অঙ্কপুরের গল্প

ধ্রুব নীল : মগডালে দুটো পা পেঁচিয়ে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে ছোট্টা খোকা শূন্য। তার মারাত্মক মন খারাপ। আজকের ঝগড়াটা একটু একতরফা হয়ে গেছে। এক আর দুইয়ের সঙ্গে আজ একটুও পেরে ওঠেনি সে। দেখতে ছোট বলে এভাবে সবার সামনে অপমান করতে হবে? এক বলে কিনা, ‘তোর তো কোনো মান নেই, একেবারে অর্থহীন। তোর নামের মানে বুঝিস? এক্কেবারে ফাঁকা। ফাঁকা মানে ফক্কা, ফক্কা মানে জিরো, জিরো মানে শূন্য।’ তার সঙ্গে তাল মিলিয়েছে হতচ্ছাড়ি দুই। বেণী দুলিয়ে বলে, ‘তুই যে কেন আছিস তা তুই নিজেও জানিস না। এই আমাকেই দেখ না! সবচে ছোট মৌলিক সংখ্যা আমি, সবাই আদর করে। তুই তো অংকই না।’

মন খারাপ হলেই শূন্য গাছের ডালে পা আটকে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে। একদম স্থির। কেউ বুঝতেই পারে না। আজও তাই ঝুলে আছে। ঝুলতে ঝুলতে শূন্য ভাবছে তার শৈশবের কথা। তাকে অংকপুরে এনে দিয়েছিল আর্যভট্ট নামের এক ভারতীয় গণিতবিদ। তারপর গোটা বিশ্বে সেকি হই চই। তার কারণেই নাকি সবাই এখন সহজে অংক করতে পারে। সবাই তার ছবি আঁকে একই ভাবে। একটা মার্বেলের মতো। অথচ এক, দুইদের চেহারা একেক দেশে একেক রকম। কিন্তু.. কিন্তু.. নাহ্, তার কোনো কাজ নেই এটা সে মানতে নারাজ। সে মোটেই অর্থহীন নয়। প্রায়ই তার ডাক পড়ে।

‘শূন্য! এই শূন্য! নিচে নেমে আয়!’

শূন্যর ভাবনার ঘুড়িটা প্রচণ্ড জোরে গোত্তা খায়। কণ্ঠটা শুনলেই তার নিজেকে আর একা মনে হয় না। অংকপুরে তার একমাত্র বন্ধু ত্রিকোণোমিতি। যার মাথায় সবসময় ছটা বেণী থাকে। একেক বেণী দিয়ে একেক রকম অঙ্ক। সেই বেণীর আবার নামও আছে, সাইন, কোসেক, কস এইরকম। শূন্য এখনো এসবের মানে বোঝে না।

গাছের গোড়ায় বেণী দুলিয়ে পেয়ারা খাচ্ছে ত্রিকোণোমিতি। তরতর করে নেমে আসে শূন্য।

– কী হয়েছে তোর! আবার ঝগড়া! তোকে না বলেছি কেউ কিছু বললে ভাগ করে দেওয়ার হুমকি দিবি।

– অ্যাঁ, ভাগ করে দেব মানে! করলে কী হবে?

– এখনো শিখিসনি! ক্লাস ফাঁকি দিলে শিখবি কী করে! কোনো কিছুকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে সেটা অদ্ভুত একটা কিছু হয়ে যায়। এটা এখনো শিখিসনি?

মাথা চুলকে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ে শূন্য। হুমকি দিতে পারবে, কিন্তু ভাগ করতে পারবে তো? ভাগ করলে সেই অদ্ভুত সংখ্যাটাই বা কেমন?

– দেখি আমার পাশে এসে একটু দাঁড়াতো, অংকটা একটু মিলিয়ে নেই।

এ কাজটা শূন্য বেশ ভালোই পারে। বিশেষ করে ফাংশন চাচা তো তাকে ছাড়া চলতেই পারে না। সমীকরণের ডান পাশে শূন্য না দাঁড়ালে তার খাওয়া বন্ধ।

ত্রিকোণোমিতির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে শূন্যর মনে হলো, সে আসলে অন্যরকম। সে মোটেই ছোটখাট কিছু নয়। সে না থাকলে অনেকেই তাদের অংক মেলাতে পারবে না।

‘এ্যাঁহে হেঁচ্চো!’

আদ্দিকালের এক ঝোলা কাঁধে দুলতে দুলতে আসছেন পরিমিতি চাচা। তিনি ছেলে বুড়ো সবারই চাচা। তাকে দেখে শূন্য চেঁচিয়ে উঠলো, ‘কি চাচা, কোথায় চললেন?’

‘আর বলো না বাবা, ওই চতুর্ভুজ চৌধুরির বাড়িতে জমি নিয়ে আবার গন্ডগোল বেঁধেছে।’ কথা বলা শুরু করলে সহজে থামেন না পরিমিতি চাচা। তিনি বলেই চললেন, ‘তা, এতো করে বললাম, বয়স হয়েছে, নাহ, শুনলো না। জমির চারপাশে একখান রাস্তা আছে, এখন রাস্তা বাদে জমিটা মাপতে হবে। কী মুশকিল বলো দেখি! সেই জমিতে আবার নাকি টাইলস বসাতে হবে, আমাকে বলেছে হিসেবটাও কষে দিতে হবে।’

ত্রিকোণোমিতি ইশারায় শূন্যকে চুপ থাকতে বলল। শূন্য বুঝে নিল, বেশি প্রশ্ন করলে বকবক করে গোটা অংকপুর গরম করে ফেলবেন পরিমিতি চাচা।

দুজনে তাই চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। কিছুদূর যেতেই শুনতে পেল হাকুংয়ের চিৎকার। হাকুং হলো অঙ্কপুরের একমাত্র পোষা বানর। যার একমাত্র কাজ হলো বাঁশে চড়া। ছোট ছোট সংখ্যারা তাকে নিয়ে বেশ মজা করে। বাঁশের মধ্যে তেল মেখে দেয়। হাকুং একটু উঠে, আবার পিছলে পড়ে। এ নিয়ে নাকি মানুষরা অংকও করে। শূন্য ভেবে কুল পায় না, হাকুং বেচারা বাঁশে চড়ে চড়ে কাহিল হয়ে যায়, তাকে নিয়ে আবার অংক করার কী আছে!

ত্রিকোণোমিতি হাঁটা থামিয়ে বলল, ‘শূন্য শোন’

‘কী?’

‘উপপাদ্যদের সঙ্গে সম্পাদ্যদের আজো ঝগড়া বেধেছে। ও পাড়ায় যাওয়া ঠিক হবে না। তারচেয়ে চল সরল দাদুর কাছে যাই, গ্রামে নতুন কেউ এলো কিনা জানা দরকার।

‘চল, কিন্তু নতুন কেউ এলে দয়া করে আমাকে জ্ঞান দিতে আসবি না! এর আগে কোন এক সমীকরণের সমাধান মশাই এসেছিল, আর পাক্কা তিন ঘণ্টা আমার মাথা খারাপ করে দিয়েছিলি তুই। আমি আর কিচ্ছু শিখতে চাই না!’

‘কিছু না শিখলে সবাই তোকে জিরো মানে ওই ফক্কা বলেই খেপাবে, বুঝলি!’

মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো বেচারা শূন্যর। অন্যমনষ্ক হয়ে ত্রিকোণোমিতির সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলো।

সরল দাদুর চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। সেই আদ্দিকাল থেকে তিনি গ্রামের সব জটিল জটিল সমস্যার সমাধান দিয়ে আসছেন। কেউ কোনো বিপদে পড়লে সবার আগে তার কাছেই ছোটে। শূন্যকে দেখে বললেন, ‘কী খোকা! আজ কয়টা সমাধান করলে?’ শূন্য লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। ত্রিকোণোমিতি জিজ্ঞেস করলো, ‘দাদু, আজ নতুন কেউ আসেনি?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ আজ একজন বিশেষ অতিথি এসেছেন’ এ বলে দাদু মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। ত্রিকোণোমিতি বুঝে গেল, আজ বিশেষ কেউ এসেছেন। হয়তো বিশেষ কোনো সমাধান!

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে উঠোন ভরে গেল। সুদকষা, লাভক্ষতি থেকে শুরু করে ছোটখাট যোগ বিয়োগ গুন ভাগরাও চলে এলো। সবার ধাক্কাধাক্কিতে শূন্য চলে গেল একদম পেছনে। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। লাফিয়ে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করছে শূন্য।

সরল দাদু কাশির মতো গমগম শব্দ করে উঠলেন। এখুনি ঘোষণা করবেন অতিথির নাম।

‘আজ আমাদের অংকপুরে এসেছেন..।

এটুকুই শুনতে পেল শূন্য। বাকিটা শোনার আগেই কোত্থেকে উড়ে এসে ধপাস করে তার উপর আছড়ে পড়লো বিশালদেহী পাঁচ। এমনিতেই বাঁকা চেহারার মধ্যে সবসময় একটা বিরক্ত ভাব। তারমধ্যে আবার পড়েছে শূন্যর গায়ে। শূন্যকে ঝাপটা দিয়ে সরিয়ে নাক সিঁটকে বলল, ব্যাটা ফাজিল! কোনো মান নেই, তার আবার হম্বিতম্বি। তুই এখানে কী করিস! যা ভাগ!

নতুন অতিথির নাম শুনতে না পারায় শূন্যর মেজাজ চড়ে গেল। সেই মুহূর্তে মনে পড়লো ত্রিকোণমিতির কথা। হ্যাঁ! পেয়েছে বুদ্ধি! শূন্যর দিকে তাকিয়ে দুই হাত ভাঁজ করে দুপা এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলল, ‘দেব নাকি ভাগ করে? হুঁ?’

মুহূর্তের মধ্যে চেহারা হয়ে গেল ইংরেজি পাঁচের মতো। বারকয়েক ঢোক গিলল। দুই কদম পিছিয়ে গিয়েই হাওয়া। বেশ ভাব নিয়ে ভীড় ঠেলে এগোতে লাগলো শূন্য। এমন সময় ধাক্কা খেল গাট্টাগোট্টা চেহারার একটা সমীকরণের সঙ্গে। বেচারা ‘সরি’ বলার আগেই শূন্য চেঁচিয়ে উঠলো, তোমাকে ভাগ করে দেব বলছি! উল্টাপাল্টা সংখ্যা হয়ে যাবে, বুঝলে!

নতুন সমীকরণটার মুখ শুকিয়ে কাঠ। সে বুঝতে পারছে না শূন্য এমন খেপলো কেন। কোনোরকম কাঁচুমাচু করে বলল, ইয়ে মানে, নতুন এসেছি তো। তাই বুঝতে পারিনি।

‘নতুন! তুমি! তুমি নতুন এসেছো!’

শূন্য রাগ ভুলে এখন মহাখুশি। নতুন অতিথি তার সামনে দাঁড়িয়ে।

‘ইয়ে হ্যাঁ। আমি একটা চতুমাত্রিক সমীকরণ। একটা বিশেষ সমাধান।’

‘তুমি কী সমাধান করেছ?’

শূন্যর তর সইছে না। তার আগ্রহ দেখে নতুন অতিথি কিছুটা হাসলো। এরপর গা দুলিয়ে বলল, ‘তুমি শুনলে খুব অবাক হবে। আমি কাজ করেছি তোমাকে নিয়েই। এক বিজ্ঞানী তোমাকে নিয়ে গত বিশ বছর গবেষণা করেছে। তারপর ফলাফলে বেরিয়ে এলাম আমি।’

‘অ্যাঁ!’

নতুন অতিথির কথা শুনে পাড়ার সবাই দাঁড়িয়ে গেছে। ফিসফিস করছে সবাই। আড়চোখে শূন্যর দিকে তাকিয়ে কয়েকজন বলল, এ কি কথা! শূন্য মানে তো শূন্য, ওটা নিয়ে আবার গবেষণার কী আছে!

অতিথি হাসিমুখে সবার দিকে তাকালো। তারপর সবাইকে আরো চমকে দিয়ে বলল, ‘শূন্য মোটেই অর্থহীন নয়। শূন্য আছে বলেই গণিত টিকে আছে। শূন্য নিয়ে এখনো চলছে অনেক অনেক গবেষণা। শূন্য না থাকলে তোমরা কেউ গুণতে পারতে?

এক, দুই ও পাঁচ গা বাঁচিয়ে আড়ালে চলে গেল। লাফাতে লাফাতে সামনে এগিয়ে এলো ত্রিকোণমিতি। শূন্যর বুকটা ফুলে ইয়া বড় হয়ে গেল। নতুন অতিথির কথাগুলো এখন আর তার কানে ঢুকছে না। অতিথি বলেই যাচ্ছেন, ‘কিছু না থাকাটাও যে একটা কিছু থাকা, সেটা এই শূন্য না থাকলে কিন্তু কেউ বুঝতে পারতো না।’ সরল দাদু কপাল চুলকে বললেন, ‘কি জটিল! কি জটিল! আগে তো এমন ভেবে দেখিনি’। অতিথি বললেন, ‘শূন্য যদি না থাকে, তবে তারপর আর কেউ আসে কী করে? শূন্য না থাকলে এক থাকতো না, দুই থাকতো না।’

এরপর অতিথি আরো অনেক কিছু বললেন। কিন্তু সেদিকে কান নেই কারো। এর মধ্যে সবাই শূন্যকে নিয়ে আনন্দমিছিল বের করেছে। নয় এসে শূন্যকে কোন ফাঁকে কাঁধেও তুলে নিয়েছে। মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছে ত্রিকোণমিতি। ছটা বেণী দুলিয়ে দুলিয়ে সে স্লোগান দিচ্ছে, ‘জিরো জিরো.. আমাদের হিরো..’।

শূন্য বার বার ঘাড় বাঁকিয়ে নতুন অতিথিকে দেখার চেষ্টা করছে। অতিথি তাকে বলেছিলেন, শূন্যকে নিয়ে গবেষণা করেই নাকি তাকে পাওয়া গেছে। তার মানে অতিথি সমীকরণটার ভেতর লুকিয়ে আছে তার আসল রহস্য। কিন্তু তা সে কখন জানতে পারবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *