রহস্যজট : বর্ষামঙ্গল

ধ্রুব নীল : ‘নিন, মাথাটা মুছুন।’
ইরিনা টাওয়াল বাড়িয়ে দিলেও ছেলেটা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না সে এটা দিয়ে কী করবে। পরে যখন বুঝতে পারলো তখন এমনভাবে মাথা মুছতে লাগলো যেন মাথায় বৃষ্টির পানি নয়, বিষাক্ত কিছু লেগে আছে। তারপর মাথা মোছা যখন থামলো, তখন সে অনেকটা স্বাভাবিক হলো। বিড় বিড় করে বললো, ‘আমার বাবার ফাাঁসি হয়ে যাবে।’
‘কফি নাকি চা?’
‘জ্বি কফি।’
ইরিনা কফি বানাতে চলে গেল। ভাল পর্যবেক্ষক হলে বুঝে ফেলবে এটা তার ইচ্ছাকৃত। বেশিরভাগ ক্লায়েন্টই এমন। হন্তদন্ত হয়ে আসে। কথা গুছিয়ে বলতে পারে না। প্রাইভেট কাউন্সেলর হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে যাওয়ায় ইরিনাকে এমন ক্লায়েন্ট কম সামলাতে হয়নি। এসব টুকটাক কৌশল তাই রপ্ত করতেই হলো তাকে।
‘এবার গোড়া থেকে বলুন।’
‘সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি। বাবা মা প্রতিদিনই ঝগড়া করে। মানে আমার সৎমা। কলেজ থেকে ফিরে দেখি ওইদিনও ঝগড়া করছে দুজন।’
কফিতে চুমুক।
‘কী নাম আপনার?’
‘শুভ।’
‘কী নিয়ে ঝগড়া হতো শুভ?’
শুভ চুপ। ইরিনা বুঝে নিল। তবে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে শুধু বুঝে নিলেই হবে না। শুভর মুখ থেকেই শুনতে হবে তাকে।
‘মার ধারণা বাবার সঙ্গে এলিনা খালার একটা সম্পর্ক আছে। আর…।’
‘আর তোমার ধারণা নেই?’
‘আমি আমার বাবাকে চিনি। এমনটা তিনি কখনই করবেন না। তবে এলিনা খালা বাবার খুব ভাল বন্ধু। তিনি প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। আমার সৎমা সেটা চাইতো না। ব্যাপারটা দিনে দিনে একদম মানে খুব খারাপের দিকে যাচ্ছিল।’
ইরিনা খেয়াল করলো শুভ তার সৎমাকে মা বলে ডাকছে না। বলার ধরন দেখেই বোঝা যায় এ রাগের ভিত অনেক গভীরে।
‘তারপর?’
‘এলিনা খালার বাড়িটা বেশ ছিমছাম। একা থাকেন। দারোয়ান পর্যন্ত রাখেননি। আমাদের বাড়ি পাঁচ নম্বর রোডে তারটা সাতে। বিয়েও করেননি। কাজের লোক ছাড়া বাড়িতে মানুষজনও নেই। এক দুই মাস পর পর আমেরিকায় নিজের ছোট বোনের কাছে গিয়ে থেকে আসেন। আর এমনিতে যেকোনও কাজে উনি আমাকেই কল করেন সবার আগে। ওই দিন ঝগড়া দেখে আমি বের হয়ে যাই। কিছুক্ষণ পার্কে বসে বৃষ্টিতে ভিজি। ঘণ্টাখানেক হবে হয়তো। রাতে বাসায় ফিরতেই এলিনা খালার ফোন। আমাকে তার বাসায় যেতে বললেন। তার ধারণা কেউ একজন তার লনে ঘোরাঘুরি করছিল। নজর রাখছিল। দরজাও খোলার চেষ্টা করেছে নাকি।’
‘তারপর?’
‘আমি দেরি না করে বের হই। একটু বের হতেই দেখি আবার ঝুম বৃষ্টি। ভুলটা করেছি এখানেই।’
শুভর ব্যথা পাওয়া চোখই বলে দেয়, এলিনা খালাকে সে আসলেই খুব আপন মনে করতো।
‘কী ভুল?’
ধরা গলায় বলল, ‘আমি রেইনকোট নিতে বাসায় ফিরি আবার। তা না করে যদি সোজা চলে যেতাম তাহলে হয়তো এলিনা খালাকে..।’
এবার ডুকরে কেঁদেই উঠলো। ইরিনা এবার বিব্রত হলো। এ ধরনের অবস্থায় কী করতে হবে তা জানে না সে। মিনিট দুয়েক লাগলো শুভর স্বাভাবিক হতে।
‘আমি এলিনা খালার গেট দিয়ে ঢুকতেই হঠাৎ করে বৃষ্টি থেমে যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মন বলছিল যা হবার হয়ে গেছে। সামনের দরজা খোলা। দরজার নব ভাঙা। ভেতরে ঢোকার আগেই থানায় ফোন করি। পুলিশ আসে। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে যায়। এলিনা খালা ড্রয়িং রুমে পড়ে ছিলেন। ছুরি দিয়ে বুকে পেটে আঘাত করা হয়। জানালা দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাটে গোটা ঘরে রক্ত মেশা পানি।’
একটু জিরিয়ে নিয়ে ধাতস্থ হলো শুভ। তারপর আবার বলল, ‘এসব সপ্তাহখানেক আগের কথা। দুদিন আগে বাবা অ্যারেস্ট হন। মামলা করে এলিনা খালার বোন। বাবাকে পছন্দ করতেন তিনি। কিন্তু সব প্রমাণ বাবার বিপক্ষে।’
প্রমাণের কথা বলতেই ফাইলটা এগিয়ে দেয় শুভ। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে চোখ বোলালো ইরিনা। আইনের ডিগ্রি আছে তার। তবে কাউন্সিলিংয়ের বাইরে সচরাচর প্র্যাকটিস করে না।
তদন্ত প্রতিবেদনে যেমনটা বলা আছে, খুন করার কাজে ব্যবহার করা ছুরিটা পাওয়া গেছে বাগানে। তাতে অবশ্য ছাপ মেলেনি। ঘরের ভেতর ড্রয়িংরুমের কয়েকটা আসবাবে শুভর বাবার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। আততায়ী ঢুকেছে সামনের দরজা ভেঙেই। সবচেয়ে বড় কথা বাগানে পাওয়া জুতোর ছাপও নাকি মিলে গেছে শুভর বাবার জুতোর সঙ্গে। যেটা তিনি কদিন আগেই জার্মানি থেকে এনেছিলেন। জুতোর ছাপগুলোর ছবি দেখে বোঝা গেল ওগুলো ঘর বরাবর। অর্থাৎ ঘরের দিকেই হেঁটে গেছে খুনি।
‘খালা খুন হওয়ার আগের দিনই বাবার জুতোটা চুরি হয়ে যায়। খুনি জানতো জুতোটা দিয়ে বাবাকে ফাঁসানো যাবে। কারণ সে..।’
‘আপনার ধারণা আপনার মা, মানে সৎমা..।’
‘হুমম। কিন্তু প্রমাণ নেই।’
‘তা নেই। কিন্তু আপাতত আপনার বাবাকে বাঁচিয়ে দেওয়া যায়।’
‘কিভাবে?’
‘সেটা সহজেই করা যাবে। আর আসল খুনিকে বের করা বোধহয় তখন কঠিন হবে না। কারণ কে তোমার বাবাকে ফাঁসাতে চায়, সেটা তো সবাই জানে। একটু চাপ দিলেই হয়তো বেরিয়ে আসবে।’
শুভর বিস্ময় আর খুশি মাখা চেহারা বেশ উপভোগ করছে ইরিনা। এখন শুভর বাবার আইনজীবীকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারলেই হয়।
কী করে নিশ্চিত হলো ইরিনা? উত্তর দেখুন নিচে

উত্তর: শুভ যখন এলিনা খালার বাড়িতে যায় তখনও বৃষ্টি হচ্ছিল। বাগানে আততায়ীর জুতোর দাগ থাকার কথা নয়। ওটা পরে ইচ্ছেকরে বসানো হয়েছে। আর জুতোর দাগও ছিল বাড়িমুখি। অর্থাৎ যদি দাগটা খুনির হতো তবে সেটা খুনের আগেই পড়েছে। কিন্তু বৃষ্টিতে সে দাগ থাকার কথা নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *