তিনটি অণুগল্প

সাব্বির হোসেন নাফিজ

খাদক

হাসপাতালের মসজিদে সারা রাত কাটিয়েছে আবুল। শরীর দুর্বল। গতরাতে আবুলের ছেলেকে একদল লোক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়।

ঘন্টা খানেক বাদে থানা থেকে ফোন দিয়ে হাসপাতালের মর্গে আসতে বলে।

আবুল মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে। কিচ্ছুক্ষণ পরপর বলে ওঠে, আমার বাজান, আমার মানিক।

পান চিবাইতে চিবাইতে মর্গের কেয়ার টেকার বলল, পোলারে নিয়া যাইবেন নাকি মুখ দেখবেন?

– পোলাটারে তো লইয়াই যামু। কেন?

যদি লাশ লইয়া যান তাহলে দু হাজার, মুখ দেখানি একশ আর কই কই চোট খাইছে তাহলে পঞ্চাশ টাকা দেওন চাই।

– পকেটে দুইশত টাকাই আছে। বাবা, আমার এক মাত্র বাজানটারে আমার হতে দিয়া দাও। আমি বাজানরে লইয়া বহুদূর চইলা যামু।

গল্প- উন্মেষ

আকাশে চাইয়া কি যেন দ্যাখে লাইজু। চারিদিকে পানি। সরকারে যে বান্ধ দিছিল তা ভাইঙ্গা গ্রাম ডুইবা গ্যাছে। দুইবছরের পোলা কাদেররে কোলে নিয়া উঁচা জায়গা দেইখা মশারি খাটাইয়া দিন গুনতাছে ফজর আলি। চেয়ারম্যান বাড়ি ঘেড়াও করছে। চেয়ারম্যান সবাইরে কইল,

– তোমাগো লাইগা ত্রাণ আইতাছে।

 মানুষজনসহ ফজর আলি চিল্লাইয়া জবাব দিল,

–  ত্রাণ দরকার নাই। বান্ধটা ঠিক কইরা দ্যান। বালা মাটিতে কিচ্ছু থাকেনা। রাইতে গরু – ঘোড়া খইচা সব আউলায় ফেলে। গ্রামের মসজিদের সাথে ইমামের কবরটাও নদীর পেটে গ্যাছে।

স্কুল গেলো গত বছর।

বাপের কোলে মাথা দিয়া কাদের, ফজর আলির মুখের দিকে চাইয়া কইল,

– বাজান ও বাজান। ভোক লাগছে। খাওন দাও।

গল্প- এতিম পৃথিবী 

প্রতিটি শিশুর ঘুম সত্যিই সুন্দর, নান্দনিক, শৈল্পিক এবং পবিত্র । ওঁরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাসে। খেলে।

রবি এক বাবা মা বিহীন সাত বছরের শিশু ছেলে। তালতলার এক বিশাল বাড়িতে কাজ করে। জীবন গড়ে। কে বা কাহারা তাকে তুলে নিয়ে এসে বিক্রি করে দিয়েছে জানা নেই। সেই বাড়িটাই তাঁর পৃথিবী। রবি হাসে, খেলে আর মন চাইলেই কাঁদে।   

একদিন মায়ের কোলে ঘুমন্ত শিশুর মত ঘুমিয়ে আছে। বড় সাহেবের ছোট ছেলে এসে পিঠের হাড় বরাবর লাথি মেরে বলল, “হারামজাদা আর কত ঘুমাবি? যা গিয়ে এক কাপ চা নিয়ে আয়। ফকিরের বাচ্চা। গিলে গিলে দেহে গোস্ত জমেছে দেখ।”

সেদিনের পর থেকে রবির আর ঘুম ভাঙ্গেনি।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *