Thursday, January 15
Shadow

বইমেলায় তিনি

ধ্রুব নীল

‘শোন পলাশ! তাকেই দেখেছি। সন্দেহ নাই! দেখ গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে!’

‘ভূত দেখলে লোম খাড়া হবে এমন কথা নাই।’

তুষার আমার কথার জবাব দিল না। তাকে দেখেও মনে হচ্ছে না সে আসলে ভূত দেখেছে। ভূত দেখতে পারার মধ্যে একটা কৃতিত্ব আছে। কিন্তু সে কৃতিত্বটা ঠিকমতো নিতে পারছে না। সত্যি সত্যি ভূত দেখলে নির্ঘাৎ চেঁচামেচি করত, না হয় ফিট হয়ে যেত। তুষারের কিছুই হয়নি। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সে বইমেলায় আসেনি, মিরপুরের জ্যামে আটকে আছে।

‘হুবহু তিনি। কোনো সন্দেহ নাই। পুবপাশে একটা স্টলের কোণায় কুঁজো হয়ে পায়চারি করছিলেন। একটা ঘিয়া রঙের চাদর। চেহারা দেখলাম হাসিখুশি।’

তুষার যাকে দেখেছে তার নাম শুনে প্রথমে আমি অট্টহাসি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু যাত্রাপালা ছাড়া আজকাল কেউ অট্টহাসি দেয় না। তুষারের হাঁপানো দেখে আমার হাসিটা ফিচ করে বের হয়ে গিয়েছিল। বেচারা আসলেই ভয় পেয়েছে।

‘উনি নাক উঁচু করে চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবছিলেন। আশ্চর্য! আশপাশের কেউ তাকে চিনতেই পারল না!’

‘এত জনপ্রিয় লেখক, চিনতে পারবে না কেন? অবশ্য মারা গেছে অনেক দিন তো হয়ে গেল। আমার সামনে দিয়ে এখন মার্ক টোয়েন হেঁটে গেলেও তো আমি চিনতে পারব না। তুই পারবি? পারবি না। অবশ্য… রবীন্দ্রনাথ হেঁটে গেলে চিনতে পারব। উনার হিসাব আলাদা।’

এবার আসল কথা বলল তুষার। ‘আমি যে তাঁকে চিনে ফেলেছি সেটা উনি ধরতে পেরেছেন। আমি তো চোখ কপালে তুলে তাকিয়ে আছি। উনি বিরক্তই হলেন। বললাম, স্যার আপনি এখানে! বইমেলায় কী করেন! উনার বিরক্তি বেড়ে গেল। ফিসফিস করে বললেন, আমি তো তোমাকে পড়াই না, আমাকে স্যার স্যার করছো কেন? আর যে লোক সারাজীবন একটা ম্যাগাজিনও পড়ে না সে-ও বইমেলায় আসে। বই দেখতে আসে। আর আমি তো সাধারণ লোক না। আমি বিখ্যাত লেখক। আমি এসেছি একটা বিশেষ কারণে। আমি এসেছি নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে। লেখা যেমনই হোক, নতুন বইয়ের ঘ্রাণটা ভালো। নাক উঁচা করে জোরে শ্বাস নাও।’

আমি সিরিয়াস। তুষারের মতো ছেলে এত সুন্দর করে গুছিয়ে এসব বলতে পারবে না। তারমানে নিশ্চয়ই তার সঙ্গে উনার দেখা হয়েছে।

‘এমনও হতে পারে, কেউ উনার মতো দেখতে। তোর সঙ্গে মজা করল। পৃথিবীতে এক চেহারার অনেক লোক আছে।’

‘আমি কি তা ভাবিনি! কিন্তু চোখের সামনে হুট করে ভ্যানিশ হয়ে গেল। উনি অবশ্য বেঁচে থাকতে জাদুও জানতেন। ভ্যানিশ হওয়া তার জন্য ডালভাত। কিন্তু চেহারা চিনতে ভুল হবে না আমার।’

‘চল! খুঁজে বের করি।’

বইমেলা এমনিতেই গোলকধাঁধা। তার ভেতর তরতাজা আধিভৌতিক রহস্য পাওয়া গেল। বই না পড়তেই অ্যাডভেঞ্চার!

তুষারকে বললাম, ‘উনার বইয়ের জন্য কয়েকটা প্রকাশনী বিখ্যাত হয়ে গেছে। সেখানে তো ঘটা করে তার বই বেচা হয়। ওগুলোর কোনোটার আশপাশে আছে নাকি?’

‘আরে দুর, ভ্যানিশ হওয়ার আগে আমাকে বলেছেন তাকে যেভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে বইয়ের কাটতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে সেটা তাঁর মোটেও পছন্দ না।’

‘গুল মারিস না। সব লেখকই কাটতি চায়।’

‘মরে যাওয়া লেখকদের কথা মনে হয় আলাদা।’

তুষারের কথায় দারুণ আত্মবিশ্বাস। শেষতক ভূতে বিশ্বাস করেই ফেলব কিনা। অবশ্য ভূত থাকতেই পারে। লাখ লাখ মানুষ ভূত দেখেছে। একজন বিখ্যাত লেখক ভূত হয়ে মেলায় আসতেই পারেন। আমরা তাঁকে বলছি ভূত। বিষয়টা ভূত না-ও হতে পারে। হয়ত অন্য কোনো মাত্রার প্রাণী হয়ে গেছেন।

হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে বুঝতে পারলাম আমরা গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি। ঘুরে ফিরে একই স্টলের সামনে এসে পড়ছি।

গেলাম তথ্যকেন্দ্রে। লেখক-ভূতকে দেখা গেছে ঝেং প্রকাশনীর সামনে। তথ্যকেন্দ্রে বসে থাকা আপুটা ভ্রƒ কুঁচকে কম্পিউটারের পর্দায় কয়েক সেকেন্ড চোখ বুলিয়ে বললেন এ নামে কোনো প্রকাশনী নেই।

অ্যাঁ! এ তো ভূতের ওপর ডাবল ভূত!

‘তুষার, তুই স্বপ্ন দেখিসনি তো?’

‘চোখ ছুঁয়ে বলছি। মিথ্যা বললে আমি অন্ধ।’ তুষার খেপে গেল।

‘আরে ওই তো! ওই তো! হিমলায় প্রকাশনীর পেছনে! দৌড়া! দৌড়া!’

ঝেড়ে দৌড় দিলাম। এবারের তুষারের আগে আমি।

আড়ালে চলে গেলেন লেখক মশাই। বাঁক কাটলাম। নেই! একেবারে হাওয়া! কোনো লোকজনও নেই। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। মাঝারি মাত্রার ভয় পেলাম। বেশি ভয় পাইনি, কারণ মেলাভর্তি মানুষ। এর মধ্যে রাক্ষস এলেও ভয় লাগবে না।

‘তোমাদের সমস্যাটা কী!’

লাফিয়ে উঠলাম দুজন। পেছন ফিরতেই আক্কেল গুড়ূম। মানে কাণ্ডজ্ঞানের মধ্যে গুড়ুম করে উঠল।

‘স্যা.. স্যা..স্যার.. আপনি!’

‘আবার স্যার! পড়াতে আমার মোটেও ভালো লাগে না!’

‘তা তা হলে কী বলে ডাকবো?’

‘কাজল চাচা ডাকতে পারো। আহা.. এই নামে আমাকে কতদিন কেউ ডাকে না রে।’

আমাদের সামনে সাক্ষাৎ মহান লেখক (মানে লেখকের ভূত), আর আমরা কথা খুঁজে পাচ্ছি না! কথা পরে হবে। আগে চোখ খোলা রাখা চাই। আবার যদি হারিয়ে যায়!

‘আপনাকে আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না কেন?’

‘আগে বলো কীসে পড়ো?’

‘জি, কলেজে। সায়েন্সে পড়ি।’

‘হুম। তা হলে বলি, আমি যে ফ্রিকোয়েন্সিতে আছি, সেটা সবার মগজে ধরা পড়বে না। তোমরা আমাকে ঠিক চোখের দেখা দেখতে পাচ্ছো না। আমি একটা রেডিও সিগনালের মতো তোমাদের মাথায় ঢুকে গেছি। লেখকরা চাইলে কাজটা করতে পারে। যখন তোমরা বই পড়ো, তখন লেখকের একটা অংশ তোমাদের মাথায় ঢুকে যায়। ভালো কথা, তুষার তুমি ভুট্টা ভাজা খেতে চাও, খাও। ভূতের ভয়ে ভুট্টা খাওয়া বন্ধ রাখার মানে হয় না। আর পলাশ তোমার মাথায় সায়েন্সের যেসব সূত্র ঘুরঘুর করছে ওটা বাদ দাও। ভূত মানে ভূত। ভূত নিয়ে এত ভাবার কিছু নাই। বিজ্ঞানীরা আজ পর্যন্ত বস্তু কী সেটাই বের করতে পারল না। বস্তু মানে বস্তু, ভূত মানে ভূত। হা হা হা।’

লেখক শব্দ করে হাসলেও কেউ সেটা শুনতে পেল, কেউ পেল না।

তুষার বেকুবের মতো বলল, ‘আপনি কি আমাদের একটা অটোগ্রাফ দেবেন?’

‘আমি তো মরে গেছি। মরার আগে নিতে পারলে কাজ হতো। চলো তোমাদের সঙ্গে আমারো ভুট্টা ভাজা খেতে ইচ্ছে করছে। বইমেলাটা ভালোই। খাবার দাবার পাওয়া যায়। বসার বেঞ্চিও আছে দেখছি। এত এত বই। ঘ্রাণ নিতে এসে মাথা ধরার অবস্থা।’

বিখ্যাত ভূত লেখকের পিছু পিছু হাঁটছি। এর মধ্যে দুজনের গায়ের ভেতর দিয়ে ছায়ার মতো হেঁটে গেছেন। লোকটা টেরও পেল না।

তবে যদি অন্য কারো মগজের ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে মিলে যায়…হলোও তাই। এক পালোয়ান সাইজের লোকের গা গলে চলে যাচ্ছিলেন আমাদের মহান ভূত-লেখক। পারলেন না। খেলেন বেমক্কা ধাক্কা। অভদ্র লোকটা খুব চোটপাট করলো। কিন্তু ভূতের সঙ্গে কি আর এসবে কাজ হয়। আমাদের ভূত লেখক তাকে শূন্যে তুলে খানিকটা বনবন করে ঘুরিয়ে আবার দাঁড় করিয়ে দিলেন। ভদ্রলোক স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়েই আছেন। ভয়ে চিৎকার না করে তিনি বাচ্চাদের মতো চিঁ চিঁ করে কান্না জুড়ে দিলেন।

‘ফুচকা খাবি?’।

কাজল চাচা (এটা তার দেওয়া নাম, আসল নামটা না-ই বা বললাম) বললেন, ‘হাওয়াই মিঠাই খা। এটা ভূতদের প্রিয় খাবার। মুখে দিলেই নাই।’

তুষারের জিব লকলক করে উঠল। ‘জি স্যার অবশ্যই খাব! থুক্কু কাজল চাচা।’

‘তুষার তুই তো দেখি পেটুক। আস্ত খাসি খেয়ে ফেলতে পারবি। তুই হবি আমার মিনি খাদক। বেঁচে থাকলে মিনি খাদক নামে একটা নাটক বানিয়ে ফেলতাম।’

তুষারের বুক পাঁচ ইঞ্চি ফুলে গেল। বিখ্যাত লেখকের সঙ্গে হাঁটতে পেরে (যদিও কেউ তা খেয়াল করছে না) আমারও বেশ গর্ব হলো।

a fiction magic realism juvenile story in bangla for kids about Humayun Ahmed

‘এই যে ভদ্রলোক।’

দুম করে ভাটা পড়ল আনন্দে। সামনে পুলিশ।

‘আপনি কি বদরুল সাহেবকে মাথার ওপর তুলে বনবন করে ঘুরিয়েছেন?’

‘জি ঘুরিয়েছি। উনি আমাকে হালকা গালিগালাজ করেছেন, তাই।’

‘সঙ্গে এরা কারা? কী হয়?’

‘কিছু হয় না।’

‘কিছু হয় না? তারপরও হাওয়াই মিঠাই খাওয়াচ্ছেন? বাচ্চারা এগুলো ফেলে দাও।’

আমি বাধ্য ছেলের মতো ফেলে দিলাম। তুষার না শোনার ভান করে পুরোটা কপ করে গিলে ফেলল। মুখ হা করে দেখাল যে হাওয়াই মিঠাই সে খায়নি।

‘কদিন ধরে এই ব্যবসায়? থানায় চলেন মুরুব্বি।’

‘আমি ছেলেধরা না। ছেলে ধরে নিয়ে কোথায় নিয়ে যায় সেটাও জানি না।’

‘থানায় চল, সব বুঝাইয়া দিমু।’

‘দেখুন। আমি..। নাহ.. এখন আমি কেউ না। যেখানে খুশি নিয়ে যাও।’

কাজল চাচার কথা শুনে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। এই লেখক যে এখনো বিরাট কিছু তা উনাকে কে বোঝাবে! তুষার গলা চড়িয়ে বলল, ‘আংকেল, আমরা উনার সঙ্গে বেড়াচ্ছি। উনি আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছেন না। বলতে পারেন আমরাই উনাকে ধরেছি। আপনি উনাকে চিনতে পারেননি। উনি বিখ্যাত লেখক…।’ ইশারা করতেই থেমে গেল তুষার। ভূত টুত বললে আবার ঝামেলা বাড়বে।

‘থানায় নিলেই সব কিলিয়ার। আমি চান্দু এত বোকা না।’

টানটান উত্তেজনা নিয়ে বসে আছি কী ঘটে দেখার জন্য। কাজল চাচার বিশাল ক্ষমতা। তিনি কী করেন দেখার বিষয়।

‘পুলিশ ভাই, এক কাজ করুন। জাফর একটা নতুন সায়েন্স ফিকশন লিখেছে। ভালো গল্প। সামনের ওই স্টলে পাবেন। আপনার মেয়ে নুসাইবা বইটা পেলে খুব খুশি হবে।’

‘আপনি আমার মেয়ের নাম জানলেন কী করে?’

লক্ষ¥ণ ভালো। তুই থেকে আপনিতে উঠেছেন।

‘আপনি লোক ভালো। বইমেলায় ডিউটি দিচ্ছেন, আর একটা বই কিনবেন না তা তো হয় না। ও! আপনাকে আমার লেখা একটা বই দিচ্ছি। এক মিনিট দাঁড়ান।’

‘না না কী দরকার। ইয়ে, মানে দেন পড়ি।’

কাজল চাচা তার খেলা দেখিয়ে দিলেন। দুম করে গায়েব হয়ে গেলেন। হাতে একটা চকচকে বই।

‘এই নিন, একেবারে নতুন। কদিন আগে লেখা। সবাই অবশ্য পড়তে পারবে না।’

আমাদের চোখ কপাল ছাড়িয়ে তালুতে ওঠার দশা! উঁকি দিয়ে বইটার নাম দেখার চেষ্টা করলাম। বিচিত্র কিছু চিহ্ন দেওয়া প্রচ্ছদে। অন্য মাত্রার বই!

কী আশ্চর্য! পুলিশ আংকেল বইটার পাতা ওল্টাচ্ছেন আর একটু পর পর গা দুলিয়ে হাসছেন!

‘স্যার, আপনার এই লোক দেখি ব্যাপক ফানি। কটকটা হলুদ পাঞ্জাবি। তারওপর আবার দেখি পকেট নাই! সেই লোক আবার বিয়ে করতে যাচ্ছে। হি হি হি।’

আমরা বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ। অন্যমাত্রার বই বলে কথা! সব দেখতে পাচ্ছেন পুলিশ আংকেল! কাজল চাচার দিকে তাকালাম। তিনি চোখ টিপে বললেন, ‘সব বইতেই দেখা যায়। ভালো বই মানুষ শুধু পড়ে না, দেখেও। এই যে তোমরা আমাকে এতক্ষণ দেখলে। ব্যাপারটা এমনই।’

আমার মনে হলো একটু পর কাজল চাচা বলবেন, ‘এবার আমাকে যেতে হবে। আমি অন্য মাত্রার বাসিন্দা। এ মাত্রায় বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারব না।’ কিন্তু তিনি তা বললেন না। বললেন, ‘একটা খেয়ে হচ্ছে না। চল আরেকটা ভুট্টা খাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *