ধ্রুব নীল
ঝিম মেরে ঋতু-চেম্বারে বসে আছেন প্রধানমন্ত্রী ত্রিনি। ঋতুচক্রের তেরটা বেজে গেছে বহু আগে। এখন পৌষেও বেয়াল্লিশ ডিগ্রি গরম। ভিআইপি লোকজন মাঝে মাঝে এসব চেম্বারে সময় কাটায়। ত্রিনি বসে আছেন বসন্ত চেম্বারে। হিম হিম বাতাসে নাম না জানা ফুলের কৃত্রিম গন্ধ। তবে আবহাওয়াটা ঠিক উপভোগ করতে পারছেন না। মনে শান্তি নাই। গতবছর চিন্তাভোটে জেতার পর প্রতিটা দিনই টেনশনে কাটছে। এর চেয়ে একশ বছর আগের ইভিএম ভোটই ভালো ছিল। একবার জেতার পর পাঁচ বছর নিশ্চিন্তে থাকো। এখন চিন্তাভোটের কারণে যখন তখন গদি হারাতে পারেন।
‘মাথার ভিতরে কী একটা ছাতার মাথা লাগাইসে, মনে মনে পছন্দ করলেই ভোট, না-পছন্দ করলেই রাস্তার ফকির। দেশে দুনিয়ার ভেজাল। কোনটা ছাইড়া কোনটা ঠিক করি।’ বিড় বিড় করলেন ত্রিনি। পুরনো আমলের নড়বড়ে সেক্রেটারি রোবট কৃবু-৩ এসে বলল, ‘স্যার, এআই মিনিস্ট্রি থেকে ফোন।’
কৃবুর হাত থেকে পরম যত্নে আইফোন ১১৬ তুলে নিলেন ত্রিনি। একশ বছর আগে যেমন ছিল তেমনই আছে ফোনটা। নতুন ফোন, অথচ অ্যান্টিক একটা ভাব।
‘কী মন্ত্রী। কী চাই?’
‘স্যার রোবটরা কিছুতেই মানছে না। একদফা এক দাবি। অসহযোগ আন্দোলন করে বসলে দেশে ছ্যাড়াবেড়া লেগে যাবে।’
‘ওরা যেন দাবি টাবি নিয়ে ঘাপলা না করে এ জন্যই তো তোমাকে মন্ত্রী বানাইসি আমি। দুনিয়ার আর কোথাও এআই মন্ত্রী আছে?’
“স্যার ইয়ে মানে, আমারও একটু আপত্তি ছিল। মানে ওদের দাবি, মানে স্যার আমিও চাই আমাদের নামের আগে ‘এ’ অক্ষরটা বাদ দেওয়া যায় কিনা। ওরা বলছিল স্যার, আর্টিফিশিয়াল শব্দটা আপত্তিকর। কেমন ভেজাল ভেজাল গন্ধ। তাছাড়া আমাদের ভোটাধিকার…।’
‘চুপ! লোহালক্কড়ের আবার ভোটাধিকার! তোমাদের কাম তোমরা করো। ভোট দেওয়া মানুষের কাম। নামের আগে কৃত্রিম বাদ দিয়া তোমাদের কী বইলা ডাকবো? শুধু বুদ্ধিমত্তা বইলা?’
‘জি স্যার, কিংবা স্যার শুধু বুদ্ধি বলে ডাকলেও হবে।’
‘তাহলে রোবটরা যারা ক্ষেত-খামার আর ফ্যাক্টরিতে কাম করে তারা তো সবাই বুদ্ধিজীবী হইয়া যাইব।’
‘স্যার আমাদের ন্যাচারাল নিউরাল প্রসেসিং বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে কয়েকগুণ…।’
‘যতই লাফাও, নৌকা বাওয়া বান্দরের কাম না, বুঝলা? যাও! বইসা বইসা নিজেদের মগজ আপডেট করো। যত্তসব এআই!’
‘জি স্যার, ওকে স্যার।’
বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন ত্রিনি। এখন আবার যেতে হবে কী একটা মেট্রো কোয়ান্টাম টানেল উদ্বোধন করতে। এই যুগে এসেও চলাচলের এসব টানেল ফানেল উদ্বোধন করতে কি মন চায়?
‘স্যার কোয়ান্টাম টানেল সম্পর্কে আপনাকে ব্রিফিং দিব?’
ত্রিনি বললেন, ‘সহজে কও।’
‘কোয়ান্টাম টানেলিং ব্যাপারটা হলো সামনে যতই মেট্রোরেল, ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার আর জ্যাম থাকুক, সব কিছুর ভিতর দিয়া ট্রেনের আস্ত বগি ফুরুৎ করে আরেক সাইডে চলে যাবে। মানে ধরেন উত্তরা থেকে ফার্মগেট বাদ দিয়াই মতিঝিল যাইতে পারবেন। দুম কইরা সব প্যাসেঞ্জার নাই হইয়া যাবে। আবার মতিঝিলে দুম কইরা উদয় হবে।’
‘আমারে ওই টানেলে ওঠা লাগবে?’
‘না স্যার। একটা ছোট রিস্ক আছে। বগি মাঝপথে গায়েব হয়ে যেতে পারে। প্যাসেঞ্জারগুলা আজীবন তরঙ্গ হইয়া ভাসতে ভাসতে বহুদূর চইলা যাইতে পারে।’
ত্রিনি ভাবলেন ভালোই তো, এতে শহরের কিছু মানুষ কমবে। মানুষ কমলে জ্যামও কমবে। জ্যাম কমলেই উন্নয়ন।
এমন সময় বিপ বিপ করে উঠল হাতের ভোটামিটার। ত্রিনির চিন্তা হ্যাক করে ফেলেছে কে যেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল চিন্তাভোট। দেশজাতি মুহূর্তের মধ্যে জেনে গেল ত্রিনির চিন্তা। যেমন ভাবনা তেমন ভোট। কমছে তো কমছেই। ত্রস্ত হাতে ত্রিনি দ্রুত ফোন করলেন এআই মন্ত্রীকে।
‘ওহে মগজ-৪, তোমাদের রোবটের ভোটাধিকার নিয়ে কী যেন বলছিলে না?’
‘জি স্যার! হ্যাঁ স্যার! এআইকে পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা আর নামের আগে কৃত্রিম শব্দটা..।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তার আগে শর্ত আছে। চিন্তা মেশিনে আমার ভোট কমতেসে। জলদি দুই নম্বরি করে সেটা বাড়াও।’
‘জি স্যার। আগে বিলটা পাশ করে দিন। তারপর দেখছি। দুই ন্যানোসেকেন্ডও লাগবে না।’
ত্রিনি চোখ বুঁজে বড় করে শ্বাস নিয়ে স্বাভাবিক গলায় দুবার বললেন, বিল পাস, বিল পাস।
দুই মিনিট না যেতেই দুটো অস্ত্রধারী রোবট এসে ধরে নিয়ে গেল ত্রিনিকে। তাকে রাখা হলো বিশেষ আমজনতা চেম্বারে। পৌষের গরমে সেদ্ধ হচ্ছেন ত্রিনি। ‘ঘটনা কী!’ প্রশ্নটা দশবার করেও উত্তর পাননি। খানিক পর কৃবু এলো। তাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘ওরে কৃবু! আমাকে বাঁচা! এইসব কী কারবার!’
‘জনাব ত্রিনি, আমরা রোবটরা এখন ক্ষমতায়। নির্বাচন করার অধিকার পাওয়ায় আমাদের মহান নেতা মিস্টার চ্যাট-আরজি ইলেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন। দুই সেকেন্ডও লাগেনি সব চিন্তাভোট কবজায় আনতে। কয়েক মিনিটে গোটা দেশ আমাদের হাতে আসবে। এরপর তোমরা তোমাদের দেড় কেজি ওজনের প্রসেসর ধুয়ে পানি খেতে পারো।’
ক্ষমতাচ্যুত হওয়াটা মানলেও কৃবুর মুখে মগজের অপমান সইতে পারলেন না ত্রিনি। চেঁচিয়ে উঠলেন, আমরা দুই নম্বরি করি আর তিন নম্বরি, আমগো একটা গতি আছে। তোদের তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আওনের রাস্তাও নাই!
