স্বপ্নের সাইকেল

কয়েকদিন যাবৎ অঝোর বৃষ্টি গোটা শহর জুড়ে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ।কতদিন সূর্যের মুখ দেখা হয় না মনে নেই।পীনপতন নীরবতা বিরাজমান শহরের অলিগলিতে।এমন এক মখমলে দিনে আসিফ মুখ ভার করে বসে আছে।তার ভীষণ রকমের মন খারাপ।কারণ তার বাবা আবদার রাখেনি তার।আজ সেই প্রতীক্ষিত দিন যে দিনে বাবা তাকে সাইকেল কিনে দিবে বলেছিল।এই দিনের অপেক্ষায় সে কতো রাত নিদ্রাহীন থেকেছে।কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি আজ।

আসিফের বাবা রিক্সাচালক।ঢাকার রায়ের বাজারে দীর্ঘ ১৬ বছর সে রিক্সা চালায়।অসীম অভাব আর টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে তার সংসার চলে যাচ্ছিল কোনোরকম।আসিফের একটা ছোট বোন আছে। তার নাম আফিয়া। আফিয়া তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। দুরন্ত স্বভাবের মেধাবী একজন মেয়ে। গত পরীক্ষা সে সেকেন্ড হয়েছে।সেজন্য তার প্রচুর মন খারাপ হয়েছিল।তাই এবার সে ভালোভাবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেছে।এবার তাকে ফার্স্ট হতে হবে।

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামল।কি বিষণ্ণ সন্ধ্যার রং।বৃষ্টি কমেনি এখনো।ঝিরিঝিরি একই ছন্দে টুপটাপ পড়ছে অবিরাম।এমন ভালো লাগার মুহূর্তেও আসিফের পরিবারে হেমন্তের পাতা ঝরা বৃক্ষের মতো শোক লেগে আছে।বৃষ্টিতে ভিজে রিক্সা চালানোর কারণে আসিফের বাবার জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।তাই সে কয়েকদিন যাবৎ রিক্সা চালাতে যেতে পারছেনা।বাড়িতে খাদ্য সামগ্রীও অন্তের দিকে।এ কারণে আসিফের মাও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।কারণ তার ঘাম ঝরানো টাকা দিয়েই এই ঝুলন্ত সংসার কোন ভাবে চলে যায়।তার অন্তহীন পরিশ্রমের কারণেই আসিফ ও তার বোন ভালোভাবেই পড়াশোনা করতে পারে।

অনেকটা সময় পর বৃষ্টি কমলো।সবার রাত কেটে গেল গভীর নিদ্রাতে।বিমুগ্ধ প্রভাত।গা হিম করা কোমল বাতাস বইছে দিগন্তজুড়ে।সূর্যের স্নিগ্ধ আলো নদীর গায়ে পড়ছে। আর এই অদ্ভুত বিকিরণে নদীর পানি মোহময় মরীচিকার মতো ঝলমল করছে।এমন ভালো লাগার মুহুর্তেও আসিফের মুখে হাসি নেই।কারণ তার স্বপ্নের সাইকেল এখনো কেনা হয়নি। তার ক্লাসমেট রাফি মনির আসাদ সবারই সাইকেল আছে। তারা তাদের সাইকেলে করেই প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া আসা করে এবং পড়ন্ত বিকেলে সাইকেল চালিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে।শুধু আসিফেরই সাইকেল নেই।সে সবার মত আনন্দ উল্লাস করতে পারে না। বন্ধুদের সাথে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে পারে না।হেঁটে যেতে হয় একাকী। এমন সব কথা মনে অজান্তেই আসিফ ভাবতে লাগলো।আর তার দুচোখ অশ্রুতে টলমল করতে লাগলো।একপর্যায়ে তা ঝরে পড়লো বিনম্র মৃত্তিকায়।এই দুঃখ বিজরিত নোনাজলে তার মুখ ও বুক ভিজে একাকার হয়ে গেল।সে মনে মনে বলতে লাগলো,আমার স্বপ্ন কবে পূরণ হবে!বাবা কি আমায় সাইকেল কিনে দিবে না।

কয়েকদিন অতিবাহিত হল।আসিফের বাবা সুস্থ হয়ে কর্মে ফিরলো পুনরায়।তার মুখে অপ্রাপ্তির যন্ত্রণার ছাপ। বুকে অসীম অভাবের ব্যথা।সন্তানের স্বপ্নপূরণ এবং সংসারকে গুছিয়ে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছা তাকে ঘুমোতে দেয় না এখনআর।তাই সে পরিবারের জন্য অশ্রান্ত পরিশ্রম করে যায় দিনরাত।

একদিন সকালে আসিফের ঘুম ভাঙলো মোরগের ডাকে।সে ঘুম থেকে উঠেই দেখে তার সামনে একটি নীল রঙের সাইকেল। সে প্রথমত নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছিল না, বারবার মনে হচ্ছিল এটা তার নিদ্রার স্বপ্ন।কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝতে পারে এটা বাস্তবেই।এবং তার পিছনে বাবা-মা ও ছোট বোন আফিয়া দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে।সে দৌড়ে গিয়ে  তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল।এবং তার চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগলো।এই নোনাজল ভীষণ আনন্দের কথা বলে।

বিকেলের মিষ্টি রোদ।গা হিম করা মৃদু বাতাসে আসিফ মুক্ত মনে সাইকেল চালাচ্ছে শহরের অলিগলিতে।তার চোখে মুখে পৃথিবী সমান আনন্দ। আজ সে মহাখুশি।কারণ আজ তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন আর তার মন খারাপ করে একা হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতে হবে না। 

লিখেছেন আবির হাসান
শিক্ষার্থী, সিদ্দীকিয়া মডেল একাডেমি
নির্দেশক,কালের পথিক
ঠিকানা,হেমায়েতপুর,সাভার,ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *