ধ্রুব নীল : মানুষ যেমন নাছোড়বান্দা হয়, পিপি তেমনি নাছোড়পিপড়া। কিছুই ছাড়বে না সে। হাতের কাছে যা পাবে, তা’ই ধরে দেখবে। যদি নতুন একটা কিছু বানানো যায়! গতবছর এভাবে একটা মাটি খোঁড়ার বেলচা আর মোটর জুড়ে দিয়ে বানিয়ে ফেলেছিল আজব এক যন্ত্র। সবাই দারুণ প্রশংসা করেছিল পিপির। যন্ত্রটা দিয়ে এক সেকেন্ডের মধ্যে মাটি খুড়ে ভেতরে ঢুকে যাওয়া যায়। মানুষের পায়ের চাপ থেকে বাঁচার জন্য যন্ত্রটার জুড়ি নেই। যন্ত্রটার জন্য পিপি বছরের সেরা পিবিজ্ঞান পুরস্কার পেয়েছিল। মহল্লার রানী পিঁপড়া তাকে নিজ হাতে চিনির দানা খাইয়ে দিয়েছিলেন।
আহা! সেই স্বাদ এখনো ভুলতে পারছে না পিপি। কিন্তু কী করবে, এ বছরে একটা নতুন আবিষ্কারও করতে পারেনি বেচারি। বসে বসে কেবল ভেবেছে আর ভেবেছে। তবে আজকে একেবারে মাথার দুটো শুঁড় বেঁধে নেমে পড়েছে পিপি। নতুন কিছু আবিষ্কার করেই ছাড়বে।
সকাল থেকে পিপিকে খুঁজে পাচ্ছে না তার মা চি বেগম। মেয়েটা অল্পবয়সেই বেশি ভাবুক হয়ে গেছে। স্কুলেও যায় না ঠিকমতো। অথচ ক’দিন বাদেই তাকে খাদ্য ও দুর্যোগ দপ্তরে যোগ দিতে হবে। তখন যে কিভাবে সবার সঙ্গে লাইন ধরে খাবার আনবে!
গর্তের প্রতিটা খোপে একবার করে ঢুঁ মারছেন চি বেগম। এমন সময় পাড়ার মুরুব্বি জনাব টুঁ বললেন, ‘লাভ নাই চি বেগম, তোমার দস্যি মেয়ে আশপাশে নাই। সাত সকালে বাক্সপুঁটলি নিয়া ধোলাইখালে গেছে।’
চি বেগম চিন্তিত মনে বাসায় ফিরে এলেন। পিপির বাবা কাজ করতেন ধোলাইখালে। তিনি ছিলেন মহল্লার এক নম্বর কারিগর। চিনি খোঁজার জন্য তিনিই প্রথম সুগার ডিটেক্টর যন্ত্র বানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বেঁচে নেই। ধোলাইখালের যন্ত্রপাতির তলায় চাপা পড়েই..। নাহ চি বেগমের দুশ্চিন্তা আরো বেড়ে গেল।পিপি ধোলাইখালে যায়নি। সে এসেছে বুয়েট নামের একটা জায়গায়। দাদার কাছে এ জায়গার গল্প অনেক শুনেছে সে। মানুষেরা এখানে অনেক কিছু বানায়। কিন্তু পিপির বাবা কোনোদিন এখানে আসেনি। ওসব দিয়ে নাকি পিঁপড়েদের কাজ নেই। তবে পিপি এ কথা মানতে নারাজ। আকারে ছোট বড় হওয়ার সঙ্গে বিজ্ঞানের কী সম্পর্ক। মানুষরা নাকি এখন ছোট ছোট জিনিস নিয়েই বেশি মাথা ঘামায়। এমন সব জিনিস বানায়, যা নাকি পিঁপড়েরাও খালি চোখে দেখবে না। পিপি তাই মোটেও হতাশ নয়। সে বুয়েটের একটা গবেষণাগারে ঢুকে পড়ল।
‘ওয়েলকাম মিস…।’
‘পিপি, মাই নেম ইজ পিপি।’
‘ওকে পিপি.. আমি হচ্ছি চিহি।’
‘এখানে কী করছো?’
‘আমি এখানেই থাকি। ওরা মজার মজার সব জাদু দেখায়।’
‘জাদু নয় বোকা, ওটা হলো সায়েন্স। মানে বিজ্ঞান।’
‘ওমমা। তুমি দেখি পিবিজ্ঞানী! এখানে এসেছ কেন? এটা তো মানুষের ল্যাবরেটরি।’
চিহি নামের মোটা পিঁপড়েটার প্রশ্নের উত্তর বেশ গম্ভীর কণ্ঠে দিল পিপি।
‘বিজ্ঞান সবার জন্য সমান, বুঝলে। আমি এসেছি আবিষ্কার করতে। এখন বল, কোথায় গেলে ছোট যন্ত্র পাওয়া যাবে।’
‘হুম..।’ চিহি কিছুক্ষণ পিপির দিকে তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করলো। যখন সে কিছুই আন্দাজ করতে পারলো না, তখনই চেঁচিয়ে উঠলো।
‘পেয়েছি! তুমি ওই মাইক্রো-মেকানিক্স লেখা ঘরটায় যাও। ছোট ছোট জাদুর বাক্স আছে ওখানে। গুন গুন শব্দ করে সারাক্ষণ।’
পিপি বীরদর্পে হাঁটতে লাগলো। দু’বার অবশ্য মানুষের পা থেকে বাঁচতে টেবিলের আড়ালে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সাহস কমলো না এতটুকু। মাইক্রো মানে ছোট আর মেকানিক্স হলো কারিগরি। তারমানে ওই ঘরে পিঁপড়েদের জন্য ছোট কিছু বানানোর যন্ত্র থাকবেই। কিন্তু কী বানাবে পিপি? কী বানালে রাণী পিঁপড়া তাকে আবার চিনির দানা খাওয়াবেন? রাণীর কথা মনে পড়তেই আইডিয়া পেয়ে গেল পিপি। মনে মনে বলল, ‘ইয়েস! পেয়েছি! রাণীকে চমকে দেব এবার। তার মতো আমরাও উড়ব!’
‘হুম, আমি দেখেই বুঝেছি তুমি একটা পিবিজ্ঞানী। আমি তোমার পিছু ছাড়ছি না। আমিও শিখবো কিভাবে যন্ত্র বানাতে হয়।’
হুট করে চিহিকে পেছনে কথা বলতে শুনে চমকে গেল না পিপি। খানিকটা বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ করল না। বরং ওর সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করা যায়।
‘আচ্ছা চিহি, তোমার কি উড়তে ইচ্ছে করে?’
‘নাহ। কখনোও না। আমি কেন উড়বো। আমি তো রাণী না।’
পিপি হতাশ হলো না। চিহির না করলেও তার মতো নিশ্চয়ই আরো অনেকের উড়তে ইচ্ছে করে। রাণী পারলে সবাই উড়তে পারবে। এখন গণতন্ত্রের যুগ। সব পিঁপড়ের সমান অধিকার থাকা দরকার।
হিজিবিজি ভাবতে ভাবতে পিপি এগিয়ে চললো ল্যাবরেটরির একটা টেবিলের দিকে। ওটার ওপর অনেক যন্ত্র আছে। ওর দরকার শুধু পাখার মতো পাতলা দুটো জিনিস। পিঠের ছোট ব্যাগ থেকে পিপি তার আবি®কৃত মিনি সিসিসি যন্ত্রটা বের করলো। ওটা দিয়ে মানুষের বানানো লোহালক্কড় থেকে সামান্য একটু ছেঁচে নেওয়া যায়। দুই মিনিটের মধ্যে কাজ হয়ে গেল। পাতলা দুটো পাত তৈরি হয়ে গেল। পাখির ডানার মতোই দেখতে। এখন সোলার প্যানেল তৈরির জন্য দরকার সিলিকন। ব্যাগের ভেতর ওটাও আছে। পথে ঘাটে তো আর ধূলোবালির অভাব নেই। ওর মধ্যেই আছে অনেক সিলিকন। পিপি তার আবিষ্কৃত ওয়্যারিং জেলিটা বের করে তিন মিনিটের মাথায় সিলিকন আর ধাতব পাত জুড়ে দিল। সঙ্গে ছোট্ট একটা ব্যাটারিও আছে। বাকি কাজ সামান্য জটিল। বালির কণার সমান একটা চুম্বকের চারপাশে কীভাবে কীভাবে যেন তার পেঁচিয়ে মোটরও বানিয়ে ফেললো। সুইচ আর গিয়ার বানাতে লাগলো আরো দশ মিনিট। এবার পুরো যন্ত্রটাকে ধরে পিঠে বয়ে নিলেই হলো। সূর্যের আলো পড়বে সিলিকনের ওপর। ওটা থেকে ছোট ছোট ইলেকট্রন কণা বের হলেই চার্জ হবে ব্যাটারি। ওটাই চালাবে মোটর। চাকতির মতো দেখতে খাঁজকাটা গিয়ারের কারণে ওপর নিচ ওঠানামা করবে পাখা। ব্যাস, হয়ে গেল ইলেকট্রনিক ডানা। এবার বাইরে গিয়ে সূর্যের আলোতে দাঁড়ালেই হয়ে গেল। চিহিকেও পরে একটা বানিয়ে দেবে সে।
পিপির ঠিক পেছনেই একটা বড় মনিটর লাগানো। সে টেরই পেল না যে খুব মনযোগ দিয়ে ওই মনিটরে তার কাজকর্ম দেখছে একটা মানুষ!
ডানাটা ব্যাগে ঢুকিয়ে পেছন ফিরে তাকাতেই থমকে দাঁড়ালো পিপি। তার ঠিক পেছনেই বিশাল এক দানবের ছবি। মানুষটাকে আগেই দেখেছে সে। মানুষকে ভয় নেই, কিন্তু ওই দানবটা এলো কোত্থেকে? ভয়ে পিপির শুঁড় দুটো নড়ে উঠতেই দেখলো দানবের শুঁড়ও নড়ে উঠলো। কিন্তু একি! দানবটাও দেখি ভয় পেয়ে হা করে তাকিয়ে আছে। পিপি তার ডান পাশের শুঁড়টা নাড়লো। দানবটার শুঁড়ও নড়ে উঠলো। একটু পরেই ব্যাপারটা টের পেল পিপি। সে আসলে নিজেকেই দেখতে পাচ্ছে। তারচেয়েও বড় কথা হলো মানুষের চোখে ধরা পড়ে গেছে সে। কে জানতো, এখানে এই ধাতব পাতটার ওপর একটা মাইক্রোস্কোপ তাক করা ছিল!
মানুষটা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। শুঁড় নাড়াতেও ভুলে গেছে পিপি। মানুষটা কি এখন তাকে ফুঁ দিয়ে ফেলে দেবে? নাকি টিপে ভর্তা বানাবে! অবশ্য কেন যেন পিপির ভয় লাগছে না। মানুষ বিজ্ঞানীদের সে খুব একটা ভয় পায় না।
হুট করে পেছনে সরে গিয়ে পই পই করে কী যেন খুঁজলো মানুষটা। আবার ফিরে এলো। দুই আঙুলে লম্বা একটা লাঠি ধরে পিপির সামনে এনে রাখলো। দু’পা সরে গেল পিপি। লাঠিটা পিপির সামনে রেখে মানুষটা আবার সরে গেল। পিপি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো, ‘আমার অভিবাদন নিন হে মানুষ। আমার নাম পিপি। মাই নেম ইজ পিপি।’ সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘরে গমগম করে উঠলো পিপির কণ্ঠ। এত জোরে শোনা গেল যে ভীষণ ঘাবড়ে গেল পিপি।
মানুষটাকে দেখলো তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে। পাগলের মতো চিৎকারও জুড়ে দিল। ‘আমি জানতাম! পিঁপড়েরা পারে! ওরা পারে না এমন কিছু নেই! আমি জানতাম।’
‘হায়! হায়!’ মনে মনে চমকে উঠলো পিপি। মানুষটা এসব কী বলছে! পিঁপড়েরা পারবে না কেন? মানুষই তো বোকার হদ্দ। পিপি এখন বাসায় গিয়ে সবাইকে পাখা বানানো শিখিয়ে দেবে। মানুষ তো আর সেটা করে না। ওদের অতো সময় কোথায়। দুই দিনের মধ্যে গোটা পিঁপড়ে সমাজ ইলেকট্রনিক পাখা বানানো শিখে যাবে! মানুষটার চেঁচামেচি শোনার কোনো মানে হয় না। পিপি দ্রুত টেবিলের পায়া বেয়ে নেমে এলো।
‘হাই পিপি! বানিয়েছো?’
‘হ্যাঁ, তোমাকেও বানিয়ে দেব।’
‘আমার ভাই টুটুর জন্যেও একটা দিও। ওর আবার পাইলট হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল।’
‘ওকে বলো, কদিন পর একটা বিমানও বানাবো। মানুষেরটার চেয়ে ভাল বিমান। কোনো ধোঁয়া টোঁয়া বের হবে না। তুমি কালই একবার টিটিনপুরে এসো।’
ব্যাগ থেকে ডানা বের করে কাঁধে চেপে ধরলো পিপি। রাস্তায় প্রখর সূর্যের আলো। সুইচ টিপতেই কান ফাটানো গুন গুন শব্দে উড়ে গেল। নিচে চিহি হাত নাড়িয়েই যাচ্ছে। একটু পর দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল চিহি। সামনে উড়ে যাচ্ছে পিপি। বাড়ি যেতে এখন দুমিনিটও লাগবে না।
টিটিনপুরের সবকটা পিঁপড়ে এসেছে পিপির নতুন আবিষ্কার দেখতে। সবাই বাহবা দিলেও পিপি খুব একটা খুশি নয়। সে ভাবছে ওই মানুষটার কথা। মানুষ তাদের কী ভাবে! পিঁপড়ে বলে তাদের বুদ্ধিসুদ্ধি নেই! যত্তসব! তারা কি সুন্দর দল বেঁধে থাকে, এক গর্তে থাকে। মানুষেরা মোটেই অমন নয়। এদিকে বিমর্ষ মুখে রাণীও এসে পিপিকে বাহবা দিলেন, ‘পিবিজ্ঞানী পিপির নতুন এ আবিষ্কারে আমাদের পিঁপড়ে সমাজ আরো অনেকদূর এগিয়ে যাবে। আমরা আরো দ্রুত দুর্যোগের খাবার জমিয়ে রাখতে পারবো। আমরা..।’
নাহ্, রাণীর ভাষণ শোনার সময় নেই পিপির। ভোঁ করে ডানা ঝাপটে চলে গেল নিজের গর্তে। তার মা চি বেগম তার জন্য চিনির বদলে স্বাস্থ্যকর গ্লুকোজের দানা নিয়ে অপেক্ষা করছেন।