বিকেল পাঁচটার পর

ধ্রুব নীলের সায়েন্স ফিকশন গল্প

সামছুল করিম কলেজে বছর বিশেক হলো অংক পড়ান আবদুল মতিন। বয়স ষাটের কাছাকাছি। এখনো শক্তসমর্থ। হাঁটাহাঁটি করেন সারাদিন। একই কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক নেপাল চন্দ্রের সঙ্গে জমে ভালো। দুজনই সমবয়সী। বহুদিনের বন্ধুত্ব। ক্লাসের ফাঁকে সময় পেলেই দুজন বিজ্ঞানের কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আবদুল মতিন অবশ্য পদার্থবিজ্ঞানের অনেক কিছু না বুঝেও হাঁ হুঁ করে চালিয়ে যান। কঠিন আলাপের এক পর্যায়ে নেপাল চন্দ্র নিজেও খেই হারিয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে চলে যান অন্য রুমে।

‘বুঝলি মতিন, সময় আমাদের চোখের সামনে থাকে। বয়ে যায়। কিন্তু আমরা সেটা বুঝতে পারি না। ধরতে পারি না। আমাদের মনে হয় ওটা একটা ফাঁকি। কিন্তু না। সময় জিনিসটা একেক জায়গায় একেক গতিতে চলে।’

‘বিষয়টা আমার মুখস্থ। এই নিয়া পঁচানব্বইবার শুনছি।’

‘না, ধর, সময় কোথাও আস্তে চলে, কোথাও দ্রুত। দুইটাকে পাশাপাশি কল্পনা কর। দেখতে পাচ্ছিস তোর সামনে আরেকটা কাঠামোর ভেতর আরেকটা মানুষ স্লো মোশনে চলছে। তার সাপেক্ষে তোর সময় চলছে দ্রুত। আবার ওই লোকের কাঠামোতে যদি ঢুকে পড়িস তবে তোর কাছে মনে হবে সময় ঠিকঠাক গতিতে চলছে। এক.. দুই.. তিন এভাবে চলবে সেকেন্ডের কাঁটা। এখন বল তোর সামনে স্লো মোশনে যে সময়টা চলছে সে তোকে কেমন দেখবে? সে দেখবে তুই শোঁ সাঁ করে সব করে ফেলছিস। মানে তার কাছে তোর চলাফেরার গতি হবে অনেক বেশি।’

‘এটা পরিষ্কার। সূত্র যদিও মনে নাই। তবে বিষয়টা জানি। ভালো কথা, আমার তো চারটার মধ্যে বের হতে হয়। তুই আজ একটু ডিউটিটা ম্যানেজ কর। আমি কাল তোরটা করে দিব।’

‘আরে.. এইটা তো তোর প্রতিদিনের রুটিন। কোনোদিন না করেছি আমি? তোর জীবন তো বিকেল পাঁচটার মধ্যে আটকে গেছে।’

বিকেল পাঁচটার প্রসঙ্গ আসলেই অপ্রস্তুত হয়ে যান আবদুল মতিন। গত বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি ঠিক চারটায় কলেজ ছেড়ে বের হয়ে যান। সবাই জানে বিকেল পাঁচটায় তাকে বাসায় পৌঁছাতে হয়। গুটিকয়েক ছাত্রও জানতো বিষয়টা। তারা আবার গোয়েন্দাগিরি করে বের করেছে আবদুল মতিন বিকেল পাঁচটায় বাসায় থাকেন না। কোথায় যান সেটা কেউ জানে না। অবশ্য এ নিয়ে কারো বিশেষ মাথাব্যথা নেই। বুড়া মানুষ, বিয়ে করেনি। ঘুরে ফিরে সময় কাটান হয়তো।

নেপাল চন্দ্র বেশ আয়েশ করে তার চূড়ান্ত তত্ত্বকথা বলার প্রস্তুতি নিলেন। ‘যা বলছিলাম। ধর তোর সামনের কাঠামোটার সময় খুব স্লো। তাহলে কী ঘটবে?’

‘সে আমাকে দেখবে আমি রকেটের মতো সব কাজ কইরা ফেলতেসি। ধুম কইরা জন্ম হইল ধুম কইরা মইরা গেলাম।’

‘ঠিক ধরছিস। তার সাপেক্ষে তোর জীবনটা হবে একটা স্ফূলিংগের মতো। এই আছে এই নেই। এতটুক পর্যন্ত ক্লিয়ার আমার কাছে। কিন্তু খটকা লেগেছে অন্য জায়গায়। ধর তোর সামনে যে সময় কাঠামোটা আছে, সেখানে সময় একেবারে স্থির। তখন কী ঘটবে? সেখানকার লোকটা কী দেখবে?’

এতক্ষণ মনযোগ না থাকলেও এবার ভ্রু খানিকটা কোঁচকালেন আবদুল মতিন। ‘আমার অঙ্কের সূত্রমতে সেই লোকের কাছে আমার অস্তিত্বই থাকবে না। আমি পুরা নাই হয়ে যাব। মানে কোনোকালে ছিলাম না।’

‘একজাক্টটলি! বাহ! মতিন তুই তো পুরা একটা নোবেল পুরস্কার টাইপ কথা বলে ফেলেছিসরে!’

‘পুরস্কার নিয়া কাম নাই। নোবেল পুরস্কার নিতে গেলে একটা নোবেল ভাষণ দিতে হয় নাকি। মঞ্চে উঠতে আমার ভয় করে। নোবেল পুরস্কার তুই নিয়া আসিস। আমি গেলাম। পাঁচটা বাজতে দেরি নাই।’

‘ভালো ভালো। কিছু রহস্য তৈরি করা ভালো। তুই মানুষ ভালো, তোর বিকেল পাঁচটার রহস্যটাও ভালো থাকুক। রহস্য যেন না ভাঙে। হা হা হা।’

বিকেল চারটার পর সময়টা মনে হয় দ্রুতই চলে। হন হন করে বেরিয়ে পড়লেন কলেজ থেকে। ঘড়ি দেখলেন কয়েকবার। সেকেন্ডের গতি বেড়ে গেছে অনেকখানি। এক.. দুই… পাঁচ.. আট..। পূর্ব মটুয়া গ্রামের পাশেই ত্রিপুরার সীমানা। সেখানে উঁচু নিচু ঢিবি আছে অনেক। একটা ছোটখাট জঙ্গলের মতো জায়গাও আছে। সেখানে একটা খুপরি ঘর কিনেছিলেন আবদুল মতিন। খুপরি ঘরটা আছে একটা উঁচু টিলার আড়ালে। ভেতরে কোনো আসবাব নেই। ভাঙাচোরা দুয়েকটা চেয়ারটেবিল আছে শুধু। কিছুদূর পরেই নো ম্যানস ল্যান্ড। এদিকটায় লোকজন খুব একটা আসে না। আবদুল মতিন কেন এ খুপরি ঘর কিনেছেন সেটাও কেউ জানে না। বাসাটায় তেমন কিছু নেই। একটা ছোট নতুন কেনা ট্রাাংক আছে। আর কিছু চেয়ার। মতিন সাহেব দ্রুত ট্রাংকটা খুললেন। বের করে আনলেন জিনিসগুলো। এরপর ঢুকে পড়লেন পাশের আরেকটা রুমে। বাড়িটার একটা অদ্ভুত বিষয় আছে। বাইরে থেকে দেখতে বড়জোর সাত আটশ বর্গফুটের মতো হবে। ভেতরে ঢুকলেই ভোজবাজির মতো সাইজ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এ রুম থেকে ও রুম। অনেকগুলো আলো-আঁধারি রুম পেরিয়ে আবদুল মতিন ঢুকলেন টয়লেটে। প্রাকৃতিক কর্ম সেরে আরেকটি ছোট কক্ষে ঢুকে পড়লেন। সময় নিয়ে টুকটাক কাজ সারলেন। এরপর বামের মরচে পড়া পুরনো দরজাটা খুলতেই বিকেলের সোনালি রোদ ঠিকরে পড়ল চোখে মুখে।

আন্ধারমানিক স্পোর্টিং ক্লাব পড়েছে মহাবিপদে। প্রথমার্ধের খেলার দশ মিনিট পার হয়ে গেছে এখনো দশ নম্বর জার্সিওয়ালা মিন্টুর দেখা নেই। তাকে ছাড়াই খেলা শুরু হয়েছে এবং যথারীতি আন্ধারমানিক টিম দশ মিনিটে দুটো গোল হজম করেছে। হন্তদন্ত হয়ে মিন্টু ছুটে আসতেই বিনাবাক্যে নেমে পড়ল মাঠে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সবাই। মিন্টুকে দেখে প্রতিপক্ষও খানিকটা নেতিয়ে গেল। ছোটখাট দূরন্ত এ ছেলে বড় হয়ে নির্ঘাৎ আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকা হবে। রোগা পাতলা শরীর, কিন্তু কী করে যেন বুঝে যায় কোথায় কোন প্লেয়ার দৌড়ে যাবে। কোথায় কত গতিতে মারতে হবে কিক। মিন্টুর এ হিসাবের রহস্য কেউ জানে না। তারা ভাবে এসব বুদ্ধি মিন্টু বুঝি নিজে নিজে বের করেছে। নিজের দলের খেলোয়াড়দের তো বটেই, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কার দৌড়ের সর্বোচ্চ গতি কত হতে পারে, কে কোনভাবে দৌড়ালে কোথায় যাবে, কে কিভাবে শরীর নাচালে কোন দিকে বল নিয়ে ছুট লাগাবে সবই তার মুখস্থ। তাই আচমকা খালি একটা জায়গায় পাস দিয়ে বসে মিন্টু। আর অমনি নিজের দলের বাঘা এক স্ট্রাইকার ছুটে গিয়ে বল নিয়ে ঢুকে পড়ে সোজা প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে।

মিন্টু হলো তার দলের ম্যাজিক বয়। ম্যাজিক বয়ের আগমন মানেই নিশ্চিত ডজনখানেক গোলের ব্যবধানে জয়। আজও ব্যতিক্রম হলো না।

যথারীতি প্রতিপক্ষের মধ্যে ফিসফিস গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।

‘এই ছেলে থাকে কোথায়? কার কাছ থেকে শিখেছে খেলা?’ কথাটা বলল প্রতিপক্ষ দল শুভপুর স্ট্রাইকিং ক্লাবের ক্যাপ্টেন। সঙ্গে থাকা আরেকজন বলল, ‘আমি খবর পাইসি। মিন্টুর এক স্যার আছে। ফুটবল কোচ না। তবে ওই স্যার অংক পড়ায়। ওই স্যার তারে কী কী জানি শিখাইসে।’

‘স্যারের খবর লাগা সালাউদ্দিন! ওই স্যাররে দরকার হইলে ভাড়া কইরা আনবি। ভাড়ায় আসতে না চাইলে বস্তায় ভইরা আনবি। আমাদেরও টেকনিক শেখা লাগবে।’

‘এত টেকনিক শেখার কী কাম ইকবাল ভাই। মিন্টুরে কিনা ফালান। আমগো ক্লাবে নিয়া আসেন।’

‘আরে নারে। অনেকবার কইসি। সে আইব না।’

খেলা শেষে মিন্টুকে নিয়ে মাতামাতি চলতে থাকে আধঘণ্টা ধরে। এরপর সন্ধ্যা হতেই যে যার বাড়ির পথ ধরে। মিন্টুও ব্যাগ গুছিয়ে রওনা দেয়।

‘তোর বাড়িতে তো নিলি না আমাকে একবারও।’

বন্ধু নিখিলের কথা শুনে হাসল মিন্টু।

‘আমার তো বাড়ি নাই। বেড়ার ঘর। ওইখানে কেমনে নিয়া যাই।’

‘আরে ধুর! আমি মনে হয় দালানে থাকি! চল নিয়া চল।’

‘রাইত হইসে তো অনেক।’

‘নাহ, তারপরও যামু। রাইতে তোর লগে আড্ডা দিমু। সক্কালে ফিরা আসবো বাসায়।’

‘হেহে। আসল কথা হইল তুই আমার অংকের স্যারের সঙ্গে দেখা করতে চাস। কিন্তু এত রাইতে স্যার তো আমার বাড়িতে আইসা বইসা থাকবে না।’

‘ধুর কী বলিস না বলিস। খেলা নিয়া আমার টেনশন নাই। আমার বাড়িত আসলে কেউ নাই। মা-বাপ তো মইরা গেসে। রাইত বিরাইতে ঘুরে বেড়াইলে কেউ কিছু কয় না। আমার কাম হইল বইসা আসমান দেখা। আসমানের তারা গুনি। হেই তারা আবার মাঝে মাঝে দৌড়াদৌড়ি করে। তারার দৌড়াদৌড়ি দেখি।’

জুতোটা খুলে ব্যাগে ভরতে ভরতে কী যেন ভাবল মিন্টু। তারপর নিখিলের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ নাটকীয় ভঙ্গিতে চুপ থেকে বলল, ‘চল তবে আমার লগে।’

গল্পকথায় সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষণ হলো। জঙ্গল আর উঁচু নিচু ঢিবি মাড়িয়ে দুই কিশোর চলল পশ্চিমের দিকে। আর একটা উঁচু ঢিবি পেরোলেই মিন্টুর ঘর। ঢিবির ওপর উঠলেই চোখে পড়ে। ঝিঁঝিঁপোকার কান ঝালাপালা করে দেওয়া ডাকের মাঝেও সব কেমন যেন নিরব নিথর। মিন্টুর বাড়িতে আলো জ্বলছে না। ঘুটঘুটে অন্ধকার।

‘ভয় পাস না। চল।’

‘তুই সঙ্গে থাকলে ভয় কিসের। ভূত জ্বিন না থাকলেই হইলো।’

রহস্যময় হাসি দিল মিন্টু। এরপর বন্ধুকে নিয়ে ঢুকে পড়ল মরচে পড়া দরজাটা ঠেলে।

‘একি! মতিন তুই! আমি এইখানে আসলাম কী করে! কী আজব কাণ্ড! আমি ছিলাম আমার মেয়ে নীলিমার বাসায়। নাতিটার সঙ্গে খেলতেছিলাম। এইখানে কেমনে আসলাম! এটা কার ঘর? এত আন্ধার কেন?’

‘ওহে নেপাল চন্দ্র নিখিল, সবই ফিজিক্স। বুঝলি, সবই ফিজিক্স। শুধু ঘটনা সব এখনো আবিষ্কার হয় নাই। একটু ঠান্ডা হয়ে বোস, সব বুঝিয়ে বলবো একটু পর।’

জঙ্গলের ভেতর ছোটখাট ভাঙাচোরা বাড়িটা থেকে বের হয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে কথাটা বললেন আবদুল মতিন ওরফে মিন্টু।

অনলাইনে ফ্রি বাংলা গল্প পড়তে আমাদের সঙ্গে থাকুন। প্রয়োজনে ওয়েবসাইট রিফ্রেশ করে সাইটের ‘বন্ধু’ হয়ে যান। সেক্ষেত্রে নতুন গল্প আপডেট হলেই শুধু নোটিফিকেশন পাবেন।

এ ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপলোড হবে বাংলা রোমান্টিক গল্প, বাংলা হরর গল্প, থ্রিলার গল্প , অতিপ্রাকৃত গল্প এবং বাংলা সায়েন্স ফিকশন গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *