‘ও কি জ্ঞান হারিয়েছে?’
‘আরে নাহ, জ্ঞান হারানোর ভাণ করে পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে। দেখছো না মুখটা কেমন হা করে রেখেছে।’
যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হল, সে কিন্তু কথাগুলো ঠিকই শুনেছে। কিন্তু চোখ মেলার সাহস হল না তার। কেননা কথাগুলো কোনো মানুষের গলা দিয়ে বের হয়নি। বলছে দুটো পাখি। চোখের ফাঁক দিয়ে ওদের খানিকটা দেখে নিল অন্তু। দেখতে বড় সাইজের তোতার মতো। কিন্তু এতবড় তোতা সে আগে দেখেনি। কমসে কম আড়াই ফুট লম্বা। নীল লেজ, গায়ে হলুদ ছোপ আর গলার দিকটা লাল। পায়ের দিকে তাকাল। নাহ, ধারাল নখ নেই। নির্ভয়ে চোখ খোলা যায়।
‘তোমরা কি ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমি?’
অন্তুর কথা শুনে দুটো পাখিই চুপ। একজন আরেকজনের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। উত্তর দিল মেয়ে পাখিটা।
‘এমন নাম তো আমরা উইকিপিডিয়াতেও শুনিনি, তা ওই ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমির বৈজ্ঞানিক নামটা বলতে পারলে হয়ত চিনতে পারি।’
অন্তু বুঝতে পারল বোকামি হয়ে গেছে। উঠে বসার চেষ্টা করল। মাথায় খুব আঘাত পেয়েছে। গতকালই সিলেটে এসেছিল তারা। আর আজ বৃষ্টিতে বেরিয়েছিল জঙ্গল দেখবে বলে। ঘুরতে ঘুরতে কোথায় যেন চলে এসেছিল। তারপর শুরু হল বৃষ্টি। একটা গাছের গোড়ায় বসে অপেক্ষা করছিল। অমনি চোখের সামনে হুড়মুড়িয়ে দেবে গেল মাটি। বিশাল এক গর্ত তৈরি হয়ে গেল। উঁকি দিয়ে দেখতে গিয়েই ঘটল অঘটন। পা পিছলে সোজা গর্তের ভেতর। এরপর কিসের সঙ্গে যেন বাড়ি খেল।
‘আমি কোথায়?’
‘তুমি ওয়ান্ডারল্যান্ডে। কিন্তু তুমি যে অ্যালিস নও সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। কারণ তুমি একটা ছেলে।’
‘আর তোমরা?’
‘তুমি যেহেতু আমাদের চিনতে পারোনি, তাই আর নাম বলবো না। বাড়ি গিয়ে ভেবে করবে আমাদের নাম। আমরা এখানে এসেছি আমেরিকা মহাদেশ থেকে, বেড়াতে।’
‘কিন্তু আমি বাড়ি যাব কী করে?’
‘ওয়ান্ডারল্যান্ডে স্বাগতম মিস্টার…।’
কথাটা বলল অন্য কেউ। পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল খরগোশটাকে। স্যুট টাই পরা খরগোশ দেখেও লাফিয়ে উঠল না অন্তু। খরগোশটা বেশ ছোট।
‘আমার নাম অন্তু। তুমি?’
‘ওহ হ্যাঁ হ্যাঁ ভাল। আমাকে আপাতত মিস্টার খগু বলে ডাকতে পার।’
‘ওকে মিস্টার খগু, আমি বাসায় যেতে চাই।’
খরগোশটা উত্তর দিল না। কী যেন ভাবল। তারপর পাখিদুটোর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বলল। কথাটা শুনে পাখা ঝাপটে উড়ে গেল ওরা।
উপরে তাকাল অন্তু। গর্তের ভেতর এরকম জঙ্গল থাকবে এটা ভাবা বোকামি। কিন্তু মাথার উপর আকাশ দেখা যাচ্ছে না। একটা নীল-সবুজ আলো ছড়িয়ে আছে। পুরো জঙ্গল পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তবে কি..।
‘মিস্টার অন্তু। আপনি আমার সঙ্গে চলুন। মহান রাজা মিস্টার শুঁয়ো আপনাকে দেখতে চেয়েছেন।’
‘খগু আমরা কি মাটির তলায়?’
‘হ্যাঁ অন্তু। আমরা এখন মাটির প্রায় সাড়ে ছয়শ কিলোমিটার নিচে আছি। আর তুমি বোধহয় কথাটা বিশ্বাস করোনি। না করলে নাই, আগে রাজার কাছে চল।’
‘এত গভীরে তো বেঁচে থাকার কথা নয়।’
‘তোমরা মানুষরা এখনো এত গভীরে এসে দেখনি। এখানে কিন্তু অক্সিজেন আছে। একারণেই এটা ওয়ান্ডারল্যান্ড।’
‘কিন্তু আমি উপরে যাব কী করে!’
মিস্টার খগু জবাব দিল না। হনহন করে জঙ্গলের পথ ধরে হাঁটতে লাগলো। অন্তু চারদিক দেখতে লাগল। জঙ্গলটা বাংলাদেশের ঠিক নিচে আছে বলেই হয়তো সবাই বাংলায় কথা বলছে। সিনেমায় যে ওয়ান্ডারল্যান্ড দেখেছে ওটা তো আমেরিকার তলায় ছিল।
‘তা তোমাদের রাজা কি একজন? মন্ত্রী, সংসদ, সদস্য এরা নেই?’
‘না আমাদের এসব দরকার হয় না।’
একটা নীল খাল এসে পড়লো সামনে। পানি এত নীল কেন ভেবে পেল না অন্তু। মনে হয় ভেতরের কোনো সমুদ্রের পানি। পানির ওপর অচেনা দুটো মাছ আবার ঝগড়াও করছে। দেখতে তেলাপিয়ার মতো। কিন্তু তেলাপিয়া কি সবুজ হয়?
‘এটা নীলগিরি খাল। সোজা আটলান্টিক থেকে এসেছে। এখানে সব সমুদ্র আর নদী একটার সঙ্গে আরেকটা লাগানো আছে। বুঝলে? তবে মাছগুলো কিন্তু এখানকার।’
খালের ওপর ঝুলন্ত সেতু। তবে কাঠের বানানো নয়। সেতুটা গাছের শেকড় দিয়ে বানানো। ওটার উপর দাঁড়াতেই কাশি দিয়ে উঠল কে যেন।
‘ওহ হো।’
এই বলেই অন্তুর হাত চেপে ধরল মিস্টার খগু। পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল বুড়ো গাছটাকে।
‘স্যরি বটু মিয়া। ভুলে গিয়েছিলাম। বয়স হয়েছে তো, সব মনে থাকে না। ইয়ে অন্তু। একটা সমস্যা আছে। তোমাদের ওখানে সেতু পার হতে গেলে টাকা দিতে হয় জানো তো, কিন্তু এখানে টাকা বা ডলার বলে কিছু নেই। এখানে তোমাকে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।’
‘প্রশ্ন?’
‘ধাঁধার জবাব দিতে পারলেই সেতু পার হতে পারবে।’ বট গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বটু মিয়া একটু সহজ দেখে ধাঁধা জিজ্ঞেস কর, ছেলেটা নতুন এসেছে ওয়ান্ডারল্যান্ডে।’
বটু মিয়া ওরফে বট গাছটা অন্তুর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘ধর একটা সেতুতে এক হাজার পাটাতন আছে। তুমি যদি দুটো বাদ দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যাও, তবে কতটা পাটাতনে তোমার পা পড়বে?’
অন্তু বলল, ‘এক মিনিট একটা ভাগ করতে হবে।’
এক মিনিটও লাগল না উত্তর পেতে। বটু মিয়াকে উত্তরটা বলতেই হাসিমুখে বলল, ‘এবার তোমরা যেতে পার।’
দশ মিনিট ধরে হাঁটল দুজন। হুট করে সামনে পড়লো দুটো সূর্যমুখি গাছ। ভীষণ ঝগড়া করছিল তারা।
‘তুই গাধা, এটা হবে কেওকারাডং।’
‘আরে না এটা তাজিংডন হবে!’
অন্তু এগিয়ে যেতেই দুজন একসঙ্গে প্রশ্নটা করল তাকে।
‘আচ্ছা ভাই তুমিই বলতো, মাউন্ট এভারেস্ট আবিষ্কারের আগে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় কোনটা ছিল? কেওকারাডং নাকি তাজিংডন?’
অন্তু উত্তরটা দিতেই চুপ হয়ে গেল দুজন। আর ঝগড়া করলো না।
চারদিকে রঙের ছড়াছড়ি। অন্তুকে দেখে পাখিগুলো সব চোখ কুঁচকে তাকালেও কেউ এগিয়ে এল না। ততক্ষণে রাজা শুঁয়োর দরবারে পৌঁছে গেল দুজন। রাজা সবে আয়েশ করে একটা লেটুস পাতায় কামড় দিতে যাচ্ছিলেন এমন সময় খগু এসে আস্তে করে কাশি দিল।
‘মহান শুঁয়ো রাজা, ওয়ান্ডারল্যান্ডে অতিথি এসেছে। নাম অন্তু।’
‘এ্যাঁ.. এটা একটা নাম হল? আজ থেকে ছেলেটার নাম গাবলু। হে হে হে। মজা করলাম। কিছু মনে কর না অন্তু। তা ওয়ান্ডারল্যান্ডটা ঘুরে দেখেছ তো?’
‘আমি বাড়ি যাব। সন্ধ্যে হলে বকা খেতে হবে।’
‘তা যাবে, টিকিট কেটেছ?’
‘এ্যাঁ! না তো! কতো টাকা টিকিট, কোথায় পাব?’
মিস্টার খগু অন্তুর কানে কানে বলল, ‘আরে বোকা, তোমাকে বলেছি না এখানে টাকা পয়সা নেই। টিকিট কাটতে হবে তোমাকে দুটো ধাঁধার সমাধান দিতে হবে।’
অন্তুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে গা দুলিয়ে হাসলো রাজা শুঁয়ো।
‘হে হে খোকা, তুমি আমার সামনে আসতে পেরেছ মানে তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান। ধাঁধার সমাধান পেয়ে যাবে, ভয় পেও না।’
‘কী ধাঁধা জলদি বলুন রাজা মশাই।’
রাজা শুঁয়ো তার পাতার ঘরে ঢুকে পড়লেন। হাতে একটা বই। একটা পৃষ্ঠা উল্টালেন। ভাল করে কেশে নিলেন।
‘হুম…। প্রথম ধাঁধা, তিনটে বিড়াল যদি তিন মিনিটে তিনটে ইঁদুর ধরতে পারে, তাহলে ৯৯ মিনিটে ৯৯টা ইঁদুর ধরতে কয়টা বিড়াল লাগবে?’
দেরি না করে রাজা দ্বিতীয় ধাঁধাটা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার চামড়া তুলে নিলেও আমি কাঁদবো না, কিন্তু তুমি ঠিকই কাঁদবে। বলতো আমি কে?’
অন্তু বুঝল, ধাঁধার উত্তরগুলো ভেবে বের করতে হবে। উত্তর অত সহজ নয়। আর ভাবতে ভাবতে আজব দেশটা আরেকটু ঘুরেও দেখা যেতে পারে। এই ভেবে মিস্টার খগুকে ইশারা করতেই সে লাফিয়ে উঠলো। রাজার সামনে বেশিক্ষণ থাকলে তার অস্বস্তি লাগে। অন্তুর সঙ্গে ঘুরতে পারলেই যেন সে বাঁচে।
তোতার মতো দেখতে পাখি দুটোর নাম কী?
সূর্যমুখি ফুল ও বটু মিয়ার ধাঁধার উত্তর কী?
রাজা শুঁয়োর তিনটি ধাঁধার সমাধান কী হবে?
(ধাঁধা গল্পটি লিখেছেন ধ্রুব নীল)