আমজাদ ইউনুস : আবিদ। বয়স সবেমাত্র সাত বছর হয়েছে। দূরন্ত ও চঞ্চল স্বভাবের ছিল। সারাদিন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত। লাগামহীন জীবন। কোন কিছুর নির্দিষ্ট সময় নেই। যখন যা খুশি যখন যা ইচ্ছে করত। সারাদিন খেলাধুলা করে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরত । আম্মু মুখ-হাত ধুয়ে দিয়ে ঘরে নিয়ে যেতেন । কিছু খেয়ে বাংলা অক্ষরের সাথে একটু একটু পরিচয় হত। কিছুই বুঝত না। যা শিখানো হত তা তোতা পাখির মত মুখস্থ করে নিত । আবিদের পড়ালেখা ভাল্লাগে না। সারাদিন খেলতে ইচ্ছে করে। সুযোগ পেলেই সারাদিম বনবাদাড়ে ঘুরত। ফড়িংয়ের পিছু পিছু দৌড়তে দৌড়তে ক্লান্ত হয়েই সবুজ গাছে একটু জিরিয়ে নিত। ফড়িং মেরে মেরে পিঁপড়াদের দাওয়াত দিত। দল বেধে পিঁপড়া ফড়িং খেতে আসত। আবিদ পিঁপড়ার সারির দিকে থাকিয়ে দেখত। বড্ড মজা পেত। কত মিল পিঁপড়াদের মাঝে। এক সারিতে সমানভাবে পথ চলে। একটু এদিক সেদিক হয়না। মাঝে মধ্যে পরস্পর আলাপ করে। আবিদ কানখাড়া করে তাদের কথা শুনতে চেষ্টা করত। কিছুই বুঝত না সে।
আজ আবিদের নানা তাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। তার জন্য অনেক ধরনের পিঠাপুলি নিয়ে এসেছেন। সে বাহির থেকে দৌড়ে এসে তার নানাকে জড়িয়ে ধরল। আবিদ তার নানাকে অনেক ভালোবাসত। গত জন্মদিনে তার নানা তাকে অনেক গল্পের বই গিফট করেছিলেন। এমন ঝকঝকে-তকতকে রঙিন গল্পের বই সেইবার প্রথম দেখেছিল সে । বইগুলোতে অনেক মজার মজার শিক্ষণীয় গল্প ছিল। বনের অসংখ্য জীব-জন্তুর বৈচিত্ররকম জীবনের গল্পে গল্পে সাজানো ছিল।
নানা তাকে সুন্দর সুন্দর গল্প বলত। নানার মুখের শব্দগুলো বড্ড মিষ্টিমধুর ছিল । খেজুর গাছ থেকে রস যেমন টপটপ করে ঝরে নানার শব্দগুলো থেকেও তেমনি রস ঝরত ।
নানার বাড়িতে বেড়াতে গেলে তার নানা গল্পের আসর পাততেন। চাঁদনি রাতে মাদুরপাতা বিছিয়ে নানার কোলে গপ্পো শোনত। নানার পান খাওয়া দুটি সুন্দর ঠোঁট থেকে নিঃসৃত অদ্ভূত সব রূপকথা ও রোমাঞ্চকর কাহিনী ভরা জমজমাট আসরে আবিদের অনেক মজা লাগত। আবিদের পছন্দ স্নিগ্ধ মোলায়েম সবুজঘেরা গ্রাম। ইট -কংক্রিটের শহরে তার দম বন্ধ হয়ে আসে।
তার নানার কাছে হরেক রকমের গল্প গচ্ছিত ছিলো। পরতে পরতে তিনি নীল ঝিলমিল প্রজাপতির ডানার মতো গল্পগুলো তুলে ধরতেন। নানার গল্পগুলো প্রজাপতি সেজে নরোম তুলতুলে ডানা ঝাপটাত। আবিদ ডানপিটে বালকের মতো সেই প্রজাপতির পিছু নিত। প্রজাপতিটি হঠাৎ হারিয়ে যেত। সে মন খারাপ করত। নানা আবার গল্প বলতেন। তার সামনে আবার ফরফর করে প্রজাপতিটি উড়ে এসে ডানা ঝাপটাতো। তার কোমল মন তখন বেশ ফুরফুরে ঝরঝরে হয়ে যেত।
এশারের দিকে দ্রুত খাওয়া-দাওয়া করে আবিদ বিছানায় চলে গেল । ঘুমাতে নয়। আজ নানার গল্প শুনবে । নানার পাশে শুয়েই নানাকে গল্প বলতে আবদার করে বসে। ছোট্ট নাতির এমন গাল-ফুলানো, কপাল-কুঁচকানো বায়না ও আবেগ জড়ানো আবদার নানা ফেলতে পারেন না। তিনি গল্প বলা শুরু করেন। নানা হরেক রকমের গল্প শোনালেন। তবে আজ নানার একটি গল্প অন্যরকম ছিল। ব্যাঙের মানিকের গল্প । সাপ আর ব্যাঙের কাছে মানিক থাকে। যে মানিকের মালিক হবে তার কাছে সাত রাজার ধন থাকে । সে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী হবে । আবিদ আজ প্রথম সাপের মানিকের কথা শোনল। গল্পটি শুনার পর তার মানিক পেতে ইচ্ছে জাগল। সাপের মানিক দেখার সাধ জাগল। নানাকে একের পর এক প্রশ্ন করে মানিকের বিষয়ে সবকিছু জেনে নিল। নানা বিরামহীন ভাবে তার সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। গল্প শুনতে শুনতে তার চোখে ঘুম ভর করে। সে ঘুমিয়ে যায়। স্বপ্নের রাজ্যে হারিয়ে যায়।
একদিন আবিদ বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলা করছিল। হঠাৎ একটি ব্যাঙ দেখতে পেল । ব্যাঙ দেখে তার নানার সেই গল্পের কথা মনে পড়ল। সে ভীষণ খুশি হলো। আজ সে সাত রাজার ধন ব্যাঙের মানিক পেয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি ছোট একটি লাঠি খুঁজে ব্যাঙটি মারতে শুরু করল । নীরবে মারল না। ‘এই ব্যাঙ মানিক দে এই ব্যাঙ এই মানিক দে’ বলে বলে মেরেই চলল । তার চিৎকার শুনে তার মা ঘর থেকে এসে গেলেন । তাকে ঘরে নিয়ে গেলেন । রাতে সবাই তার মানিক উদ্ধার অভিযানের কথা শুনে হাসতে হাসতে সে কী অবস্থা ! আবিদ অভিমান করে অসহায় বালকের মতো খাটের এক কোণে বসে থাকল।
বাকলিয়া, চট্টগ্রাম