কবির কাঞ্চন
চেয়ারে পিঠ ঠেকে চোখদুটো বন্ধ করে দাঁতে দাঁত কাটতে লাগলেন সোহান চৌধুরী। এ প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছেন প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। তবু সবকিছু নিজের মতো করে চালিয়ে নিতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে কী তিনি কোনো ভুল পথে হাঁটছেন? তিনিই এখানকার সর্বেসর্বা। তার কথা সবার কাছে হুকুমের মতো। ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে মুখে বিড়বিড় করেন, “না, না, আমাকে কোমল হলে চলবে না। অধীনস্থদের দৌড়ের ওপর না রাখতে পারলে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া এখানে যারা কর্মরত রয়েছে তারা সবাই নিজ নিজ শাখায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। এদের ছাড় দিলে আমার নিজের দুর্বলতা ওদের সামনে ধরা পড়ে যেতে পারে। তাই যে যাই বলুক আমাকে কঠোর হতে হবে।”
এরইমধ্যে নিঃশব্দে তার কক্ষে ঢুকে পড়েন জুলি ম্যাম। স্যারকে একাকী বিড়বিড় করতে দেখে খুসখুস কেশে বললেন,
– স্যার, কিছু বলছেন?
সোহান চৌধুরী সোজা হয়ে বসে জুলি ম্যামকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন। বয়স পঁয়তাল্লিশ পার হয়েছে ঠিকই কিন্তু এখনও শরীরে বার্ধক্যের ছিঁটেফোঁটা নেই। মনে হয় চোখের সামনে ষোড়শী কুমারী বসে আছে। চলনে বলনে সবার চেয়ে আলাদা। এ প্রতিষ্ঠানে আসার পর থেকে জুলি ম্যামকেই তার মনের ধরেছে। তাই একটু সময় পেলেই দু’জনে খোশগল্পে মেতে ওঠেন।
জুলি ম্যাম সহকারী ব্যবস্থাপক পদে চাকরি করছেন। নিজের কাজে ফাঁকি দিতে তার জুড়ি নেই। অনেকে বলে তিনি নাকি তার কাজটাই বোঝেন না। শুধু হাত-পা গুটিয়ে নিজের কক্ষে বসে থাকেন। আর ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকেন।
প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত সবাই তা জানে। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তির জোরে নিজের অবস্থান পাকা করে রেখেছেন।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সোহান চৌধুরী দিয়ে বললেন,
– কিছুই ভালো লাগছে না।
– কেনো কী হয়েছে, স্যার?
– এখানে এলাম প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। কিন্তু সবকিছু এখনও আমার আয়ত্তে আসেনি। যেদিকেই এগুতে চাই প্রতিবাদের ঘ্রাণ খুঁজে পাই। অথচ আমার অভিধানে পরাজয় বলে কিছু নেই। আমি জ্ঞানে না পারলেও জোর দিয়ে হলেও জিতে যাই। কিন্তু —।
– আপনিই তো জিতবেন। এখানে আপনার কথার উপর কারো কথা বলার অধিকার নেই।
– তা ঠিক। তবু—।
– স্যার, আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছেন।
– হয়তো আপনি ঠিক বলছেন। অ্যানিওয়ে, আপনার কী খবর? আজকাল আপনার দিকে তাকালে চোখের পলক পড়ে না। আপনি সত্যি অপরূপা!
জুলি ম্যাম লজ্জায় লাল হয়ে ক্ষীণ কন্ঠে বললেন,
– স্যার, আপনি বাড়িয়ে বলছেন।
– একদম মিথ্যে বলছি না। আসলেই বিধাতা আপনাকে আপন মাধুরি মিশিয়ে তৈরি করেছেন। হয়তো একারণেই আপনাকে আমি আলাদাভাবে খুঁজে পেয়েছি।
– স্যার, আস্তে বলুন, দেয়ালেরও কান আছে।
– ঠিক আছে। আজকাল আপনার জন্য আমার ঘুম হয় না, তা কেনো হয় বলতে পারেন?
– একেই বলে আত্মিক টান। ইদানিং আমারও এমনটি হচ্ছে। কিন্তু —।
– আবার কিন্তু কী?
– না, মানে ইয়ে, ভাবছি আমাদের ফ্যামিলির কথা। আমার পরিবার আছে। আপনারও। মন চাইলেও সবকিছু করা যায় না।
– মনের মিল থাকলে সবই করা যায়। বরং আমি আপনি এদিক থেকে অনেকটা চিন্তামুক্ত আছি। কারণ কেউই আমাদের সন্দেহের চোখে দেখবে না। দু’জনে চুটিয়ে প্রেম করতে পারব। এ বয়সে এসে এমন সুযোগ পাব তা স্বপ্নেও ভাবিনি। খাব আমরাই অথচ বিল উঠবে আরেকজনের নামে! কী চমৎকার আইডিয়া!
এ কথা বলে সোহান চৌধুরী হো হো করে হেসে উঠলেন।
– স্যার, মুখে লাগাম দিন, নইলে লাইলী মজনুর প্রেম কাহিনির মতো সবার মুখে মুখে রটে যাবে।
জুলি ম্যাম উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন।
– রটলে রটুক। আমি কাউকে ভয় করি না।
– এখানে ভয় না করলেও আমাদের ঊর্ধ্বতনদের কথা ভাবুন।
– ঊর্ধ্বতনদের এসব নিয়ে ভাববার সময় নেই। যাই হোক চলুন আমরা ফ্যাক্টরী ভিজিট করে আসি।
– জ্বি, চলুন।
সোহান চৌধুরী গলার টাইটা ঠিক করে নিয়ে কক্ষ থেকে বের হলেন। জুলি ম্যামও তাকে অনুসরণ করে হাঁটছেন।
পুরো ফ্যাক্টরীর চারদিকে নীরব পরিবেশ। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। সোহান চৌধুরী ও জুলি ম্যামের দিকে অনেকেই বাঁকা চোখে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নেয়। ফ্লোর ইনসার্জ সিরাজুল দু’কদম এগিয়ে এসে সুপারভাইজার মনোয়ারের কানে কানেবলতে লাগল,
– ঐ দেখো, দু’জন এদিকে আসছে। এ বয়সে এসেও তাদের যেনো ভীমরতি ধরেছে। মনোয়ার ভাই, ভালো করে দেখো, দু’জনে আজ ড্রেসও ম্যাচ করে এসেছে।
মনোয়ার কপালে ভাঁজ করে বলল,
– কী বিচ্ছিরি! প্রতিষ্ঠানের আয়া ভুয়া থেকে শুরু করে সবার মুখে মুখে উনাদের নিয়ে নানান কথা শুনি। আমি বলি কী উনাদের কানে কী ওসব যায় না?
– যাবে কীভাবে! সবাইকে যেভাবে দৌড়ের ওপর রেখেছে। কোনো কথা বলা যায় না। কিছু বলতে গেলে ব্ল্যাকলিস্টে নাম লিখে রাখে। পরে সুযোগ বুঝে সুদে আসলে উসুল করে নেয়। থাক ভাই, ওসব উনাদের ব্যাপার। আমরা অমন পাপের সাক্ষী হতে চাই না।
একথা বলে বাইরের দিকে তাকাতেই জুলি ম্যামের চোখে চোখ পড়ে যায়। সিরাজুল চট করে চোখ নামিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জুলি ম্যাম সিরাজুলকে এভাবে দেখতে পেয়ে মনে মনে ভাবতে লাগল,
– ছেলেটা আমাদের নিয়ে আবার কী যেনো ভাবছে। আর বেশ কিছুক্ষণ ধরে আরেকটা ছেলের সাথে সে কী যেনো কানাকানি করছিল। ওদের দেখে মনে হচ্ছে ওরা আমাদের সন্দেহ করেই কথা বলছিল। যাই হোক এদের পরে ঠিকই একটা ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। নইলে পচা শামুকে পা কাটতে পারে।
সোহান চৌধুরী হঠাৎ জুলি ম্যামকে একমুহূর্তের জন্য পাশে না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি পিছনে ফিরে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। ততক্ষণে জুলি ম্যাম তার পাশে এসে দাঁড়ান।
সোহান চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন,
– কী ব্যাপার পিছিয়ে পড়লেন কেনো?
– না, একটা বিষয় খেয়াল করেছি।
– গুরুত্বপূর্ণ কিছু?
– হ্যাঁ, স্যার। আপনাকে রুমে গিয়ে বলব।
– আচ্ছা, চলুন তাহলে।
একটুপর তারা সোহান চৌধুরীর কক্ষে এসে আবার বসলেন। জুলি ম্যাম সিরাজুল সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দিলেন যা শুনে সোহান চৌধুরী মুহূর্তে ঘামাতে শুরু করলেন। জুলি ম্যাম আবার বললেন,
– স্যার, আপনি বোধহয় খুব টেনশন করছেন।
– হ্যাঁ, আপনার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমাদের জন্য টিকে থাকা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে।
তাই বলছি কী স্যার, চারিদিকে সব ছড়িয়ে পড়ার আগে আগে ওকে কোনো একটা কারণ দেখিয়ে চাকরিচ্যুত করা যায় কীনা।
– আপনার আইডিয়াটা দারুণ।
এরইমধ্যে জুলি ম্যাম সোহান চৌধুরীর দিকে মিষ্টি হেসে বললেন,
– স্যার, আমি একটু আসি।
– কোথায় যাবেন?
– আমার রুমে।
– জরুরি কোনো কাজ আছে?
– না, তারপরও সেই যে আপনার সাথে আছি আর আলাদা হইনি। বাইরে আয়া-বুয়া, পিয়ন আছেন।
– তাতে কী হয়েছে? ওরা তো আমাদের পাহারা দিচ্ছে।
– না, স্যার, সময়ে ওরাও আমাদের জন্য বিপত্তির কারণ হতে পারে। তাই আগেভাগে সাবধান হওয়া উচিত।
– হঠাৎ একথা বলছেন! ওদের কাউকে কী আপনার সন্দেহ হয়?
– আমার তো এ প্রতিষ্ঠানের সবাইকে সন্দেহ হয়।
– একেই বলে চোরের মনে পুলিশ পুলিশ।
একথা বলে জুলি ম্যাম হো হো করে হেসে ওঠে বললেন,
– স্যার, আমি তাহলে যাই।
– যাই না, আসি বলুন। আপনি না এলে আমি যে মরেই যাব।
দু’জনে চোখে চোখ রেখে একসাথে মৃদুস্বরে হেসে উঠলেন। এরপর জুলি ম্যাম কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন।
পরদিন সোহান চৌধুরী ফ্যাক্টরী মালিকের কাছে সিরাজুলের বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন। ফ্যাক্টরী মালিক বারিক মজুমদার এসব কথা শুনে হুকুমের স্বরে বললেন,
– এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কাউকে আমার প্রতিষ্ঠানে দেখতে চাই না। শীঘ্রই এদের ফ্যাক্টরী থেকে বের করে দিন। মনে রাখবেন, আমার অনুপস্থিতিতে আপনিই প্রতিষ্ঠানের সব দেখভাল করছেন। তাই প্রতিষ্ঠানের জন্য মঙ্গল হয় এমন যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে আমার কোনো বাধা থাকবে না।
– জ্বি, স্যার। আমি তাই করছি।
ফ্যাক্টরী মালিকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে খুশি মনে নিজ কক্ষে প্রবেশ করেন সোহান চৌধুরী। এসি ছেড়ে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
– যাক, বাঁচা গেল। কালই ওকে বের করা যাবে।
– স্যার, কার কথা বলছেন?
হঠাৎ জুলি ম্যামের গলার আওয়াজ শুনে সোহান চৌধুরী চোখ কপালে তুলে বললেন,
– আপনি! কখন এলেন? একটুও টের পেলাম না।
– আপনার পরপরই।
– ওহ্! আচ্ছা। যাই হোক, কথা বলছিলাম সিরাজুলের বিষয়ে। ফ্যাক্টরী মালিকের সাথে ওর ব্যাপারে আমার কথা হয়েছে। শুধু ও নয়, আমার অধীনস্থ যে কারো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে অনুমতি দিয়েছেন।
– তার মানে ওকে আমরা চাকরিচ্যুত করতে যাচ্ছি!
– হ্যাঁ, এবং সেটা আগামীকালই।
– ধন্যবাদ, স্যার।
– এখন থেকে আপনি খেয়াল রাখবেন আর কে কে আমাদের সম্পর্কের বিষয় নিয়ে মুখ খোলে। ধরতে পারলেই ওদের চাকরিচ্যুত করা হবে।
– জ্বি, স্যার।
হঠাৎ সোহান চৌধুরী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। জুলি ম্যামও দাঁড়িয়ে গেলেন। এরপর হাতের ইশারা করে বসতে বলে তিনি ওয়াশরুমে প্রবেশ করলেন। জুলি ম্যাম একা বসে আছেন। বাইরে থেকে পিয়ন মোবারক পাহারা দিচ্ছে। ফ্যাক্টরীর কার্যক্রমও চলছে যথারীতি। একটুপর সোহান চৌধুরী বেরিয়ে এসে জুলি ম্যামের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বললেন,
– আমার চাকরি জীবনে অনেককে দেখেছি। কিন্তু আপনার মতো একজনও পাইনি। আপনি পারেনও বটে।
– স্যার, কী যে বলেন! আপনি একজন দক্ষ খেলোয়াড়। আপনার চোখে একবার যে পড়বে তার নিজেকে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। যেভাবে আমি ধরা দিয়েছি।
সোহান চৌধুরী হেসে ওঠে বললেন,
– আচ্ছা, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।
– বলুন, স্যার।
– আসছে ‘শ্রমিক দিবস’ উপলক্ষে প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। আপনার কোনো আপত্তি না থাকলে চলুন না দু’জন কোথাও গিয়ে ঘুরে আসি।
জুলি ম্যাম কপালে চিন্তার ভাঁজ এনে বলতে লাগল,
– না, মানে স্যার, বলছিলাম কী, ঐদিন তো আমার উনারও অফিস বন্ধ থাকবে।
– তাতে সমস্যা কী?
– উনাকে কী বলে বের হব?
– বলবেন ফ্যাক্টরী ম্যানেজার স্যার আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি মিটিং দিয়েছেন।
– তাই বলে ছুটির দিনেও!
– বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সবই সম্ভব। বুঝিয়ে বলবেন।
– তাহলে কোথায় যাব?
– আপনি সোজা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে বিকেল চারটার দিকে চলে আসবেন। আমি সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করব।
– আচ্ছা, স্যার।
– এক কাজ করুন, ম্যাম আপনি একটু পুরো ফ্যাক্টরীটা ভিজিট করে আসুন।
– স্যার, আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও কী দেখে আসব?
– হ্যাঁ, আমি যতদিন আছি এ প্রতিষ্ঠানের সবার ওপর আপনার কর্তৃত্ব চলবে।
– যতদিন আছি মানে?
– এমনিতেই বললাম।
– ওহ্! আচ্ছা।
এই কথা বলে জুলি ম্যাম ফ্যাক্টরী ভিজিটের জন্য বেরিয়ে গেলেন।
শুক্রবার। সকাল থেকে পথে পথে শ্রমজীবি মানুষের ঢল নেমেছে। সময় যতই গড়াচ্ছে সীবীচ এলাকায় লোকজনের আনাগোনা ততই বাড়ছে।
বিকেল চারটা বাজতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় বাকি। পুবের সূর্যটা অনেকটা পশ্চিমে হেলে গেছে। বিকেলের স্নিগ্ধ আলো সমুদ্রের জলের ওপর পড়ে এক অনাবিল প্রশান্তির সৃষ্টি করেছে। সোহান চৌধুরী দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। পিছন থেকে জুলি ম্যাম আস্তে করে বললেন,
– আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
পিছন ফিরে সোহান চৌধুরী আশানু হয়ে জবাব দিলেন,
– ওয়ালাইকুম আসসালাম, তাহলে চলে এসেছেন।
হঠাৎ হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
– একেবার ঠিক সময়ে এসেছেন। এজন্যই আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।
– ধন্যবাদ, স্যার। এতোক্ষণ কী করছিলেন, স্যার?
– দূর আকাশের স্নিগ্ধ আলো সমুদ্রের জলে মিশে পড়ন্ত বিকেলের যে অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে তা দেখছিলাম। এতক্ষণ উদাসী মনে এর আসল সৌন্দর্য বুঝতে পারিনি।
– কেন, স্যার?
– আমার চোখদুটো ওদিকে থাকলেও অন্তর্দৃষ্টি তো আপনার দিকেই ছিল। আপনি কখন আসবেন। হৃদয়ে হৃদয় বিছিয়ে আমাকে ধন্য করবেন।
– স্যার, আপনার সাথে কী আর কেউ আছে?
– না, আমি একাই এসেছি।
– গাড়ি আনেননি?
– এনেছিলাম। ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিয়েছি। যাবার সময় কল দিলে চলে আসবে। আপনার সাথে কী আর কেউ এসেছে?
– না, আমিও একা এসেছি।
– তাহলে ভালোই হলো।
– মানে!
– ও কিছু না। চলুন, কোথাও গিয়ে নিরিবিলি বসি।
– জ্বি, কিন্তু এখানে নিরিবিলি জায়গা কোথায় পাবেন! চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। শুক্রবার হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের ঢল নেমেছে। আমাদের ফ্যাক্টরীর শ্রমিকরাও আসতে পারে। কেউ দেখে ফেললে কিন্তু মানইজ্জত বলে কিছুই থাকবে না।
– আপনি ঠিক বলেছেন। চলুন আমরা বোট ক্লাবের দিকে যাই। সেখানকার পরিবেশ এখন খুব সুন্দর। আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। আমার জন্যও সুবিধা হবে।
– বুঝলাম না, স্যার।
সোহান চৌধুরী জুলি ম্যামকে উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবতে দেখে বললেন,
– কী ভয় পেলেন মনে হয়?
– না, কী যে বলেন!
– আরে কোনো ভয় নেই। আমার জন্য সুবিধা হবে মানে বোট ক্লাবে আমরা যারা সামরিক বাহিনীর সদস্য তাদের জন্য বিশেষ কিছু সুবিধা থাকে। সেখানে গেলেই তা বুঝতে পারবেন।
– ওহ্! এই কথা।
এরপর সোহান চৌধুরী জুলি ম্যামকে সাথে নিয়ে বোট ক্লাবের দিকে চলে আসেন। দু’জনে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কথা না বলে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
এরইমধ্যে ওয়েটার এসে আস্তে করে বলল,
– স্যার, কিছু অর্ডার করবেন?
সোহান চৌধুরী জুলি ম্যামকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন,
– কী অর্ডার করব?
– হালকা কিছু হলে চলবে। সাথে আইসক্রিমও।
– ওকে।
সোহান চৌধুরী ওয়েটারকে অর্ডার করে আবার জুলি ম্যামের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠলেন। পাশ দিয়ে একটি বিশাল জাহাজ যেতে দেখে দু’জনেই সেদিকে লক্ষ্য করেন। কাচের দেয়াল দিয়ে ওপারের দৃশ্যাবলী বড়ই নয়নাভিরাম লাগছে। নদীর টলমলে জলে ছোট বড় বেশ কয়েকটি জাহাজ আসা যাওয়া করছে। পাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলে যাচ্ছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। কোনটি পালতোলা আর কোনটির পালবিহীন। ওপারের ছায়া সুনিবিড় প্রকৃতির নান্দনিক রূপ কর্ণফুলির খরস্রোতা জলে মিশে মনকাড়া খেলায় মেতেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সুসজ্জিত জাহাজগুলো নদীর বুকে নিরাপত্তার এক বিশাল দেয়াল হয়ে অবস্থান করছে। পড়ন্ত বিকেলের আবছা আলোয় আকাশ আর কর্ণফুলির জলের মিতালি যেনো আগত মানুষের মনে খুশির জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে।
এরইমধ্যে ওয়েটার নাস্তা নিয়ে হাজির হয়।
সোহান চৌধুরী জুলি ম্যামের দিকে নাস্তা এগিয়ে দিয়ে বললেন,
– শুরু করুন, ম্যাম।
– জ্বি, স্যার, আপনিও নিন।
– ওকে।
নাস্তা খাওয়া শেষ হতে না হতেই জুলি ম্যামের ফোনটা বেজে ওঠে। ঝটপট কানের কাছের নিয়ে “হ্যালো” বলতেই ওপার থেকে আওয়াজ আসে,
– মেডাম, স্যার এক্সিডেন্ট করেছেন। আপনি তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসুন।
মুহুর্তে জুলি ম্যামের অস্থিরতা দেখে সোহান চৌধুরী উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– মেডাম, বড় ধরনের কোনো সমস্যা?
জুলি ম্যাম হতাশা মিশ্রিত গলায় বললেন,
– হ্যাঁ, স্যার আমাকে এক্ষুণি বেরুতে হবে। আমার সাহেব নাকি এক্সিডেন্ট করেছেন।
এ কথা বলতে বলতে জুলি ম্যাম চোখের জল ছেড়ে দেন। সোহান চৌধুরী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ড্রাইভারকে কল করেন। এরপর বিল পরিশোধ করে জুলি ম্যামের বাসার দিকে রওনা দেন।
বাসার সামনে এসে দু’জন গাড়ি থেকে নামলেন।
জুলি ম্যাম ব্যস্ত গলায় বললেন,
– তাহলে আমি আসি, স্যার।
– আমিও আসি। উনাকে দেখে যাই।
জুলি ম্যাম হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
– সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। এসময় আমাদের একসাথে দেখলে সন্দেহ করতে পারে।
– না, সন্দেহ করবে না। বলব আমরা জরুরি মিটিংয়ে ছিলাম। উনার এক্সিডেন্টের খবর পেয়ে দেখতে এসেছি। এতে পরবর্তীতে বাসায় আসা-যাওয়ায় সুযোগ সৃষ্টি হবে।
জুলি ম্যাম বিষন্ন ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে বললেন,
– স্যার, আপনি পারেনও! আসুন আমার সাথে।
সোহান চৌধুরীও জুলি ম্যামের সাথে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। জুলি ম্যাম দৌড়ে এসে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। পাশ থেকে সোহান চৌধুরী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে থামতে বললেন। ততক্ষণে ব্যথায় কাতর হুমায়ুন আবিদ ক্লান্ত চোখে সবার দিকে তাকান।
স্ত্রীকে খুব ভেঙে পড়তে দেখে তিনি ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন,
– কেঁদো না, জুলি। আমার মারাত্মক কিছু হয়নি। আল্লাহর কাছে দোয়া কর। আর হ্যাঁ, উনি কে?
সোহান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন।
জুলি ম্যাম সোহান চৌধুরীকে ইশারা করে বললেন,
– উনি হলেন আমাদের ফ্যাক্টরীর ম্যানেজার স্যার।
– সোহান চৌধুরী!
– হ্যাঁ।
– ওহ্! আচ্ছা। উনাকে গেস্ট রুমে নিয়ে নাস্তা দাও।
স্বামীর মুখের এমন কথায় জুলি ম্যামের বুক ধুক করে ওঠে। “ তবে কী ও আমাদের সবকিছু জেনে গেছে! নাকি এমনিতেই আতিথেয়তার জন্য বলেছে।” এমন ভাবনা থেকে সোহান চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– স্যার, আমার সাথে আসুন।
সোহান চৌধুরী জুলি ম্যামকে অনুসরণ করে গেস্ট রুমে এসে বসলেন।
এরপর বললেন,
– জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর উনি আমাকে দেখে আপনাকে কী যেনো বলেছেন। কিছু বুঝলাম না।
– আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছেন। আপনাকে গেস্ট রুমে বসিয়ে নাস্তা করাতে বলেছেন। ওর এমন কথায় আমি খুব ভয় পেয়েছি। আর কোনোদিন তো এভাবে বলেনি।
– আর কোনোদিন তো আমিও আপনাদের বাসায় আসিনি। থাক ওসব। এখন নাস্তা খাব না। রাত সাড়ে আটটার মতো বেজেছে। আমাকে এখনই বেরুতে হবে।
– ঠিক আছে।
এরপর সোহান চৌধুরী জুলি ম্যামের সাথে আবার হুমায়ুন আবিদের কাছে আসেন। হুমায়ুন আবিদকে ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন থাকতে দেখে তিনি জুলি ম্যামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ড্রাইভারকে কল করেন।
সোহান চৌধুরী গাড়ির পিছনে আরাম করে বসলেন। গন্তব্যে দ্রুত গতিতে গাড়ি চলছে। চারদিকে হরেক রঙের আলোক বাতি জ্বলছে। গাড়ির পর গাড়ি, মানুষের পর মানুষ গন্তব্য পথে ছুটছে। ফুটপাতেও মানুষের ভীড়। সোহান চৌধুরী গ্লাসের বাইরে তাকিয়ে দেখে ব্যস্ত সড়কে কেউ কারো নয়। যে যার মতো করে এগিয়ে যাচ্ছে। দেওয়ান হাট মোড়ে এসে হঠাৎ থেমে যায় গাড়ি। সোহান চৌধুরী সীট থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। নিজেকে সামলে নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,
– কী হয়েছে, মনির? হঠাৎ গাড়ি থামালে কেনো?
– স্যার, সামনে মানুষের ভীড়। আপনি বসুন, আমি একটু দেখে আসি।
– আচ্ছা, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
– জ্বি, স্যার।
একটুপর মনির ভীড়ের মধ্যে মিশে যায়। একজন যুবক অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জল নেই অথচ চোখেমুখে জগতের হতাশা। হাতদুটো দু’দিকে। দু’জন সুন্দরী যুবতী মেয়ে দেদারসে টানছে। জামার উপরের দিকে ক’টা বোতামও ছিঁড়ে গেছে। লোকজন কেউ এগিয়ে আসছে না। শুধু দূর থেকে কয়েকজন লোক মেয়েদের ছেলেটাকে ছেড়ে দিতে বলছে। কে শুনে কার কথা। আশপাশের লোকজনের বলাবলি শুনে মনির আবার ফিরে এসে গাড়িতে উঠে বসল। পিছনের সীট থেকে সোহান চৌধুরী কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বললেন,
– ওখানে কী হয়েছে, মনির?
– স্যার, একটা লোককে দু’জন মেয়েলোক টানাটানি করছে। একজন নাকি তার বৌ। আরেকজন প্রেমিকা।
– কেউ ছাড়িয়ে দিচ্ছে না?
– না, স্যার। ওরা খুব বেপরোয়া।
– আচ্ছা, ওপাশ দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নাও।
– জ্বি, স্যার, তা-ই করছি।
মনির বিকল্প রাস্তায় গাড়ি ঘুরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।
রাস্তায় কোনো জ্যাম না থাকায় অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যান সোহান চৌধুরী। বাসায় পৌঁছেই তিনি জুলি ম্যামের নম্বরে কল দেন।
– মেম, এইমাত্র বাসায় পৌঁছেছি। এখন আবিদ সাহেবের কী অবস্থা?
– এখনও ঘুমোচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। খুব টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম,স্যার। মাথাসহ শরীর ভালোভাবে মুছে দেয়ার পর এখন ঘুমিয়ে পড়েছেন। আপনার সামনে কী এখন কেউ আছে?
– না, আমি একা।
– ম্যাডাম কোথায়?
– বিছানায় পড়ে আছে হয়তো। অসুস্থ হলে যা হয়।
– অসুস্থ মানে?
– ও হ্যাঁ, আপনাকে তো বলাই হয়নি আপনাদের ম্যাডাম আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্যারালাইসড হয়ে আছেন। আমরা দু’জন দুই রুমে থাকি। ওর দরকার হলে আমাকে ডাকে। আমার কোনো কিছুতে ও হস্তক্ষেপ করে না।
– তাহলে তো এদিক থেকে আপনি নিরাপদেই আছেন। যত্তসব বিপত্তি আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে।
– হঠাৎ এমন করে বলছেন কেনো?
– কী আর বলব। আমরা নারীরা কতো কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করি তোমরা পুরুষ সমাজ তা বুঝতে চাও না।
ওপার থেকে সোহান চৌধুরী উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন।
জুলি ম্যাম অবাক হয়ে বললেন,
– স্যার, আমি কী হাসির কিছু বলেছি! এভাবে হাসলেন যে।
সোহান চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন,
– পরমানন্দে হেসেছি। এই প্রথম আপনি আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করেছেন।
– কী বলেন, স্যার!
– হ্যাঁ, ঠিকই বলেছি। আমি আপনার তুমি বলাটা খুব উপভোগ করেছি। এখন থেকে তুমি করে বললেই আমি খুশি হব।
– আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু তুমি তো এখন আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করছ। সংস্কার হলে দু’পক্ষেরই দিক থেকে হতে হবে।
– অবশ্যই। তো রাত তো অনেক হলো। আজকের মতো ফোন রেখে দিচ্ছি। ভালো থেকো, প্রিয়তমা।
– তুমিও ভালো থেকো। আল্লাহ হাফেজ।
একদিন সিরাজুলকে সোহান চৌধুরীর কক্ষে ডাকা হলো। জুলি ম্যাম পাশের চেয়ারে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বসে আছেন। সিরাজুল কক্ষে প্রবেশ করেই সালাম দিল। সোহান চৌধুরী সিরাজুলকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললেন,
– তাহলে তোমার নাম সিরাজুল!
– জ্বি স্যার।
– অনেকদিন ধরে এ নামটা বারবার কানে বাজছিল।
– স্যার!
– হ্যাঁ, এই চিঠিটা তোমার জন্য পুরস্কার হিসেবে এসেছে।
– কীসের পুরস্কার, স্যার?
– চাকরি হতে অব্যাহতির চিঠি। তোমার কৃতকর্মের পুরস্কার। কতো বছর চাকরি করেছ এখানে?
– স্যার, পনেরো বছর। আমি কী অপরাধ করেছি? আমাকে কেনো চাকরি হতে ছাঁটাই করা হবে?
– কী করোনি বল? তুমি ফ্যাক্টরীর শ্রমিকদের মাঝে গ্রুপিং শুরু করেছো। যা কর্তৃপক্ষের নজরে আসায় এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেখো এখানে তিন মাসের বেতন দেয়া আছে। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাও।
– স্যার, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি যদি এমন কোনো কাজ করতাম তাহলে তো আমাকে সতর্ক করা হতো। তা তো করা হয়নি, স্যার।
আমাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। আমি মালিকের কাছে যাব। বিচার চাইব।
এই কথা বলে দু’চোখের জল ছেড়ে দিয়ে সিরাজুল কাঁদতে লাগল।
সোহান চৌধুরী ধমকের গলায় বললেন,
– ওসব কথা এখানে বলে কোনো লাভ হবে না। আর হ্যাঁ, মালিকের কাছে গেলে তোমার অবশিষ্ট পাওনাদি কীভাবে পাও আমি সেটা দেখে নেব।
– স্যার, আপনি এমন করতে পারেন না। আমি আপনার কী এমন ক্ষতি করেছি! স্যার, এ চাকরি করে যা পাই তা দিয়েই আমার সংসার খরচ চলে। এ চাকরি হারালে আমার বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যাবে। প্লিজ স্যার, আমাকে ক্ষমা করুন।
একথা বলে সোহান চৌধুরীর পায়ের দিকে এগুতে লাগল সিরাজুল। সোহান চৌধুরী চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বললেন,
– এই দূরে থাক। এদিকে আসছো কেনো? এমন মায়াকান্না করে কোনো লাভ হবে না। এক্ষুণি প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যাও।
সিরাজুল দু’হাতে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
– স্যার, আমি চলে যাচ্ছি। আমার সাথে আপনারা যে অন্যায় করেছেন তার ফল একদিন নিশ্চয় পাবেন। আমি চলে যাচ্ছি ঠিকই। তবে হয়তো আবার ফিরে আসব। আর হ্যাঁ, কাউকে আঘাত করে কেউ কোনোদিন পার পায় না। আপনারাও পাবেন না। খুব সহসাই আপনাদের পাপের ফল ভোগ করবেন। এই গরিবের অভিশাপে সম্মান হারাবেন।
কথাগুলো বলতে বলতে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যায় সিরাজুল।
সিরাজুল চলে যাবার পর থেকে তার পথে আরো অনেককে হাঁটতে হয়েছে। এরইমধ্যে তাদের সংখ্যা ত্রিশের ঘরে পৌঁছেছে। একদিন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাক্টরীর মালিক বারিক মজুমদারের কাছে গেল। অন্যায়ভাবে তাদের চাকরি হতে ছাটাই করা হয়েছে বলে অভিযোগ করল। পাশাপাশি সোহান চৌধুরী ও জুলি ম্যামের অপকর্মের বর্ণনা করল। অভিযোগপত্র পড়ে বারিক মজুমদার রীতিমতো থ বনে যান। তিনি মনে মনে ভাবেন, এদের কথার সাথে কিন্তু আমার ফ্যাক্টরীর বর্তমান অবস্থার অনেক মিল পাওয়া যাচ্ছে। নতুন ফ্যাক্টরী ম্যানেজার সোহান চৌধুরীকে নেয়ার পর থেকে প্রোডাকশনও কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে তো ফ্যাক্টরীর জন্য মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাবে। আমাকে এখনই এর সুরাহা করতে হবে।
এরপর তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন,
– তোমরা আমার ফ্যাক্টরীতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছো। সকলে নিজ নিজ কাজে আন্তরিক ছিলে বলেই হয়তো দিনদিন আমার ফ্যাক্টরীর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু নতুন ফ্যাক্টরী ম্যানেজারকে নিয়োগ দেয়ার পর থেকে দিনদিন লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। তোমাদের অশেষ ধন্যবাদ। তোমাদের কথা যদি সত্যি হয় তবে আমি অবশ্যই এর একটা বিহিত করেই ছাড়ব। আর হ্যাঁ, তোমরা কেউই হতাশ হবে না। আমি অতিদ্রুতই তোমাদের নক করব।
ফ্যাক্টরী মালিকের কথায় সবাই খুশি হয়ে তাকে সালাম জানিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে চলে যায়। একসপ্তাহ ধরে ফ্যাক্টরীর সার্বিক অবস্থা আঁচ করতে বিশেষ ব্যক্তি নিয়োগ করেন বারিক মজুমদার। এরপর সোহান চৌধুরী ও জুলি ম্যামের সকল অপকর্মের সত্যতার প্রমাণ পেয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন তিনি। সোহান চৌধুরীকে চাকরিচ্যুত করা, জুলি ম্যামকে সতর্কীকরণ নোটিশ প্রদান এবং ফ্যাক্টরীর চাকরিচ্যুত নিবেদিত কর্মীদের পুনরায় চাকরিতে ফিরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে আবার চলতে থাকে ফ্যাক্টরীর কর্মকাণ্ড। মাত্র আট মাসের মাথায় চাকরি হারিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন সোহান চৌধুরী। তার চোখের সামনে দিয়েই আবার সিরাজুলসহ সেই চাকরিহারা শ্রমিকরা ফ্যাক্টরীর চাকরি ফিরে পায়।
সোহান চৌধুরী চলে যাবার পর ফ্যাক্টরীতে আবারও জুলি ম্যাম একা হয়ে গেলেন। দিন যায়, মাস আসে। আসে নতুন বছর। সেই সাথে আসে নতুন ফ্যাক্টরী ম্যানেজারও। কিন্তু তিনি সোহান চৌধুরীর মতো নন। জুলি ম্যাম সম্পর্কে আগে থেকেই সবকিছু জানার কারণে নতুন ম্যানেজার তাকে নূন্যতম ছাড় দিতে রাজি নন। পড়ন্ত বিকেলে এসে জুলি ম্যাম খুব একা হয়ে গেছেন। সোহান চৌধুরীর মতো কেউ একজন হয়তো অচিরেই আসবেন। আপন করে নেবেন তাকে। এমন প্রত্যাশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তিনি।
সমাপ্ত
লেখক পরিচিতি ও যোগাযোগ :
মোহাম্মদ কবির উদ্দিন। লেখালেখি করেন কবির কাঞ্চন নামে।
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় নলচিরা ভূঁঞার হাট এলাকায় ১ জুন, ১৯৮৫ইং সনে জন্ম গ্রহণ করেন। চরঈশ্বর রায় আফাজিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে এসএসসি পাশ করেন। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে চাকরি নেন। এরপর ২০১১ সালে বিএসসি অনার্স (প্রাণিবিদ্যা), ২০১২ সালে এমএসসি (ফিশ এন্ড ফিশারিজ) এবং ২০১২ সালে বিএড (শিক্ষা) প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজ সিইপিজেড, চট্টগ্রাম-এ শিক্ষকতা করছেন।
মূলতঃ মাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকে তাঁর লেখালেখিতে আসা। প্রথম লেখা (ছড়া-অপরূপ হাতিয়া) প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে স্থানীয় দ্বীপায়ন পত্রিকায়। সেই থেকে দেশের জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিতভাবে লিখে চলেছেন একাধারে গল্প, ছড়া, কবিতা, প্রবন্ধ ও গান।
কবির কাঞ্চন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত সাহিত্যিকদের একজন। প্রতিদিনই দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় তার লেখা গল্প, ছড়া, কবিতা স্থান পাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার লেখা গানও প্রচারিত হয়েছে। তিনি ‘পাক্ষিক সৃজনী’ নামক সাহিত্যের একটি ছোটকাগজের সম্পাদনা করেন। এছাড়া তিনি স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হাতিয়ার কথা’র সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
এ যাবৎ অসংখ্য যৌথগ্রন্থের পাশাপাশি তাঁর মৌলিক ১৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
২০০৯ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ (উপন্যাস- শেষচিঠি) প্রকাশিত হয়েছে। এরপর ২০১৩ সালে উপন্যাস- আলেয়ার আলো, ২০১৫ সালে ছড়াগ্রন্থ- ফুলের বনে শিশুর হাসি, ২০১৬ সালে ছোটগল্পের বই-স্বপ্নবিলাস, ২০১৭ সালে শিশুকিশোর উপযোগী ভৌতিক গল্পের বই ‘ভুতের সাথে বন্ধুত্ব’ ও উপন্যাস- মায়াদ্বীপ, ২০১৯ সালে ছড়ার বই-কবির কাঞ্চনের শতেক ছড়া ও গল্পের বই- বিজয়ের হাসি, ২০২০ সালে ভৌতিক গল্পের বই-ভূত শেখায় ইংরেজি, ছড়ার বই- চাঁদের দেশে মায়ের হাসি, ছোটদের গল্পের বই- সুমতির গল্পস্বল্প ও ছোটগল্পের বই-উপলব্ধি এবং ২০২১ সালে ছড়ার বই-ফুলপাখিদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি দাঁড়িকমা লেখালেখি স্মৃতি পুরস্কার ২০১৬ ও কাব্যচন্দ্রিকা একাডেমি পুরষ্কার ২০২০খ্রিঃ (শিশুসাহিত্য), চলন্তিকা পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০২১ (ছড়ায়) ও জার লিমিটেড গল্প প্রবন্ধ ও কবিতা প্রতিযোগিতা-২০২০পুরস্কার (কবিতায়), অমরাবতী পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০২০ (ছড়া) বিজয়ী, কৈরব পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ১৪২৭ বিজয়ী (গল্পে) সাগরিকা পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০২০ (গল্প) বিজয়ী, সাহিত্য দিগন্ত লেখক পুরস্কার ২০২০ ও সালফি পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ২০২১ (গল্প) লাভ করেন।
অনলাইনে ফ্রি বাংলা গল্প পড়তে আমাদের সঙ্গে থাকুন। প্রয়োজনে ওয়েবসাইট রিফ্রেশ করে সাইটের ‘বন্ধু’ হয়ে যান। সেক্ষেত্রে নতুন গল্প আপডেট হলেই শুধু নোটিফিকেশন পাবেন।
এ ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপলোড হবে বাংলা রোমান্টিক গল্প, বাংলা হরর গল্প, থ্রিলার গল্প , অতিপ্রাকৃত গল্প এবং বাংলা সায়েন্স ফিকশন গল্প ।