ধ্রুব নীল : ‘ছেলেটার নাম অন্তু। বয়স তের কি চৌদ্দ। কিন্তু ভাব দেখে মনে হবে তেইশ চব্বিশ। এক নামে সবাই চেনে। বখাটে বলেও ডাকে কেউ কেউ। লম্বা একটা লাল শার্ট পরে ঘুরে বেড়ায়। লম্বা শার্টের সঙ্গে মাঝে মাঝে হাফ প্যান্ট পরে। চুল এলোমেলো। সম্ভবত তার মা-বাবা কেউ নেই। আমি তাকে প্রতিদিন দেখি। বিকেলে মাঠের এককোণে একদল টোকাইয়ের সঙ্গে বসে বসে বাদাম খায় সে। গ্রামে এমন কেউ নেই, যাকে সে জ্বালিয়ে মারেনি। তবে তার চোখেমুখে সবসময় একটা কিং.. কিং.. কিং..।’
– কী লিখসেন এইডা? ওই মিয়া কী লিখসেন এইহানে।
– কিংকর্তব্যবিমূড় হবে ওটা। হেহেহে। মানে কী করবে তা ভেবে না পাওয়াকে বলে কিং..।
– হেইডা কী, খায় না মাতায় পিন্দে। আপনে তো আসলেই একটা কিলিকবাজ।
– কী বাজ?
– কিলিকবাজ, এইডার মানে শিইখা লন আমার কাসে। কিলিকবাজ হইলো কিলিকবাজি করা, সিম্পল। ছলিম্মা, স্যাররে জিগা আমগো নিয়া গালগপ্পো লিখতাসে, ট্যাক্স দিসে তো।
অন্তুর ডান পাশে লিকলিকে রোগা ছেলেটা কিছুটা বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। তার হাতে একটা ক্রিকেট ব্যাট। কিন্তু ধরার স্টাইল দেখেই বোঝা যাচ্ছে ওটা তার তুলনায় একটু বেশি ভারি হয়ে গেছে।
না ওস্তাদ, ট্যাক্স দেয় নাই। একশ বারো পৃষ্ঠার বই। দুই ট্যাকা কইরা সব মিলাইয়া দুইশ চব্বিশ হইসে।
অন্তু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার আরেক সাগরেদ জাহাঙ্গির মহা আনন্দে মোতাব্বির সাহেবকে তাক করে ক্রিকেটের স্ট্যাম্প ধরে আছে। চোখে মুখে একটু মাস্তান ভাব আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে। কিন্তু মারামারির অভ্যাস নাই তার। বরং মার খেয়েই বেশি অভ্যস্ত জাহাঙ্গির। তার পাশে দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে আক্রমণাত্বক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মিন্টু। দলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সে। তবে যেমন তার শক্তি তেমনি আবার ভীতুও।
এলাকার প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক মোতাব্বির সাহেব ভীষণ ঘামছেন। মনে মনে নিজের মাথার চুল ছিড়ছেন আর ভাবছেন, কোন ভুত যে মাথায় চড়েছিল! এমন জানলে তিনি কি আর এসব ছোকড়াদের নিয়ে গল্প লিখতে যেতেন! আরো কতো কতো ভালো ছেলেরা ছিল। কেন যে পাশের বাসার সোলায়মান সাহেবের ছেলে রাজুকে নিয়ে লিখলেন না!
– ট্যাক্স বাইর করেন। আমার নামে উল্টাপাল্টা লিখসেন এই জন্য দুইশত চব্বিশ টাকার লগে আরো পঞ্চাশ ট্যাকা দিবেন। আপনারে কেডা কইসে আমার মা-বাপ নাই। বাপ নাই এইডা সত্য, মা তো আসে। আপনে আমার মারে নাই কইলেন কেলা (কেন)? দিমুনি গাইল!
– না না ইয়ে.. টাকা.. মানে ট্যাক্স.. হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। অবশ্যই। আমার মানিব্যাগটা..।
মোতাব্বির সাহেবের চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেছে। তিনি তার প্যান্টের পকেটে মানিব্যাগ খুঁজেই যাচ্ছেন। অথচ টেবিলের ওপরেই দেখতে পাচ্ছেন ওটা। তারপরও পকেটে হাত চলে যাচ্ছে বারবার। গতকালই বেতন পেয়েছেন। বেতনের সঙ্গে একটা উপন্যাসের রয়্যালিটির টাকাও পেয়েছেন। সেই উপন্যাসই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন যে এসব লিখতে গেলেন।
– স্যার, এরপর আমগোরে নিয়া লিখতে অইলে হাসা (সত্য) কতা লিখবেন। আপনে কেমনে জানেন যে আমরা খারাপ পোলা, আমরা ভিলেন। আর কোনহানের ঐ অপু টপুরে নিয়া আইসেন। হেরে তো আমরা চিনিই না। হে কেমতে আমগোরে কিরকেট খেলায় হারাইয়া দিল।
– ও কেউ না। ও ও ও কাল্পনিক চরিত্র।
মোতাব্বির সাহেব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য হাসার চেষ্টা করলেন। একগ্লাস পানি পেলে বেশ হতো। একা থাকেন, এটা জেনেই বোধহয় ছেলেগুলো এতো সাহস পেয়েছে। বলা নেই কওয়া নেই দল বেঁধে হুট করে হামলা। উফফ কী ভয়ংকর।
– আফনেরে এইসব আজাইররা কল্পনা করতে কে কইসে হুনি। বালা হইয়া যান।
টাকাটা পরপর তিনবার গুনলো ছলিম। ইশারা করতেই দুদ্দাড় করে অন্তু ও তার দল বেরিয়ে গেল মোতাব্বির সাহেবের বাসা ছেড়ে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে, ক্রিকেট টুর্নামেন্টের জন্য চাঁদা চাইতে গিয়েছিল।
মোট দুইশ চুয়াত্তর টাকা। ছলিমের মনে সন্দেহ নেই। তবু এর মধ্যে আরো কয়েকবার গুনে ফেলেছে। তার ধীরগতিতে টাকা গোনার দৃশ্য দেখে বিরক্ত হয়ে একপর্যায়ে জাহাঙ্গির বললো, ‘অন্তু চল চা খাই।’
এখন আর তারা কেউ অন্তুকে ওস্তাদ বলছে না। কথাও বলছে বেশ আস্তে আস্তে। তার মানে এতোক্ষণ ওরা একটু বেশিই অভিনয় করেছে।
– চায়ের সঙ্গে সবার জন্য দুইটা করে বিস্কিট।
– ওস্তাদ আমি একটা কোক। হিহিহিহি।
ছলিমের কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। অন্তু বললো, ‘ঐ বেটা নির্ঘাৎ লেখালেখি ছাইড়া দিবো। এমন গাট্টা খাইসে না।’
মিন্টুর হাতে সেই অলক্ষুণে উপন্যাস। নাম ‘অপু বনাম অন্তু’। সে একের পর এক পাতা উল্টে যাচ্ছে। একপর্যায়ে থামলো। খানিকপর হেসে উঠলো।
– অন্তু শোন, এইখানে কী লিখসে দেখ, ‘অপুর কাছে হেরে গিয়ে অন্তুর কেন জানি খারাপ লাগলো না। সে এগিয়ে চললো বনের দিকে। একটা জারুল গাছের তলায় গিয়ে বসলো। ডালের ওপর একটা নাম না জানা পাখির বাসা দেখতে পেলো। তাতে আবার ছানাও আছে। ছানাগুলো দেখে অন্তুর ছোটবেলার কথা মনে পড়লো। আহা কী সুন্দর। চিঁচিঁ করে ডাকছে। অন্তুর চোখ ভিজে গেল। ’
হিহিহি, অন্তু তুই কি আসলে এমন কইরা কানদিস? পইখের ছানা দেইখা? হিহিহি।
মিন্টুর হাসির সঙ্গে পেটটাও অদ্ভুতভাবে দুলছে। সেই দুলুনি দেখে অন্তুর মেজাজ অষ্টমে চড়ে গেল।
– ছানাগুলার কথা পইড়া আমার রসুমিয়ার চিকেন ফ্রাইয়ের কতা মনে পড়সিলো! এখন আবার যামু ঐ মোতাব্বিরের বাসায়! পইখের ছানার বিরানি খাওয়ামু!
রাগ ঝাড়তে ঝাড়তে অন্তু, মিন্টু, ছলিম ও জাহাঙ্গির মাঠের কাছে পৌঁছে গেল। একটা জটলা দেখে খানিকটা এগিয়ে গেল। নতুন একটা ছেলে। বয়সে তাদের সমানই হবে। হাতে চকচকে ব্যাট। মাথায় ক্যাপ। সবাই সম্ভবত ব্যাটটা দেখতেই জটলা পাকিয়েছে। অন্তু সবাইকে ইশারায় এগিয়ে যেতে বললো। হাতে স্ট্যাম্প বাগিয়ে প্রশ্নটা করলো জাহাঙ্গির।
– কী নাম? নতুন এসেছো?
– হ্যাঁ, আমার নাম অপু। তোমার..।
হাত বাড়িয়ে দিল ছেলেটা। অন্তুর চোখ কুঁচকে গেছে। মিন্টু হা করে তাকিয়ে আছে। ছলিম তেমন পাত্তা দিচ্ছে না।
– আমার নাম জাহাঙ্গির। এ হচ্ছে আমাদের বস অন্তু। আর ও ছলিম।
– বস? বস কেন?
এবার মুখ খুললো অন্তু।
– বস হইতে যা লাগে সেটা আমার আছে। আর একজন বাকি আছে, ওর নাম মিন্টু। ওই মিন্টু, বাইয়ের লগে হাত মিলা। নয়া আইসে।
– তুমি এমন মাস্তানদের মতো কতা বলছো কেন?
– সেইডাতো আমারো প্রশ্ন। তুমি এমন ভদ্দরলোকের মতো কতা কইতাসো কেন?
– আমি ভদ্র তাই।
– আমিও মাস্তান, তাই মাস্তানের মতো কতা কইতাসি। হাহাহাহা।
– ওহ আচ্ছা।
– ওহ আচ্ছা দিয়া কাম অইবো না। মাঠে খেলতে অইলে ট্যাক্স দেয়া লাগবে। ছলিম..।
জাহাঙ্গিরের ইশারা দেখতে পায়নি অন্তু। সবাই কেমন যেন চুপসে গেছে। অন্তু কিছু বলার আগেই পেছন থেকে কে যেন খপ করে তার কলার চেপে ধরলো। মোটা একটা হাত। ঘুরে তাকানোর আগেই শুনতে পেল।
– স্যার, এই সেই বজ্জাত। এরাই আমার টাকা নিয়েছে। প্রমাণও আছে স্যার। এই যে দেখেন এই ছেলেটার হাতে আমার উপন্যাস। একটু আগে আমার ঘর থেকে নিয়ে এসেছে।
নতুন ছেলে অপুও ভয় পেয়েছে। ভয়ে দুপা পিছিয়ে গেছে। মুহূর্তে জটলা উধাও। দুজন কনস্টেবল ছলিম ও জাহাঙ্গিরের হাত আঁকড়ে রেখেছে। মিন্টু সুযোগ পেয়ে ঝেড়ে দৌড় দিয়েছে। মোতাব্বির সাহেবের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে অন্তু।
– ওসি সাহেব, ঐ ছেলেটার পকেটে হাত দিন, টাকা পাবেন।
ওসি সাহেব অন্তুর হাত ধরতেই কলার ছেড়ে দিলেন লেখক মোতাব্বির সাহেব। মনে মনে মোতাব্বির সাহেবকে ছোবড়া বানিয়ে ফেললেও বাস্তবে কিছুটা করুণ দৃষ্টিতে ওসি সাহেবের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো অন্তু। ছলিমের পকেট থেকে টাকা বের করে ওসি সাহেবের দিকে বাড়িয়ে ধরলো এক কনস্টেবল।
– এই যে স্যার টাকা।
– আমার কাছে রশিদ আছে।
ছলিম জানে এই রশিদে কাজ হবে না। তবু শেষ ভরসা…।
– চোপ! সবকটাকে নিয়ে চল।
ওসি সাহেবের গর্জনে সবার গলা শুকিয়ে এলো। বারকয়েক মোতাব্বির সাহেবের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে হাঁটতে শুরু করলো ছেলেরা।
ঝট করে পেছনে তাকালো অন্তু। অপু তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। শেষ চেষ্টা করে দেখলো অন্তু।
– স্যার, আমরা ক্রিকেট খেলার জন্য চাঁদা চাইতে গিয়েছিলাম। আঙ্কেল আমাদের ভুল করে একটু বেশি চাঁদা দিয়ে ফেলেছিলেন। এইজন্য উনি আবার ফেরত নিতে এসেছেন। বিশ্বাস না হলে অপুকে জিজ্ঞেস করেন।
দারুন গল্প বানিয়েছে অন্তু। মনে মনে প্রশংসা না করে পারলো না বাকিরা।
ওসি সাহেবও তাকিয়েছেন অপুর দিকে। অপু দ্বিধাগ্রস্তের মতো বারকয়েক মাথা উপরনিচ করে বলল, ‘আমি জানি না স্যার, ওরা আমার বন্ধু না।’
– ও.. বুঝেছি। গপ্পো বানানো হচ্ছে! এটা গল্পের আসর! চল থানায়!
অপুর কথা শুনে রাগে ফুঁসে ওঠার আগেই অন্তু মনে মনে চিৎকার দিয়ে উঠলো, গপ্পো! ওসি সাহেবের মুখে গল্পের কথা শুনে দারুন একটা আইডিয়া পেয়েছে।
– এক মিনিট স্যার। ও স্যার এট্টু দাঁড়ান। ঐ ছলিম! বইটা ল। এদিক দে।
ছলিমের হাত থেকে বইটা নিয়েই দুদ্দাড় করে পাতা ওল্টাতে লাগলো অন্তু। মোতাব্বির সাহেব ভ্রƑ কুঁচকে কাণ্ড দেখতে লাগলেন। ওসি সাহেব বিরক্ত মুখে একবার ঘড়ি দেখলেন। সন্ধা ঘনিয়ে আসছে। ভেবেছিলেন বাচ্চাগুলোকে কিছুক্ষণ বকাঝকা করে ছেড়ে দেবেন। এখন দেখি আবার মাঝরাস্তায় গল্পের বই পড়ার শখ জেগেছে।
– আমার রাগ চড়ে যাচ্ছে কিন্তু ছোকড়া!
– এক মিনিট স্যার, হ্যাঁ পাইসি! এই যে দেখেন স্যার। বত্রিশ নম্বর পৃষ্ঠায় কী লিখসে দেখেন স্যার। এই গল্পের নাম হইলো পুলিশ যখন চোর। আপনের কতা লিখসে। জায়গার নাম থানার নাম সব এক। মোতাব্বির মিয়ার চোখে আপনি হইলেন স্যার এক নম্বর শয়তান।
ওসি সাহেব ঝট করে বইটা কেড়ে নিলেন। বিড়বিড় করে পড়তে লাগলেন-
‘…এদিকে ওসি খন্দকারের কথামতো চোর দুটো ঠিক রাত দুটোয় কলিম মুন্সির বাড়ির সামনে হাজির। প্ল্যানটা হচ্ছে তারা দুজন নির্দ্বিধায় চুরি করবে। ধরা পড়লে ওসি নিজে এসে তাদের ধরে নিয়ে যাবে। কিন্তু প্রথম চোরটা হচ্ছে একটা অকালকু.. কু.. ’।
– অকালকুষ্মাণ্ড।
শব্দটা ধরিয়ে দিলেন স্বয়ং লেখক মোতাব্বির। ওসি সাহেব পড়া থামিয়ে তার দিকে হা করে তাকিয়ে আছেন।
‘এসব কী লিখেছেন মোতাব্বির সাহেব!’
‘না মানে, ইয়ে.. এটা তো গল্প। একটা মজার গল্প। গল্পের ওসি হচ্ছেন আসলে একজন চোর। ইয়ে.. মানে.. ওটা তো আর আপনি..।’
‘হোয়াট ননসেন্স! আপনি আমার নাম পর্যন্ত লিখে দিয়েছেন!’ টিপ্পনি কাটলো ছলিম, ‘স্যার, গল্পের ওসি কিন্তু টাকলা। আপনারও মাথাতেও চুল নাই। হেহেহে।’
‘মোতাব্বির সাহেব! কাজটা কিন্তু ঠিক হয় নাই! কনস্টেবল, ওদের ছেড়ে দাও!!
এরপর মোতাব্বির সাহেবের ব্যাপারে অন্তুরা কোনো খোঁজ নেয়নি। পুলিশ নিশ্চয়ই গল্প লেখার অপরাধে তাকে ধরে নিয়ে যায়নি। ভয় যা পেয়েছেন তাই বা কম কী। তবে সবাই এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মোতাব্বির সাহেবের পরবর্তী উপন্যাসের জন্য। কারণ উনি অন্তুদের কথা দিয়েছেন অন্তুকে নায়ক বানিয়ে একটা ফাটাফাটি কিশোর এডভেঞ্চার গল্প লিখবেন। সঙ্গে ছলিম জাহাঙ্গির মিন্টুও থাকবে। আর সেই গল্পে অবশ্যই নাস্তানাবুদ করা হবে অপুকে। আপাতত এটাই লেখক মোতাব্বির সাহেবের জরিমানা।