গত ছমাস ক্ষণিকা হাসপাতালে। কোনো কাজ নেই। দিনরাত শুধু শুয়ে থাকা। প্রথম কদিন বেশ খারাপ লেগেছিল। পরে সয়ে এসেছে। বিছানায় শুয়ে চোখ বুঁজে ভাবাটাই এখন তার কাজ। মাঝে মাঝে বদ্ধ পরিবেশটায় সবকিছু অসহনীয় মনে হয়। কিন্তু চোখ বুঁজলেই মনে হয় সামনে অসীম দিগন্ত।
হাসপাতালে ছমাস। অথচ ক্ষণিকার স্বামী তাকে একবারও দেখতে আসেনি। ইশ্, অন্তুটা না জানি কী করছে! সামনের ডিসেম্বরে তিনে পা দেবে। এই সেদিন টুকটুক করে কথা বলা শিখেছে। বদ্ধ পরিবেশটায় থাকলে সময় বোধহয় দ্রুতই যায়। ইমতিয়াজ কি অন্তুকে ঠিকমতো সময় দিচ্ছে? সে নিজেই তো ভুলোমনা। ক্ষণিকা এ জন্য তাকে একটা নামও দিয়েছে, ‘ভুলু’।
সন্তান ও স্বামীর কথা অনেক ভেবেছে ক্ষণিকা। প্রথম দিকে খুব অভিমান জন্মালেও এখন আর তা নেই। চোখ বন্ধ করে চাইলেই সে এখন অন্তুকে আদর করতে পারে। কেবল ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। কিছু বলতে গেলেই গা ঝাঁকিয়ে দৌড়ে পালাবে।
আপাতত ভাবার মতো কিছু পাচ্ছে না ক্ষণিকা। মা ছোটবেলাতেই মারা গেছেন। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই তাকে দেখতে আসতো। শুধু দেখতোই না, গুটুর গাটুর আলাপও জমাতো। বাবা না আসায় একটুও কষ্ট পায় না ক্ষণিকা। এতো বড় ব্যবসা একা সামলাতে হয়। শুধু ইমতিয়াজ আর অন্তুর কথা ভাবতে গেলেই ভোঁতা একটা কষ্টের অনুভূতি তৈরি হয়। কীভাবে চলছে! কী খাচ্ছে, কে জানে! চোখ বুঁজে ইমতিয়াজকে বহুবার শাসিয়েছে ক্ষণিকা। ঠিকমতো খাও! সময়মতো ঘুম থেকে ওঠো! ঘুমুতে যাও! বাচ্চার দুধ কেনা.. ইত্যাদি ইত্যাদি। বেশিরভাগ সময়ই বাধ্য ছেলের মতো শুনতো ইমতিয়াজ।
আজ আর অতোটা বকবে না ঠিক করলো ক্ষণিকা। কল্পনায় হ্যান্ডসাম এক ইমতিয়াজকে দাঁড় করায়। ক্ষণিকাই কথা শুরু করে। ‘কী ব্যাপার! আমাকে দেখতে আসো না কেন?’ ইমতিয়াজ লাজুক হাসি দেয়। মাথা নিচু করে বলে, অন্তুকে একা কার কাছে রেখে আসবো, সেতো হাসপাতালে আসতে চায় না। ‘আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে এটা বললেই পারো! অজুহাত দেখানোর কী দরকার!’। ইমতিয়াজের মাথা আরো নিচু হয়। মিনমিন করে কী যেন বলে। কল্পনায় সেটা স্পষ্ট শুনতে পায় না ণিকা। শুধু ঠোঁট নাড়ানো দেখে। ক্ষণিকা আগের চেয়ে জোরালো কণ্ঠে বলে, তোমার ঐ সুন্দরী কলিগকে বিয়ে করলেই পারো! তোমাকে দেখলেতো খুশিতে গদগদ! ইমতিয়াজ এবার অনেকটা বাচ্চাদের মতো মাথা দুলিয়ে হাসে। ক্ষণিকা যতো রাগবে তার হাসির পরিধি ততোই বাড়বে। নিজের কল্পনায় নিজেই কেমন যেন ধরা পড়ে যায় ক্ষণিকা। নাহ্ ইমতিয়াজকে সে বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। এতো ভালোবাসা কি ঠিক? ভীষণ কষ্ট পেতে হয়। কল্পনাটা ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে আসে।
মানুষ বলতে ক্ষণিকা এখন শুধু দুয়েকজন ডাক্তারকে দেখে। মাঝে মাঝে গুটিকয়েক শিক্ষানবীশ ডাক্তারও তাকে দেখে যায়। ওদের মধ্যে একটা মেয়েকে বেশ মিষ্টি লাগে। চোখের ভেতর সারাক্ষণই কেমন যেন ভয় খেলা করে। ক্ষণিকা ভাবে এ মেয়ে ডাক্তার হতে গেল কেন? দেখে মনে হয় ঠিকমতো সূঁচও ঢোকাতে পারবে না। তবে মেয়েটাকে দেখলেই ক্ষণিকার নিজের অতীতের কথা মনে পড়ে।
ইমতিয়াজের সঙ্গে সে একসঙ্গেই পড়েছে। ইমতিয়াজ সবসময়ই ঢিলেঢালা শার্ট পরতো। চুপচাপ থাকতো। মাঝে মাঝে পত্রিকায় লেখালেখি করতো। তবে ইমতিয়াজের লেখক পরিচয়টা জানতো না ক্ষণিকা। তাই বান্ধবীদের সঙ্গে ইমতিয়াজকে নিয়ে আড়ালে অজস্র ভ্রুকূটি চলতো। ইভ টিজিংয়ের মতো তারা দলবেঁধে রীতিমতো অাডাম টিজিং করতো। কিন্তু ইমতিয়াজ ছিল নির্বিকার। এই নির্বিকারত্বই ক্ষণিকাকে প্রেমে পড়তে বাধ্য করে।
অতীতের কথা ভাবলেই ক্ষণিকা শিরশিরে একটা আনন্দের অনুভূতি উপলব্ধি করে। মনে হয়, এ উপলব্ধি তার বোধের স্তর পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা ঘরময়। নিজেকে হঠাৎ করে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কোনো অস্তিত্ব মনে হতে থাকে। অজস্র কষ্ট, অজস্র আনন্দ ছাড়াও ভালোবাসার আরেক বিশেষ উপলব্ধি টের পায় সে।
শৈশবের কথাও ভাবে ক্ষণিকা। বাবার হাত ধরে একদিন আইসক্রিম খেয়েছিল। কেন জানি শুধু সেদিনকার স্মৃতিটাই তার মাথায় গেঁথে আছে। সেদিন বিকেলে পুরো আকাশজুড়ে মেঘ। প্রচণ্ড বাতাস। স্কুল থেকে ফেরার পথে হঠাৎ আইসক্রিম খাওয়ার শখ জাগে ক্ষণিকার। বাবাকে বলতেই রাজী হয়ে যায়। যখন তখন ঝড় শুরু হতে পারে। ক্ষণিকা স্পষ্ট দেখে, সে তার বাবার হাত ধরে আইসক্রিমে কামড় দিচ্ছে এবং ঠাণ্ডায় মুখের ভেতরটা শিরশির করে উঠছে। ধূলো উড়ছে। লোকজনের ছোটাছুটি। খেয়াল নেই দুজনেরই। এতোটুকুই মনে আছে ক্ষণিকার। তার মস্তিষ্কটা বোধহয় এর বেশি মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি।
শৈশবের এ দৃশ্য বহুবার ভেবেছে ক্ষণিকা। তবে কখনো কাঁদেনি। তার কাঁদার প্রয়োজনও কি ফুরিয়ে গেছে? ক্ষণিকার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, তার জন্যে কেউ কাঁদছে কিনা। আগে অবশ্য একটা ছেলে প্রায়ই কাঁদতো। নাম সুনীল। ক্ষণিকাকে পছন্দ করতো। এখন কী করছে কে জানে। কলেজে থাকতেই তার সঙ্গে শেষবার দেখা হয়েছিল ক্ষণিকার। সুনীলের অদ্ভুত কর্মকাণ্ড বেশ উপভোগ করতো সে। হয়তো এখনো করতো। হয়তো তাকে নিয়ে ভাবার প্রয়োজনও ফুরিয়ে গেছে।
ক্ষণিকার সব ভাবনা ঘুরে ফিরে অন্তুর কাছে এসেই ঠেকে। দেখতে বাবার মতোই হয়েছে। তবে স্বভাব পেয়েছে উল্টোটা। কান্নাকাটি আর বায়না ধরে পুরো বাসা মাথায় তোলে। জন্মের পর তাকে নিয়ে কতো হই চই। সামান্য একটু কেঁদে উঠলেই ইমতিয়াজ তড়াক করে লাফিয়ে উঠতো। বাচ্চা কোলে নেয়া নিয়ে ক্ষণিকার সঙ্গে সেকি ঝগড়া! অন্তুকে এখন সারাদিনই কোলে নিয়ে ঘুরতে পারে ইমতিয়াজ। তবে এ নিয়ে ক্ষণিকার খুব একটা অভিমান জন্মায় না।
ক্ষণিকা ভাবতে ভালোবাসে। ভাবার জন্যই ভাবা। আনন্দ বা দুঃখ পাওয়ার জন্য নয়। বদ্ধ ঘরটায় বোধের একাকীত্ব কাটানোর এক অবিরাম প্রহসন চলে তার ভেতর।
ভেবে ভেবেই কেটে যায় অনেক দিন। অনে..ক। তবু কেউ তাকে দেখতে আসে না। মাঝে মাঝে সেই মিষ্টি চেহারার মেয়ে ডাক্তারটা আসে। ভীতু চাহনী। দ্রুত ছুটে চলা।
ইমতিয়াজ, অন্তুকে নিয়ে অনেক অনেক নতুন কল্পনা তৈরি হয়। তবু অভিমান জন্মায় না। ক্ষণিকার শরীরটাও বড্ড বেশি ভঙ্গুর হয়ে গেছে। ডাক্তারদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। ক্ষণিকার কল্পনার মতো তার শরীরটাকে টিকিয়ে রাখার প্রহসনও চলছে। তবু ক্ষণিকার অভিমান জন্মায় না, হিমশীতল মর্গটার প্রতিও।