Sunday, November 30
Shadow

তোমাদের জন্য কারিকুলাম : রম্য সায়েন্স ফিকশন গল্প

ধ্রুব নীল

‘মিল্কিওয়ে, অ্যান্ড্রোমিডা, ক্যানিস গ্যালাক্সির হে মহান অধিপতি, আপনার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব। আপনি বলেছিলেন মামাউসি গ্রহের কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় না দিতে। আমরা দিয়ে ফেলেছি। তাদের দেখাদেখি আমরা আমাদের কারিকুলাম বদলে ফেলেছিলাম। বই থেকে বারোতম মাত্রার সুপার কোয়ান্টাম স্পেস-বাবল টানেলিং বলবিদ্যা বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে এই গ্যালাক্সির একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম…।’

‘আরে রাখো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম! বর্তমান প্রজন্ম কী ঘোড়ার ডিম বানাইয়া ফেলতাসে! তোমরা একটা অ্যান্টি-গ্র্যাভিটন কণা পর্যন্ত বানাইতে পারো না। তোমাদের বিশেষ শিক্ষার দরকার কী? সবাই ঢালাওভাবে মহাকাশের ইতিহাস পড়ো। বিসিএস (বায়োসিনাপটিক কসমোলজিক্যাল সায়েন্স) পরীক্ষায় আসবে নয়নতারা গ্যালাক্সি কবে তৈরি হয়েছিল, আন্ত-গ্যালাক্টিক নিরাপত্তা কমিটির সদরদপ্তর কোথায়—এসব হাবিজাবি শেখো। কোয়ার্কট্রনিকস বিদ্যা তোমাদের জন্য না। এত জ্ঞান ধুয়ে পানি খাবে?’

ঢোক গিললেন দিপিনি। আন্তঃগ্যালাক্সিপুঞ্জের চেয়ারম্যান শিহার মুখে যা শুনলেন সেগুলো সম্পর্কে তার নিজেরও আইডিয়া নেই। নিজে যা বলেছেন সেটাও মুখস্থ করে আসা। বিজ্ঞানের বড় কোনো অধ্যাপককে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলেই ল্যাঠা চুকে যেত। এখন না পারছেন পদ ছাড়তে, না পারছেন মানবজাতিকে উদ্ধার করতে।

দিপিনি জাদুঘরে রাখা কোয়ান্টাম কম্পিউটারে পড়েছেন—আগের যুগের পৃথিবীর পড়াশোনা পৃথিবী ঘিরেই ছিল। সব ছিল গ্লোবাল। এখন ইন্টার-গ্যালাক্টিক। অন্য গ্রহের প্রাণীরা চাকরি-বাকরি সব নিয়ে যাচ্ছে।

মহাবিশ্বে যে গ্রহ যত জানে, তার কদর তত বেশি। সে গ্রহের বাসিন্দারাই গ্যালাক্টিক কমিটিতে চান্স পায়। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ডার্ক ম্যাটারে গিলে খাবে।

শিক্ষানীতি নিয়ে নতুন করে ভাবা ছাড়া উপায় নেই। দরকার হলে সুইজা গ্যালাক্সিতে আবার একটা কমিটি পাঠাবেন দিপিনি। কয়েকদিন আগে সরকারি টাকা খরচ করে যে কর্মকর্তারা অ্যান্ড্রোমিডার জিরমানিয়া গ্রহে যারা গিয়েছিল, তারা শিখে এসেছে কাঁচা কাঁঠালের রেসিপি। ওই গ্রহের সবাই নাকি জন্ম থেকে শিক্ষিত। তাদের শিখতে হয় কেবল রান্নাবান্না আর শহর গোছানো।

‘বাচ্চাকাচ্চাদের কী শেখাই বলতো রবু মিয়া?’

‘রোবটমুখে বড় কথা কমু মন্ত্রী ম্যাডাম?’ বিনীত স্বরে বলল কিউ সিরিজের পিএস রোবট রবু মিয়া।

‘ভণিতা করবা না। কেশে বলো।’

গলা খাঁকারি জাতীয় শব্দ করতে গিয়ে কানের দিকে শর্ট সার্কিটের মতো কিছু হলো রবুর। খানিক ধোঁয়া বের হওয়ার পর ধাতস্থ হলো। বলল, ‘গ্যালাক্সিপুঞ্জগুলাতে কৃত্রিম বুদ্ধিওয়ালা ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তারের অভাব নাই। বিজ্ঞানের কঠিন সব তত্ত্বকথা প্রমাণ হইয়া গেছে। এহন আমাগো বেশি দরকার…।’

‘আবার লেকচার! এআই হয়ে নিউরনে হাত দিও না! নতুন কারিকুলাম লাগবে বুঝলে! আমার প্রচারকক্ষ রেডি করতে বলো। মাথায় নতুন কারিকুলামের আইডিয়া এসেছে। এবার সবাই শিখবে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীতে কয়টা রাজ্য ছিল, কে কার সঙ্গে মারামারি করত, লাঠি দিয়ে একটা গোলকপিণ্ডকে বাড়ি দেওয়ার খেলা খেলে কে কে রাজ্যের শাসক হয়েছিল এসব। সঙ্গে পুরোনো আমলের সংস্কৃত ভাষায় লেখা বিজ্ঞান বইও পড়বে!’

নাটকীয় বিরতি দিলেন দিপিনি। এরপর বললেন, ‘তবে… যে যতই জানুক আর পড়ুক; ফাইনাল পরীক্ষায় আসবে সাড়ে তেত্রিশের নামতা। ওইটা যারা পারবে তারাই হবে বিশ্ব কর্মকর্তা।’

‘জো হুকুম মন্ত্রী ম্যাম।’

নতুন কারিকুলাম তৈরি করতে বসলেই দিপিনির ভেতর কী জানি ভর করে। নিজেকে বিরাট ক্ষমতাধর মনে হয়।

‘আমি বইসা বইসা কী করমু তাইলে?’

‘তুমি এআই রোবট আর কী করবে। মানবজাতির মঙ্গল নিয়ে ভাব। আমার কারিকুলাম আমি বানাবো। কেউ যদি সিঙ্গাড়া-বেগুনির ওপর ডক্টরেট করতে চায় করবে। বিদ্যার্জনে বাধা নেই। উফ! সিঙ্গাড়ার কথা ভেবে খিদে লেগে গেছে! সেক্রেটারি নিহা সমীকরণ কোথায়! আলুভর্তার ওপর পিএইচডি করা গর্দভটাকে বলো দুটো চপ বানাতে। এমনি এমনি তাকে সিনিয়র ভাজাপোড়া অফিসার বানাইনি।’

বলতে বলতে দিপিনি চলে গেলেন আন্তর্জাতিক লাইভ সম্প্রচার কক্ষে। অতি প্রাচীন সরকারি প্রচার ব্যবস্থা। লোকজন যদিও এসব সেকেলে অগমেন্টেড রিয়েলিটি চ্যানেল দেখে না।

‘প্রিয় পৃথিবীবাসী ও আমার প্রিয় গুলুমুলু শিক্ষার্থীবৃন্দ; তোমাদের জন্য এ মাসে চতুর্থ কারিকুলাম নিয়ে হাজির হলাম আমি পৃথিবীর শিক্ষামন্ত্রী। তোমরা এখন থেকে..।’

হুট করে বন্ধ হয়ে গেল সম্প্রচার। প্রযুক্তির আগামাথা বোঝেনে না দিপিনি। তাই কয়েকবার ‘লাইভ! লাইভ!’ চিৎকার করে শেষে বিরক্ত হয়ে বসেই রইলেন।

ওদিকে দিপিনি যখন প্রচার কক্ষে যাচ্ছিলেন, তখন রবুর গলার কাছে থাকা এয়ারপাইপ দিয়ে সামান্য বাতাস লিক করেছিল। ফুসস করে বাতাসটা বেরুনোর সময় পোঁ করে শব্দ করে ইদানিং। সাড়ে এগার মাত্রার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট হয়ে যে আরামে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলবে সেই জো নেই।

দীর্ঘশ্বাসটা ফেলে রবুই বন্ধ করে দিয়েছে সম্প্রচার। কারণ মন্ত্রীর নির্দেশ সে পেয়েছে। জাতির মঙ্গলের জন্য তাকেই কিছু করতে হবে। আর সেই মঙ্গলের স্বার্থে আপাতত নিজের হাতে তুলে নিয়েছে কারিকুলাম বানানোর ক্ষমতা। প্রাচীন ফ্ল্যাট-মানবদের বানানো রোবটরাই এখন সব পারে, সব করে। কিন্তু মানবজাতির তো একটা কারিকুলাম লাগবে। রবুর মতে সেই কারিকুলামে একটা কোর্সই আপাতত দরকার—ভাবনা কোর্স।

‘পোলাপান বইসা বইসা ভাববো। কেউ গালে হাত দিয়া চিন্তা করবে, কেউ মাথার চুল টাইনা টাইনা ভাববো। কাগজপত্র লাগব না। এসাইনমেন্ট জমা দিতে হইব না। যে যত গভীরে চিন্তা করবো, সে হইব তত বড় জ্ঞানীগুণী, সে অটোপাস। এই যে দিলাম আপলোড কইরা নতুন কারিকুলাম, এইবার চিন্তা কর হগ্গলে মিললা।’ এআই হয়েও ইদানিং মানুষের মতো বিড়বিড়ানির অভ্যাস হয়েছে রবুর। সে বক বক করেই চলেছে।

dhrubonil@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *