ইয়োর হাউজ এগেইন…
আ আ আ আ আ…. ওহ মাই গড ওহ মাই… ওহ লর্ড…
ম্যাম ম্যাম, হোয়াট হ্যাপেন্ড….
টাকি ইজ অনদা ট্রি….
ম্যাম, আর ইয়ু টেলিং মি ইয়োর টু ইয়ার ওল্ড সন ক্লাইম্ব আপ আ ট্রি?
নো নো, টাকি ইজ মাই বেইবি ক্যাট ইয়ু মোরান….
হাহাহাহাহাহ…. পিয়াস হাসতে হাসতে আবার নব ঘোরাতে লাগলো…
হিউস্টন, দিস ইস অরবিট সিক্স ফ্রম আই এস সি। ওভার
দিস ইস হিউস্টন। কংগ্রাচুলেশনস অরবিট সিক্স। ইউ হ্যাভ রিচড দা হাইয়েস্ট প্লাটফর্ম দেট ইজ ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টার। হাউ আর ইয়ু অল গাইজ? ওভার
সাউন্ড এন্ড ক্লিয়ার হিউস্টন। উই কংগ্রাচুলেট ইউ টু। উইদাউট ইউ গাইজ ইট ওয়াজ নট পসিবল এট অল। ওভার
অরবিট সিক্স ইউ হ্যাভ অনলি এইট আওয়ারস টু প্রপেয়ার। আনলোড অল ফ্রম দা বার্ড ডাবল চেক মেরিট লিস্ট। বাই জিরো টু টুয়েলভ ইউ মাস্ট বি ওয়াকিং ইনদা স্পেইস। ওভার
লাউড এন্ড ক্লিয়ার হিউস্টন। ওভার এন্ডআউট।
নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিলো না পিয়াস। এই মাত্র যা শুনলো তা স্পেস স্টেশনের সাথে নাসার কথা বার্তা! এইতো দুদিন আগে নাসা পৃথিবী থেকে একটা রকেট পাঠিয়েছে। সাথে তিনজন মানুষ গেছে। এরা থাকবে আর ওখানে থাকা বাকি তিনজন চলে আসবে। এই মিশনের নাম দেয়া হয়েছে অরবিটসিক্স। পিয়াস একটু ধাতস্থ হয়ে নিয়ে মনে মনে খুব কষ্ট পেলো মেশিন কাক্কুকে নিয়ে বাজে কথা ভাবার জন্য। মেশিন কাক্কু আসলেই জিনিয়াস! পিয়াস নবটা আরো একটু ঘোরালো…। তার রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সী স্পেস স্টেশন ছাড়িয়ে আরো দুরে যাচ্ছে। সেকেন্ডে বিলিয়ন ওয়েভের থেকেও বেশি। পিয়াস আরো একটু নব ঘোরালো। ফ্রিকোয়েন্সী এবার এই সৌরজগত পার হয়ে।আরো দুরে চলে গেছ। এখন শুধু অনেক পরে পরে ইকো টাইপ শব্দ হয়ে যাচ্ছে। তারমানে পিয়াস এখন মহাশুন্যের অনেক অনেক দুরে। মেশিন কাক্কু আসলেই একটা জিনিয়াস!
পিয়াস এবার হেডফোনের জ্যাকটা রেডিও থেকে খুলে এন্টেনায় লাগায়। এবারে তার হেডফোনের মাইক্রোফোন অন হয়েছে। পিয়াস দুবার হ্যালো হ্যালো করে। হেডফোনে সে তার হ্যালো হ্যালো শুনতে পায়। সে বুঝতে পারে মাইক্রোফোন কাজ করছে। সে আবার বলে, হ্যালো…. হ্যালো…. ওভার!
পিয়াস! ঘুমিয়ে পরেছিস?
বাবা!
পিয়াস জলদি সমস্ত কানেকশন ছুটিয়ে রেডিওটা টেবিলে রেখে এন্টেনাটা স্কুল ব্যাগের মধ্যে রেখে দরোজা খুলে দেয়। বাবা ঘরের ভেতরটায় হাল্কা উঁকি দিয়ে দেখে পিয়াস কে বললেন,
উতে ভেয়াবসে পারইয়াদকে?
পিয়াস জানে এটার মানে। বাবা রাশিয়ান ভাষায় জানতে চেয়েছেন সব ঠিকঠাক আছে কিনা। পিয়াস বলে, উমিনিয়াভসে নরমালনো, বাবা। মানে আমি ঠিক আছি।
বাবা আরেকবার ঘরের ভেতরটা খেয়াল করে বললেন, আই এম অলওয়েজ উইথ ইউ মাই সন। হোয়েন এভার ইউ নিড মি…
লাভ ইয়ু বাবা।
তো ঠিক হ্যায়, তোম সো যাও।
আচ্ছা বাবা। গুন্নাইট।
বাবা চলে গেলে আবার ঘরে ঢোকে পিয়াস। নাহ, আজ আর এসব নিয়ে বসবে না। এখন সে ঘুমাবে। দরোজা আর লক করলো না। দরোজা লক করে ঘুমানো তার নিষেধ। বাবা বলেছেন বড় হলে সে দরোজা লক করে ঘুমানোর পার্মিশন পাবে। বাবা তাকে ছোট থেকেই ইংরেজি আর রাশিয়ান ভাষা শেখাচ্ছেন। ইদানিং মা কে রাগানোর জন্য হিন্দিতে কথা বলেন। মা হিন্দি সিরিয়াল দেখেও এখনো হিন্দিতে কথা বলতে শেখেননি। তাই মাঝে মাঝে মা কে খেপানোর জন্য বাবা পিয়াসের সাথে হিন্দিতে কথা বলেন। পিয়াস শুয়ে পরেছে। তার বিশ্বাসই হচ্ছেনা যে সে নাসা আর অরবিট সিক্স এর মধ্যকার কথা শুনেছে!
(২)
নাসার হেডকোয়ার্টারে মিটিং বসেছে। এটা কোড ফাইভ মিটিং। যত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং হয় এটা তাদের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সবাই গম্ভীরমুখে বসে আছে। মিটিংয়ে সিআইএ, এফবিআই সহ খুব বড়সড় হোমড়াচোমরা লোকজন বসে আছে। মিটিংয়ের বিষয় খুব বিপদের। কিছুক্ষন আগে কেউ একজন তাদের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সীতে ঢুকে পরেছিলো আর একটা বাচ্চা কন্ঠ কয়েকবার হ্যালো হ্যালো বলেছে। এই ফ্রিকোয়েন্সী এতটাই নিরাপদ আর গোপনীয় যে এখানে যে কেউ ঢুকতে পারবে না। চেষ্টা করলেই তার পিন পয়েন্ট লোকেশান ট্রেস হয়ে যাবে। কিন্তু এই এই ঘটনার পরও লোকেশান তো দুর, ফ্রিকোয়েন্সী পর্যন্ত ট্রেস হয়নি। সয়ং প্রেসিডেন্ট কেও জানানো হয়েছে ব্যাপারটা! এর মধ্যে রাশিয়ার স্পেস সেন্টার থেকেও ফোন এসেছে। তারাও নাকি শুনতে পেয়েছে এই হ্যালো হ্যালো। ইন্ডিয়া থেকেও একই ফোন পেয়েছে নাসা। সবাই অবাক। একই সময় একটা সিঙ্গেল ফ্রিকোয়েন্সী কিভাবে তিনটি আলাদা আলাদা ফ্রিকোয়েন্সী এন্টারাপট করতে পারে আর পরে তার কোন ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না! এলিয়েন তো আর বাচ্চা কন্ঠে হ্যালো বলবে না। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব! একই সাথে গোটা আমেরিকা, রাশিয়া আর ইন্ডিয়ায় রেড এলার্ট জারি হয়ে গেছে। এই তিন দেশের গোয়েন্দা দফতরের চিকন ঘাম ছুটে গেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলেও হয়তো এমন হতো না! এতো বিশ্বস্ত ফ্রিকোয়েন্সীতে কেউ ঢুকতে পারলে তাদের পারমানবিক অস্ত্রও নিরাপদ নয়। নিরাপদ না দেশের নিরাপত্তাও!
আজ শনিবার। একটু দেরিতেই ঘুম থেকে উঠলো পিয়াস। সারারাত অদ্ভূত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে সে। নাস্তা সেরে টিভির সামনে বসলো সে। টিভি অন করতেই দেখলো টিভিতে দেখাছে অরবিট সিক্স সাক্সেসফুলি ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টার এ পৌছেছে আর পরবর্তী আট ঘন্টা পর কিছুক্ষন আগে তিনজন স্পেস ওয়াক করে কিছু রিপেয়ারের কাজ শেষ করে আবার স্পেস সেন্টারে প্রবেশ করেছে। পিয়াস থ মেরে বসে আছে। এইকথা গুলোই তো সে কাল রাতে শুনেছে! পিয়াস জলদি বাসার কাপড় পাল্টে বাইরে যাবার কাপড় পড়ে নিল। তারপর চলে গেলো মেশিন কাক্কুর দোকানে।
কিরে হ্যালো হ্যালো ওভার সাহেব?
জ্বী কাক্কু?
অমন করে কেউ হ্যালো হ্যালো ওভার বলে?
কাক্কু! তুমি শুনেছো কিভাবে?
হো হো হো হো, ভুলে গেলি? আমি তোর মেশিন কাক্কু! আমার কি এমন কোন রেডিও নেই যেটাতে তোর এন্টেনা ধরা যাবে না?
কিন্তু কাক্কু আমি কালকে নাসা আর অরবিট সিক্স এর মধ্যে যে কথা হয়েছে সব শুনেছি!
হুম, তাতো হবেই। তুই নিজে নিজে যেভাবে পার্টস গুলো রেডিওতে বসিয়েছিস তাতে তোর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী এতো শক্তিশালী হয়েছে। আমি জানিরে, তুই আমার পঞ্চতন্ত্র!
পঞ্চতন্ত্র মানে কি কাক্কু?
তুই হলি সেরা পাঁচ নম্বর!
বাকি চার জন কে কাক্কু?
থাক। ওসব আর শুনতে হবে না। তোকে তো আরো কাজ করতে হবে। এই যে তুই বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সীতে চলে যাচ্ছিস, পরিচিত ভাষা বলে তুই সব বুঝতে পারছিস। আরো দুরের কোন সিগনাল পেলে সেটার মিনিং ধরবি কেমন করে?
তাহলে কি করতে হবে কাক্কু?
এই পিয়াস! তুই এখানে আর তোর মা বাড়ি মাথায় তুলেছে তুই হারিয়ে গেছিস বলে। জলদি বাড়ি চল! পিয়াসের বাবা খুব বিরক্ত চেহারা নিয়ে মেশিন কাক্কুর দোকানে দাড়িয়ে আছেন।
চল বাবা, আসি কাক্কু।
হুম, যা। আপাতত একটা রেগুলেটর বানা। এইটাই এখন জরুরী, বুঝেছিস?
জ্বী কাক্কু, হি হি হি!
পিয়াস বাসায় একা। বাবা মা এক আত্মীয়ের বাসায় গেছেন। পিয়াস সবার বাসায় যায় না। বিশেষ করে যেসব বাসায় তার সমান কেউ নেই সেসব বাসায় তো না ই। কাক্কুর দোকান থেকে আসার পথে বাবা জিজ্ঞেস করেছিলো, কিসের রেগুলেটর রে? পিয়াস তখন রেগুলেটর এর ব্যাপারটা বাবাকে বলতেই বাবা হেসে খুন! বললেন, তুই যদি বানাতে পারিস তাহলে তুই যা চাবি তাই দেব। হি হি হি হি, বাবা মাকে অনেক ভয় পায়! ওরা দুজন বেড়াতে গেলো মাত্র আধা ঘন্টা হয়েছে। পিয়াসের খুব বিরক্ত লাগতে শুরু করলো। তারপর সে তার রুমে গিয়ে রেডিওটা বের করলো। স্কুল ব্যাগ থেকে এন্টেনা আর হেড ফোনটা বের করলো। তারপর পড়ার টেবিলে সব সেট করে রেডিও অন করলো। কাল রাতে ফ্রিকোয়েন্সী নবটা যেখানে ছিলো আজ ওখান থেকেই সামনের দিকে ঘোরাতে শুরু করলো। কিন্তু অনেক পরে পরে একটা হালকা বিপ বিপ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেলো না। পিয়াস বুঝতে পারলো তার রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী এখন এই ছায়াপথ ছেড়ে আরো দুরে চলে গেছে। আচ্ছা, ওখানে কি এমন কেউ আছে যা তার কথা বুঝতে পারবে? ওরা কি বাংলা কথা বুঝবে? পিয়াস ঠিক করলো সে এই বিপ বিপ শব্দ করা ফ্রিকোয়েন্সিতে একটা বার্তা পাঠাবে। এই মহাকাশে যদি আর কেউ থাকে তাহলে নিশ্চয়ই সাড়া দিবে। কিন্তু কি বলবে সে? অনেকক্ষন চিন্তা করে সে একটা লাইন ঠিক করলোঃ
আসসালামুআলাইকু, আমি বাংলাদেশ থেকে বলছি। গ্রহ পৃথিবীর একটি ছোট দেশ থেকে। আমার কথা যদি কেউ শুনতে পান তাহলে উত্তর দিন।
কিন্তু এই বাংলা যদি এলিয়েনরা বুঝতে না পারে তখন কি হবে? অবশ্য আব্বু তাকে ইংলিশ রাশিয়ান আর হিন্দি ভাষাও শিখিয়েছেন। এই তিন ভাষাতেও বলা যায়।
পিয়াস কাগজ কলম নিয়ে বাংলা, ইংরেজ, রাশিয়ান আর হিন্দি ভাষাতে কথাটা লিখে ফেললো। তারপর বেশ কয়েকবার প্রাকটিসও করে নিলো। সিনেমায় সে দেখেছে। এসব কথা গুলো থেমে থেমে বারবার বলতে হয়। অনেকবার বলতে হয়।
পিয়াস আবার রেডিওটা অন করে হেডফোনটা কানে লাগিয়ে তার ছোট মাইক্রোফোনটা মখের কাছে এনে ধরেছে। তারপর বলতে শুরু করলো-
আসসালামুআলাইকু, আমি বাংলাদেশ থেকে বলছি। গ্রহ পৃথিবীর একটি ছোট দেশ থেকে। আমার কথা যদি কেউ শুনতে পান তাহলে উত্তর দিন।
hi there, I am from Bangladesh. A little country of planet Earth. If you can listen me please response.
প্রিভিয়েত ইয়েজ বাংলাদেশ। মালিয়াংকায়া ইস্ত্রায়ানা প্লানেতা জিমলা। ইয়েস্লিভি মোজেতে স্লুসাত মোনেয়া, পাজাউস্তা আতভেত।
সালাম, মেয় বাংলাদেশ সে হু। গৃহ পৃথিবী কা এক ছোটাসা দেশ। ইয়া আপ মুঝে সুন সাকতে হ্যায় তো কৃপা জওয়াব দে।
রেডিও বন্ধ করে পিয়াস প্লেটে ভাত নিয়ে টিভির সাম্নে বসেছে। গত এক ঘন্টা টানা সে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সীতে কথাটা বলে গেছে। এখন অপেক্ষার পালা। কেউ থাকলে নিশ্চয়ই উত্তর দিবে।
সেদিন আর কিছু হলো না। বাবা মা বাসায় ফিরে এলেন। পিয়াস পরীক্ষার পড়া পরছিলো। রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পুরো সপ্তাহেই তার পরীক্ষা। বাবা বলেছেন এবার এইটে ভালো রেজাল্ট করলে তাকে কম্পিউটার কিনে দেবেন। চেষ্টা তো করতেই হবে। যদিও বাবা বলেননি ভালো রেজাল্ট মানে কতটুকু ভালো নাম্বার, তবুও পিয়াস জানে মোটামুটি ভালো হলেই বাবা খুশি হবেন। যদিও মা ফার্স্ট সেকেন্ড ছাড়া খুশি হয়না মোটেও! সে রাতে শুধু ১১টার দিকে খুব মেঘ ডেকেছে। গ্রুম গ্রুম করে মেঘ ডেকেছে। যদিও বারোটার আবার যা তাই।
পরদিন সকালে পিয়াস পরীক্ষা দিতে গেলো। এক দিনে দুটো করে পরীক্ষা। প্রশ্ন পেয়ে সে খুব অবাক হল। এতো সহজ কখনো কোন প্রশ্ন হয়! সে আশেপাশে বন্ধুদের দিকে তাকালো, দেখলো কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে আবার কেউ মাথা চুলকাচ্ছে আবার কেউ কেউ গালে হাত দিয়ে মন খারাপ করে বসে আছে। আরে অবাক বিষয়! প্রশ্ন এতো সহজ তারপরেও ওরা এমন করছে! পিয়াস লিখতে বসে গেলো।
পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরলো পিয়াস। আসার সময় শুধু দেখলো মেশিন কাক্কুর দোকানের শাটার নামানো। নিশ্চয়ই কাক্কু কোথাও বেড়াতে গেছেন। সেদিন রাতেও ঠিক ১১ টায় গ্রুম গ্রুম শব্দে খুব মেঘ ডাকলো। আবার বারোটার দিকে সব যেমন ছিলো তেমন। পরদিন সোমবার পিয়াসের ইংরেজি ও অংক পরীক্ষা। পিয়াস আজ তাড়াতাড়িই শুয়ে পরলো।
ইংরেজি আর অংক পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরেছে পিয়াস। আজও প্রশ্ন সহজ ছিলো কিন্তু বাকিদের জন্য কেন যেনো কঠিন হয়ে গেছিলো! আজও আসার সময় কাক্কুর দোকান বন্ধ পেলো পিয়াস। বাবাকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, হুম, আমিও তাই দেখলাম দোকান বন্ধ। গেছে হয়তো কোথাও ঘুরতে!
এভাবে পুরো ৫ দিন কেটে গেলো। আজ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে দশটা। একটু আগে ভাত খেয়ে নিজের ঘরে এসেছে পিয়াস। এই কদিন প্রতিদিনই ফেরার সময় মেশিন কাক্কুর দোকান বন্ধ পেয়েছে। প্রতিদিনই রাত ১১ টায় প্রচন্ড মেঘ ডেকেছে আবার ঠিক এক ঘন্টা পর পুরো আকাশ পরিস্কার। বাবা বলেছেন এটা জলবায়ু পরিবর্তনের ফল। পরীক্ষা শেষ। পিয়াস আবার আগের মত নিজের ইচ্ছে মত চলতে পারবে। সে তার ঘরের দরোজা বন্ধ করলো।
পিয়াস! খবরদার দরজা বন্ধ করে ঘুমাবি না! মা বললেন।
আচ্ছা মা, মনে আছে। আমি ঘুমাবার আগে খুলে দেবো।
পিয়াস রেডিও খুলে বসলো। আজ হঠাৎ কেনো যেনো এন্টেনার এলইডি বাতিগুলোর রং পরিবর্তন হচ্ছে। এতোদিন শুধু নীল রং ছিলো। আজ হঠাৎ লাল সাদা রং এর আলো দিচ্ছে লাইট গুলো। পিয়াস অবাক হয়ে হেডফোনটা কানে লাগায়। ঠিক তখনি বাইরে প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত হয়। গ্রুম গ্রুম শব্দে মেঘ ডাকতে শুরু করে। পিয়াস ভলিউমটা বাড়িয়ে দেয়। তখনই শুনতে পায় শব্দটা।
বিপ বিপ, বিপ বিপ বিপ বিপ বিপ, বিপ, বিপ বিপ বিপ, বিপ বিপ, বিপ বিপ, বিপ বিপ বিপ, বিপ, বিপ বিপ বিপ
পিয়াসের বুক ধরফর করে ওঠে। এটা কি এলিয়েন দের পাঠানো কোন ম্যাসেজ? সে ভয় পেয়ে রেডিও বন্ধ করে দরজার লক খুলে শুয়ে পরে। একটু আগে মেঘডাকাও বন্ধ হয়ে গেছে।
নাসার হেডকোয়ার্টারে আবার বিশাল মিটিং বসেছে। গত কয়েকদিন টানা মিটিং হচ্ছিলো। সবাই নড়ে চড়ে উঠলো যখন ওরা ফ্রিকোয়েন্সী হ্যাকারের কন্ঠ শুনতে পেরে নিশ্চিত হলো যে হ্যাকার নেহায়েত একটি বাচ্চা ছেলে আর যে কিনা ইন্ডিয়ার প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এ থাকে এবং এই পুরো ফ্রিকোয়েন্সী হ্যাকিংটা সে ওখানে বসেই করেছে। এর পরপরই তারা তাদের বাঘা বাঘা সব এজেন্টদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। যেভাবেই হোক তাদের এই ছেলেকে তাদের চাই। ইন্ডিয়া বা রাশিয়ার আগে এই ছেলেকে তাদের দরকার। বাংলাদেশ এই ছেলের প্রয়োজন কখনোই বুঝবে না। কিন্তু সমস্যা হলো এই ছেলের পিনপয়েন্ট লোকেশান ট্রেস করা যাচ্ছে না। ছেলেটার কাছে গত কয়েকদিনে একটা কোডেড ম্যাসেজ বারবার আসছে। কিন্তু ছেলেটা ম্যাসেজ রিসিভ করছিলো না। আজ রিসিভ করেছে। তাতেই তার লোকেশন এর রেডিয়াসটা পাওয়া গেছে। এখন শুধু বাকি পিনপয়েন্ট করা। সে কোন রিপ্লাই দিলেই তা জানা যাবে। ওই রেডিয়াসে বাঘা বাঘা সব এজেন্ট চলে গেছে। যে কোন পরিস্থিতি তারা সামাল দিতে পারদর্শী। যতদুর জানা গেছে ইন্ডিয়া আর রাশিয়া তাদের এজেন্টও পাঠিয়েছে। ছেলেটিকে নিয়ে যেতে নয়, মেরে ফেলতে!
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেছে পিয়াসের। মেশিন কাক্কু বলেছিলো একটা কাজ করা এখনো বাকি। সেটা কি? কাক্কু কি তাহলে এই ম্যাসেজ ডিকোডিং যন্ত্র বানানোর কথা বলেছেন? কিন্তু মেশিন কাক্কু ছাড়া সে যন্ত্র বানাবার পার্টস পাবে কোথায়! সারারাত ঘুম হলোনা পিয়াসের। সে শুধু এপাশ ওপাশ করেছে আর বিপ বিপ শব্দ গুলোর মানে চিন্তা করেছে। শেষ রাতে তার মনে হলো এটা মোর্স কোড হতে পারে। এটা পৃথিবীর আদি কোডিং সিস্টেম। এবং এটা প্রাইমারি লেভেলের কোডিং। বারমুডা ট্রায়াংগেল এর একটা গল্পে বাবা এই কোডিং এর কথাই বলেছিলেন। কিন্তু এটা ডিকোড করার যন্ত্র পাবে কই সে? এসব ভাবতে ভাবতে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে গেলো পিয়াস।
শুক্রবার সকাল ১১ টা। পিয়াস মাত্র নাস্তা করে টিভির সামনে বসেছে। বাবা এসে জলদি রেডি হতে বললেন। আজ উনার এক বন্ধুর মেয়ের বিয়ে। সবাইকে দাওয়াত দিয়েছে, না গেলে খারাপ দেখাবে। কি আর করা, পিয়াস তার ঘরে গিয়ে নতুন কাপড় বের করে গোসল করে নিল। তারপর তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে দেখে বাবা মা দুজনই রেডি হয়ে বসে আছে। তাকে দেখেই মা বললেন, দেখেছো দেখেছো, চুলটাও ঠিক মত আচঁড়ায় নি। বাবা মার কথায় পাত্তা না দিয়ে বললেন, চল সবাই বের হই। পৌছাতেই তো ঘন্টা দুই লেগে যাবে।
পিয়াসরা বিয়ের দাওয়াত আর বেড়ানো শেষ করে ফিরলো তখন বাজে রাত সাড়ে আটটা। পিয়াস তার ঘরে গিয়ে জামা কাপড় পাল্টে বিছানায় শুতেই তার মাথায় আসলো ব্যাপারট। এমন ওয়েবসাইট তো থাকতেই পারে যেখানে সাউন্ড শুনিয়ে মোর্সকোড ডিকোড করা যায়। লাফ দিয়ে উঠলো পিয়াস। দৌড়ে বাবার কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে এলো। তারপর দরোজা বন্ধ করে গুগল করতেই তেমন একটা পেইজ সামনে এলো। এখন শুধু রেডিও অন করে বিপ বিপ শব্দটা মোবাইলের মাইক্রোফোনের কাছে শোনালেই ওই পেইজে ম্যাসেজটার ডিকোডিং দেখাবে। পিয়াস রেডিও ছেড়ে ঠিক এমনটাই করলো। সাথে সাথেই বিপ বিপ এর মানে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখা গেলো। ওখানে লেখাঃ “রুফটপ ইলেভেন পিএম”!
সঙ্গে সঙ্গে সব পরিস্কার হয়ে গেলো পিয়াসের। সেই শনিবার রাতে তার ম্যাসেজ পাঠাবার পর থেকেই প্রতি রাতে ঠিক ১১ টায় গ্রুম গ্রুম মেঘ ডাকার শব্দও তার কাছে পরিস্কার হয়ে গেলো। এলিয়েনরা তার কাছে এসেছে প্রতি রাতে! সে ছাদে ওঠেনি বলে কিছুক্ষন থেকে চলে গেছে। এভাবে তারা প্রতিদিন এসেছে। তারমানে আজ রাতেও আসিবে! পিয়াস জলদি মোবাইলে একটা টেক্সট টাইপ করে। সেখানে লেখা আছে-
“টু নাইট ইলেভেন পিএম”
তারপর এটার মোর্স কোড অডিও ইন্টারনেটে কনভার্ট করে মোবাইলে ডাউনলোড করে রেডিও অন করে সেই ফ্রিকোয়েন্সীতে শুনিয়ে দেয়। এখন রাত ৯ টা বাজে। আর মাত্র দুই ঘন্টা বাকি। খুব অস্থির লাগতে থাকে পিয়াসের।
আমেরিকা, রাশিয়া আর ইন্ডিয়াতে একটা ঝড় বয়ে গেছে। এই মাত্র পিনপয়েন্ট লোকেশন পাওয়া গেছে ছেলেটার। সে মোবাইলের একটা ওয়েবসাইটে ম্যাসেজটা ডিকোড করে আবার আরেকটা ম্যাসেজ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সীতে থ্রো করেছে। আজকে রাত ১১ টা কে সে কনফার্ম করেছে। কি হবে আজকে রাত ১১ টায়? এই তিন দেশই তাদের এজেন্টদের পিয়াসদের বাড়ির দিকে ছুটতে অর্ডার করেছে। তিন দেশই চায় মিশন সাকসেসফুল যেনো হয়।
রাত দশটায় বাবা এসে জানতে চাইলেন পিয়াস ভাত খাবে কিনা, পিয়াস খাবে না জানালো আর মোবাইলটা আজ রাতের জন্য তার কাছে রাখতে পারে কিনা জানতে চাইলো। বাবা মুচকি হেসে বললেন, কেউ কল দিবে নাকি রে? দেখিস, বেশি রাত জাগিস না! আর শোন, আমরা খেয়ে শুয়ে পরলাম। আজ সারাদিন ঘোরাঘুরি করে তোর মাও খুব টায়ার্ড।
বাবা চলে গেলেন। পিয়াস ঘরে পায়চারী করছে। এর মধ্যে লুকিয়ে সে ছাদের পানির ট্যাংক এর নিচে রেডিও আর এন্টেনাটা রেখে এসেছে। রাত এখন সাড়ে দশটা বাজে। পিয়াস বাবা মার ঘরে দিকে উকি দেয়। দেখে দরজা বন্ধ। পিয়াস ড্রইং রুমের লাইট নিভিয়ে আস্তে করে দরজা খুলে ছাদের সিড়ির দিকে হাটে। খুব সাবধানে সিড়ি বেয়ে ছাদে ওঠে। পুরো ছাদে হালকা একটা আলো। ঘড়িতে রাত দশটা পঞ্চান্ন মিনিট। ছাদের ঠিক উপরের আকাশে হঠাৎই মেঘ জমতে শুরু করেছে। আশেপাশে আর কোথাও কোন মেঘ নেই। মেঘ গুলো খুব দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেছে আর গ্রুম গ্রুম শব্দ হচ্ছে। পিয়াস রেডিও অন করে এন্টেনা সেট করে তার বাবার মোবাইলটা দিয়ে তার সোর্সকোডটা পাঠাতে লাগলো। মেঘগুলো প্রায় তার ছাদের উপরে এসে গেছে। পিয়াসদের বাড়ির চারদিকে দুটো আমগাছ আর দুটো কাঠাল গাছ আছে। চারটা গাছই ছাদের থেকে লম্বা। পিয়াসের মনে হলো প্রতিটা গাছেই একজন করে মানুষ বসে আছে। এর মধে দুজন তার দিকে কি যেনো একটা তাক করে আছে। ছাদের উপরে ধোয়ার মত কি যেন একটা দেখা যাচ্ছে। আস্তে আস্তে আরো গাঢ় হচ্ছে ধোয়া। পিয়াস এখন আর গাছ গুলোও দেখতে পাচ্ছে না। গ্রুম গ্রুম শব্দে এখন তার কানে তালা লেগে যাচ্ছে। পিয়াস উপরের দিকে তাকাতে পারছে না বিদ্যুৎ চমকের আলোর জন্য।
হঠাৎই ছাদের চার দিকে কারা যেন এসে হাজির হলো। পিয়াস আবছা আবছা দেখতে পেলো তাদের হাতে বন্দুক। ওরা তার দিকেই এগিয়ে আসছে। এরই মধ্যে কেউ একজন তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরতেই চারদিকে চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানি খেলে গেলো আর বিকট শব্দ হলো। আশেপাশের পুরো এলাকা কেপে উঠলো। যারা বারান্দা বা জানালার কাছে ছিলো একমাত্র তারাই দেখলো পিয়াসদের বাড়ির ছাদে ভয়াবহ বজ্রপাত হলো!
ভোরবেলা থেকেই পিয়াসদের বাড়ি ঘিরে রেখেছে পুলিশ আর আর্মি। রাতে বজ্রপাতের পর থেকেই পিয়াসকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির ছাদে দুজনের ডেডবডি পাওয়া গেছে। এদের একজন রাশিয়ান এবং অন্যজন ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা। এরা দুজনেই বজ্রপাতে মারা গেছে। ছাদে আরো পাওয়া গেছে একটি সম্পুর্ন পুড়ে যাওয়া পুরান রেডিও আর একটা গোল তরকারির মতন বাটি। পিয়াসের বাবার মোবাইলটাও পাওয়া গেছে কিন্তু ওটার কোন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু গতকাল রাতের ওই বজ্রপাতে সময় কোন এক অজানা কারনে মেশিন কাক্কুর দোকানটা পুরো ধসে পরেছে। এলাকায় তুমুল উত্তেজন। কেউ বুঝতে পারছে না কি ঘটেছে। দলে দলে মানুষ শুধু পিয়াসদের বাড়ির দিকে যাচ্ছে।
এতো মানুষের ভীড়ে শুধু একজন মানুষ উল্টোদিকে হেটে যাচ্ছ। খুব ভালো করে খেয়াল করলে হয়তো বোঝা যাবে সে পিয়াসের মেশিন কাক্কু! তার ঠোটের কোনে হাসি। আজ সে তার পাঁচ নম্বর কাজ শেষ করেছে। এলিয়েনদের কাছে সব থেকে বেশি বুদ্ধিমান পাঁচটা মানুষ পাচার করেছে। মানুষদের এই পৃথিবী দখল করার আগে এলিয়েনরা মানুষদের সব ব্যাপার বুঝতে চেয়েছিলো। সেজন্য তারা মহাসিন মিয়াকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। তাকে আবার ফেরত পাঠায় ইলেকট্রনিকস বিদ্যা শিখিয়ে। পাঁচজন পাঠানো শেষ। এবারে মহাসিন মিয়া আবার নতুন মিশন পেয়েছেন। এবারের বিষয় সাহিত্যিক!
