জুয়েল আশরাফ
গুলজার মামা ভূত বিশ্বাস করেন না। কেউ ভূতুড়ে গল্প বললে তেতে ওঠেন। মামা একটা কোম্পানিতে ম্যানেজার পদে চাকরি করেন। অফিসের কেউ যদি তার সাথে ভূতের ভয়ানক কিছু বলেন, তাহলে মামা ভয় পান না। মামা বলেন, ভূত বলে কিছু নেই। এ সবই মানুষের মনের ব্যাপার।
একদিন অফিসে বেশি কাজ থাকায় রাতে মামা বাড়ি ফিরছিলেন। বাইক নিয়ে আরাম করে বাড়ি ফেরার পথে, হঠাৎ নির্জন রাস্তায় বাইক বন্ধ হয়ে যায়। রাত অনেক হয়ে গেছে, এসময় কোনো দোকান খোলা থাকে না। বাইক ঠিক করতে পারবে না ভেবে টেনে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন।
কিছুদূর পৌছে দেখলেন বাসস্টপের কাছে মাজন সন্ন্যাসী বসে আছে। একসময় সে মাজন বিক্রি করত, তাই ওই নাম। ব্যবসায় লাভবান হয়নি, মাজন ব্যবসা ছেড়ে হালে সন্ন্যাসীর বেশভূষা ধরেছে। আজকাল কেউ আঙুলের মাথায় ছাইপাঁশ লাগিয়ে দাঁত মাজে না। সবাই এখন টুথপেষ্ট আর টুথব্রাশে অভ্যস্ত।
অনেকক্ষণ ধরে বাইক টেনে নিয়ে আসাতে মামা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ভাবলেন এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবেন। মামা সোজা সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে বসলেন। তার সাথে কথা বলতে লাগলেন। দুজনে প্রায় দশ মিনিট কথা বললেন। কথা প্রসঙ্গে ভূতের কথাও চলে আসে। হাসতে হাসতে মামা বললেন, ভূত বলে কিছু নেই আর আমি ওদের বিশ্বাস করি না। এগুলো সবই মিথ্যা ও ভ্রান্ত বিষয়।
সন্ন্যাসী অবাক চোখে মামার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি ভূত বিশ্বাস করো না, সে ভিন্ন কথা। তুমি যদি বলো ভূতের অস্তিত্ব নেই তবে তা একেবারেই ভুল।
মামা আবার হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ভূত আছে? তাহলে দেখা যাচ্ছে না কেন? তুমি কি কখনও ভুত দেখেছ? তুমি কি আমাকে একটা ভূত দেখাবে?
সন্ন্যাসীর মনে হল আজ তাকে ভূত দেখাতে হবে। সে মামাকে অনুসরণ করতে বলল। তারপর শ্মশানের দিকে এগিয়ে গেল।
নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুজনেই। এবার মামা একটু ভয় পেতে লাগলেন, কিন্তু সাহস করে এগিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে দুজনেই শ্মশানে পৌঁছে গেলেন। সেখানে অনেক মৃত মানুষ হাঁটছে।
সন্ন্যাসী মামাকে এক জায়গায় বসিয়ে বলল, এখানে কিছুক্ষণ আগে একটি লাশ পোড়ানো হয়েছে। এখন এখানে আমি তোমাকে ভূত দেখাব।
সন্ন্যাসী সঙ্গে সঙ্গে সেখানে একটি পেরেক বসিয়ে একটি সুতা বেঁধে দিল। তারপর সুতার শেষ অংশটা মামার হাতে দিয়ে বলল, আমি সুতার লাইনে চারটা বাতাশা রেখেছি। তাদের খেতে চারটি ভূত আসবে। যতক্ষণ ভূত এই বাতাশা চারটিকে সম্পূর্ণরূপে খেয়ে শেষ না করে ততক্ষণ পর্যন্ত এই সুতা ছাড়বে না, না হলে তোমার বিপদ ঘটবে।
এই বলে মাজন সন্ন্যাসী গুলজার মামাকে চোখ বন্ধ করতে বলল। তারপর বিড়বিড় করে মন্ত্র পাঠ করতে লাগল।
সন্ন্যাসীর কান্ডকারখানা দেখে মামা একটু ভয় পেলেন, কিন্তু সুতাটা দ্রুত ধরে চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ মন্ত্র পাঠ করার পর সন্ন্যাসী তাকে চোখ খুলতে বলল।
মামা চোখ খুলতেই তার সামনে চারটি ভূত হাবুডুবু খাচ্ছে। মামা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার চোখ পড়ল একটি ভূতের ওপর। সে আর কেউ নয়, তার প্রতিবেশী, যিনি দুই দিন আগে মারা গেছে। তাকে দেখেই মামার হাত থেকে সাদা সুতাটি আলগা হয়ে গেল। সন্ন্যাসীর দিকে হতভম্ব হয়ে তাকালেন, কিন্তু সন্ন্যাসী মন্ত্র পড়ে চলে গেল।
এবার মামা ভয়ে দ্রুত ছুটতে লাগলেন বাড়ির দিকে। এসময় পেছন থেকে কেউ বারবার তার নাম ধরে আওয়াজ দিচ্ছে, কিন্তু সে মুখ ফিরিয়ে তাকাননি। কোনোরকমে বাড়ি পৌঁছে ভয়ে ভোর হয়ে গেল।
সকালে প্রথমে মামা তার নানা নানিকে রাতের ঘটনা বললেন তারপর ঘুমাতে বিছানায় গেলেন। কিছুক্ষণ পর যখন তার চোখ খুলল, তখন তিনি শ্মশানে। কেউ জানে না কীভাবে মামা আবার শ্মশানে পৌঁছেছেন। সেদিন থেকেই মামার মানসিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
……………………… লেখকের ঠিকানা
জুয়েল আশরাফ
পিতা- জনাব আলী
গ্রাম- বাহ্রা চরকান্দা
পোস্ট- বাহ্রা
উপজেলা- নবাবগঞ্জ
জেলা- ঢাকা