খরগোশের লাভ ম্যারেজ

ফারুক আহম্মেদ জীবন

ঘন- কুয়াশায় ঘেরা শীতের সকাল। নয়ন আজ মাঠে গেছে ও বাবার সাথে খেতের সিম তুলতে। সিমের বান থেকে সিম তুলছে নয়ন। সেসময় হঠাৎ! ওর সামনে দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল

একটা খরগোশ। নয়ন খরগোশটাকে ধরার জন্য পিছনে ছুটলো। কিন্তু চোখের পলকেই যেনো মুহুর্তে হারিয়ে গেলো খরগোশটি। খরগোশ খুঁজে না পেয়ে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল নয়নের। সে এদিক-সেদিক খরগোশটির সন্ধান করতে লাগলো। 

হঠাৎ! ঝোপঝাড়ের মধ্যে চোখ যেতেই সে ছোট্ট একটা খরগোশ ছানা দেখতে পেল।ছানাটি তার কুচিকুচি দাঁত দিয়ে বেশ আয়েশ করে চোয়াল নেড়ে-নেড়ে মুরুব্বীদের পান চাবানোর মতো কি যেনো চিবিয়ে খাচ্ছে। আর বিড়বিড় করে তাকাচ্ছে নয়নের দিকে। খরগোশ ছানাটিকে দেখে নয়নের চোখে মুখে যেনো মুহুর্তে খুশির ঝলক ফুটে উঠল। সে দেরি না করে একটু আড়ালে গিয়ে। পা-টিপে টিপে চুপি সারে গিয়ে ঝপাৎ করে খরগোশ ছানাটিকে ধরে ফেললো। আনন্দের যেনো শেষ নেই নয়নের। সে উৎফুল্ল হয়ে হেসে ওঠে চিৎকার করে বললো ও আব্বা, আব্বা..

এই দেখো.. একটা খরগোশ ছানা ধরেছি। নয়নের 

আব্বা, স্বজল বললো…তাই! যাক খুব ভালো হয়েছে। নয়ন বললো…আব্বা আমি আর সিম তুলবো না বাড়ি যাচ্ছি। তারপর নয়ন খরগোশ ছানাকে বুকের সাথে জাপটে ধরে আনন্দে টগবগ করতে করতে মাঠ থেকে বাড়ির দিকে দৌড় দিল।

আর খুশিতে ছড়া কাটতে লাগলো….

আহা! কি- যে খুশি লাগছে

ধরে খরগোশ ছানা…

খরগোশ ছানার লম্বা দু,কান

চোখ যে টানা টানা।

কি- যে সুন্দর পশম গায়ের

নরম যে তুল তুলে,

আদর করতে ইচ্ছা করবে

একবার দেহ ছুঁলে।

এই সংবাদ মুহূর্তে ওদের পাড়ায় ছড়িয়ে পড়তেই। নয়নের মতো ছোট ওর বয়সী পড়শী যেসব ছেলে-মেয়েরা। যারা ওর খেলার সাথী। তারা সব  খরগোশ ছানাটিকে দেখতে নয়নদের বাড়ি ভীড়

জমালো। এদের মধ্যে আগে থেকেই নয়নদের বাড়ির পাশে কাজল নামের একটি মেয়ের পোষা খরগোশ ছানা ছিল। সেও এলো তার ছানাটিকে সঙ্গে নিয়ে। নয়নের খরগোশ ছানাটি ছিল মায়া।

ওদের মধ্যে কথা হচ্ছে কি নাম রাখা যায় নয়নের খরগোশ ছানাটির? শুনে নয়নের খেলার সাথীদের মধ্যে কেউ বললো.বেলী রাখ নয়ন। তো আবার কেউ বললো. ফুলি রাখ। কাজল মেয়েটি বললো.

যেহেতু আমার খরগোশ ছানাটি পুরুষ। আর তাই ওর নাম রেখেছি পুষি। নয়ন, তোর খরগোশ ছানা

তো মায়া।  তোর ছানার নাম থাক টুসি। নয়নের খুব পছন্দ হলো কাজলের দেওয়া নামটি। নয়ন বললো বাহ! মিল করে খুব সুন্দর নাম বলেছিস তো। যেহেতু আমি ওকে ফুলের জমির ঝোপ থেকে ধরেছি। তাই ওর নাম থাক ফুলটুসি। অবশ্য সংক্ষেপে টুসি বলেই ডাকব ভালো হবে না? সবাই

বললো…হুম খুব ভালো হবে। 

তারপর থেকে খরগোশ ছানা টুসিকে ঘিরেই যেনো নয়নের দু,চোখে ঘুম নেই। নেই যেনো ওর কোনো নাওয়া-খাওয়া । নয়ন কোথায় রাখবে টুসিকে? টুসিকে সে কি- কি খেতে দেবে? এইসব চিন্তায়। দুপুরে ওর আব্বা বাড়ি আসলে একবার ওর মাকে তো একবার ওর আব্বাকে জিজ্ঞাসা করছে তার ছোট্ট টুসিকে সে কি খেতে দেবে?আর কোথায় রাখবে? নয়নের মা-বললো..একটা লোহার খাঁচা বানিয়ে সেই খাঁচায় রাখতে খরগোশ ছানাটিকে। নয়ন বললো…

ঠিক আছে মা। রাতে শোয়ার সময় কিন্তু আমার সাথে রাখবো টুসিকে। কি খাওয়াবে সে টুসিকে?

এবার, নয়নের বাবা বললো…খরগোশ ছানা কচি ঘাস, কলমিলতা শাক, গাজর, জল এসব খেতে পছন্দ করে। নয়ন বললো…ঠিক আছে আমি এখনি ওর জন্য মাঠ থেকে কচি জালি ঘাস কেটে আনছি। তারপর কাঁচতে হাতে নয়ন মাঠে ছুটলো  ঘাস কাঁটতে। নয়ন তার শোয়ার ঘরে ছানাটিকে কাছে নিয়ে ঘুমায়। এভাবে বেশ কয়েকদিন যেতে না যেতে ছানাটি বেশ পোষ্য হয়ে উঠল নয়নের। এখন খরগোশ ছানাটিকে টুসি বলে ডাক দিলেই দৌড়ে চলে আসে নয়নের কাছে। ছানাটি সবসময় নয়নের কাছাকাছি থাকে। টুসির আদর যত্নের কোনো কমতি নেই। মাসকয়েক যেতে না যেতেই 

ছানাটি বেশ ডাগর হয়ে উঠলো।ওদিকে কাজলের

পুরুষ ছানাটিও বড় হয়েছে। মাঝেমধ্যে ছাড়া পেলেই কাজলের খরগোশ ছানা পুষি। নয়নদের বাড়ি ছুটে চলে আসে। টুসির সাথে দেখা করতে। টুসিও সুযোগ পেলেই ছুট ধরে পুষিকে একনজর দেখতে। ওদের মধ্যে বেশ ভাব জমেছে তা-সকলে

বুঝতে পারে। এরইমধ্যে একদিন টুসি বেশ অসুস্থ

হয়ে পড়লো। টুসিকে সুস্থ করার জন্য এলাকার

পশু হসপিটাল থেকে চিকিৎসক আনা হলো। টুসি – র জন্য পুষির মন বেজায় খারাপ। কাজল খাদ্য

দিলেও পুষি খাচ্ছে না। মন মরা হয়ে এদিকওদিক 

তাকাচ্ছে। মজে- মজে পুষি আর টুসির প্রেম বহু

দূর যে গড়িয়ে গেছে তা- কারোর আর বুঝতে বাকি থাকে না। যাহোক- অনেক ওষুধ পথ্য যত্নের 

পর টুসি সুস্থ হয়ে উঠেছে। তা-দেখে কাজলের পুষির সেই মন মরা ভাবও যেনো কেটে গেছে । নয়ন কাজল বয়সে কিশোর-কিশোরী হলেও কমবেশি বুঝতে শিখেছে ওরা । যা-বুঝার বুঝতে বাকি থাকে না ওদের। পাড়ার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এ নিয়ে কানাঘুঁষা চলতে থাকে। সকলে বসে সিন্ধান্ত নিল পুষি আর টুসির মন দেওয়া নেওয়ার

ঘটনা অনেকদূর গড়িয়েছে। যেহেতু ওদের বিয়ের বয়স হয়েছে। আর তাই দেরি না করে ওদের লাভ ম্যারেজ পড়িয়ে দিতে দিবে। ওদের যে কথা সেই কাজ। কিন্তু খরগোশ ছানা পুষি আর টুসির বিয়ের বরযাত্রী হবে কারা? 

নয়ন আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলতে লাগলো। আরে তুরা কোনো চিন্তা করিস না…..

আজ যে আমার পোষা টুসির

হবে খুশির বিয়ে,

দাওয়াত দে-সব পশু পাখির

কচ্ছপ ময়না টিয়ে।

সিংহ থাকবে থাকবে যে বাঘ

থাকবে শিয়াল মামা,

টুসির জন্য কিনে আন সব

শাড়ী গয়না জামা।

তারপর সুন্দর করে সকলে কাজলের পুষি আর নয়নের টুসিকে বিয়ের সাজে সাজালো। কাজিকে

ডাকলো একসময় বিয়ে পড়ানোর জন্য। নয়ন আর কাজলের পাড়ার খেলার সাথীরা। তারা সব যার যার নিজেদের বাড়ি থেকে চাল, ডাল, আলু, আর টাকা তুলে। তারপর  মাংস কিনে পুষি আর টুসির বিয়েতে ধুমধাম করে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করলো। মালা বদল করিয়ে সকলে মিলে খুব আনন্দের সাথে হৈ-হুল্লোড় করে পুষির আর টুসির বিয়ে দিল।

তাং-২৩/১/২০২৫/ইং

নারাংগালী ঝিকরগাছা যশোর বাংলাদেশ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *